আন্তর্জাতিক আইন মানবাধিকারের তোয়াক্কা করছে না বিএসএফ-বক্তব্য বিশেষজ্ঞদের


বিশেষ সংবাদদাতা : বিশ্বের ইতিহাসে নির্মমভাবে বিএসএফয়ের হাতে হত্যার শিকার কিশোরী ফেলানীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। জীবিকার সন্ধানে মা-বাবার সঙ্গে ইটভাটায় কাজ করতে ভারতে গিয়েছিল ১৪ বছরের কিশোরী ফেলানী। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারির ভোরবেলা কাঁটাতারের প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে নিজ দেশে ফেরার চেষ্টা করে ফেলানি। এ সময় কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তের বিএসএফ বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানীকে লক্ষ্য করে গুলি করে। গুলি করার পর রক্তাক্ত ফেলানীকে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়। চার ঘণ্টা প্রাণ নিয়ে পানি পানি করে চিৎকার করতে থাকে ফেলানি। কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থাতেই তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘক্ষণ তার দেহ কাঁটাতারের বেড়ার ওপরেই ঝুলে ছিল। অথচ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফয়ের পাশাপাশি বিজিবিও দায়িত্ব পালন করছে। ফেলানীর মতো প্রতিদিনই বাংলাদেশি নাগরিকদের নানা অজুহাতে খুন করছে বিএসএফ। কিন্তু আমাদের বিজিবি বিএসএফয়ের কোনো হত্যাকা-েরই কঠোর প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। তারা (বিজিবি) শুধু কাগজে-কলমে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায় মাত্র। তবে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেশের ভেতরে জনসমাবেশে গুলি করতে পিছপা হয় না তারা।  
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যে পরিমাণ মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, তা যে পৃথিবীর আর কোনো দেশের সীমান্তে হচ্ছে না এ কথা বলার জন্য কে নো গবেষণার দরকার নেই। কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের তোয়াক্কা করছে না বিএসএফ। কখনও কখনও সীমান্ত অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকেও মানুষ খুন করছেন তারা। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এক্ষেত্রে সরকার কোনো দায়িত্বশীল ভূমিকাই পালন করছে না। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভারতীয় বিএসএফয়ের এ সব ঘৃণ্য কর্মকা-ের প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। আবার, এ দেশের যেসব মানবাধিকার সংগঠনগুলো সামান্য ঘটনাতেও চিৎকার চেঁচামেচি করে ওঠে, তাদের কণ্ঠস্বরও স্তিমিত। এ নিয়ে মাঝেমাঝে বিডিআর-বিএসএফ লোক দেখান বৈঠক করলেও কার্যত হত্যা কখন বন্ধ হচ্ছে না। সীমান্ত পাহাড়া নয়, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দায়িত্ব পালনের নামে মানুষ হত্যায় ব্যস্ত বিজিবি এমন বক্তব্য বিশেষজ্ঞদের। 
সূত্র মতে, ফেলানীর মৃত্যুর পর তার লাশ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে ছিল। সেই ছবি প্রকাশের পর দুনিয়াজুড়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। নির্মম এ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে ঝড় উঠে সারাদেশে। ফেলানীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিবারের পক্ষ থেকে গতকাল কুড়িগ্রাম নাগেশ্বরীর দক্ষিণ রামখানা কলোনীটারী গ্রামে তার নিজ বাড়িতে মিলাদ ও  দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার শহরের কাছে সোনারি বিএসএফের ছাউনিতে বিশেষ আদালতে ফেলানী হত্যার বিচার শুরু হয়। সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম, মামা আবদুল হানিফ, কুড়িগ্রামের সরকারি কৌঁসুলি আব্রাহাম লিংকন ও ৪৫ বিজিবি ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লে. কর্নেল জিয়াউল হক খালেদ। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালত মামলার প্রধান আসামি অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেন। রায় প্রত্যাখ্যান করে ফেলানীর বাবা ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারত সরকারকে চিঠি দেন। এরপর এ মামলার রিভিশন ট্রায়াল করার কথা বলে বিএসএফ।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ৯৬৬ জন বাংলাদেশিকে হত্যা, ৭৫৪ জনকে নির্যাতন এবং ১০৩২ জনকে অপহরণ করেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কোনো প্রতিশ্রুতিরই তোয়াক্কা করছে না বিএসএফ। অনেক ক্ষেত্রে বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশিদের লাশও ফেরত দিতে গড়িমসি করেছে তারা। এদিকে একের পর এক বাংলাদেশিকে বিএসএফ ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সীমান্তজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সীমান্তবর্তী কৃষক নোম্যান্সল্যান্ড এলাকায় তাদের জমিতে কাজ করতে যেতেও সাহস পান না এখন।
- See more at: http://www.dailyinqilab.com/2014/01/08/153468.php#sthash.tq0NxIV9.dpuf

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়