গৃহকর্মী থেকে লেখিকা এক বাঙালি নারী
- Get link
- X
- Other Apps
অনলাইন ডেস্ক | আপডেট: ১১:০৯, জানুয়ারি ০৬, ২০১৪
এখনো ৪০ না পেরোনো বেবি হালদারের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস এর মধ্যেই ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, জাপানিসহ মোট ১২টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ভারতের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত তো বটেই, দুনিয়ার সেরা বইমেলা আর সাহিত্যের আসরগুলোতেও আমন্ত্রিত হিসেবে কথা বলতে গেছেন তিনি। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, নিজেকে কখনোই লেখিকা হিসেবে পরিচয় দিতে চান না বেবি। অসাধারণ জীবনযাপনের মতোই অনন্য এক ভঙ্গিমায় বলেন, ‘আমি একজন গৃহকর্মী, লেখক নই।’
২০০৬ সালে ‘আ লাইফ লেস অর্ডিনারি: আ মেমোয়ার’ নামে তাঁর প্রথম উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের পরপরই আলোচনায় আসেন বেবি। নিজের জীবনসংগ্রামের গল্প নিয়ে ‘আলো আঁধারি’ নামে বইটির প্রথম প্রকাশ হয়েছিল হিন্দি ভাষায়, ২০০২ সালে। প্রথম উপন্যাসের ধারাবাহিক হিসেবে ২০১০ সালে ‘ঈষত্ রূপান্তর’ নামে প্রকাশ হয় তাঁর দ্বিতীয় বই। সামনের মাসেই এর ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ হওয়ার কথা। আর নিজের শৈশব-কৈশোরের গল্প নিয়ে বেবির তৃতীয় উপন্যাস এ মাসেই প্রকাশের অপেক্ষায় আছে।
ইতিমধ্যেই দুটি বই বেরিয়েছে তাঁর, শিগগিরই প্রকাশের অপেক্ষায় আছে আরেকটি, তবুও বেবি কেন এভাবে কথা বলেন? তা জানতে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে দুই দশক আগে। পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুর থেকে নয়াদিল্লিতে পাড়ি জমিয়ে গৃহকর্মীর কাজ নিয়েছিলেন বেবি। জীবনের দুঃসহ অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কোনো সহায়সম্বল ছিল না তাঁর। গ্রামীণ জীবনের নিষ্ঠুরতা থেকে পালিয়ে এসে পরিত্রাণ মেলেনি রাজধানীতেও। ওই কঠিন কংক্রিটের নগরে অনেক নির্মম অভিজ্ঞতার মুখোমুখিই হতে হয়েছে তাঁকে। গৃহকর্তার নিপীড়ন থেকে বাঁচতে কাজ ছেড়ে পালিয়েছেন আবার। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি।
বেবির জীবনের মোড় ফিরেছিল হরিয়ানার গুড়গাঁওতে এসে। এখানে নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক প্রবোধ কুমারের বাড়িতে কাজ নেন বেবি। শুধু গৃহকর্মীর কাজ নয়, এখানে আশ্রয়ও মেলে তাঁর। ১৪ বছর ধরে এখানেই আছেন। এখানেই বাড়ির ছাতে একটা অস্থায়ী ঘরে থাকেন তিনি।
৮০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক প্রবোধ কুমার শুধু বেবির গৃহকর্তাই নন, তাঁর বইয়ের অনুবাদকও। বেবি সম্পর্কে তিনি জানান, ‘বাড়িতে কাজ নেওয়ার পর থেকেই লক্ষ করতাম বইয়ের প্রতি খুবই আগ্রহ মেয়েটার। সময় পেলেই শেলফ থেকে কোনো একটা বাংলা বই নিয়ে খুব মন দিয়ে পড়ছে ও। ওর সঙ্গে কথা বলার পর বুঝতে পারি, ওর নিজের গল্পটা ও বলতে চায়।’ এভাবেই সপ্তম শ্রেণী পাস বেবির হাতে একদিন কাগজ-কলম ধরিয়ে দিয়ে মাতৃভাষায় নিজের জীবনের গল্প লেখা শুরু করতে বলেছিলেন তিনি।
লেখালেখি শুরুর সে সময়ের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বেবি বলেন, ‘কলমটা হাতে নিয়েই কাঁপতে শুরু করেছিলাম আমি। স্কুল ছাড়ার পর তো আর কিছু লিখিনি। কিন্তু লেখা শুরু করার পর যেন আপনা থেকেই সব হতে থাকল। সত্যি বলতে কি, লেখাটাই যেন আমার ধ্যান আমার আশ্রয় হয়ে দাঁড়াল।’
প্রবোধ জানান, বেবির লেখাগুলো ছিল খুবই গভীর বোধসম্পন্ন। নিজের ভালো লাগা থেকে বন্ধুবান্ধবদের সেসব দেখিয়েছিলেন তিনি। এরপর সবাই মিলে উত্সাহ জোগান বেবিকে। শুরু করেন বেবির লেখা অনুবাদের কাজও। এভাবেই শুরু। বেবির লেখা হিন্দিতে অনুবাদের কাজ নিজেই করেন প্রবোধ কুমার। এরপর একে একে বেরিয়েছে তিনটি বই। প্রকাশকদের সহায়তায় সেসব অনুবাদ হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায়।
লেখালেখিই এখন বেবির নেশা এবং পেশা হলেও এতদিনের কাজ ছেড়ে যাননি বেবি। প্রবোধের আশ্রয়ে, স্নেহেই দ্বিতীয় জন্ম তাঁর। তাঁকে পিতার মতোই শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন। তাই তাঁকে ছেড়ে যেতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন বেবি। তবে, একসময় কলকাতায় বসবাস শুরু করার ইচ্ছা আছে জানিয়ে বেবি বলেন, বাংলায় লেখালেখির জন্য কলকাতাই সেরা জায়গা।
অরুন্ধতী রায়, তসলিমা নাসরিন আর ঝুম্পা লাহিড়ির লেখার ভক্ত বেবি। তসলিমার ‘আমার মেয়েবেলা’ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বই। তসলিমার সঙ্গে অনেকবার দেখাও হয়েছে বেবির। প্রতিবারই তাঁকে অনেক উত্সাহ দিয়েছেন তসলিমা।
জীবনসংগ্রামে বরাবরই নিজের দুই সন্তানকে সর্বস্ব দিয়ে আগলে রেখেছেন বেবি। তাঁর ছেলে তাপসের বয়স এখন ২০, আর মেয়ে প্রিয়ার ১৭। লেখালেখির আয় থেকেই কলকাতায় একটা বাড়ি বানিয়েছেন বেবি হালদার। গুড়গাঁও ছেড়ে আসার সময় হলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে কলকাতাতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চান বেবি।
- Get link
- X
- Other Apps
Comments