নক্ষত্র যত দূরেই হোক তা কিন্তু আমাদের খুব কাছেই
নক্ষত্র যত দূরেই হোক তা কিন্তু আমাদের খুব কাছেই
সাবিত সারওয়ার
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। হেমন্তের সন্ধ্যা। ভালোই লাগছে। পশ্চিম আকাশে জ্বল জ্বল করছে জিলহজের তিলক চিহ্ন। নতুন চাঁদ। একেবারে স্বচ্ছ ছুরির মত। এমন দৃশ্য সর্বশেষ কবে দেখেছি তাও মনে নেই। মনে করারও তাগিদ নেই মনে। শুধু বুঝলাম ওটা ঈদের চাঁদ। যান্ত্রিকতার ভিড়ে ওর জৌলুস দেখে নিতান্তই ভ্রুকূটি মনে হচ্ছে। তুলনা খুঁজতে চেষ্টা করলাম। সামনে এসে দাঁড়াল ভাঙাচোরা এক মূর্তিদৃশ্য। যার ভ্রু-ভঙ্গিমায় মিশে ছিল বিরক্তির রক্তিম আভা। শেলীর অজিমেন্ডিয়াস মূর্তিটির সাথে এর প্রকৃত তুলনা চলে।
চলন্ত রিকশায় বসে আছি। রিকশা এগিয়ে চলছে দ্রুত। গন্তব্য দৈনিক নয়া দিগন্ত অফিস। বৈচিত্র্যের ঈদ সংখ্যার কাজ চলছে প্রস্তুতির শেষ প্রান্তে প্রায়। জাকির ভাইয়ের একটি কবিতা নিতেই এখানে আসা। আমার দৃষ্টিতে তিনি একজন ভাল মানুষ। দৈনিক পত্রিকার একজন সাহিত্য সা¤পাদক হিসেবে নয়। কবি জাকির আবু জাফরকে কেতাদুরস্ত একজন ভদ্রলোক হিসেবে অনেকে পছন্দ করেন। তারুণ্যের প্রতি তার এক ধরনের ভালবাসা তরুণদেরকেও আকৃষ্ট করে।
অনুমতি চেয়ে ঢুকে পড়লাম তার রুমে। ছোট একটি কক্ষ। সুন্দর ফিটফাট। রুমে চমৎকার একটি বুক সেলফ। সেলসে সাজানো রয়েছে আদিকাল থেকে বর্তমান সময়ের নামিদামি লেখকদের সংকলন। আমি যে চেয়ারটিতে বসে আসি তার পাশে আরো একজন ভদ্রলোক বসা। তিনি অনর্গল কথা বলে চলেছেন। আলাপচারিতায় তিনি বুঝাতে চাইলেন- তিনি কবি। আমিও বুঝলাম তিনি কবিÑ কক্ষচ্যুত কবি। তার পর খানিকক্ষণ আড্ডা হল। জাকির ভাই আমাকে বৈচিত্র্যের জন্য একটি কবিতার খাম ধরিয়ে দিলেন। সাথে নয়া দিগন্তের ঈদ সংখ্যা। না আমাকে নয়। বৈচিত্র্য সম্পাদক কবি শাহীন রেজার। লেখক কপি। আমি হেসে বল্লাম এতটুকুন বসাতেই যদি এতোকিছু পেয়ে যাই তবে আরো কিছুক্ষণ বসিÑ নিশ্চই আরো কিছু পাওয়া যাবে। জাকির ভাই হাসলেন এবং সেই সাথে আমাকেও দুটি সংকলন গিফট করলেন। আমি খুশি হলাম। কৃতজ্ঞচিত্তে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলাম এবং বললাম তাহলে কি এবার উঠতেই বলছেন? তিনি আবারো হাসলেন। বল্লেনÑ না মিয়া বস। বসতেও চাইলাম কিন্তু আর হল না। ফজল ভাই দাঁড়ানো নিচে। অনেক দিন দেখিনি তাকে। আমরা নিচে নামলাম। ফজল শাহাবুদ্দীন মানেই আড্ডার হাট। চমৎকার গল্প আর বুদ্ধিদীপ্ত উক্তির সমাহার। তার ঠোঁট যেন কথা তৈরির কারখানা। আমরা একত্রে বসলাম হোটেলে। নয়া দিগন্তের নিচে। ফজল ভাই ডিম-পরোটার অর্ডার দিলেন। ডিম-পরোটার সঙ্গে আমাদের আড্ডাও বেশ জমে উঠল। আড্ডা ও ডিম-পরোটার চেয়ে আড্ডাই যেন বেশি মজার। আমার ধারণা তার আড্ডা কেবল আড্ডাই নয়। জীবন জগৎ সম্পর্কে জানবার অপ্রাতিষ্ঠানিক এক পাঠশালা। বিশেষ করে একজন কবির জীবন জগৎ সম্পর্কে কাছ থেকে দেখবার এ এক মহাসুযোগ।
স্বীকার করি তার সাথে আড্ডা দেবার কিছু সমস্যাও আছে। অনেকেই সেটা বলেন। যারা কাছ থেকে তাকে দেখেছেন তারা তা অকপটে বলে বেড়ান। কিন্তু সবকিছুর পরেও ব্যক্তিগতভাবে আমার ভাল লাগে তার সংস্পর্শে যেতে। গোলাপের চারপাশে কিছু কাটা তো চির কালই ছিল। তাই বলে গোলাপের প্রতি আকর্ষণ কি কোন জšে§ হ্রাস পেয়েছে? তা নিশ্চয় নয়। তবে আর সমস্যা কোথায়। শাপলা হাতের কাছেই মেলে। ওর সুন্দর হাসিতে কেবল চোখের প্রশান্তি মেলে। অনুভূতিকে আকৃষ্ট করতে গোলাপের প্রয়োজন। গোলাপের জন্য কাটার আঘাত সইতে আপত্তি কেন! অনুভূতিকে উজ্জীবিত করতে আমার গোলাপ দরকার। আমি ফজল শাহাবুদ্দীনের মাঝে শুধু গোলাপের ঘ্রাণ নয় শাপলার শুভ্র হাসিও দেখেছি। এরই মধ্যে হোটেল বয় জিজ্ঞেস করল স্যার আর কি খাবেন ? ফজল ভাই বল্লেনÑ দুধ চা দাও। আমার ব্যস্ততা সত্ত্বেও কাটিয়ে দিলাম পুরো দুঘণ্টা। একটু সমস্যা হলেও ক্ষতি হয়নি কিছুই। বরং অভিজ্ঞতার ঝুলিতে সঞ্চিত হল বিচিত্র্য এক জীবনবোধ। যা কিনা একজন কবির একান্ত নিজস্ব। কবি বলেই হয়তো তার পক্ষে এমনটা সম্ভব। আমিও মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। কেননা গত দুবছর আগে একই কারণে আমি বাবাকে হারিয়েছি। ঘটনাটি ক্যান্সার সংক্রান্ত। শুনে কিছুটা অবাকই হলামÑ ক্যান্সার! ফজল শাহাবুদ্দীনের! তার মানে তো নির্ঘাৎ মৃত্যু। কই ফজল ভাই তো আগে কখনও বলেনি তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। না এখন নয় জীবনের কোন এক বাকে ঘটে যাওয়া ঘটনা। তার ইতিবৃত্ত উঠে এলো আমাদের আড্ডায়। না শুধু আমাকে নয় তিনি কাউকে বলেনি এতোদিন। এমনকি একমাত্র সহধার্মিণীকেও নয়। আমি অবাক হয়ে ভাবছি এটা কিভাবে সম্ভব। ঘটনাটি শুনলাম তার নিজের মুখেই। ডাক্তার বল্লেনÑ আপনার দেহে ক্যান্সারের জীবাণু। ৬ মাস আপনাকে ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। তার পর পরিষ্কার বোঝা যাবে আপনি ক্যান্সারে আক্রান্ত কি না। ডাক্তার প্রশ্ন করলেন ধরুন ৬ মাস পর প্রমাণিত হল আপনি ক্যান্সারে আক্রান্ত তখন কি করবেন? ফজল ভাইযের সহজ উত্তরÑ কি আর করব, কিছুই করব না। যদি তা-ই হয় তবে মারা যাব আর তা না হলে আমার সৌভাগ্য, আমি বেঁচে যাব। ডাক্তার উত্তর শুনে চমকে উঠলেনÑ যেখানে জীবন মরণের প্রশ্ন যেখানে কিভাবে সম্ভব এত সহজ ও স্থির থাকা। শুনে আমারও প্রথম তা-ই মনে হয়েছিল। পরে বুঝলাম একজন প্রকৃত কবির প্রকৃতিতে বাঁচা-মরার পার্থক্য কেবল কর্মের মাঝেই নিহিত। গৃহপালিত পশুর মত কেবল বেঁচে থাকাই জীবনের সফলতা নয়। বরং জীবন ও বাস্তবতার রূঢ় নির্যাসে সিক্ত হতে হতে জীবনের অর্থকে উপলদ্ধি করাই জীবনের মূল রহস্য। আর মৃত্যু? সে তো অমোঘ সত্য-শরাব। ইচ্ছে হোক বা না হোক তা পান করতেই হবে। এবার শুরু হল ওষুধ খাওয়ার পালা। ৬ মাসের কোর্স শেষ হল। আবারও চললো পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কথা ছিল এবার বোঝা যাবে তার দেহে ক্যান্সারের জীবাণু আছে কি না। থাকলেও তার পরিমাণ কি। প্রথম ৬ মাসের কোর্স শেষ হলে ডাক্তার বল্লেনÑ স্যরি কবি সাহেব কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আপনাকে আরও ছয় মাস মেডিসিন চালিয়ে যেতে হবে। কি আর করা কাউকে জানালেন না ফজল ভাই। জানানোর প্রয়োজনও বোধ করলেন না।
অবশেষে একদিন ভাবির হাতে ধরা খেয়ে গেলেন কবি। ভাবি জিজ্ঞেস করলেন তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে কিসের ওষুধ খাচ্ছো? ভাবির জোরাজুরিতে ফজল ভাই বল্লেন এটা একটা খারাপ ঔষধ। ভাবি পড়লেন মহা চিন্তায়Ñ খারাপ ওষুধ! অথচ ফজল ভাইকে দেখে কারও বোঝারও উপায় নেই। তিনি চলছেন তার চিরাচরিত নিয়মে। হাসি, আড্ডা, কবিতা পাঠ ইত্যাদিতে ব্যস্ত সমস্ত কেটে যায় তার দিন। এক পর্যায়ে ভাবির জোরাজুরিতে গেলেন তার এক ডাক্তার বন্ধুর কাছে। তিনি ক্যান্সার বিশেষ্ণ। ভদ্রলোক বহুদিন পর বন্ধুকে কাছে পেয়ে উচ্ছ্বাসে হেসে উঠলেন। সব কিছু শুনে তিনিও বেশ গম্ভীর । রিপোর্টপত্র দেখে কবিকে আশ্বস্ত করলেন এবং ভাবিকে পাশের রুম থেকে ডাকলেন। ডাক্তার সাহেব তার সামনেই সমস্ত অবস্থা বর্ণনা করলেন। ভাবি শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকালেন ফজল ভাইয়ের দিকে। বল্লেনÑ এতো বড় ঘটনা অথচ আমাকে কিছুই বলনি। ফজল ভাই একটু হাসলেন। ডাক্তার সাহেব কবি-দম্পতির জন্য আপ্যায়নের ব্যবস্থা করলেন। পিয়নকে ডেকে বিরিয়ানির অর্ডার দিলেন।
আড্ডায় ডুবে আমাদের ডিম-পরোটা কখন যে শেষ হয়ে ঠোঁট চায়ের কাপে সংযুক্ত হল তা বুঝতে পারলাম না। জাকির ভাই, জুনাইদ, মুবারক এবং আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইলাম ফজল ভাইয়ের দিকে। মনে হল কত কাল যেন দেখা হয়নি তাকে। জাকির ভাই রসবোধের মানুষ। হঠাৎ রসিকতা করে বল্লেনÑ এতো বড় ঘটনা অথচ আগে তো কখনো বলেননি ফজল ভাই? তবে কি বুঝবো আমরা আপনার দূরের লোক। ফজল ভাইও এর যথার্থ জবাব দিলেন। তিনি বল্লেনÑ শোন, নক্ষত্রের অবস্থান যত দূরেই হোক না কেন তা কিন্তু আমাদের খুব কাছেই।
সাবিত সারওয়ার
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। হেমন্তের সন্ধ্যা। ভালোই লাগছে। পশ্চিম আকাশে জ্বল জ্বল করছে জিলহজের তিলক চিহ্ন। নতুন চাঁদ। একেবারে স্বচ্ছ ছুরির মত। এমন দৃশ্য সর্বশেষ কবে দেখেছি তাও মনে নেই। মনে করারও তাগিদ নেই মনে। শুধু বুঝলাম ওটা ঈদের চাঁদ। যান্ত্রিকতার ভিড়ে ওর জৌলুস দেখে নিতান্তই ভ্রুকূটি মনে হচ্ছে। তুলনা খুঁজতে চেষ্টা করলাম। সামনে এসে দাঁড়াল ভাঙাচোরা এক মূর্তিদৃশ্য। যার ভ্রু-ভঙ্গিমায় মিশে ছিল বিরক্তির রক্তিম আভা। শেলীর অজিমেন্ডিয়াস মূর্তিটির সাথে এর প্রকৃত তুলনা চলে।
চলন্ত রিকশায় বসে আছি। রিকশা এগিয়ে চলছে দ্রুত। গন্তব্য দৈনিক নয়া দিগন্ত অফিস। বৈচিত্র্যের ঈদ সংখ্যার কাজ চলছে প্রস্তুতির শেষ প্রান্তে প্রায়। জাকির ভাইয়ের একটি কবিতা নিতেই এখানে আসা। আমার দৃষ্টিতে তিনি একজন ভাল মানুষ। দৈনিক পত্রিকার একজন সাহিত্য সা¤পাদক হিসেবে নয়। কবি জাকির আবু জাফরকে কেতাদুরস্ত একজন ভদ্রলোক হিসেবে অনেকে পছন্দ করেন। তারুণ্যের প্রতি তার এক ধরনের ভালবাসা তরুণদেরকেও আকৃষ্ট করে।
অনুমতি চেয়ে ঢুকে পড়লাম তার রুমে। ছোট একটি কক্ষ। সুন্দর ফিটফাট। রুমে চমৎকার একটি বুক সেলফ। সেলসে সাজানো রয়েছে আদিকাল থেকে বর্তমান সময়ের নামিদামি লেখকদের সংকলন। আমি যে চেয়ারটিতে বসে আসি তার পাশে আরো একজন ভদ্রলোক বসা। তিনি অনর্গল কথা বলে চলেছেন। আলাপচারিতায় তিনি বুঝাতে চাইলেন- তিনি কবি। আমিও বুঝলাম তিনি কবিÑ কক্ষচ্যুত কবি। তার পর খানিকক্ষণ আড্ডা হল। জাকির ভাই আমাকে বৈচিত্র্যের জন্য একটি কবিতার খাম ধরিয়ে দিলেন। সাথে নয়া দিগন্তের ঈদ সংখ্যা। না আমাকে নয়। বৈচিত্র্য সম্পাদক কবি শাহীন রেজার। লেখক কপি। আমি হেসে বল্লাম এতটুকুন বসাতেই যদি এতোকিছু পেয়ে যাই তবে আরো কিছুক্ষণ বসিÑ নিশ্চই আরো কিছু পাওয়া যাবে। জাকির ভাই হাসলেন এবং সেই সাথে আমাকেও দুটি সংকলন গিফট করলেন। আমি খুশি হলাম। কৃতজ্ঞচিত্তে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলাম এবং বললাম তাহলে কি এবার উঠতেই বলছেন? তিনি আবারো হাসলেন। বল্লেনÑ না মিয়া বস। বসতেও চাইলাম কিন্তু আর হল না। ফজল ভাই দাঁড়ানো নিচে। অনেক দিন দেখিনি তাকে। আমরা নিচে নামলাম। ফজল শাহাবুদ্দীন মানেই আড্ডার হাট। চমৎকার গল্প আর বুদ্ধিদীপ্ত উক্তির সমাহার। তার ঠোঁট যেন কথা তৈরির কারখানা। আমরা একত্রে বসলাম হোটেলে। নয়া দিগন্তের নিচে। ফজল ভাই ডিম-পরোটার অর্ডার দিলেন। ডিম-পরোটার সঙ্গে আমাদের আড্ডাও বেশ জমে উঠল। আড্ডা ও ডিম-পরোটার চেয়ে আড্ডাই যেন বেশি মজার। আমার ধারণা তার আড্ডা কেবল আড্ডাই নয়। জীবন জগৎ সম্পর্কে জানবার অপ্রাতিষ্ঠানিক এক পাঠশালা। বিশেষ করে একজন কবির জীবন জগৎ সম্পর্কে কাছ থেকে দেখবার এ এক মহাসুযোগ।
স্বীকার করি তার সাথে আড্ডা দেবার কিছু সমস্যাও আছে। অনেকেই সেটা বলেন। যারা কাছ থেকে তাকে দেখেছেন তারা তা অকপটে বলে বেড়ান। কিন্তু সবকিছুর পরেও ব্যক্তিগতভাবে আমার ভাল লাগে তার সংস্পর্শে যেতে। গোলাপের চারপাশে কিছু কাটা তো চির কালই ছিল। তাই বলে গোলাপের প্রতি আকর্ষণ কি কোন জšে§ হ্রাস পেয়েছে? তা নিশ্চয় নয়। তবে আর সমস্যা কোথায়। শাপলা হাতের কাছেই মেলে। ওর সুন্দর হাসিতে কেবল চোখের প্রশান্তি মেলে। অনুভূতিকে আকৃষ্ট করতে গোলাপের প্রয়োজন। গোলাপের জন্য কাটার আঘাত সইতে আপত্তি কেন! অনুভূতিকে উজ্জীবিত করতে আমার গোলাপ দরকার। আমি ফজল শাহাবুদ্দীনের মাঝে শুধু গোলাপের ঘ্রাণ নয় শাপলার শুভ্র হাসিও দেখেছি। এরই মধ্যে হোটেল বয় জিজ্ঞেস করল স্যার আর কি খাবেন ? ফজল ভাই বল্লেনÑ দুধ চা দাও। আমার ব্যস্ততা সত্ত্বেও কাটিয়ে দিলাম পুরো দুঘণ্টা। একটু সমস্যা হলেও ক্ষতি হয়নি কিছুই। বরং অভিজ্ঞতার ঝুলিতে সঞ্চিত হল বিচিত্র্য এক জীবনবোধ। যা কিনা একজন কবির একান্ত নিজস্ব। কবি বলেই হয়তো তার পক্ষে এমনটা সম্ভব। আমিও মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। কেননা গত দুবছর আগে একই কারণে আমি বাবাকে হারিয়েছি। ঘটনাটি ক্যান্সার সংক্রান্ত। শুনে কিছুটা অবাকই হলামÑ ক্যান্সার! ফজল শাহাবুদ্দীনের! তার মানে তো নির্ঘাৎ মৃত্যু। কই ফজল ভাই তো আগে কখনও বলেনি তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। না এখন নয় জীবনের কোন এক বাকে ঘটে যাওয়া ঘটনা। তার ইতিবৃত্ত উঠে এলো আমাদের আড্ডায়। না শুধু আমাকে নয় তিনি কাউকে বলেনি এতোদিন। এমনকি একমাত্র সহধার্মিণীকেও নয়। আমি অবাক হয়ে ভাবছি এটা কিভাবে সম্ভব। ঘটনাটি শুনলাম তার নিজের মুখেই। ডাক্তার বল্লেনÑ আপনার দেহে ক্যান্সারের জীবাণু। ৬ মাস আপনাকে ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। তার পর পরিষ্কার বোঝা যাবে আপনি ক্যান্সারে আক্রান্ত কি না। ডাক্তার প্রশ্ন করলেন ধরুন ৬ মাস পর প্রমাণিত হল আপনি ক্যান্সারে আক্রান্ত তখন কি করবেন? ফজল ভাইযের সহজ উত্তরÑ কি আর করব, কিছুই করব না। যদি তা-ই হয় তবে মারা যাব আর তা না হলে আমার সৌভাগ্য, আমি বেঁচে যাব। ডাক্তার উত্তর শুনে চমকে উঠলেনÑ যেখানে জীবন মরণের প্রশ্ন যেখানে কিভাবে সম্ভব এত সহজ ও স্থির থাকা। শুনে আমারও প্রথম তা-ই মনে হয়েছিল। পরে বুঝলাম একজন প্রকৃত কবির প্রকৃতিতে বাঁচা-মরার পার্থক্য কেবল কর্মের মাঝেই নিহিত। গৃহপালিত পশুর মত কেবল বেঁচে থাকাই জীবনের সফলতা নয়। বরং জীবন ও বাস্তবতার রূঢ় নির্যাসে সিক্ত হতে হতে জীবনের অর্থকে উপলদ্ধি করাই জীবনের মূল রহস্য। আর মৃত্যু? সে তো অমোঘ সত্য-শরাব। ইচ্ছে হোক বা না হোক তা পান করতেই হবে। এবার শুরু হল ওষুধ খাওয়ার পালা। ৬ মাসের কোর্স শেষ হল। আবারও চললো পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কথা ছিল এবার বোঝা যাবে তার দেহে ক্যান্সারের জীবাণু আছে কি না। থাকলেও তার পরিমাণ কি। প্রথম ৬ মাসের কোর্স শেষ হলে ডাক্তার বল্লেনÑ স্যরি কবি সাহেব কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আপনাকে আরও ছয় মাস মেডিসিন চালিয়ে যেতে হবে। কি আর করা কাউকে জানালেন না ফজল ভাই। জানানোর প্রয়োজনও বোধ করলেন না।
অবশেষে একদিন ভাবির হাতে ধরা খেয়ে গেলেন কবি। ভাবি জিজ্ঞেস করলেন তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে কিসের ওষুধ খাচ্ছো? ভাবির জোরাজুরিতে ফজল ভাই বল্লেন এটা একটা খারাপ ঔষধ। ভাবি পড়লেন মহা চিন্তায়Ñ খারাপ ওষুধ! অথচ ফজল ভাইকে দেখে কারও বোঝারও উপায় নেই। তিনি চলছেন তার চিরাচরিত নিয়মে। হাসি, আড্ডা, কবিতা পাঠ ইত্যাদিতে ব্যস্ত সমস্ত কেটে যায় তার দিন। এক পর্যায়ে ভাবির জোরাজুরিতে গেলেন তার এক ডাক্তার বন্ধুর কাছে। তিনি ক্যান্সার বিশেষ্ণ। ভদ্রলোক বহুদিন পর বন্ধুকে কাছে পেয়ে উচ্ছ্বাসে হেসে উঠলেন। সব কিছু শুনে তিনিও বেশ গম্ভীর । রিপোর্টপত্র দেখে কবিকে আশ্বস্ত করলেন এবং ভাবিকে পাশের রুম থেকে ডাকলেন। ডাক্তার সাহেব তার সামনেই সমস্ত অবস্থা বর্ণনা করলেন। ভাবি শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকালেন ফজল ভাইয়ের দিকে। বল্লেনÑ এতো বড় ঘটনা অথচ আমাকে কিছুই বলনি। ফজল ভাই একটু হাসলেন। ডাক্তার সাহেব কবি-দম্পতির জন্য আপ্যায়নের ব্যবস্থা করলেন। পিয়নকে ডেকে বিরিয়ানির অর্ডার দিলেন।
আড্ডায় ডুবে আমাদের ডিম-পরোটা কখন যে শেষ হয়ে ঠোঁট চায়ের কাপে সংযুক্ত হল তা বুঝতে পারলাম না। জাকির ভাই, জুনাইদ, মুবারক এবং আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইলাম ফজল ভাইয়ের দিকে। মনে হল কত কাল যেন দেখা হয়নি তাকে। জাকির ভাই রসবোধের মানুষ। হঠাৎ রসিকতা করে বল্লেনÑ এতো বড় ঘটনা অথচ আগে তো কখনো বলেননি ফজল ভাই? তবে কি বুঝবো আমরা আপনার দূরের লোক। ফজল ভাইও এর যথার্থ জবাব দিলেন। তিনি বল্লেনÑ শোন, নক্ষত্রের অবস্থান যত দূরেই হোক না কেন তা কিন্তু আমাদের খুব কাছেই।
Comments