আজ ত্রপার বিয়ে (স্নিগ্ধা রোশনী )
- Get link
- X
- Other Apps
আজ ত্রপার বিয়ে
| তারিখ: ১৬-০২-২০১৩
শাড়ি পরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল ত্রপা। নিজেই নিজেকে যেন চিনতে পারছে না। নীল জামদানিতে তাকে চমৎকার মানিয়ে গেছে। কপালে যত্নে লাল পাথরের টিপ বসাল সে, চোখে কাজল পরল। তার শ্যামলা গায়ের রঙে কাজলটা অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। আয়নার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল ত্রপা। হেসে যেন নিজেকে অভয় দেওয়ার চেষ্টা করছে ও। আজ একটা অন্যায় করতে যাচ্ছে সে, বড় ধরনের অন্যায়।
দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ত্রপা ঠিক করার চেষ্টা করল মাকে সে কী বলবে...কিছু অজুহাত সে ঠিক করেছে কিন্তু মাকে ব্যাখ্যা করাটা কি এতটাই সহজ হবে? মা কখনোই কিছু নিয়ে ভুল বোঝেন না কিন্তু মাকে মিথ্যা বলতে তার এত খারাপ লাগছে...কিন্তু উপায় নেই!
মায়ের ঘরে উঁকি দিল ত্রপা, শুয়ে বই পড়ছেন সোহানা। মায়ের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় ডাকল ত্রপা—‘মা?’ বই থেকে মুখ তুললেন না সোহানা, বললেন ‘আয় মা।’
বিছানায় বসে মায়ের একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিল ও। সোহানা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ‘কিরে, তোর অনুষ্ঠান কখন?’
‘এই তো যাব এখন’ বলতে গিয়ে গলাটা কেঁপে গেল ওর। মায়ের দিকে তাকাতে পারছে না চোখ তুলে। মিথ্যা বলতে ভয়ানক খারাপ লাগছে ওর। মা-ই যে তার সব। বাবা মারা যাওয়ার পর সবদিক শক্ত হাতে সামলেছেন। শত ব্যস্ততায়ও ত্রপাকে একা রাখেননি। এও ভালোবাসেন মা যে বাবার অভাবটা তেমন করে বোধ করার সুযোগ পায়নি ত্রপা। আজ সেই মাকে না বলে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত ওকে নিতে হচ্ছে।
—কী রে চুপ করে আছিস কেন?
—মা একটা কথা বলব?
—‘কী বলবি’ চশমাটা তুলে মেয়ের দিকে তাকালেন সোহানা, আঁচলটা আঙুলে পেঁচাচ্ছে ত্রপা, কীভাবে কথাটা বলবে বুঝতে পারছে না ও।
মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন সোহানা—‘মা, তোর দেরি হচ্ছে, গাড়ি নিয়ে যা।’
—উহু, আজ রিকশা নেব, আকাশ দেখতে দেখতে যাব।
ত্রপা উঠে দাঁড়াল, তার খুব কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে।
সোহানা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছেন, সেই হাসিতে মমতা ঝরে পড়ছে।
ফাহিম একটু পর পর ঘড়ি দেখছে, অস্থির হওয়া তার স্বভাবে নেই, তবু কেন যেন তার অস্থির লাগছে। আজ বিশেষ কিছু ঘটতে যাচ্ছে এ জন্যই কি? পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিল ও রুমালের খোঁজে, যা ভেবেছিল তা-ই—নেই। দরকারের সময় কিছুই পাওয়া যাবে না। রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে সে। ত্রপা কি আসবে না?
সোহানা মেয়ের ঘরে ঢুকলেন, জানালাগুলো বন্ধ করে দেবেন। ঘরে ঢুকে দেখলেন তাঁর মেয়ে এককোনায় চুপচাপ বসে আছে। ঘর প্রায় অন্ধকার। তাঁর বুক ধক করে উঠল—‘ত্রপা’?
মেয়ে ছুটে এসে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
—‘কী হয়েছে মামণি? বলো আমাকে।’ মেয়ের মাথায় হাত বুলাচ্ছেন তিনি।—‘মা, আমি ভয়ংকর একটা অন্যায় করতে যাচ্ছিলাম।’ কাঁদতে কাঁদতেই বলছে ত্রপা।
—‘আমি জানি’।
মায়ের দিকে অবাক হয়ে তাকাল ও। কী বলছেন তিনি!! তার আর ফাহিমের কথা তো তেমন কেউই জানে না, জানানোর সাহস ওর নিজেরই হয়নি, ফাহিম যে তাদের সমকক্ষ নয়।
—‘মা?’ ভাঙাগলায় ডাকল ত্রপা।
মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন সোহানা, ‘আমি জানি, আমাকে না বলে কখনো তুই কিছু করিসনি। ফাহিমের জন্য যখন তুই রাতের পর রাত জেগে থাকতি, আমিও থাকতাম রে মা, তারপর ওর খোঁজ নিয়েছি। জানতাম যে আমাকে না বলে তুই কাজি অফিসে, জানতাম পারবি না...কথা শেষ করতে পারলেন না তিনি—ত্রপা তাঁকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
‘ তুই যা, বেচারা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে তোর জন্য।’
কিছু বলতে পারল না ত্রপা, ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে সে।
বিকেল গড়িয়ে আসছে। ফাহিম বুঝতে পারছে না সে কি চলে যাবে না অপেক্ষা করবে, রিকশা দেখা যাচ্ছে একটা...ত্রপা কি এল অবশেষে? হাসিমুখে এগিয়ে গেল ফাহিম সেদিকে...
রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মেটাল ত্রপা। ফাহিমকে দেখা যাচ্ছে, বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসছে তার দিকে। আঁচলে চোখ মুছল ও।
—‘এলে তবে, আমি ভেবেছি তুমি মত বদলেছ’—হাসছে ফাহিম।
—‘কেন ভাবলে এমন’, অভিমানী সুরে বলল ত্রপা।
—‘তোমাকে অপূর্ব লাগছে ত্রপা, ইচ্ছে হচ্ছে...’
হাসছে ত্রপা। চোখ ভর্তি হয়ে যাচ্ছে জলে। শেষ বিকেলের রোদটা এসে পড়ছে ত্রপা মুখে, জলভর্তি চোখ নিয়ে ফাহিমের দিকে তাকাল সে। কাছে এসে ত্রপার হাত ধরল ফাহিম। মুগ্ধ চোখে দেখছে মেয়েটাকে, কেউ কি পারে তার ত্রপার মতো সুন্দর করে হাসতে...
স্নিগ্ধা রোশনী
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ত্রপা ঠিক করার চেষ্টা করল মাকে সে কী বলবে...কিছু অজুহাত সে ঠিক করেছে কিন্তু মাকে ব্যাখ্যা করাটা কি এতটাই সহজ হবে? মা কখনোই কিছু নিয়ে ভুল বোঝেন না কিন্তু মাকে মিথ্যা বলতে তার এত খারাপ লাগছে...কিন্তু উপায় নেই!
মায়ের ঘরে উঁকি দিল ত্রপা, শুয়ে বই পড়ছেন সোহানা। মায়ের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় ডাকল ত্রপা—‘মা?’ বই থেকে মুখ তুললেন না সোহানা, বললেন ‘আয় মা।’
বিছানায় বসে মায়ের একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিল ও। সোহানা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ‘কিরে, তোর অনুষ্ঠান কখন?’
‘এই তো যাব এখন’ বলতে গিয়ে গলাটা কেঁপে গেল ওর। মায়ের দিকে তাকাতে পারছে না চোখ তুলে। মিথ্যা বলতে ভয়ানক খারাপ লাগছে ওর। মা-ই যে তার সব। বাবা মারা যাওয়ার পর সবদিক শক্ত হাতে সামলেছেন। শত ব্যস্ততায়ও ত্রপাকে একা রাখেননি। এও ভালোবাসেন মা যে বাবার অভাবটা তেমন করে বোধ করার সুযোগ পায়নি ত্রপা। আজ সেই মাকে না বলে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত ওকে নিতে হচ্ছে।
—কী রে চুপ করে আছিস কেন?
—মা একটা কথা বলব?
—‘কী বলবি’ চশমাটা তুলে মেয়ের দিকে তাকালেন সোহানা, আঁচলটা আঙুলে পেঁচাচ্ছে ত্রপা, কীভাবে কথাটা বলবে বুঝতে পারছে না ও।
মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন সোহানা—‘মা, তোর দেরি হচ্ছে, গাড়ি নিয়ে যা।’
—উহু, আজ রিকশা নেব, আকাশ দেখতে দেখতে যাব।
ত্রপা উঠে দাঁড়াল, তার খুব কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে।
সোহানা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছেন, সেই হাসিতে মমতা ঝরে পড়ছে।
ফাহিম একটু পর পর ঘড়ি দেখছে, অস্থির হওয়া তার স্বভাবে নেই, তবু কেন যেন তার অস্থির লাগছে। আজ বিশেষ কিছু ঘটতে যাচ্ছে এ জন্যই কি? পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিল ও রুমালের খোঁজে, যা ভেবেছিল তা-ই—নেই। দরকারের সময় কিছুই পাওয়া যাবে না। রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে সে। ত্রপা কি আসবে না?
সোহানা মেয়ের ঘরে ঢুকলেন, জানালাগুলো বন্ধ করে দেবেন। ঘরে ঢুকে দেখলেন তাঁর মেয়ে এককোনায় চুপচাপ বসে আছে। ঘর প্রায় অন্ধকার। তাঁর বুক ধক করে উঠল—‘ত্রপা’?
মেয়ে ছুটে এসে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
—‘কী হয়েছে মামণি? বলো আমাকে।’ মেয়ের মাথায় হাত বুলাচ্ছেন তিনি।—‘মা, আমি ভয়ংকর একটা অন্যায় করতে যাচ্ছিলাম।’ কাঁদতে কাঁদতেই বলছে ত্রপা।
—‘আমি জানি’।
মায়ের দিকে অবাক হয়ে তাকাল ও। কী বলছেন তিনি!! তার আর ফাহিমের কথা তো তেমন কেউই জানে না, জানানোর সাহস ওর নিজেরই হয়নি, ফাহিম যে তাদের সমকক্ষ নয়।
—‘মা?’ ভাঙাগলায় ডাকল ত্রপা।
মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন সোহানা, ‘আমি জানি, আমাকে না বলে কখনো তুই কিছু করিসনি। ফাহিমের জন্য যখন তুই রাতের পর রাত জেগে থাকতি, আমিও থাকতাম রে মা, তারপর ওর খোঁজ নিয়েছি। জানতাম যে আমাকে না বলে তুই কাজি অফিসে, জানতাম পারবি না...কথা শেষ করতে পারলেন না তিনি—ত্রপা তাঁকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
‘ তুই যা, বেচারা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে তোর জন্য।’
কিছু বলতে পারল না ত্রপা, ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে সে।
বিকেল গড়িয়ে আসছে। ফাহিম বুঝতে পারছে না সে কি চলে যাবে না অপেক্ষা করবে, রিকশা দেখা যাচ্ছে একটা...ত্রপা কি এল অবশেষে? হাসিমুখে এগিয়ে গেল ফাহিম সেদিকে...
রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মেটাল ত্রপা। ফাহিমকে দেখা যাচ্ছে, বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসছে তার দিকে। আঁচলে চোখ মুছল ও।
—‘এলে তবে, আমি ভেবেছি তুমি মত বদলেছ’—হাসছে ফাহিম।
—‘কেন ভাবলে এমন’, অভিমানী সুরে বলল ত্রপা।
—‘তোমাকে অপূর্ব লাগছে ত্রপা, ইচ্ছে হচ্ছে...’
হাসছে ত্রপা। চোখ ভর্তি হয়ে যাচ্ছে জলে। শেষ বিকেলের রোদটা এসে পড়ছে ত্রপা মুখে, জলভর্তি চোখ নিয়ে ফাহিমের দিকে তাকাল সে। কাছে এসে ত্রপার হাত ধরল ফাহিম। মুগ্ধ চোখে দেখছে মেয়েটাকে, কেউ কি পারে তার ত্রপার মতো সুন্দর করে হাসতে...
স্নিগ্ধা রোশনী
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
- Get link
- X
- Other Apps
Comments