সাঈদীর ফাঁসির রায়


ইত্তেফাক রিপোর্ট
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসির রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা ২০টি অভিযোগের মধ্যে ৮টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে দুইটি গণহত্যার অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারমান এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ আজ বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেন। 

বেলা ১১টার পর বিচারকরা ১২০ পৃষ্ঠার রায়ের সার-সংক্ষেপ পড়া শুরু করেন। এর আগে ১০টার দিকে সাঈদীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। জামায়াতের এই নেতার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালীন খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ধর্মান্তরিতকরণে জড়িত থাকায় ২০টি অভিযোগ আনা হয়।

এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তৃতীয় ও ট্রাইব্যুনাল-১ এর দেয়া প্রথম রায়। এর আগে জামায়াত নেতা আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন দেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারকরা।

রায়ের আগে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপু ইত্তেফাককে বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি। তাই যথাযথ রায় পাবো বলে আশা করছি। অন্যদিকে সাঈদীর আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেন, সবগুলো অভিযোগই মিথ্যা, বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীর দায়ের করা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে একটি মামলায় সাঈদীকে ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। গত বছরের ১১ জুলাই সাঈদীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। পরে ১৪ জুলাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগের বিষয়ে শুনানি শেষে ৩ অক্টোবর সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।

এ মামলায় সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর। প্রায় সাড়ে চার মাসে তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। তাদের মধ্যে ২০ জন ঘটনার বিষয়ে এবং সাতজন জব্দ তালিকার বিষয়ে সাক্ষ্য দেন। রাষ্ট্রপক্ষের ২৮তম ও শেষ সাক্ষী হিসেবে এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. হেলালউদ্দিন সাক্ষ্য দেয়া শুরু করেন ৮ এপ্রিল। নয় কার্যদিবসে ২৪ এপ্রিল তার সাক্ষ্য শেষ হয়। আসামিপক্ষ ২৫ এপ্রিল তাকে জেরা শুরু করেন। ৪৮ কার্যদিবসে অর্থাত্ ১৩ আগস্ট তার জেরা শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা। এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া ১৫ সাক্ষীর জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালের আদেশে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এরপর ২ সেপ্টেম্বর থেকে সাঈদীর পক্ষের সাক্ষীদের সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সাঈদীর পক্ষে আইনজীবীরা সাফাই সাক্ষ্য দিতে ৪৮ জনের নামের তালিকা দিলেও ২০ জনকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য অনুমোদন দেয় ট্রাইব্যুনাল। ২০ জনের মধ্যে ১৭ জন হাজির হয়ে সাফাই সাক্ষ্য দেন। গত ২৩ অক্টোবর তারা আর কোনো সাফাই সাক্ষী আনতে না পারায় সেদিনই সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ বন্ধ করে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের তারিখ ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। এদের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের গণেশ চন্দ্র সাহা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেন। অভিযোগ রয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষের আরেকজন সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে ট্রাইব্যুলের গেট থেকে অপহূত হয়েছেন। আজ পর্যন্ত তার হদিস মেলেনি।

উল্লেখ্য, গত ২৯ জানুয়ারি সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা দ্বিতীয়বারের মতো অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। গত বছরের ডিসেম্বরে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে সর্বপ্রথম সাঈদীর মামলার বিচার শেষ হয়। ৬ ডিসেম্বর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখে। ৯ ডিসেম্বর বেলজিয়াম প্রবাসী আইনজ্ঞ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে স্কাইপ কথোপকথনের খবর প্রকাশের পর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন বিচারপতি নিজামুল হক। ১৩ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১ পুনর্গঠিত হওয়ার পর নতুন চেয়ারম্যান সাঈদীর মামলায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক পুনরায় উপস্থাপনের আদেশ দেন।
- See more at: http://www.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDJfMjhfMTNfMF8wXzNfMjI1OTE=#sthash.kfFL3Fqk.dpuf

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়