রাসুল (সা.) অবমাননার প্রতিবাদে গণবিস্ফোরণ : গাইবান্ধায় নিহত ৩ সিলেটে ১ ঝিনাইদহে ১ সারাদেশে আহত ৪ হাজার, কাল দেশব্যাপী হরতাল : বায়তুল মোকাররম এলাকায় পুলিশের হাজার রাউন্ড গুলি
স্টাফ রিপোর্টার
| | পরের সংবাদ» |
ধর্মপ্রাণ তৌহিদী জনতার গর্জন শুনেছে বাংলাদেশ। আল্লাহ ও রাসুলপ্রেমী লাখো জনতার বিক্ষোভে গতকাল সারা দেশ ছিল উত্তাল। ধর্মদ্রোহী নাস্তিক, মুরতাদদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফুঁসে ওঠা ইসলামী জনতার মহাজাগরণ দমাতে উন্মত্ত হামলা চালায় পুলিশ, র্যাব ও শাসকদলের ক্যাডারবাহিনী। এতে শহীদ হয়েছেন অন্তত পাঁচজন। রাজধানীসহ সারা দেশের চার লক্ষাধিক মসজিদ থেকে বিক্ষোভের কর্মসূচি চলাকালে বিনা উসকানিতে পুলিশ ও সরকারদলীয়রা হামলা চালায়। এতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। ব্যাপক সহিংসতায় কয়েক হাজার মুসল্লি আহত হয়েছেন। নিরস্ত্র মুসল্লিদের ওপর নির্বিচারে হাজার হাজার রাউন্ড গুলি ও টিয়ারশেল ছুড়েছে পুলিশ। নির্দয় নির্যাতন করে আটক করেছে শত শত মুসল্লিকে। কর্মসূচি ঠেকাতে অবরুদ্ধ করে রাখা হয় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ বহু মসজিদ। কর্মসূচিতে বাধা ও পাঁচ প্রতিবাদী মুসল্লিকে হত্যার প্রতিবাদে ইসলামী দলগুলো রোববার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে।
এদিকে ইসলামী দলগুলোর কর্মসূচি সংবাদ সংগ্রহের সময় সহিংসতার মাঝে পড়ে ঢাকাসহ সারা দেশে অন্তত ২৫ সাংবাদিক আহত হয়েছেন। ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকায় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন আমার দেশ-এর চিফ ফটোগ্রাফার মীর আহম্মদ মীরু। কয়েকটি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিককে মারধর ও ক্যামেরা ভাংচুর করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ইটিভি সাংবাদিককে পিটিয়েছে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। পরে বিকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে শাসকদলের মিছিল থেকে হামলা ও তাণ্ডব চালানো হয়েছে। চট্টগ্রামে আমার দেশ ও দিগন্ত টিভির ব্যুরো অফিসে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট চালিয়েছে আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা। সিলেটে ব্যাংক, হাসপাতাল, মার্কেট, কোচিং সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুট ও আগুন দেয়া হয়।
দেশের আলেমকুল শিরোমণি, কওমি মাদরাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান আল্লামা আহমদ শফির নেতৃত্বাধীন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল ও সংগঠন ব্লগে আল্লাহ, রাসুল (সা.), ইসলাম ও কোরআন শরিফকে অবমাননার প্রতিবাদে বিক্ষোভের ডাক দেয়। জুমার নামাজ শেষে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী নিরীহ মুসল্লিদের ওপর নজিরবিহীন বেপরোয়া অ্যাকশন চালায় পুলিশ। সিলেট, গাইবান্ধা ও ঝিনাইদহে পাঁচ মুসল্লিকে হত্যা ছাড়াও চার হাজারের বেশি মুসল্লিকে আহত ও গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের অবিরাম গুলি ও টিয়ারশেল বর্ষণে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র দীর্ঘসময় ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নেয়। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকাসহ পুরো রাজধানী হয়ে পড়েছে আতঙ্কের নগরী। নিরীহ জনতার বিপক্ষে পুলিশ ব্যবহার করেছে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হ্যান্ড গ্রেনেড। ওইসব গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের ভেতরেও। হাফ ডজন রায়ট কার থেকে থেকে বৃষ্টির মতো গুলি ও টিয়ারশেল ছোড়া হয়েছে বায়তুল মোকাররম মসজিদের ভেতরে। পুলিশের এই নজিরবিহীন অ্যাকশনে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে পড়েন জুমার নামাজে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিরা।
পুলিশ বেষ্টনীতে লাগাতার সংঘর্ষে টানা চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিল বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদ। বায়তুল মোকাররম ও আশপাশের এলাকা, পুরানাপল্টন, বিজয়নগর, দৈনিক বাংলা মোড়, মুক্তাঙ্গন, প্রেস ক্লাব, তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচা এলাকা ছিল রীতিমত যুদ্ধক্ষেত্র। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কার্যত কোনো উসকানি ছাড়াই টানা চার ঘণ্টা নিরীহ জনতার ওপর তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে যুদ্ধংদেহী পুলিশ সদস্যরা। পুলিশের গুলিতে বায়তুল মোকাররম ও আশপাশের এলাকায় আহত হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ। গ্রেফতার করা হয়েছে দুই শতাধিক মুসল্লিকে।
হামলার প্রতিবাদে কাল রোববার ঢাকাসহ সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে সমমনা ইসলামী ১২ দল। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুরো ঢাকা ছিল এক আতঙ্কের নগরী। রাস্তাঘাট ছিল যানবাহনশূন্য ফাঁকা। শহরজুড়ে ছিল পুলিশের কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবলয়। মানুষের মধ্যে ছিল উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা।
পুলিশি হামলায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে অজ্ঞাত তিন ব্যক্তি, ঝিনাইদহে ঝিনাইদহ আলিয়া মাদরাসার শিক্ষক ও ঝিনাইদহ সদরের আরাফপুর জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুস সালাম এবং সিলেটে অজ্ঞাত এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকায় আহত হয়েছেন খেলাফত আন্দোলনের আমির প্রবীণ আলেম মাওলানা শাহ আহমদুল্লাহ আশরাফ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, ইসলামী আন্দোলনের ঢাকা মহানগর সভাপতি অধ্যাপক এটিএম হেমায়েত উদ্দিনসহ অনেক শীর্ষ আলেম। এছাড়া আটক করা হয়েছে দুই ব্রিটিশ নাগরিকসহ বহু আলেমকে।
ঢাকায় বিক্ষুব্ধ মুসল্লিরা জানান, তারা নাস্তিক ব্লগারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ইসলামের অবমাননার বিরুদ্ধে ব্লাসফেমি আইনের মতো একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়নের দাবি করে আসছেন। তাদের শান্তিপূর্ণ মিছিল কর্মসূচিতে ক্ষমতাসীন দলের নির্দেশে এক ধরনের বিনা উসকানিতেই গুলি ও হামলা চালিয়েছে পুলিশ। আবার পুলিশের প্রহরায় ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা উসকানিমূলক স্লোগানসহ মিছিল করেছে।
বায়তুল মোকাররম এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে, নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে সকাল থেকেই উত্তেজনা ছিল। মোতায়েন ছিল অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশ। তারা সকাল থেকেই ছিল রণসাজে সজ্জিত। জুমার নামাজের আগেই তারা কয়েক দফা উত্তেজনা তৈরি করে মুসল্লিদের সঙ্গে। এতে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন মুসল্লিরা। এ সময় তারা সরকারের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন।
বেলা ১টা ২০ মিনিটে জুমার নামাজের সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গেই ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ‘নারায়ে তাকবির’ ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি তুলে বিক্ষোভ মিছিলসহ মসজিদ থেকে বের হয়ে আসে। তারা বায়তুল মোকাররম উত্তরগেটেই জড়ো হয়ে সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিলসহ প্রেস ক্লাবের দিকে রওনা হয়। মিছিলটি পল্টন চৌরাস্তায় পৌঁছে সামনে এগোনোর চেষ্টা করা মাত্রই পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে। পুলিশের মুহুর্মুহু গুলি, রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, বেপরোয়া লাঠিচার্জে বিশাল বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয়া হাজার হাজার মানুষ বিজয়নগর, মুক্তাঙ্গন, পল্টন, আশপাশের বিভিন্ন অলিগলিতে প্রবেশ করে। তারা ইসলাম ও নবী করিম (সা.)-এর অবমাননার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়ে পুলিশকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশ জনতাকে লক্ষ করে আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য হাজার হাজার রাউন্ড গুলি, রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে পুরো বায়তুল মোকাররম এলাকায় মহাযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পুলিশের বেপরোয়া অ্যাকশন ছড়িয়ে পড়ে বায়তুল মোকাররম উত্তর ও দক্ষিণ গেট, পুরানা পল্টন, দৈনিক বাংলা, জিপিও, বিজয়নগর, প্রেস ক্লাব, তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচা হয়ে মত্স্যভবন পর্যন্ত। পুলিশ রায়ট কার থেকে গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এগুলোর বিস্ফোরণে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হয়। ওই সময় পুলিশ মিডিয়া কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়, মিছিলকারীরা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। পুলিশের গুলি, গ্রেনেড ও লাঠিচার্জে আহত শত শত মুসল্লিকে রাস্তায় অজ্ঞান ও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা দুটি মোটরসাইকেল, ফুটপাতে দোকানসহ বিভিন্ন সরঞ্জামে আগুন দেয়। পুলিশের গুলির ভয়ে সহযোগী মুসল্লিরা তাদের উদ্ধার করতে আসার সাহস পায়নি। এরই মধ্যে মুসল্লিদের ধাওয়ায় পুলিশ কিছুটা সরে গেলে আহতদের উদ্ধার করে নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও বাসাবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
নামাজের পর কিছু মুসল্লি মসজিদ থেকে বের হলেও ১০ হাজারের মতো মুসল্লি তখনও মসজিদের ভেতরে। তারা পুলিশের অ্যাকশনের মধ্যে আটকে পড়ে। তারা মসজিদের ভেতরে পুলিশকে লক্ষ করে জুতা, ইট ও কাচের টুকরো নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশও মসজিদে শত শত রাউন্ড গুলি, টিয়ারশেল ও বেশ কয়েকটি হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। পুলিশ রায়টকার থেকে কনডোর নামে কয়েকটি হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে মসজিদের ভেতরে।
এরই মধ্যে পুলিশ জিপিও, বাইতুল মোকাররম উত্তর গেট, দক্ষিণ গেট, পুরানাপল্টন, বিজয়নগর ও সেগুনবাগিচা এলাকায় গুলি ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালাতে থাকে। জনতা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে পুলিশকে ধাওয়া করে। ধাওয়া পল্টা ধাওয়ায় কিছুক্ষণ পুলিশের দখলে, কিছুক্ষণ জনতার দখলে এভাবে সংঘর্ষ এগোতে থাকে। বেলা ১টা ৫০ মিনিটের দিকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে একজন দাড়িওয়ালা প্যান্ট-শার্ট পরিহিত ব্যক্তি বের হয়ে আসেন। কয়েকজন পুলিশ তার ওপর হামলা করে বেধড়ক লাঠিপেটা করে। তিনি দৌড়ে রাস্তার অপরপ্রান্তে গেলে কমপক্ষে ৭-৮ জন পুলিশ তার ওপর বেপরোয়া গুলি ছুড়তে থাকে। কিন্তু ওই ব্যক্তি তখন দৌড়ে পুরানা পল্টনে আজাদ প্রোডাক্টের দিকে চলে যান। অলৌকিকভাবে তার গায়ে একটি গুলিও লাগেনি।
বেলা ২টার দিকে পুরানা পল্টন জামে মসজিদ থেকে আরেকটি মিছিল বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটের দিকে আসে। মিছিলটি বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে পৌঁছামাত্র পুলিশ আবার গুলি ছুড়তে শুরু করে। রায়ট কার থেকেও মিছিল লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে। এ সময় রায়ট কারগুলো সাইরেন বাজিয়ে টহল দিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়। জনতার দেয়া আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছলে সেগুলোতেও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। একপর্যায়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে।
বেলা ২টার দিকে দৈনিক বাংলার দিকে আবার পুলিশ গুলি শুরু করে। তারা গুলি করতে করতে বায়তুল মোকাররমের দিকে আসে এবং মসজিদের ভেতরে গুলি করে। সোয়া দুটোর দিকেও কয়েক রাউন্ড গুলি ও বিস্ফোরণ ঘটায় পুলিশ। বেলা আড়াইটার দিকে জিপিও এবং বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটের দিকে কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে।
এরই মধ্যে মসজিদের ভেতরে আটকাপড়া মুসল্লিরা বিক্ষোভ করে বের হয়ে আসতে চাইলে পুলিশ গুলি, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে থাকা পুলিশ সদস্যরাও রাস্তা থেকে ইট কুড়িয়ে মসজিদের ভেতরে নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশের টিয়ারশেল থেকে বাঁচার জন্য মুসল্লিরা মসজিদের কার্পেটসহ বিভিন্ন সরঞ্জামে আগুন ধরিয়ে দেয়। দীর্ঘসময় ধরে মসজিদের ভেতরের কয়েকটি স্থানে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।
দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে কয়েক প্লাটুন পুলিশ বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে এবং কয়েক প্লাটুন বায়তুল মোকাররম জুয়েলারি মার্কেটের দোতলায় ওঠে। তারা দুই দিক থেকে মসজিদের ভেতরে মুসল্লিদের লক্ষ্য করে গুলি ও টিয়ারশেল মারতে থাকে।
বেলা পৌনে তিনটার দিকে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে ওভার ব্রিজের নিচ থেকে একটি রায়ট কার থেকে মাইকে সাধারণ মুসল্লিদের বের হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। মাইকে বলা হয়, সাধারণ মুসল্লি যারা আছেন, আমরা আপনাদের উদ্ধার করার জন্য এসেছি। আপনারা একে একে বের হয়ে আসুন। বের হয়ে না এলে আমরা মসজিদের ভেতরে ঢুকব। আপনারা বের হয়ে না এলে যত প্রকার আইনি ব্যবস্থা নেয়া যায় আমরা সবই নেব। পুলিশের ঘোষণা শুনে কয়েকজন মুসল্লি বের হয়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু এ সময় জুয়েলারি মার্কেটের দোতলায় অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা আবারও টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলি ছুড়ে মুসল্লিদের রক্ষা করে। এ সময় পুলিশের বের হয়ে আসা ও গুলি এই দ্বিমুখী নীতির কারণে ক্ষোভ দেখা দেয়। পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকে মুসল্লিরা।
বেলা পৌনে তিনটার দিকে মিডিয়া কর্মীদের একটি অংশ মসজিদের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। তারাও সাধারণ মুসল্লিদের বের হয়ে আসার আহ্বান জানায়। কিন্তু যারা বের হয়ে আসেন তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে আটক করে। বেলা তিনটার দিকে দক্ষিণ গেট ও স্টেডিয়ামের গেট দিয়ে কিছু মুসল্লি বের হয়ে যান। পরে সেখানে গিয়েও পুলিশ ধরপাকড় শুরু করে।
আতঙ্কিত মুসল্লিরা মসজিদের ভেতরে থেকেই আসরের নামাজ আদায় করেন। আসরের নামাজের আগে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ পুলিশি পাহারায় কয়েকটি খণ্ড খণ্ড মিছিল বের করে। সেগুলো থেকে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়া হয়। মিছিলটি পল্টন, বায়তুল মোকাররম, দৈনিকবাংলা হয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গিয়ে শেষ হয়।
পল্টন থেকে পুলিশের গুলি ও হামলায় দুই হাজারের বেশি মুসল্লি আহত হয়েছেন। তাদের অনেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাতাল, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছেন। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
গতকাল দুপুর ১২টার আগে থেকেই মুসল্লিরা বায়তুল মোকাররম মসজিদে যাওয়ার চেষ্টা করেন। গেট আটকিয়ে এবং তল্লাশি করে তাদের মসজিদে নামাজ পড়ায় বাধা সৃষ্টি করে পুলিশ। মুসল্লিরা বাধা পেয়ে পুরানা পল্টন গ্র্যান্ড আজাদ হোটেলের সামনে জুমার নামাজ আদায় করেন। সেখান থেকেও তারা মিছিল বের করেন। এছাড়া পুরানা পল্টন জামে মসজিদেও নামাজ শেষে মিছিল বের করা হয়।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দাবি করেছে, তাদের নগর সভাপতি অধ্যাপক মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দিন, কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ূমসহ প্রায় ২০ জন গুলি বিদ্ধ ও শতাধিক কর্মী আহত এবং বেশকিছু কর্মী গ্রেফতার হয়েছে। আহতদের মধ্যে রয়েছে মো. সিরাজুল ইসলাম, আবদুস সাত্তার, শাহ আলম, আবু বকর, আবদুল্লাহ, রেজাউল করিম, আবদুল আজিজ, ওবায়দুল হক, ইবরাহীম খলিল, শামসুল আলম, মাস্টার মুজাম্মেল হক, দ্বীন ইসলাম, আল আমিন, আবদুল আহাদ. নুরুল ইসলাম, গোলাম রাব্বীসহ আরও বেশ কয়েকজন রয়েছেন। তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, তাদের ৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তারা ১৭২ জনকে নাশকতার অভিযোগে গ্রেফতার করেছেন।
কাঁটাবন এলাকা : কাঁটাবন জামে মসজিদে জুমার নামাজের আগে থেকেই অতিরিক্ত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। মসজিদে নামাজে যাওয়ার আগে মুসল্লিদের হয়রানি করা হয়। নামাজ শেষে মুসল্লিরা মিছিল বের করতে চাইলে পুলিশ গুলি, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে মুসল্লিদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুলিশ সেখান থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করে। তারা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত দুজন ব্রিটিশ নাগরিককে আটক ও আহত করে। কাঁটাবনে পুলিশের হামলায় অর্ধশতাধিক মুসল্লি আহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই রাবার বুলেট ও পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সেখানে শাহবাগ থানার ওসিসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
কারওয়ানবাজার : কারওয়ানবাজার আম্বরশাহ মসজিদে জুমার নামাজ শেষে কারওয়ানবাজার এলাকা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি সোনারগাঁও ক্রসিং হয়ে শাহবাগের দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ তাদের লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সেখান থেকেও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়েছে।
মিরপুর এলাকা : বেলা ২টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বরে পুলিশের তৌহিদী জনতার সংঘর্ষ শুরু হয়। জুমার নামাজের পর মিরপুরে বিভিন্ন মসজিদ থেকে মুসল্লিরা ১০ নম্বর গোলচক্করের দিকে আসতে থাকে। এ সময় পুলিশ তাদের বাধা দেয়। বেলা সোয়া দুইটার দিকে তৌহিদী জনতা মিছিল করতে চাইলে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। মিছিলগুলো থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ইবাদুর রহমান, কাজী রমজান, আবদুল হান্নান ও নূর আলম নামে চারজনকে আটক করেছে। এছাড়াও এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও দাঙ্গা পুলিশ এবং র্যাব সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
খিলগাঁও বাসাবো এলাকা : খিলগাঁও চৌরাস্তা, খিলগাঁও বড় মসজিদ, বাসাবোসহ বিভিন্ন মসজিদ থেকে মুসল্লিরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় খিলগাঁও এলাকায় পুলিশ মিছিলে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় বেশ কয়েকজন মুসল্লিকে আটক করে পুলিশ।
আজিমপুর : আজিমপুর ও হাজারীবাগে তৌহিদী জনতার ব্যানারে মিছিল করতে চাইলে পুলিশি বাধায় সেটি পণ্ড হয়ে যায়। আজিমপুর মসজিদে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা মুসল্লিদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ।
নাখালপাড়ায় হামলা : ইসলাম ও নবী (স.) এর অবমাননা প্রতিবাদে সাধারণ মুসল্লিদের ব্যানারে নাখালপাড়া বড় মসজিদ থেকে একটি বিশাল মিছিল বের হয়। মিছিলটি গোটা নাখালপাড়া প্রদক্ষিণ শেষে রেলগেট শহীদ মিনারে শেষ হওয়ার প্রাক্কালে ৩৮নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার শেখ মুজিবুর রহমান ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা তার ভাই শেখ লিটন, শেখ কাদির, শেখ মাইদুল, হেদায়েত, সাগর, বায়েজীদের নেতৃত্বে মিছিলের পেছন থেকে হামলা করা হয়। এই হামলায় ৫ জন মুসল্লি আহত হয়েছেন। তাদের স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিত্সার জন্য ভর্তি করা হয়।
ঢামেকে আহতরা : পুলিশের গুলি ও ইট-পাটকেলে আহতদের মধ্যে কমপক্ষে ৪০ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছে। তাদের মধ্যে ২৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশ আহতদের মধ্যে ৬ জনকে আটক করে নিয়ে যায়। আহতদের মধ্যে মো. আরিফুর রহমান হীরা (৩২) এবং ৩৫ বছর বয়সী অজ্ঞাত এক ব্যক্তির অবস্থা আশঙ্কাজনক।
আহত হীরার ভাই মানিক সাংবাদিকদের জানান, তার ভাই হীরা কোনো দলের ছিলেন না। গতকাল তিনি বায়তুল মোকাররমে যান জুমার নামাজ আদায় করার জন্য। নামাজ শেষে বের হলে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটের সামনে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন। তার কোমরের ডান পাশে আঘাত লাগে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, হীরার ক্ষত দেখে মনে হচ্ছে তাকে পুলিশ রাইফেল ঠেকিয়ে গুলি করেছে। হীরা আমার দেশ সমবায় সমিতির সভাপতি। তার বাবার নাম মোসলেম উদ্দিন হাওলাদার। তার বাসা যাত্রাবাড়ীর ভাঙ্গাপ্রেস চাঁদনীর মাঠ।
অজ্ঞাত ওই ব্যক্তিকে ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিত্সাধীন রাখা হয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়রা গুলি বিদ্ধ হয়েছে। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আহতরা হলেন চ্যানেল একাত্তরের ক্যামেরাম্যান আরিফুর রহমান পিয়াস, জিটিভির রিপোর্টার মাসুদুর রহমান, আল-আমিন, মো. হান্নান, মো. অসিম, ফজলে রাব্বি, মো. বেলাল হোসেন, সুমন, মো. সফিক, মো. সেলিম, আমিনুল ইসলাম, সংবাদের রিপোর্টার সাইফ বাবলু, সুমন, জাকির হোসেন, ময়নুদ্দিন, ইমরান হোসেন, জহিরুল হক, অহিদুল ইসলাম, পথচারী সোনিয়া, সাদেক, জনকণ্ঠের ফটোসাংবাদিক মামুন এবং মোক্তার হোসেন।
ঝিনাইদহে খতিব নিহত : ঝিনাইদহে গতকাল জুমার নামাজের পর ওলামা-মাশায়েখদের সঙ্গে সরকার সমর্থকদের সংঘর্ষে আবদুস সালাম (৪৭) নামে এক মাদরাসা শিক্ষক ও জামে মসজিদের খতিব নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩ সাংবাদিকসহ অর্ধশত মানুষ। নিহত আবদুস সালাম ঝিনাইদহ শহরের আলিয়া মাদরাসার আরবি বিভাগের প্রভাষক ও আরাফপুর জামে মসজিদের খতিব। তিনি রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার মাটিপাড়া গ্রামের আবদুল মজিদের ছেলে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল জুমার নামাজের পর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে মিছিল বের করার চেষ্টা করে মুসল্লিরা। সেখানে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীরা বাধা দেয়। পরে শহরের শেরেবাংলা সড়কে নতুন হাটের রাস্তায় জামায়াত ও ইসলামী সমমনা দলগুলো ওলামা-মাশায়েখদের ব্যানারে মিছিল বের করে। এসময় পুলিশ মিছিলে বাধা দেয়। তারপরও তারা মিছিল চালিয়ে গেলে সরকার সমর্থক ক্যাডাররা হামলা চালায়। উভয় পক্ষ ব্যাপক ইটপাটকেল ছোড়ে। এক পর্যায়ে পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে মিছিলকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। সংঘর্ষের সময় ঝিনাইদহ হাটের রাস্তায় হামদর্দ চিকিত্সা কেন্দ্রের সামনে আবদুস সালামকে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা। এসময় তিনি অজ্ঞান হয়ে রাস্তার ওপর পড়ে যান। তাকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নেয়া হলে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রাশেদ আল মামুন মৃত ঘোষণা করেন। সংঘর্ষে আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি।
গাইবান্ধায় গুলিতে নিহত ৩ : পবিত্র কোরআন ও ইসলাম রক্ষা এবং কোরআন ও ইসলামবিরোধীদের গ্রেফতারের দাবিতে গতকাল জুমার নামাজ শেষে গাইবান্ধার পলাশবাড়িতে সমমনা কয়েকটি ইসলামী দলের কয়েক হাজার লোক মিছিল করে রংপুর-বগুড়া মহাসড়ক অবরোধ করে। এসময় পুলিশ অবরোধকারীদের ওপর হামলা করলে উভয় পক্ষে ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে ২ জন ঘটনাস্থলে এবং একজন হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান। এছাড়া পুলিশসহ ৫০ জন আহত ও ১৫টি গাড়ি ভাংচুর করা হয়।
সূত্র জানায়, পলাশবাড়ি চৌরাস্তা থেকে মহেশপুর পর্যন্ত ১ কিলোমিটার সড়ক অবরোধ করে রাখার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিনা উস্কানিতে ৩০ রাউন্ড গুলি নিক্ষেপ করে। এসময় ৬ জন গুলিবিদ্ধ হন। গুলিতে নিহত ২ জনের লাশ থানায় নেয়ার পর বিকালে তাদের মৃতদেহ গাইবান্ধা হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। তাদের পরিচয় জানায়নি পুলিশ। থানায় কোনো মিডিয়াকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। মোমিন নামের অপর আহত একজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান বলে এলাকার লোকজন জানান। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ ১৫ জনকে আটক করেছে। পুলিশ নিহত বা আহত ব্যক্তিদের নাম দিতে পারেনি। পলাশবাড়ি থানায় কোনো মিডিয়াকে ঢুকতে দেয়া হয়নি।
অপরদিকে গাইবান্ধা স্টেশন জামে মসজিদ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরের কাচারী বাজার পৌঁছলে সেখানে পুলিশের সঙ্গে তৌহিদি জনতার সংঘর্ষ বাধে। মিছিল থেকে ৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
সিলেটে নিহত ১ : বাদ জুমা সিলেটে তৌহিদি জনতার মিছিলে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে এক যুবক এবং অর্ধশতাধিক আহত হন। এসময় নগরীর চৌহাট্টা পয়েন্ট ও সংলগ্ন সড়কগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এসময় গণজাগরণ মঞ্চ ভাংচুর, পাশের ট্রাস্ট ব্যাংকের গ্যারেজ ও এটিএম বুথ এবং দুই মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। জুমার নামাজের পর কয়েক হাজার লোকের মিছিল চৌহাট্টা আসার পর পুলিশ উভয় দিক থেকে মিছিলকারীদের আক্রমণ করলে সংঘর্ষ বেধে যায়। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে চৌহাট্টা-মীরবক্স টুলা সড়কে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় অজ্ঞাত পরিচয় একজনকে উদ্ধার করে ওসমানী হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নেয়ার পর ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে সিংহবাড়ী ও আশপাশের এলাকা থেকে আটক করা গুলিবিদ্ধ ও লাঠিচার্জে আহত অন্তত অর্ধশত লোককে পুলিশের গাড়িতে করে ওসমানী হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে পুলিশ প্রহরায় চিকিত্সা শেষে ২০ জনকে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গুলিবিদ্ধ ১২ জনকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নগরীতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সিলেটে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় মোস্তফা মুর্শেদ তাহসীন (১৮)। তার বাবা নুরুল মোস্তফা জালালাবাদ গ্যাসে কর্মরত। এমসি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র তাহসীন। জুমার নামাজ শেষে হাউজিং এস্টেট মসজিদ থেকে মুসল্লিদের মিছিলে অংশ নেয় এবং চৌহা্ট্টায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়।
রোববার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ঘোষণা : রোববার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল এবং সোমবার সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইসলামী দলগুলো। গতকাল রাজধানীসহ সারাদেশে আলেম-ওলামাসহ ধর্মপ্রাণ মানুষের বিক্ষোভে পুলিশ ও র্যাবের বেপরোয়া হামলায় ৪ জন নিহত, শত শত মানুষ গুলিবিদ্ধসহ দুই সহস্রাধিক মুসল্লি আহত, গ্রেফতার ও নির্যাতনের প্রতিবাদ, আটক নেতাকর্মীদের মুক্তি এবং নাস্তিক-মুরতাদদের শাস্তি দাবিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বিকালে রাজধানীর কামরঙ্গীরচর মাদরাসায় বিভিন্ন ইসলামী দলের যৌথ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা শাহ আহমদুল্লাহ আশরাফ।
এ সময় তিনি বলেন, সরকার কথিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে দেশ থেকে ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ উত্খাতের ষড়যন্ত্র করছে। তারা কথিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বললেও সম্প্রতি বিচারের দাবিদার শাহবাগি নৈরাজ্যবাদীদের নবী-রাসুল (সা.) ও ইসলামবিরোধিতায় তাদের থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়েছে। তারা কথিত বিচারের নামে ইসলামকেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। স্বঘোষিত নাস্তিকরা আল্লাহ, নবী-রাসুল (সা.), সাহাবায়ে কিরাম ও আজওয়াজে মোতাহারাদের সম্পর্কে কটূক্তি করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি।
তিনি বলেন, সরকার ও কুচক্রীদের ঘৃণ্য অপতত্পরতার প্রতিবাদে গতকাল বাদ জুমা দেশের সব ইসলামী দল ও ইসলামপ্রিয় জনতা রাজপথে নেমে এলে সরকারের নির্দেশে পুলিশ ও সন্ত্রাসী বাহিনী উলামা-মাশায়েখ, ইসলামপ্রিয় এবং দেশপ্রেমী জনতার ওপর হামলা, লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ এবং বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করছে। এতে সারাদেশে ইসলামী দলগুলোর নেতাসহ দুই সহস্রাধিক ইসলামপ্রিয় ও দেশপ্রেমী জনতা আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে শত শত গুলিবিদ্ধ ও ঝিনাইদহ, গাইবান্ধা ও সিলেটে ৪ জনকে শহীদ করা হয়েছে। পুলিশ সারাদেশে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে অতীতে ফেরাউন, নুমরুদ ও হামানদের শেষ রক্ষা হয়নি; আওয়ামী লীগেরও শেষ রক্ষা হবে না।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, মাওলানা আবু জাফর কাসেমী, মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, মুফতি ফখরুল ইসলাম, মুফতি মাহমুদুল হাসান, মুফিতি আবু সাঈদ প্রমুখ।
ঢাকায় মসজিদে যেতে মুসল্লিদের বাধা : আজকের বিক্ষোভ ঠেকাতে সকাল থেকেই কড়া প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সব মসজিদ এলাকাতেই সাঁজোয়া যান নিয়ে র্যাব-পুলিশের সতর্ক অবস্থান ও টহলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। বিশেষ করে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ আশপাশের সব মসজিদকে ঘিরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলে তারা। একপর্যায়ে বায়তুল মোকাররমের সব গেটে র্যাব ও পুলিশ অবস্থান নিয়ে মুসল্লিদের জুমার নামাজের উদ্দেশে মসজিদে যেতে দফায় দফায় বাধা দেয়। এ সময় মসজিদে যেতে চাইলে বিজয়নগর, পল্টন মোড়, দৈনিকবাংলাসহ বিভিন্ন স্থানে ইসলামী দলের কর্মী-সমর্থক এবং পাঞ্জাবি পরা ও টুপি-দাড়িধারী সাধারণ মুসল্লিদের অবরুদ্ধ করে রাখে। পুলিশের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করে সাধারণ মুসল্লি পরিচয়ে অনেকে মসজিদে প্রবেশ করেন। অধিকাংশ মুসল্লিই পুলিশি বাধায় ফিরে গিয়ে অন্য মসজিদে নামাজ আদায় করেন। আগে থেকে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও জুমার নামাজের উদ্দেশে মুসল্লিদের মসজিদে যেতে এভাবে বাধা দেয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা।
বায়তুল মোকাররমে আটকেপড়া মুসল্লিদের আর্তনাদ : জুমার নামাজের পর বের হওয়া ইসলামী দলগুলোর মিছিলে পুলিশ বেপরোয়া গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে বায়তুল মোকাররমে আসা সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পুলিশ মসজিদের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব পাশ দিয়ে মসজিদ চত্বরে মুহুর্মুহু টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে গ্যাসের প্রভাবে ছোটাছুটি করতে থাকেন মুসল্লিরা। অনেকে আহত হয়ে পড়ে কান্নাকাটি করেন। ছুটে যান অজুখানার ভেতরে পানির জন্য। হুড়োহুড়ি করে রুমাল ভিজিয়ে বা চোখে মুখে পানি দেয়ার চেষ্টা করেন তারা। অনেকেই মসজিদের ভেতরে কাগজে আগুন জ্বালান। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়াদের একে অপরকে ধরে সেবা করেন সেখানে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় নিচ তলা থেকে ৫-৬ তলা পর্যন্ত ছোটাছুটি করে আতঙ্কিত ও আহত মুসল্লিরা। এ সময় পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। মসজিদের ভেতরে সাধারণ মুসল্লিদের ওপর এ ধরনের হামলা নিকট অতীতে আর হয়েছে বলে কেউ মনে করতে পারছিলেন না। পরিস্থিতি শান্ত হলে আসরের পর অবরুদ্ধ মুসল্লিদের অনেকে বের হয়ে যান।
ইসলামী আন্দোলনের সমাবেশ : বাদ জুমা রাজধানীর হাউস বিল্ডিং চত্বরে ইসলামী আন্দোলন এক সমাবেশ করে। সমাবেশে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ বলেন, সরকার ঈমানি মিছিলে গুলি চালিয়ে নিজেদের সর্বনাশা পতন ডেকে আনছে। ঈমানদার মুসল্লি, আলেম-উলামার ওপর নির্মম গুলি ও বেধড়ক লাঠিপেটা করে নাস্তিক-মুরতাদরে পক্ষাবলম্বন করেছে। বাম-রাম ও নাস্তিকদের পরামর্শে আলেমদের ওপর গুলি চালিয়ে অত্যন্ত খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে অবিলম্বে নাস্তিক-মুরতাদরে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া না হলে হরতালসহ কঠোর কর্মসূচির হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। এদিকে এ হামলা ও গ্রেফতারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ২৫ সমমনা ও ইসলামী সংগঠন।
আহমদ আবদুল কাদের অসংখ্য মুসল্লি গুলিবিদ্ধ : খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে এক প্রেসব্রিফিংয়ে বলা হয়, জুমার নামাজের পর দলের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের হয়ে প্রেস ক্লাবের দিকে যাওয়ার সময় পল্টন পুলিশ বক্সের সামনে সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে পুলিশ নির্বিচার গুলিবর্ষণ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, যুগ্ম মহাসচিব শেখ গোলাম আসগর, মহানগরী সভাপতি মাওলানা নোমান মাযহারী, আবদুল জলিল, আবুল কালাম আযাদ, অ্যাডভোকেট শায়খুল ইসলামসহ বহু নেতাকর্মী বুলেটবিদ্ধ হন। আহত হয়েছেন শতাধিক নেতাকর্মী। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে অনেককেই গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে খেলাফত মজলিসের উদ্যোগেও পৃথকভাবে রোববার সারাদেশে হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
এদিকে ইসলামী দলগুলোর কর্মসূচি সংবাদ সংগ্রহের সময় সহিংসতার মাঝে পড়ে ঢাকাসহ সারা দেশে অন্তত ২৫ সাংবাদিক আহত হয়েছেন। ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকায় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন আমার দেশ-এর চিফ ফটোগ্রাফার মীর আহম্মদ মীরু। কয়েকটি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিককে মারধর ও ক্যামেরা ভাংচুর করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ইটিভি সাংবাদিককে পিটিয়েছে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। পরে বিকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে শাসকদলের মিছিল থেকে হামলা ও তাণ্ডব চালানো হয়েছে। চট্টগ্রামে আমার দেশ ও দিগন্ত টিভির ব্যুরো অফিসে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট চালিয়েছে আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা। সিলেটে ব্যাংক, হাসপাতাল, মার্কেট, কোচিং সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুট ও আগুন দেয়া হয়।
দেশের আলেমকুল শিরোমণি, কওমি মাদরাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান আল্লামা আহমদ শফির নেতৃত্বাধীন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল ও সংগঠন ব্লগে আল্লাহ, রাসুল (সা.), ইসলাম ও কোরআন শরিফকে অবমাননার প্রতিবাদে বিক্ষোভের ডাক দেয়। জুমার নামাজ শেষে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী নিরীহ মুসল্লিদের ওপর নজিরবিহীন বেপরোয়া অ্যাকশন চালায় পুলিশ। সিলেট, গাইবান্ধা ও ঝিনাইদহে পাঁচ মুসল্লিকে হত্যা ছাড়াও চার হাজারের বেশি মুসল্লিকে আহত ও গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের অবিরাম গুলি ও টিয়ারশেল বর্ষণে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র দীর্ঘসময় ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নেয়। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকাসহ পুরো রাজধানী হয়ে পড়েছে আতঙ্কের নগরী। নিরীহ জনতার বিপক্ষে পুলিশ ব্যবহার করেছে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হ্যান্ড গ্রেনেড। ওইসব গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের ভেতরেও। হাফ ডজন রায়ট কার থেকে থেকে বৃষ্টির মতো গুলি ও টিয়ারশেল ছোড়া হয়েছে বায়তুল মোকাররম মসজিদের ভেতরে। পুলিশের এই নজিরবিহীন অ্যাকশনে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে পড়েন জুমার নামাজে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিরা।
পুলিশ বেষ্টনীতে লাগাতার সংঘর্ষে টানা চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিল বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদ। বায়তুল মোকাররম ও আশপাশের এলাকা, পুরানাপল্টন, বিজয়নগর, দৈনিক বাংলা মোড়, মুক্তাঙ্গন, প্রেস ক্লাব, তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচা এলাকা ছিল রীতিমত যুদ্ধক্ষেত্র। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কার্যত কোনো উসকানি ছাড়াই টানা চার ঘণ্টা নিরীহ জনতার ওপর তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে যুদ্ধংদেহী পুলিশ সদস্যরা। পুলিশের গুলিতে বায়তুল মোকাররম ও আশপাশের এলাকায় আহত হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ। গ্রেফতার করা হয়েছে দুই শতাধিক মুসল্লিকে।
হামলার প্রতিবাদে কাল রোববার ঢাকাসহ সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে সমমনা ইসলামী ১২ দল। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুরো ঢাকা ছিল এক আতঙ্কের নগরী। রাস্তাঘাট ছিল যানবাহনশূন্য ফাঁকা। শহরজুড়ে ছিল পুলিশের কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবলয়। মানুষের মধ্যে ছিল উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা।
পুলিশি হামলায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে অজ্ঞাত তিন ব্যক্তি, ঝিনাইদহে ঝিনাইদহ আলিয়া মাদরাসার শিক্ষক ও ঝিনাইদহ সদরের আরাফপুর জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুস সালাম এবং সিলেটে অজ্ঞাত এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকায় আহত হয়েছেন খেলাফত আন্দোলনের আমির প্রবীণ আলেম মাওলানা শাহ আহমদুল্লাহ আশরাফ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, ইসলামী আন্দোলনের ঢাকা মহানগর সভাপতি অধ্যাপক এটিএম হেমায়েত উদ্দিনসহ অনেক শীর্ষ আলেম। এছাড়া আটক করা হয়েছে দুই ব্রিটিশ নাগরিকসহ বহু আলেমকে।
ঢাকায় বিক্ষুব্ধ মুসল্লিরা জানান, তারা নাস্তিক ব্লগারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ইসলামের অবমাননার বিরুদ্ধে ব্লাসফেমি আইনের মতো একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়নের দাবি করে আসছেন। তাদের শান্তিপূর্ণ মিছিল কর্মসূচিতে ক্ষমতাসীন দলের নির্দেশে এক ধরনের বিনা উসকানিতেই গুলি ও হামলা চালিয়েছে পুলিশ। আবার পুলিশের প্রহরায় ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা উসকানিমূলক স্লোগানসহ মিছিল করেছে।
বায়তুল মোকাররম এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে, নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে সকাল থেকেই উত্তেজনা ছিল। মোতায়েন ছিল অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশ। তারা সকাল থেকেই ছিল রণসাজে সজ্জিত। জুমার নামাজের আগেই তারা কয়েক দফা উত্তেজনা তৈরি করে মুসল্লিদের সঙ্গে। এতে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন মুসল্লিরা। এ সময় তারা সরকারের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন।
বেলা ১টা ২০ মিনিটে জুমার নামাজের সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গেই ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ‘নারায়ে তাকবির’ ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি তুলে বিক্ষোভ মিছিলসহ মসজিদ থেকে বের হয়ে আসে। তারা বায়তুল মোকাররম উত্তরগেটেই জড়ো হয়ে সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিলসহ প্রেস ক্লাবের দিকে রওনা হয়। মিছিলটি পল্টন চৌরাস্তায় পৌঁছে সামনে এগোনোর চেষ্টা করা মাত্রই পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে। পুলিশের মুহুর্মুহু গুলি, রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, বেপরোয়া লাঠিচার্জে বিশাল বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয়া হাজার হাজার মানুষ বিজয়নগর, মুক্তাঙ্গন, পল্টন, আশপাশের বিভিন্ন অলিগলিতে প্রবেশ করে। তারা ইসলাম ও নবী করিম (সা.)-এর অবমাননার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়ে পুলিশকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশ জনতাকে লক্ষ করে আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য হাজার হাজার রাউন্ড গুলি, রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে পুরো বায়তুল মোকাররম এলাকায় মহাযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পুলিশের বেপরোয়া অ্যাকশন ছড়িয়ে পড়ে বায়তুল মোকাররম উত্তর ও দক্ষিণ গেট, পুরানা পল্টন, দৈনিক বাংলা, জিপিও, বিজয়নগর, প্রেস ক্লাব, তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচা হয়ে মত্স্যভবন পর্যন্ত। পুলিশ রায়ট কার থেকে গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এগুলোর বিস্ফোরণে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হয়। ওই সময় পুলিশ মিডিয়া কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়, মিছিলকারীরা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। পুলিশের গুলি, গ্রেনেড ও লাঠিচার্জে আহত শত শত মুসল্লিকে রাস্তায় অজ্ঞান ও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা দুটি মোটরসাইকেল, ফুটপাতে দোকানসহ বিভিন্ন সরঞ্জামে আগুন দেয়। পুলিশের গুলির ভয়ে সহযোগী মুসল্লিরা তাদের উদ্ধার করতে আসার সাহস পায়নি। এরই মধ্যে মুসল্লিদের ধাওয়ায় পুলিশ কিছুটা সরে গেলে আহতদের উদ্ধার করে নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও বাসাবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
নামাজের পর কিছু মুসল্লি মসজিদ থেকে বের হলেও ১০ হাজারের মতো মুসল্লি তখনও মসজিদের ভেতরে। তারা পুলিশের অ্যাকশনের মধ্যে আটকে পড়ে। তারা মসজিদের ভেতরে পুলিশকে লক্ষ করে জুতা, ইট ও কাচের টুকরো নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশও মসজিদে শত শত রাউন্ড গুলি, টিয়ারশেল ও বেশ কয়েকটি হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। পুলিশ রায়টকার থেকে কনডোর নামে কয়েকটি হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে মসজিদের ভেতরে।
এরই মধ্যে পুলিশ জিপিও, বাইতুল মোকাররম উত্তর গেট, দক্ষিণ গেট, পুরানাপল্টন, বিজয়নগর ও সেগুনবাগিচা এলাকায় গুলি ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালাতে থাকে। জনতা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে পুলিশকে ধাওয়া করে। ধাওয়া পল্টা ধাওয়ায় কিছুক্ষণ পুলিশের দখলে, কিছুক্ষণ জনতার দখলে এভাবে সংঘর্ষ এগোতে থাকে। বেলা ১টা ৫০ মিনিটের দিকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে একজন দাড়িওয়ালা প্যান্ট-শার্ট পরিহিত ব্যক্তি বের হয়ে আসেন। কয়েকজন পুলিশ তার ওপর হামলা করে বেধড়ক লাঠিপেটা করে। তিনি দৌড়ে রাস্তার অপরপ্রান্তে গেলে কমপক্ষে ৭-৮ জন পুলিশ তার ওপর বেপরোয়া গুলি ছুড়তে থাকে। কিন্তু ওই ব্যক্তি তখন দৌড়ে পুরানা পল্টনে আজাদ প্রোডাক্টের দিকে চলে যান। অলৌকিকভাবে তার গায়ে একটি গুলিও লাগেনি।
বেলা ২টার দিকে পুরানা পল্টন জামে মসজিদ থেকে আরেকটি মিছিল বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটের দিকে আসে। মিছিলটি বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে পৌঁছামাত্র পুলিশ আবার গুলি ছুড়তে শুরু করে। রায়ট কার থেকেও মিছিল লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে। এ সময় রায়ট কারগুলো সাইরেন বাজিয়ে টহল দিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়। জনতার দেয়া আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছলে সেগুলোতেও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। একপর্যায়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে।
বেলা ২টার দিকে দৈনিক বাংলার দিকে আবার পুলিশ গুলি শুরু করে। তারা গুলি করতে করতে বায়তুল মোকাররমের দিকে আসে এবং মসজিদের ভেতরে গুলি করে। সোয়া দুটোর দিকেও কয়েক রাউন্ড গুলি ও বিস্ফোরণ ঘটায় পুলিশ। বেলা আড়াইটার দিকে জিপিও এবং বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটের দিকে কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে।
এরই মধ্যে মসজিদের ভেতরে আটকাপড়া মুসল্লিরা বিক্ষোভ করে বের হয়ে আসতে চাইলে পুলিশ গুলি, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে থাকা পুলিশ সদস্যরাও রাস্তা থেকে ইট কুড়িয়ে মসজিদের ভেতরে নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশের টিয়ারশেল থেকে বাঁচার জন্য মুসল্লিরা মসজিদের কার্পেটসহ বিভিন্ন সরঞ্জামে আগুন ধরিয়ে দেয়। দীর্ঘসময় ধরে মসজিদের ভেতরের কয়েকটি স্থানে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।
দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে কয়েক প্লাটুন পুলিশ বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে এবং কয়েক প্লাটুন বায়তুল মোকাররম জুয়েলারি মার্কেটের দোতলায় ওঠে। তারা দুই দিক থেকে মসজিদের ভেতরে মুসল্লিদের লক্ষ্য করে গুলি ও টিয়ারশেল মারতে থাকে।
বেলা পৌনে তিনটার দিকে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে ওভার ব্রিজের নিচ থেকে একটি রায়ট কার থেকে মাইকে সাধারণ মুসল্লিদের বের হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। মাইকে বলা হয়, সাধারণ মুসল্লি যারা আছেন, আমরা আপনাদের উদ্ধার করার জন্য এসেছি। আপনারা একে একে বের হয়ে আসুন। বের হয়ে না এলে আমরা মসজিদের ভেতরে ঢুকব। আপনারা বের হয়ে না এলে যত প্রকার আইনি ব্যবস্থা নেয়া যায় আমরা সবই নেব। পুলিশের ঘোষণা শুনে কয়েকজন মুসল্লি বের হয়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু এ সময় জুয়েলারি মার্কেটের দোতলায় অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা আবারও টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলি ছুড়ে মুসল্লিদের রক্ষা করে। এ সময় পুলিশের বের হয়ে আসা ও গুলি এই দ্বিমুখী নীতির কারণে ক্ষোভ দেখা দেয়। পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকে মুসল্লিরা।
বেলা পৌনে তিনটার দিকে মিডিয়া কর্মীদের একটি অংশ মসজিদের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। তারাও সাধারণ মুসল্লিদের বের হয়ে আসার আহ্বান জানায়। কিন্তু যারা বের হয়ে আসেন তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে আটক করে। বেলা তিনটার দিকে দক্ষিণ গেট ও স্টেডিয়ামের গেট দিয়ে কিছু মুসল্লি বের হয়ে যান। পরে সেখানে গিয়েও পুলিশ ধরপাকড় শুরু করে।
আতঙ্কিত মুসল্লিরা মসজিদের ভেতরে থেকেই আসরের নামাজ আদায় করেন। আসরের নামাজের আগে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ পুলিশি পাহারায় কয়েকটি খণ্ড খণ্ড মিছিল বের করে। সেগুলো থেকে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়া হয়। মিছিলটি পল্টন, বায়তুল মোকাররম, দৈনিকবাংলা হয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গিয়ে শেষ হয়।
পল্টন থেকে পুলিশের গুলি ও হামলায় দুই হাজারের বেশি মুসল্লি আহত হয়েছেন। তাদের অনেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাতাল, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছেন। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
গতকাল দুপুর ১২টার আগে থেকেই মুসল্লিরা বায়তুল মোকাররম মসজিদে যাওয়ার চেষ্টা করেন। গেট আটকিয়ে এবং তল্লাশি করে তাদের মসজিদে নামাজ পড়ায় বাধা সৃষ্টি করে পুলিশ। মুসল্লিরা বাধা পেয়ে পুরানা পল্টন গ্র্যান্ড আজাদ হোটেলের সামনে জুমার নামাজ আদায় করেন। সেখান থেকেও তারা মিছিল বের করেন। এছাড়া পুরানা পল্টন জামে মসজিদেও নামাজ শেষে মিছিল বের করা হয়।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দাবি করেছে, তাদের নগর সভাপতি অধ্যাপক মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দিন, কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ূমসহ প্রায় ২০ জন গুলি বিদ্ধ ও শতাধিক কর্মী আহত এবং বেশকিছু কর্মী গ্রেফতার হয়েছে। আহতদের মধ্যে রয়েছে মো. সিরাজুল ইসলাম, আবদুস সাত্তার, শাহ আলম, আবু বকর, আবদুল্লাহ, রেজাউল করিম, আবদুল আজিজ, ওবায়দুল হক, ইবরাহীম খলিল, শামসুল আলম, মাস্টার মুজাম্মেল হক, দ্বীন ইসলাম, আল আমিন, আবদুল আহাদ. নুরুল ইসলাম, গোলাম রাব্বীসহ আরও বেশ কয়েকজন রয়েছেন। তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, তাদের ৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তারা ১৭২ জনকে নাশকতার অভিযোগে গ্রেফতার করেছেন।
কাঁটাবন এলাকা : কাঁটাবন জামে মসজিদে জুমার নামাজের আগে থেকেই অতিরিক্ত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। মসজিদে নামাজে যাওয়ার আগে মুসল্লিদের হয়রানি করা হয়। নামাজ শেষে মুসল্লিরা মিছিল বের করতে চাইলে পুলিশ গুলি, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে মুসল্লিদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুলিশ সেখান থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করে। তারা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত দুজন ব্রিটিশ নাগরিককে আটক ও আহত করে। কাঁটাবনে পুলিশের হামলায় অর্ধশতাধিক মুসল্লি আহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই রাবার বুলেট ও পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সেখানে শাহবাগ থানার ওসিসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
কারওয়ানবাজার : কারওয়ানবাজার আম্বরশাহ মসজিদে জুমার নামাজ শেষে কারওয়ানবাজার এলাকা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি সোনারগাঁও ক্রসিং হয়ে শাহবাগের দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ তাদের লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সেখান থেকেও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়েছে।
মিরপুর এলাকা : বেলা ২টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বরে পুলিশের তৌহিদী জনতার সংঘর্ষ শুরু হয়। জুমার নামাজের পর মিরপুরে বিভিন্ন মসজিদ থেকে মুসল্লিরা ১০ নম্বর গোলচক্করের দিকে আসতে থাকে। এ সময় পুলিশ তাদের বাধা দেয়। বেলা সোয়া দুইটার দিকে তৌহিদী জনতা মিছিল করতে চাইলে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। মিছিলগুলো থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ইবাদুর রহমান, কাজী রমজান, আবদুল হান্নান ও নূর আলম নামে চারজনকে আটক করেছে। এছাড়াও এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও দাঙ্গা পুলিশ এবং র্যাব সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
খিলগাঁও বাসাবো এলাকা : খিলগাঁও চৌরাস্তা, খিলগাঁও বড় মসজিদ, বাসাবোসহ বিভিন্ন মসজিদ থেকে মুসল্লিরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় খিলগাঁও এলাকায় পুলিশ মিছিলে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় বেশ কয়েকজন মুসল্লিকে আটক করে পুলিশ।
আজিমপুর : আজিমপুর ও হাজারীবাগে তৌহিদী জনতার ব্যানারে মিছিল করতে চাইলে পুলিশি বাধায় সেটি পণ্ড হয়ে যায়। আজিমপুর মসজিদে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা মুসল্লিদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ।
নাখালপাড়ায় হামলা : ইসলাম ও নবী (স.) এর অবমাননা প্রতিবাদে সাধারণ মুসল্লিদের ব্যানারে নাখালপাড়া বড় মসজিদ থেকে একটি বিশাল মিছিল বের হয়। মিছিলটি গোটা নাখালপাড়া প্রদক্ষিণ শেষে রেলগেট শহীদ মিনারে শেষ হওয়ার প্রাক্কালে ৩৮নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার শেখ মুজিবুর রহমান ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা তার ভাই শেখ লিটন, শেখ কাদির, শেখ মাইদুল, হেদায়েত, সাগর, বায়েজীদের নেতৃত্বে মিছিলের পেছন থেকে হামলা করা হয়। এই হামলায় ৫ জন মুসল্লি আহত হয়েছেন। তাদের স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিত্সার জন্য ভর্তি করা হয়।
ঢামেকে আহতরা : পুলিশের গুলি ও ইট-পাটকেলে আহতদের মধ্যে কমপক্ষে ৪০ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছে। তাদের মধ্যে ২৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশ আহতদের মধ্যে ৬ জনকে আটক করে নিয়ে যায়। আহতদের মধ্যে মো. আরিফুর রহমান হীরা (৩২) এবং ৩৫ বছর বয়সী অজ্ঞাত এক ব্যক্তির অবস্থা আশঙ্কাজনক।
আহত হীরার ভাই মানিক সাংবাদিকদের জানান, তার ভাই হীরা কোনো দলের ছিলেন না। গতকাল তিনি বায়তুল মোকাররমে যান জুমার নামাজ আদায় করার জন্য। নামাজ শেষে বের হলে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটের সামনে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন। তার কোমরের ডান পাশে আঘাত লাগে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, হীরার ক্ষত দেখে মনে হচ্ছে তাকে পুলিশ রাইফেল ঠেকিয়ে গুলি করেছে। হীরা আমার দেশ সমবায় সমিতির সভাপতি। তার বাবার নাম মোসলেম উদ্দিন হাওলাদার। তার বাসা যাত্রাবাড়ীর ভাঙ্গাপ্রেস চাঁদনীর মাঠ।
অজ্ঞাত ওই ব্যক্তিকে ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিত্সাধীন রাখা হয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়রা গুলি বিদ্ধ হয়েছে। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আহতরা হলেন চ্যানেল একাত্তরের ক্যামেরাম্যান আরিফুর রহমান পিয়াস, জিটিভির রিপোর্টার মাসুদুর রহমান, আল-আমিন, মো. হান্নান, মো. অসিম, ফজলে রাব্বি, মো. বেলাল হোসেন, সুমন, মো. সফিক, মো. সেলিম, আমিনুল ইসলাম, সংবাদের রিপোর্টার সাইফ বাবলু, সুমন, জাকির হোসেন, ময়নুদ্দিন, ইমরান হোসেন, জহিরুল হক, অহিদুল ইসলাম, পথচারী সোনিয়া, সাদেক, জনকণ্ঠের ফটোসাংবাদিক মামুন এবং মোক্তার হোসেন।
ঝিনাইদহে খতিব নিহত : ঝিনাইদহে গতকাল জুমার নামাজের পর ওলামা-মাশায়েখদের সঙ্গে সরকার সমর্থকদের সংঘর্ষে আবদুস সালাম (৪৭) নামে এক মাদরাসা শিক্ষক ও জামে মসজিদের খতিব নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩ সাংবাদিকসহ অর্ধশত মানুষ। নিহত আবদুস সালাম ঝিনাইদহ শহরের আলিয়া মাদরাসার আরবি বিভাগের প্রভাষক ও আরাফপুর জামে মসজিদের খতিব। তিনি রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার মাটিপাড়া গ্রামের আবদুল মজিদের ছেলে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল জুমার নামাজের পর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে মিছিল বের করার চেষ্টা করে মুসল্লিরা। সেখানে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীরা বাধা দেয়। পরে শহরের শেরেবাংলা সড়কে নতুন হাটের রাস্তায় জামায়াত ও ইসলামী সমমনা দলগুলো ওলামা-মাশায়েখদের ব্যানারে মিছিল বের করে। এসময় পুলিশ মিছিলে বাধা দেয়। তারপরও তারা মিছিল চালিয়ে গেলে সরকার সমর্থক ক্যাডাররা হামলা চালায়। উভয় পক্ষ ব্যাপক ইটপাটকেল ছোড়ে। এক পর্যায়ে পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে মিছিলকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। সংঘর্ষের সময় ঝিনাইদহ হাটের রাস্তায় হামদর্দ চিকিত্সা কেন্দ্রের সামনে আবদুস সালামকে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা। এসময় তিনি অজ্ঞান হয়ে রাস্তার ওপর পড়ে যান। তাকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নেয়া হলে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রাশেদ আল মামুন মৃত ঘোষণা করেন। সংঘর্ষে আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি।
গাইবান্ধায় গুলিতে নিহত ৩ : পবিত্র কোরআন ও ইসলাম রক্ষা এবং কোরআন ও ইসলামবিরোধীদের গ্রেফতারের দাবিতে গতকাল জুমার নামাজ শেষে গাইবান্ধার পলাশবাড়িতে সমমনা কয়েকটি ইসলামী দলের কয়েক হাজার লোক মিছিল করে রংপুর-বগুড়া মহাসড়ক অবরোধ করে। এসময় পুলিশ অবরোধকারীদের ওপর হামলা করলে উভয় পক্ষে ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে ২ জন ঘটনাস্থলে এবং একজন হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান। এছাড়া পুলিশসহ ৫০ জন আহত ও ১৫টি গাড়ি ভাংচুর করা হয়।
সূত্র জানায়, পলাশবাড়ি চৌরাস্তা থেকে মহেশপুর পর্যন্ত ১ কিলোমিটার সড়ক অবরোধ করে রাখার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিনা উস্কানিতে ৩০ রাউন্ড গুলি নিক্ষেপ করে। এসময় ৬ জন গুলিবিদ্ধ হন। গুলিতে নিহত ২ জনের লাশ থানায় নেয়ার পর বিকালে তাদের মৃতদেহ গাইবান্ধা হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। তাদের পরিচয় জানায়নি পুলিশ। থানায় কোনো মিডিয়াকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। মোমিন নামের অপর আহত একজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান বলে এলাকার লোকজন জানান। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ ১৫ জনকে আটক করেছে। পুলিশ নিহত বা আহত ব্যক্তিদের নাম দিতে পারেনি। পলাশবাড়ি থানায় কোনো মিডিয়াকে ঢুকতে দেয়া হয়নি।
অপরদিকে গাইবান্ধা স্টেশন জামে মসজিদ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরের কাচারী বাজার পৌঁছলে সেখানে পুলিশের সঙ্গে তৌহিদি জনতার সংঘর্ষ বাধে। মিছিল থেকে ৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
সিলেটে নিহত ১ : বাদ জুমা সিলেটে তৌহিদি জনতার মিছিলে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে এক যুবক এবং অর্ধশতাধিক আহত হন। এসময় নগরীর চৌহাট্টা পয়েন্ট ও সংলগ্ন সড়কগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এসময় গণজাগরণ মঞ্চ ভাংচুর, পাশের ট্রাস্ট ব্যাংকের গ্যারেজ ও এটিএম বুথ এবং দুই মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। জুমার নামাজের পর কয়েক হাজার লোকের মিছিল চৌহাট্টা আসার পর পুলিশ উভয় দিক থেকে মিছিলকারীদের আক্রমণ করলে সংঘর্ষ বেধে যায়। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে চৌহাট্টা-মীরবক্স টুলা সড়কে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় অজ্ঞাত পরিচয় একজনকে উদ্ধার করে ওসমানী হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নেয়ার পর ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে সিংহবাড়ী ও আশপাশের এলাকা থেকে আটক করা গুলিবিদ্ধ ও লাঠিচার্জে আহত অন্তত অর্ধশত লোককে পুলিশের গাড়িতে করে ওসমানী হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে পুলিশ প্রহরায় চিকিত্সা শেষে ২০ জনকে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গুলিবিদ্ধ ১২ জনকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নগরীতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সিলেটে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় মোস্তফা মুর্শেদ তাহসীন (১৮)। তার বাবা নুরুল মোস্তফা জালালাবাদ গ্যাসে কর্মরত। এমসি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র তাহসীন। জুমার নামাজ শেষে হাউজিং এস্টেট মসজিদ থেকে মুসল্লিদের মিছিলে অংশ নেয় এবং চৌহা্ট্টায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়।
রোববার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ঘোষণা : রোববার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল এবং সোমবার সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইসলামী দলগুলো। গতকাল রাজধানীসহ সারাদেশে আলেম-ওলামাসহ ধর্মপ্রাণ মানুষের বিক্ষোভে পুলিশ ও র্যাবের বেপরোয়া হামলায় ৪ জন নিহত, শত শত মানুষ গুলিবিদ্ধসহ দুই সহস্রাধিক মুসল্লি আহত, গ্রেফতার ও নির্যাতনের প্রতিবাদ, আটক নেতাকর্মীদের মুক্তি এবং নাস্তিক-মুরতাদদের শাস্তি দাবিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বিকালে রাজধানীর কামরঙ্গীরচর মাদরাসায় বিভিন্ন ইসলামী দলের যৌথ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা শাহ আহমদুল্লাহ আশরাফ।
এ সময় তিনি বলেন, সরকার কথিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে দেশ থেকে ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ উত্খাতের ষড়যন্ত্র করছে। তারা কথিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বললেও সম্প্রতি বিচারের দাবিদার শাহবাগি নৈরাজ্যবাদীদের নবী-রাসুল (সা.) ও ইসলামবিরোধিতায় তাদের থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়েছে। তারা কথিত বিচারের নামে ইসলামকেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। স্বঘোষিত নাস্তিকরা আল্লাহ, নবী-রাসুল (সা.), সাহাবায়ে কিরাম ও আজওয়াজে মোতাহারাদের সম্পর্কে কটূক্তি করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি।
তিনি বলেন, সরকার ও কুচক্রীদের ঘৃণ্য অপতত্পরতার প্রতিবাদে গতকাল বাদ জুমা দেশের সব ইসলামী দল ও ইসলামপ্রিয় জনতা রাজপথে নেমে এলে সরকারের নির্দেশে পুলিশ ও সন্ত্রাসী বাহিনী উলামা-মাশায়েখ, ইসলামপ্রিয় এবং দেশপ্রেমী জনতার ওপর হামলা, লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ এবং বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করছে। এতে সারাদেশে ইসলামী দলগুলোর নেতাসহ দুই সহস্রাধিক ইসলামপ্রিয় ও দেশপ্রেমী জনতা আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে শত শত গুলিবিদ্ধ ও ঝিনাইদহ, গাইবান্ধা ও সিলেটে ৪ জনকে শহীদ করা হয়েছে। পুলিশ সারাদেশে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে অতীতে ফেরাউন, নুমরুদ ও হামানদের শেষ রক্ষা হয়নি; আওয়ামী লীগেরও শেষ রক্ষা হবে না।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, মাওলানা আবু জাফর কাসেমী, মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, মুফতি ফখরুল ইসলাম, মুফতি মাহমুদুল হাসান, মুফিতি আবু সাঈদ প্রমুখ।
ঢাকায় মসজিদে যেতে মুসল্লিদের বাধা : আজকের বিক্ষোভ ঠেকাতে সকাল থেকেই কড়া প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সব মসজিদ এলাকাতেই সাঁজোয়া যান নিয়ে র্যাব-পুলিশের সতর্ক অবস্থান ও টহলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। বিশেষ করে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ আশপাশের সব মসজিদকে ঘিরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলে তারা। একপর্যায়ে বায়তুল মোকাররমের সব গেটে র্যাব ও পুলিশ অবস্থান নিয়ে মুসল্লিদের জুমার নামাজের উদ্দেশে মসজিদে যেতে দফায় দফায় বাধা দেয়। এ সময় মসজিদে যেতে চাইলে বিজয়নগর, পল্টন মোড়, দৈনিকবাংলাসহ বিভিন্ন স্থানে ইসলামী দলের কর্মী-সমর্থক এবং পাঞ্জাবি পরা ও টুপি-দাড়িধারী সাধারণ মুসল্লিদের অবরুদ্ধ করে রাখে। পুলিশের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করে সাধারণ মুসল্লি পরিচয়ে অনেকে মসজিদে প্রবেশ করেন। অধিকাংশ মুসল্লিই পুলিশি বাধায় ফিরে গিয়ে অন্য মসজিদে নামাজ আদায় করেন। আগে থেকে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও জুমার নামাজের উদ্দেশে মুসল্লিদের মসজিদে যেতে এভাবে বাধা দেয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা।
বায়তুল মোকাররমে আটকেপড়া মুসল্লিদের আর্তনাদ : জুমার নামাজের পর বের হওয়া ইসলামী দলগুলোর মিছিলে পুলিশ বেপরোয়া গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে বায়তুল মোকাররমে আসা সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পুলিশ মসজিদের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব পাশ দিয়ে মসজিদ চত্বরে মুহুর্মুহু টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে গ্যাসের প্রভাবে ছোটাছুটি করতে থাকেন মুসল্লিরা। অনেকে আহত হয়ে পড়ে কান্নাকাটি করেন। ছুটে যান অজুখানার ভেতরে পানির জন্য। হুড়োহুড়ি করে রুমাল ভিজিয়ে বা চোখে মুখে পানি দেয়ার চেষ্টা করেন তারা। অনেকেই মসজিদের ভেতরে কাগজে আগুন জ্বালান। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়াদের একে অপরকে ধরে সেবা করেন সেখানে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় নিচ তলা থেকে ৫-৬ তলা পর্যন্ত ছোটাছুটি করে আতঙ্কিত ও আহত মুসল্লিরা। এ সময় পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। মসজিদের ভেতরে সাধারণ মুসল্লিদের ওপর এ ধরনের হামলা নিকট অতীতে আর হয়েছে বলে কেউ মনে করতে পারছিলেন না। পরিস্থিতি শান্ত হলে আসরের পর অবরুদ্ধ মুসল্লিদের অনেকে বের হয়ে যান।
ইসলামী আন্দোলনের সমাবেশ : বাদ জুমা রাজধানীর হাউস বিল্ডিং চত্বরে ইসলামী আন্দোলন এক সমাবেশ করে। সমাবেশে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ বলেন, সরকার ঈমানি মিছিলে গুলি চালিয়ে নিজেদের সর্বনাশা পতন ডেকে আনছে। ঈমানদার মুসল্লি, আলেম-উলামার ওপর নির্মম গুলি ও বেধড়ক লাঠিপেটা করে নাস্তিক-মুরতাদরে পক্ষাবলম্বন করেছে। বাম-রাম ও নাস্তিকদের পরামর্শে আলেমদের ওপর গুলি চালিয়ে অত্যন্ত খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে অবিলম্বে নাস্তিক-মুরতাদরে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া না হলে হরতালসহ কঠোর কর্মসূচির হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। এদিকে এ হামলা ও গ্রেফতারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ২৫ সমমনা ও ইসলামী সংগঠন।
আহমদ আবদুল কাদের অসংখ্য মুসল্লি গুলিবিদ্ধ : খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে এক প্রেসব্রিফিংয়ে বলা হয়, জুমার নামাজের পর দলের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের হয়ে প্রেস ক্লাবের দিকে যাওয়ার সময় পল্টন পুলিশ বক্সের সামনে সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে পুলিশ নির্বিচার গুলিবর্ষণ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, যুগ্ম মহাসচিব শেখ গোলাম আসগর, মহানগরী সভাপতি মাওলানা নোমান মাযহারী, আবদুল জলিল, আবুল কালাম আযাদ, অ্যাডভোকেট শায়খুল ইসলামসহ বহু নেতাকর্মী বুলেটবিদ্ধ হন। আহত হয়েছেন শতাধিক নেতাকর্মী। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে অনেককেই গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে খেলাফত মজলিসের উদ্যোগেও পৃথকভাবে রোববার সারাদেশে হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
Comments