পুলিশের গুলি ও লাঠিচার্জে আমার দেশ এর মীরুসহ ২৫ সাংবাদিক আহত


স্টাফ রিপোর্টার
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলাকালে রক্ষা পাননি সাংবাদিকরাও। গতকাল রাজধানীতে পুলিশের গুলি, রাবার বুলেট, টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৫ জন সংবাদকর্মী। পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন আমার দেশ-এর চিফ ফটোসাংবাদিক মীর আহাম্মদ মীরু। তার পায়ে পাঁচটি গুলি বিদ্ধ হয়। পরে অস্ত্রোপচার করে তার গুলি বের করেছেন চিকিত্সকরা।
অপরদিকে, চট্টগ্রামে আমার দেশ ও দিগন্ত টিভি অফিসে হামলা ও লুটপাট চালিয়েছে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা।
আমার দেশ-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো অফিসে ভাংচুর করে সেখান থেকে হামলাকারীরা কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ মালামাল লুট করে।
গতকাল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণমাধ্যম কর্মীরা ছিল পুলিশ, সরকার দলের ক্যাডারদের মূল টার্গেট। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশের গুলিতে আহত ও লাঞ্ছিত হয়েছেন সাংবাদিকরা। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে, এমনকি পরিচয়পত্র দেখিয়েও নিজেদের রক্ষা করতে পারেননি তারা। পরিচয় জেনেও পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তেড়ে এসেছে সাংবাদিকদের ওপর। নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও গুলি ছুড়ে আহত করেছেন পেশাগত দায়িত্বপালকারী সংবাদকর্মীদের। পুলিশ সংবাদকর্মীদের সংবাদ সংগ্রহ ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়ার পাশাপাশি তাদের ওপর অহেতুক চড়াও হয়েছে। পুলিশ অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছে সাংবাদিকদের। এ নিয়ে উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা বিরাজ করছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সংবাদকর্মীদের পরিবারে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা ছাড়াও তাদের ক্যামেরা কেড়ে নেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
এদিকে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন কার্যালয় লক্ষ করে পুলিশ গুলি চালালে আহত হন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির আপ্যায়ন সম্পাদক ও দৈনিক আমাদের অর্থনীতির সিনিয়র রিপোর্টার আমিনুল হক ভূইয়া। আহত সাংবাদিকদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।
আহত অন্য সাংবাদিকরা হলেন আমার দেশ-এর কোর্ট রিপোর্টার সরোজ মেহেদী, আমিনুল হক ভুইয়া, এনটিভির রিপোর্টার ফাহাদ মাহামুদ, মাছরাঙা টিভির সিনিয়র রিপোর্টার আবদুল্লাহ তুহিন, গাজী টিভির রিপোর্টার মাসুদুর রহমান, একাত্তর টিভির রিপোর্টার আরিফুজ্জামান পিয়াস, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির নুরুল ইসলাম, জনকণ্ঠের ফটোসাংবাদিক মামুন, সংবাদের রিপোর্টার সাইফ বাবলু, নিউ এজ-এর রিপোর্টার নিতাই রঞ্জন, জিটিভির রিপোর্টার মাসুদুর রহমান, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির ক্যামেরাম্যান নুরুল ইসলাম, এটিএন বাংলার ক্যামেরাম্যান জাহিদুজ্জামান, বাংলাভিশনের পলাশ ও বিটিভির এক ক্যামেরাম্যান। এদের মধ্যে অনেকেই গুলি বিদ্ধ হয়েছেন।
আমার দেশ-এর সাংবাদিক মীর আহম্মেদ মীরু বায়তুল মোকাররম এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। জুমার নামাজের পর মুসল্লিরা মিছিল করে জাতীয় প্রেস ক্লাবের দিকে যাওয়ার সময় পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে মুসল্লিদের সংঘর্ষ শুরু হলে ছবি তুলতে যান মীরু। এ সময় পুলিশের গুলিতে আহত হন সাংবাদিক মীরু। তার ডান পায়ে পাঁচটি গুলি বিদ্ধ হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সহকর্মীরা ছুটে এসে একটি রিকশাভ্যানে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে তাকে কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেয়া হয়। গতকাল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, গুলিতে আহত সাংবাদিক মীরু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। ডাক্তাররা অস্ত্রোপচার করে তার পায়ে লাগা একটি বুলেট ও কয়েকটি ছররা গুলি বের করেন।
অন্যদিকে র্যাব সদস্যদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন আমার দেশ-এর সুপ্রিমকোর্ট রিপোর্টার সরোজ মেহেদী। বিক্ষোভকারী সন্দেহে তাকে গুলি করতে উদ্যত হয় র্যাব। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর গুলি না করলেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এদিকে বায়তুল মোকাররম মসজিদে জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ শুরু করে মুসল্লিরা। এ সময় মেহেদী বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে দৈনিক বাংলার দিকে যাওয়ার সময় পথে র্যাবের একটি দল তাকে লক্ষ্য করে গুলি করতে উদ্যত হয়। একজন র্যাব সদস্য ‘শ্যুট শ্যুট’ দৌড়াবি না বলতে থাকে। এ সময় মেহেদী হাত উঁচিয়ে ‘জার্নাালিস্ট, জার্নাালিস্ট’ বলে চিত্কার করলে তাদের একজন সদস্য তার নাকের উপর বন্দুক ধরে আরেকজন মেহেদীর মাথার বাঁ পাশে বন্দুক তাক করে। তখন তিনি আবার জার্নালিস্ট, রিপোর্ট সংগ্রহ করছি বললে তাকে ছেড়ে দেয় র্যাবের এ দলটি। এরপর দৌড়ে আর একটু সামনে গেলে র্যাবের আরেকটি দলের তোপের মুখে পড়তে হয় তাকে। তারা এখানে কি, এখানে কি বলে তাকে ধরতে এলে মেহেদী সাংবাদিক পরিচয় দেন। এরপরও তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
অপরদিকে বেলা ২টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় পুলিশের একটি সাঁজোয়া যান (এপিসি-৯) টহল দিচ্ছিল। গাড়িটি ক্র্যাব কার্যালয়ের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয় লক্ষ করে এক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এ সময় কার্যালয়ের সামনে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক দাঁড়িয়ে ছিলেন। পুলিশের গুলিবর্ষণে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দৌড়ে ক্র্যাব কার্যালয়ে ঢুকে পড়েন। পুলিশের গুলিতে তখন ক্র্যাবের সিনিয়র সদস্য ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির আপ্যায়ন সম্পাদক সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম ভুঁইয়া আহত হন। একটি গুলি তার ডান পায়ে লাগে।
ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন ক্র্যাব কার্যালয়ে পুলিশের গুলি ও সাংবাদিক আমিনুল হক ভুঁইয়া আহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ক্র্যাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান লাভলু ও সাধারণ সম্পাদক আবুল সালেহ আকন। ক্র্যাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, অতীত এরূপ ঘটনা কখনও ঘটেনি। তারা গুলিবর্ষণকারী পুলিশ সদস্যকে শনাক্ত করে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। নেতারা বলেন, একটি সাংবাদিক সংগঠনের কার্যালয় লক্ষ্য করে এভাবে পুলিশের গুলি স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকিস্বরূপ। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এভাবে সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে পুলিশের গুলির ঘটনা অবশ্যই নিন্দনীয়। নেতারা বলেন, দোষী পুলিশ সদস্যকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা না হলে ক্র্যাবের পক্ষ থেকে বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ দুপুর ১২টায় ডিআরইউ চত্বরে ক্র্যাবের উদ্যোগে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এ ব্যাপারে মতিঝিল জোনের পুলিশের ডিসি শেখ নাজমুল আলম জানান, ক্র্যাব কার্যালয়ে গুলির ঘটনা আমার জানা নেই। সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের ব্যাপারে তিনি বলেন, পুলিশ সাংবাদিকদের ওপর কোনো লাঠিচার্জ করেনি। যদি হয়ে থাকে তাহলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে, রাজধানীর পাশাপাশি ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানেও সংবাদকর্মীরা ছিল টার্গেট। চট্টগ্রামে প্রায় ৮ জন সাংবাদিক আহত হন বলে জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলায় যুগান্তরের ফটো সাংবাদিক রাজেশ চক্রবর্তী, ইনকিলাবের কুতুব উদ্দিন, মাছরাঙার ক্যামেরাম্যান রবিউল টিপু, বণিকবার্তার প্রতিনিধি ওমর ফারুক আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, সিলেটেও হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। হামলায় বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর নাজমুল কবির, সিলেট সংলাপ-এর আবদুল মাজিদ, চ্যানেল ২৪-এর শফি আহমদ, উত্তর পূর্ব-এর নুরুল ইসলাম, সময় সংবাদ-এর সিলেট ব্যুরো প্রধান একরামুল করীম এবং দৈনিক সংবাদের দুই ফটোসাংবাদিক আবু বক্কর ও ইদ্রিস আলী আহত হন।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়