নকল করতে না দেয়ার জের এসএসসি পরীক্ষার্থীর হাতে শিক্ষক খুন



কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) উপজেলা সংবাদদাতা : ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে এসএসসি পরীক্ষায় নকল করতে না দেয়ায় গতকাল সোমবার ভোরে চুনকুটিয়া গার্লস স্কুলের সহকারী ইংরেজি শিক্ষক মো. গোলাম মস্তফা ভূইয়াকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে এক ছাত্র। ঘটনার পর থেকেই এসএসসি পরীক্ষার্থী ওই ছাত্র রিয়াদ হোসেন পলাতক রয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ও শত শত সাধারণ লোকজন হত্যার বিচারের দাবিতে ঢাকা-মাওয়া সড়কের লিংকরোডে বিক্ষোভ মিছিল ও রাস্তা অবরোধ করে রাখে। এই খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা-মাওয়া সড়ক জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তারা রাস্তা অবরোধ করে রাখে। এসময় পুলিশ বাধা দিলে শিক্ষার্থীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করে। বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রাস্তায় অবস্থান করছিলেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শত শত সাধারণ লোকজন। কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বিচারের আশ্বাস দিলে বিক্ষোভকারীরা রাস্তা থেকে চলে যান। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ফারুক হোসেন, কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বাবুল মিয়া, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ সার্কেল এএসপি ডা. শহিদুল ইসলাম। ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার খবর পেয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে আসেন। তিনি নিহতের স্ত্রী লাকি বেগমকে একটি সরকারি চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান। অন্যদিকে শিক্ষক হত্যার ঘাতক রিয়াদ হোসেনের বাসায় বিক্ষোভকারীরা ভাঙচুরের চেষ্টা চালায়। রিয়াদের পরিবার বাসায় তালা দিয়ে পালিয়ে যায়। তার বাসার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ দেয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। নিহত স্কুল শিক্ষক গোলাম মস্তফা ভূইয়ার পরিবারের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। তার স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। শিক্ষকের স্ত্রী লাকি বেগম বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। নিহতের দুই শিশু সন্তান রাজ ও রাজিব তার বাবার কি হয়েছে তারা বুঝতে পারেনি। তাদের মা লাকি বেগমের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও অবুঝ দুই শিশু সন্তানরা পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের বাবার এ্যালবামে আটকানো ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে সন্তান রাজ। তাদের বাবা আর ফিরে আসবে কিনা তারা জানে না।
জানা যায়, রোববার এসএসসি অংক পরীক্ষা ছিল। ওরিয়ান্ট হাই স্কুলে এসএসসি পরীক্ষার্থী রিয়াদ হোসেন অংক পরীক্ষা দিচ্ছিল। পরীক্ষা হলে চুনকুটিয়া গার্লস স্কুলের সহকারী ইংরেজি শিক্ষক গোলাম মোস্তফা ডিউটি করছিলেন। পরীক্ষার্থী রিয়াদ হোসেন অংক নকল করার চেষ্টা করে। এসময় শিক্ষক গোলাম মস্তফা ভূইয়া নকল করতে না দেয়ায় ক্ষুব্ধ হয় রিয়াদ হোসেন। ওই সময় সে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়। রিয়াদ হোসেন পরীক্ষা না দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে যায়। শিক্ষক গোলাম মস্তফা ভূইয়া চুনকুটিয়া পূর্বপাড়া ফাতেমা ভিলার তৃতীয় তলায় ভাড়া থাকেন। চুনকুটিয়া গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক কেএম ইলিয়াস হোসেন জানান, অংক পরীক্ষার সময় নকল করার চেষ্টা চালিয়েছিল রিয়াদ। পরীক্ষার শুরু থেকে সে শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। ইংরেজি শিক্ষক গোলাম মস্তফা নকল করতে বাধা দিলে তার উপড় চড়াও হয়। পরে স্কুলের সকল শিক্ষক এসে ঘটনাটি মীমাংসা করে দেন। মীমাংসা হলেও রিয়াদ তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে যায়।
নিহতের স্ত্রী লাকি বেগম জানান, শুভাঢ্যা ইউনিয়নের তেলঘাট এলাকার ইব্রাহিমের ছেলে রিয়াদ হোসেন ভোরে তাদের বাসার সামনে আসে। এসময় স্যার বলে গেটে ধাক্কাধাক্কি করে। গেট খুললে রিয়াদ হোসেন বাসার ভিতর প্রবেশ করে। তাকে বসতে বললে সে বসতে চায়নি। এসময় তার স্বামী গোলাম মস্তফা সামনে গেলে হঠাৎ একটি ধারালো চাকু দিয়ে বুকে আঘাত করে। মুহূর্তের মধ্যে রিয়াদ হোসেন দৌড়ে পালিয়ে যায়। এসময় ডাকচিৎকার দিলে পাশের লোকজন তার স্বামীকে উদ্ধার করে মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত বলে ঘোষণা দেন। লাকি বেগম আরও জানান, সোমবার পরীক্ষা বন্ধ ছিল। সে সারাদিন বাসায় থাকবে বলে তাকে জানায়। ইলিশ মাছ সে নিজেই পাকিয়ে খাওয়াবে বলে সে জানিয়েছিল। অংক পরীক্ষা কেন্দ্রে রিয়াদের সঙ্গে গ-গোল হয়েছে। রিয়াদ হোসেন তার স্বামীকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। তবে সে সত্যসত্যই এই কাজটি করেছে। রিয়াদ হোসেন অংক পরীক্ষা না দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। সে খারাপ ছাত্র। এই কথাটি তার স্বামী রাতে বলেছিল। কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বাবুল মিয়া জানান, খুব সকালে এসএসসি পরীক্ষার্থী ইংরেজি শিক্ষক মস্তফা ভূইয়াকে ছুরিকাঘাত করে। হাসপাতালে নেয়ার পর সে মারা যায়। হত্যাকারীকে ধরার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই ঘটনায় কেরানীগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ফিরোজা বেগম জানান, নিহত স্কুল শিক্ষক গোলাম মস্তফার লাশ তার গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার থানার দিগলদি গ্রামে পাঠানোর জন্য ১০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ সাখওয়াত হোসেন জানান, নকল করতে না দেয়ায় শিক্ষককে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে এক ছাত্র। সে ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়