মোটা কোমর বনাম মোটা মাথা


মোটা কোমর বনাম মোটা মাথা

সৈয়দ আবুল মকসুদ | তারিখ: ০৫-০২-২০১৩
এত বেশি হতে হতে বিশ্বরেকর্ড করার মতো বিষয় এখন কমে আসছে। তবে অনুসন্ধানের অন্ত নেই। সবচেয়ে মোটা কোমর নিয়ে বিশ্বরেকর্ড করেছেন এক নারী। আমাদের কাগজে গত হপ্তায় তাঁর প্রকাণ্ড কোমরের ছবিসহ প্রতিবেদন বেরিয়েছে। তাঁর কোমরের ব্যাস তাঁর উচ্চতার চেয়ে বেশি। সাড়ে পাঁচ ফুটের ওপরে। তাঁরও স্বামী আছেন। তিনি হালকা-পাতলা। বউয়ের কোমর নিয়ে তাঁর কোনো অসুবিধা হচ্ছে না বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তিনি নাকি অসুখী নন। সেটা যদি তাঁর মনের কথা নাও হয়, তবু আমরা অবিশ্বাস করতে পারি না। খুব যে অসুখী নন, তা বোঝা যায় এ থেকে যে তাঁরা হাওয়া খেতে সমুদ্রসৈকতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
মানুষের শরীরে যত অংশ আছে, তার মধ্যে কোমর কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে দেহের অন্যান্য অংশের মধ্যে মাথাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নারী হোক পুরুষ হোক, কোমর মোটা হলে বিশেষ ক্ষতি নেই। কিন্তু মাথা মোটা হলে মানুষটির দাম থাকে না। মোটা মাথার চেয়ে বরং মোটা কোমর ভালো।
মানুষের মতো জাতিরও কোমর হয়। যে জাতির মাথা মোটা, অথচ কোমরের জোর নেই, সে জাতির দুনিয়াতে দাম নেই। সে জাতি নদীর ওপরে সেতু বানাতে বিশ্ব সংস্থা থেকে ঋণ পায় না। মাথা মোটা হলে সে জাতির জনপ্রিয় নেতারাও গণতন্ত্রের জন্য বিদেশিদের কাছে ভিক্ষা চান।
মোটা কোমরের মানুষদের নিয়ে অন্য কারও সমস্যা নেই। এমনকি তাঁদের স্বামী-স্ত্রীরও নয়। কিন্তু মোটা মাথার নেতাদের নিয়ে বহু জনগোষ্ঠীর সমস্যার শেষ নেই। যাঁদের মোটা মাথা, তাঁরা কখন কোন উদ্দেশ্যে কী করেন, কী বলেন, কী লেখেন, তা শুধু তাঁরাই জানেন। দুনিয়ার সব দেশেই দুর্নীতি হয়। সব ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি আছে। কোথাও দুর্নীতি ধরা পড়লে তার তদন্ত হয়। দোষীর শাস্তি হয়। অভিযুক্তদের বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে শুধু মোটা মাথার জাতিই। তারাই শুধু বলতে পারে অভিযোগ নিয়ে সাড়ে সাত শ রকমের কথা, যাদের মাথা মোটা।
বিরোধীদলীয় নেতা তাঁর মনের ভেতরের আবেগ ও ভাব প্রকাশের জন্য আমেরিকার এক কাগজে একটি রচনা লিখেছেন। তাৎপর্যের ব্যাপার যে নিবন্ধটি তিনি নিকারাগুয়া, এল সালভাদর বা বলিভিয়ার কোনো কাগজে লেখেননি। আমি একজন ক্ষুদ্র রচনালেখক। ৫০ বছর যাবৎ কলম ঘষছি। রাজনৈতিক রচনা বলতে যা বোঝায়, তা আমি কিঞ্চিৎ জানি। ওই রচনাটির মাজেজা বা মাথামুণ্ডু আমার মাঝারি ধরনের মোটা মাথায় বোধগম্য হয়নি। হয়তো তিনি মনে করেছেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্টও যখন মাঝেমধ্যে নিবন্ধ লেখেন, তাঁর লিখতে দোষ কী? আমি মনে করি, রচনাটি ওয়াশিংটনের কাগজে লিখে যে ফায়দা হয়েছে, ওটা অত পয়সা খরচ করে ওখানে প্রকাশ না করে ফেনী বা বগুড়ার কাগজে লিখলেও একই ফল হতো। জননেতার জনগণের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।
ওই রচনাটির লেখিকার চেয়ে তাঁর পাঠকদের প্রতিভা আরও এক কাঠি বেশি। কারও কোনো ব্যাপারে মনের ভাব প্রকাশ করা বা মতামত দেওয়া ‘দেশদ্রোহিতা’ নয়। মাত্রার বেশি দেশপ্রেমওয়ালাদের দিয়ে অতীতে দুনিয়ার বহু ক্ষতি হয়েছে।
ওই নিবন্ধ পাঠ করে অথবা না করেই তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা দানাপানি ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁরা হাহাকার করছেন—হায়, সব শেষ। যেন ওই এক নিবন্ধেই মহাজোটের নেতাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে। নদনদী ও বঙ্গোপসাগরের পানি উথলে উঠে প্লাবিত করবে জনপদ। বনভূমিতে সৃষ্টি হবে দাবানল। পানির মাছ লাফিয়ে উঠবে ডাঙায়। নীড়ের পাখি গাছের ডাল থেকে উড়াল দিয়ে চলে যাবে অন্য দেশে। গোয়ালের গরু, ছাগল, ভেড়া ছুটতে থাকবে দিগিবদিক।
পার্লামেন্টে দাবি উঠেছে, ওই নিবন্ধের জন্য তাঁকে ক্ষমা চাইতে হবে। তবে তিনি ক্ষমা চাইলে যে ক্ষমা পাবেন, তাতে সন্দেহ নেই। কারণ, দেশে খুনের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিরাও আকছার ক্ষমা পাচ্ছেন।
যে দেশের কাছে লেখিকা গণতন্ত্র প্রার্থনা করেছেন, সেই দেশটাকেও নেতারা ধোলাই দিচ্ছেন। অথচ আমরা জানি, ওই দেশের প্রধান দূতের বাসভবনে সরকারি দল, বিরোধী দল ও যুদ্ধাপরাধী দলের নেতারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও ডিনার করেন হপ্তায় হপ্তায়। পদ্মা সেতুর ঋণ কেন বাতিল হলো, তা নিয়ে মাননীয়রা সংসদকক্ষ উত্তপ্ত করেননি। 
তাই বলি, মোটা কোমরও ভালো মোটা মাথার চেয়ে। মোটা কোমরে অসুবিধা যা হওয়ার, তা ওই কোমরওয়ালা বা ওয়ালির হয় এবং স্বীকার করুন বা না করুন, অসুবিধা হয় তাঁর স্বামী বা স্ত্রীর। কিন্তু মোটা মাথার কারণে—সেই মোটা মাথাটি যদি হয় রাজনৈতিক কর্তা বা নেতাদের, তা হলে সে জাতির মানুষের ভাগ্যবিড়ম্বনা রোধ করা বিধাতার পক্ষেও সম্ভব নয়। মাথা মোটা হলে কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারে না সেই জাতি।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়