সবজির তালিকায় পাটশাক মানবদেহের জন্য উপকারী
মিজানুর রহমান তোতা : দেশে পাটশাকের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। সবজি হিসেবে পাটশাক পাট আবাদের ভরা মৌসুমে বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রচুর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রেকর্ডে দেখা যায়, পাট উৎপাদনের সময় সাধারণত কচিপাতা শাক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে বহুকাল আগে থেকেই। পাটের পাতা তুলে অন্যান্য শাক-সবজির মতো রান্না করে খাওয়ার অভ্যাসও নতুন নয়। কিন্তু বছর তিনেক আগে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট উদ্ভাবন করে বিনা পাটশাকের একটি জাত। যা গবেষণাগার থেকে এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঠে মাঠে আবাদ ও উৎপাদন হচ্ছে। সংশি¬ষ্ট বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরা জানান, দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাটপাতা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়। পাটপাতায় প্রচুর ভিটামিন, ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়াম বিদ্যমান। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষনা ইন্সটিটিউট সুত্র জানায়, তারা দীর্ঘদিন গবেষণা করে বিনা পাটশাক জাত উদ্ভাবন করে বিরাট সফলতা পেয়েছে। নতুন জাতের পাটশাকে সাধারণ পাটের মতো আঁশ নয় এবং ডাটাসহ বড়ও নয়। লালশাক, সবুজ শাকের মতো স্রেফ পাটশাক হিসেবে আবাদ ও উৎপাদন হচ্ছে। পাটশাকে প্রচুর ভিটামিন ছাড়াও ক্যান্সার রোগ প্রতিরোধে বিরাট সহায়ক।
সুত্র জানায়, পাটশাকে ফাইটলের পরিমান অনেক বেশী। পাটশাকের পাতার ফলন অন্যান্য শাকের চেয়ে অন্তত ৩০% বেশী হয়। ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীগণ উন্নতমানের পাটপাতার নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য পরমাণু শক্তি ব্যবহার করেন। দেশীজাত সিভিএল-১ এর বীজে গামা রশ্মি প্রয়োগ করে বেশী পাতা বিশিষ্ট জাতটি উদ্ভাবন করা হয়। নাম দেয়া হয় বিনা পাটশাক-১। গবেষনাগার থেকে মাঠে সবজি চাষীদের মধ্যে নতুন জাতের বীজটি সরবরাহের পর ব্যাপক আগ্রহের সঙ্গে চাষাবাদ শুরু হয়েছে। ভোক্তাদের কাছেও চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে সবজি উৎপাদনের রেকর্ড সৃষ্টির যশোর, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ এলাকার মাঠে নতুন পাটশাক আবাদ ও উৎপাদন হচ্ছে। ক্রমেই পাটশাক আবাদের বিস্তৃতি ঘটছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। পাটশাক আবাদে পলি দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে বেশী উপযোগী। এটেল থেকে বেলে দো-আঁশ মাটিতেও পাটশাক আবাদ করা যায়। একবার আবাদ করে কমপক্ষে ৬মাস পর্যন্ত পাটশাকের পাতা তুলে নেয়া যায়। পাটশাক অত্যন্ত সুস্বাদু। ইউরোপের অনেক দেশেই পাটশাক স্যুপ হিসেবে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষনা ইন্সটিটিউটের এক বিজ্ঞানী জানান, সাধারণ শাক-সবজির মতো পাটশাক সারাদেশে ব্যাপকভাবে আবাদ ও উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত বীজ সরবরাহের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। একইসাথে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সবজি চাষীদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
কৃষি বিজ্ঞানী ও কৃষকদের কথা, বিনা পাটশাক বীজ উৎপাদনের জন্য নতুন কোন কৌশলের প্রয়োজন হচ্ছে না। জাতটি স্ব পরাগায়িত ফসল। বীজ উৎপাদনে কোন সমস্যা নেই। স্বাভাবিকভাবে বীজ বপন করে বীজ উৎপাদন করা সম্ভব। বীজ ভালোভাবে সংরক্ষণ করলে অন্তত ৩ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। পাটশাকের ডগা ছিড়ে শাক খাওয়ার পর আবার নতুন পাতা জন্মে। অর্থাৎ একবার আবাদ করে কয়েকমাস পর্যন্ত শাক পাওয়া যাবে। নতুন জাতের পাটশাকে কোনরূপ আঁশ নেই সাধারণ পাটের মতো। গাছ হয় সবুজ শাক আর লাল শাকের মতো একেবারেই ছোট। পাটশাকের পাতা গাঢ়ো সবুজ ও সতেজ। সংশি¬ষ্ট সুত্র জানায়, পাটশাক সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়ার পাশাপাশি পাতা শুকিয়ে গুড়া করে পাউডার বানিয়ে অন্যান্য তরকারীতেও মিশিয়ে খাওয়া যায়। যা মানবদেহের জন্য খুবই উপকারী। একজন চিকিৎসক জানান, জাপান ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষনা ইন্সটিটিউটের (বিনা) গবেষকগণ প্রমাণ পেয়েছেন যে, পাটপাতায় ক্যান্সার প্রতিরোধক উপাদান যেমন ফাইটল ও মনোগ্যালাকটোসিল বিদ্যমান। তাছাড়া শুকনো পাটপাতা ভিজানো পানি কৃমিনাশক, অজীর্ণতা ও কোষ্ঠ্য-কাঠিন্য নিরাময়েও পরীক্ষিত।
Comments