গুরঞ্জিতের সুর এবং মুক্তিযুদ্ধ


স্টালিন সরকার : গান-বাজনা, নাটক-সিনেমাসহ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান কেন্দ্র করে এক সময় টেলিভিশনের দর্শক গড়ে উঠতো। মানুষের মধ্যে জানার আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়েক বছর আগে টেলিভিশনের সচিত্র খবর হয়ে উঠে জনপ্রিয়। বর্তমানে মানুষের মধ্যে রাজনীতি সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে বেসরকারি টেলিভিশনের টকশো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। টকশোগুলোর মাধ্যমে ‘হঠাৎ করে কিছু বুদ্ধিজীবী’ গজিয়ে উঠলেও বিশিষ্টজনদের মধ্যে অনেকেই নিয়মিত টকশোতে যান বিভিন্ন ইস্যুতে কথাবার্তা বলেন। দেশের সাধারণ মানুষ দুঃখ-দুর্দশায় থাকলেও বলতে পারেন না; বিশিষ্টজনেরা তাদের কথাই তুলে ধরেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন-আদালত সবকিছুই টকশোতে আলোচনা হয়। এসব ক্ষমতাসীনদের বিরক্তির কারণ হলেও মানুষ উপভোগ করেন; ক্ষেত্রবিশেষে উপকৃত হন। বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা নিয়ে কেউ কথা বলেন; আবার কেউ সব বিষয়ে কথা বলে থাকেন সবজান্তার মতো। আলোচনা সভা এবং টকশোর এই ‘সবজান্তার’ তালিকায় যে কজনের নাম রয়েছে তাদের অন্যতম হচ্ছেন দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। কালো বিড়াল ধরতে গিয়ে নিজেই কালো বিড়াল হওয়া এই প্রবীণ নেতা প্রায় প্রতিদিনই আলোচনা সভা ও টকশোতে জাতিকে ‘ছবক’ দিচ্ছেন। এক সময় শেখ মুজিবুর রহমানের নামে খিস্তি খেউর করলেও তিনি এখন মুজিব সৈনিক। জ্ঞানী-গুণী এ ব্যক্তি কয়েকদিন আগে মতিঝিলে শাপলা চত্বরের র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবির যৌথ অভিযানের সাফাই গাইতে গিয়ে বলেন, হেফাজতিরা মার খেয়ে ‘সোবহান আল্লাহ’ ‘সোবহান আল্লাহ’ বলে পালিয়েছেন। পরে ক্ষমাও চেয়েছেন। চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় বলেছিলেন, ভোটে ওদের (আলেম সমাজ, ওলামা-মশায়েখ, মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, ইসলাম ধর্মপ্রিয় পরহেজগার মানুষ) খবর থাকবে না। হেফাজতের আস্ফালন ফাঁপা বেলুনের মতো উড়ে যাবে। স্থানীয় এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের ভরাডুবি ঘটার পর তিনি বলেন, চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ‘অপপ্রচারের’ জয় হয়েছে। সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদগোষ্ঠী একত্র হয়ে যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিল জনগণের ভাবাবেগের কারণে সেই অপপ্রচারেরই জয় হয়েছে। তার অবস্থা কানকাটা শেয়ালের গল্পের মতো। ‘এক কান কাটা শেয়াল যায় রাস্তার ধার দিয়ে; আর দুই কান কাটা শেয়াল যায় রাস্তার মাঝ দিয়ে’। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জনগণ মতিঝিলের গভীর রাতের ‘বুলেটের জবাব ব্যালটে’ দেয়ার পর আওয়ামী লীগের সমর্থক বুদ্ধিজীবী, শাহবাগের মঞ্চই কেবল মুক্তিযুদ্ধের ধারক-বাহক, আগামী দিনে তারাই কেবল দেশের নেতৃত্ব দেবেন বলে গলা ফাটিয়েছেন তাদের অনেকেই নীরব হয়ে গেছেন। চার সিটি নির্বাচনে দেখিয়ে দেব, দেখে দেব ইত্যাদি বলে যারা ধর্মপ্রিয় মানুষের শক্তি, আবেগ অনুভূতিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন তাদের অনেকেই গর্তে লুকিয়েছেন। চক্ষুলজ্জার কারণে তাদের অনেকেই টকশোতে গেলেও রাজনীতি আর নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে উৎসাহী না হয়ে এখন পরিবেশ, জীব বৈচিত্র্য, পরিবার, শিল্প সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে বেশি আগ্রহী। কয়েকদিনের টকশোগুলোতে এটা পরিষ্কার হয়েছে। কিন্তু দুই কান কাটা প্রবীণ এই নেতা ‘গায়ে মানেনা আপনে মোড়লের’ মতো এখনো তার ‘ছবক’ দিয়েই যাচ্ছেন। কারাগারে থাকা বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বাইরে থাকলেও হয়তো দপ্তরবিহীন মন্ত্রীর মুখের লাগাম টেনে ধরতে পারতেন। অবশ্য মধ্যরাতে দৈনিক পত্রিকা নিয়ে আলোচনার এক অনুষ্ঠানে সাবেক সচিব আসাফ উদ্ দৌলা সুরঞ্জিতের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
সিটি নির্বাচনে ‘অপপ্রচার’ বলতে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত কি বুঝিয়েছেন? প্রশ্ন শুনেই একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বললেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থিত বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন তারাই একমাত্র জনগণের রাজনীতি করেন; অন্যেরা করে না। যেমন শাহবাগ মঞ্চে অংশ নেয়া তরুণদের মুক্তিযুদ্ধের ‘একমাত্র নতুন প্রজন্ম’ মনে করেন তারা। ব্লগারদের ডাকে শাহবাগের যারা এসেছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ‘নতুন প্রজন্মের জাগরণ’ মনে করেন তারা প্রতিপক্ষকে স্বীকার করতে চান না। মুদ্রার যে অন্য পীঠ থাকে সেটা তারা মানতে নারাজ। শাহবাগের প্রজন্মের চেয়েও মতিঝিলে হেফাজতের সমাবেশে গ্রাম থেকে মাদ্রাসা পড়–য়া ৫০ গুণ বেশি তরুণ এসেছিলেন তাদেরকে ওরা নতুন প্রজন্ম মনে করেন না। আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট চাওয়া, মিটিং মিছিল করা এবং ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের নিজেদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টাকে তারা নির্বাচনী প্রচারণা মনে করেন। আর প্রতিপক্ষ তথা ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাওয়া, মিটিং মিছিল করাকে তিনি (সুরঞ্জিত) অপপ্রচার বলেছেন। চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যারা বিজয়ী হয়েছেন তাদের পক্ষে কি অপপ্রচার করা হয়েছে? খোঁজ নিয়ে জানা যায় রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট চার সিটিতেই শাহবাগ মঞ্চের সমর্থনে মঞ্চ গঠন করা হয়েছিল। সে মঞ্চে যারা এসেছেন, দিনের পর দিন খাবার সরবরাহ করেছেন, আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন তারা সকলেই সদ্য সমাপ্ত স্থানীয় নির্বাচনে ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে ছিলেন এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। ভোটারদের তারা বুঝিয়েছেন তারাই একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি। দেশ গড়তে তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দিতে হবে। পক্ষান্তরে ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন আলেম সমাজ, সাধারণ মানুষ, সমাজের গণমান্য ব্যক্তি, বর্তমান সরকার দ্বারা নানাভাবে নিগৃহীত, নিষ্পেষিত মানুষ। রাজনীতি করেন না এবং বিএনপিতে সমর্থন করেন না এমন মানুষও সরকারের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন। তাদের অনেকেই সারাদেশের মসজিদের ঈমান-মুয়াজ্জিন, মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, ধর্মপ্রিয় মানুষের ওপর সরকারের জুলুম নির্যাতন এবং দাঁড়ি টুপি পরিহিত মানুষের প্রতি সরকারের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। নির্বাচনে দুই পক্ষের প্রচারণায় যাদের কথা ভোটারদের পছন্দ হয়েছে তাদের প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। সুরঞ্জিতের কথা সঠিক হলে যারা ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন তারা সবাই অপপ্রচারের শিকার? লাখ লাখ ভোটার কি বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন? তার দাবি সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদীরা অপ-প্রচারণা করেছেন। ইসলামের পক্ষে থাকা এবং ইসলামের পক্ষে কথা বলা কি সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদ? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি শুধু শাহবাগী তরুণরা ধারণ করেন অন্যেরা করেন না? দেশের আলেম সমাজ- মাদ্রাসা পড়–য়া তরুণরা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে? ’৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ করে যারা দেশ স্বাধীন করেছেন তাদের অধিকাংশই কোন এলাকার সন্তান? শাহবাগী ব্লগারদের মতো তথাকথিত প্রগতিবাদী ধর্মবিদ্বেষী তরুণের মতো কতজন মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে সরাসরি যুদ্ধ করেছে? আর গ্রামের গরীব কৃষকের সন্তান, মাদ্রাসা-স্কুল কলেজ পড়–য়া, বেকার কতজন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন? হিসেব করলে দেখা যাবে সংখ্যার হিসেবে গ্রামের ছেলেরা যে হারে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল; তার শতভাগের এক ভাগও আজকের শাহবাগী তথাকথিত প্রগতিশীল তরুণদের মতো সে সময়ের তরুণদের যুদ্ধে যেতে দেখা যায়নি। তিনি (সুরঞ্জিত) জনগণের বিভ্রান্তি শব্দটি জোর দিয়ে ব্যবহার করেছেন। প্রশ্ন হলো জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি কারা ছড়িয়েছে? সরকার না তৌহিদী জনতা? শেয়ারবাজার লুট করে ৩২ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে পথে বসানো, দুর্নীতির কারণে পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংকের চলে যাওয়া, হলমার্কের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা লুটে নেয়া, রেলওয়েতে চাকরি দেয়ার ঘুষের ৭২ লাখ টাকা মন্ত্রীর ঝিকাতলার বাসায় যাওয়ার সময় পিলখানায় ধরা পড়া, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ, ইউনি পে টুসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের ঘটনা ভোটারদের সামনে তুলে ধরা কি অপপ্রচার? সুরঞ্জিত সেন অপপ্রচার বলতে ধর্মীয় রাজনীতির কথা বলেছেন। ধর্মীয় রাজনীতি, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি এবং রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার শব্দের অর্থগুলো কি তিনি বোঝেন? নাকি বুঝেও নিজেদের রাজনীতির সুবিধার জন্য সবগুলোকে একাকার করে ফেলেন? ধর্মীয় আচার-আচরণ, অসুশাসন এবং রীতিনীতির মধ্য থেকে রাজনীতির মাধ্যমে তার বিস্তার ঘটানো এবং সে আলোকে রাজনীতি পরিচালনাই হলো ধর্মীয় রাজনীতি। যেটা আলেম ওলামারা করে থাকেন। পৃথিবীতে রাজনীতি সৃষ্টির সময় থেকেই এটা চলে আসছে এবং চলতে থাকবে। আর ধর্ম নিয়ে রাজনীতি হলো রাজনীতিতে সুবিধা আদায়ের জন্য ধর্মের ব্যবহার। যেমন হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোরআন পোড়ানোর কাল্পনিক অভিযোগ তুলে অপপ্রচার চালানো এবং সংখ্যালঘু নির্যাতন। সরকার মিডিয়ায় ব্যপকভাবে প্রচারণার পরও কি দেশের মানুষকে বিশ্বাস করাতে পেরেছে হেফাজতের কর্মীরা পবিত্র কোরআন পুড়িয়েছেন? তৃতীয়ত হলো রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে জীবন পরিচালিত করেন না অথচ ভোটের সময় ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার ভান (যেমন হিজাব পরিধান) করে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ভোট চাওয়ার কৌশল গ্রহণ। অতএব কাউকে খাটো করে নিজে বড় হওয়া যায় না এটা কালো বিড়ালদের বোঝা উচিত। তাদের আরো বোঝা উচিত আলেমদের জুলুম-নির্যাতন করে ভালো থাকা যায় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন। সঠিকভাবে অনুসন্ধান করা হলে অবশ্যই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয়ের মূল কারণ বের হয়ে আসবে। 

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়