কারাগারে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়

(ইনকিলাব ঢাকা, রোববার, ০২ জুন ২০১৩, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, ২২ রজব ১৪৩৪)
সাখাওয়াত হোসেন : ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ বেশি বন্দী নিয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে কাটছে কারাগারে আটক বন্দীদের জীবন। রাজনৈতিক নেতা, ভিআইপি বন্দী, ইসলামী চিন্তাবিদ, জঙ্গি ও পেশাদার অপরাধীদের রাখা হচ্ছে একই সেলে। কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি সেন্ট্রাল কারাগারটি ফাঁসির আসামি, জঙ্গি ও ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীদের রাখার জন্য তৈরি করা হলেও এখন ওই কারাগারে ভিআইপি ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের রাখা হচ্ছে। সুচিকিৎসা ও সঠিক পরিচর্যা না থাকায় কোন ব্যক্তি কারাগারে সুস্থ অবস্থায় গেলে ফিরে আসছেন অসুস্থ হয়ে। বর্তমানে দেশের ৬৮টি কারাগারে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বন্দী ধারণক্ষমতা ২৮ হাজার হলেও বর্তমানে সেখানে ৭৪ হাজারের অধিক বন্দী অবস্থান করছেন। প্রতিদিনই বাড়ছে বন্দীর সংখ্যা। সর্বত্রই লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবাধিকার। নানা অব্যবস্থার পাশাপাশি কারাগারগুলোতে অবাধে বিক্রি হচ্ছে হেরোইন, ইয়াবা ও গাজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক দ্রব্য। আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত সন্ত্রাসীরা কারাগারে বসেই নিয়ন্ত্রণ করছে আন্ডারওয়ার্ল্ড। কারাগারে বসে মোবাইলফোনে কথা বলা এখন ওপেন সিক্রেট। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি সূত্র জানায়, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মাদকসেবিদের মধ্যে ইয়াবা ও গাঁজাখোরের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। জেলের অভ্যন্তরে সাধারণত মহিলারা হাজতি ও কয়েদিদের কাছে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেন্সিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক দ্রব্য সরবরাহ করে থাকে। এদের পাশাপাশি কোর্ট হাজতে যাওয়া আসামিদের একটি সিন্ডিকেটও এর সাথে জড়িত রয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এসব বিষয়ে এখনই জোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। অন্যথায় কারাগারের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থানে বিশৃংখলা সৃষ্টির আশংকা রয়েছে বলে ওই সূত্র দাবি করেন।
একজন দায়িত্বশীল গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, কারাগারের ভেতর থেকে সহজেই বাইরে সংবাদ পাঠানো সম্ভব। কারাগারে আটক জঙ্গিসহ পেশাদার সন্ত্রাসীরা টাকার বিনিময়ে কারারক্ষীদের দিয়ে এসব কাজ করাচ্ছে।
তিনি বলেন, আটক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কারাগারে বসেই এখন আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা চিরকুট, কারাগারে বসে ও কোর্টে যাওয়ার পথে মোবাইলফোন এবং হাজিরার সময় সরাসরি তাদের ক্যাডারদের নির্দেশনা দেয়। মামলার খরচ, পরিবারের খরচ এবং বাহিনীর জন্য অস্ত্র কেনার খরচ তাদের নির্দেশেই ব্যবসায়ীরা বাইরে থাকা ক্যাডারদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রয়েছেন দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক রাজনৈতিক নেতা, ভিআইপি বন্দী, ইসলামী চিন্তাবিদ ও সাধারণ বন্দীরা। তাদের বেশির ভাগই অসুস্থ হয়ে পড়লেও তারা মৌলিক চিকিৎসাটুকুও পাচ্ছেন না। এমনকি তাদের অসুস্থতার খবর পরিবার-পরিজনকেও জানতে দেয়া হচ্ছে না। অনেককেই তাদের স্বজনদের সাথে নিয়মমাফিক দেখা সাক্ষাৎ করার সুযোগও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। বন্দীদের অনেকেই নামাজ পড়া, ন্যায্য খাবার, ঘুমের জায়গা ও নিয়মিত গোসলের সুযোগ পাচ্ছেন না। সব মিলিয়ে বন্দীরা কারাগারে দুর্বিষহ দিন যাপন করছেন। কারাগারে আটক পুরুষ, নারী এবং তাদের সাথে থাকা শিশুরা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অসুস্থতায় কারা ডাক্তারের কাছে গিয়ে সমস্যার কথা জানালে ডাক্তার যেকোনো রোগের জন্য শুধু প্যারাসিটামলজাতীয় ২-৩টি করে ট্যাবলেট ধরিয়ে দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক কথা সুস্থ কোন ব্যক্তি কারাগারে গেলে বের হচ্ছেন অসুস্থ অবস্থায়।
সূত্র জানায়, দেশে ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার ও ৫৫টি জেলা কারাগারের মধ্যে বেশিরভাগ বন্দী মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। আর হাই সিকিউরিটি সেন্ট্রাল কারাগার তৈরি করা হয়েছিল মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি, টপটেরর, জঙ্গি, হিজবুত তাহরীর ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের জন্য। এখন এখানে রাখা হচ্ছে ভিআইপি ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের। হাই সিকিউরিটি কারাগারের আসামিরা সেল থেকে মূলত বের হতে পারেন না। এখানে থাকার তেমন সমস্যা না থাকলেও বর্তমানে খাবারের মান খুবই খারাপ।
কারাগারে আটক কয়েকজন ইসলামী চিন্তাবিদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে একজন হিন্দু চিকিৎসক রয়েছেন। তিনি কোন ইসলামী চিন্তাবিদ বা দাড়িটুপিওয়ালা কাউকে দেখলে তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এমন কি চিকিৎসা দিতেও তিনি অনিহা প্রকাশ করেন। কিন্তু ভয়ে কেউ অভিযোগ করার সাহস পান না। বিষয়টি তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে বলে তারা মন্তব্য করেন।
সম্প্রতি এক মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে হিউম্যান রাইটস ফোরামের আহ্বায়ক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, দেশে মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। তবে সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। কারাবন্দীদের শারীরিক মানসিক এবং যৌন নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়