সউদী আরবে এখনো তিন লক্ষাধিক অবৈধ প্রবাসী কর্মী



শামসুল ইসলাম : সউদী বাদশা’র  সাধারণ ক্ষমা ঘোষাণায় অবৈধ প্রবাসী কর্মীদের বৈধতা লাভের কার্যক্রম পুরোদমে চলছে। আগামী ৩ জুলাই সাধারণ ক্ষমার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। এ সময়ের মধ্যে সউদী আরবে অবৈধ প্রবাসীদের সকলেই বৈধতা লাভের সুযোগ পাবে না।  সাধারণ ক্ষমার মেয়াদ আরো দু’মাস বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। সউদী শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাত করে দেশটির ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বুধবার সাধারণ ক্ষমার মেয়াদ বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছেন। সাধারণ ক্ষমার সময় বাড়ানো না হলে তিন লক্ষাধিক অবৈধ প্রবাসী বাংলাদেশীকে দেশে ফিরে আসতে হবে। এতে দেশের অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। সউদী সরকারের সাধারণ ক্ষমার মেয়াদ বর্ধিতকরণের লক্ষ্যে সরকার উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। এযাবত জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনসুলেট থেকে প্রায় ২০ হাজার অবৈধ প্রবাসী আউট পাস গ্রহণ করলেও মাত্র ৪ শ’ প্রবাসী দেশে ফিরেছে। সউদী আরবে সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. দিপু মনি বুধবার জেদ্দাস্থ সউদী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ড. নিজার বিন ওবাইদ মাদানীর সঙ্গে সাক্ষাত করে অবৈধ প্রবাসী কর্মীদের বৈধতা লাভের সুবিধার্থে সাধারণ ক্ষমার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য  অনুরোধ জানান। এ ব্যাপারে সউদী বাদশাকে অনুরোধ জানিয়ে প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ অ্যাডভোকেট এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা চিঠিও এ সময় প্রতিমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন তিনি।
অনুরোধের জবাবে দীপু মনিকে আশ্বস্ত করে সউদী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের অনুরোধ সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো হবে। জেদ্দাস্থ প্রবাসী সাংবাদিক রুমী সাঈদ ইনকিলাবকে এ তথ্য জানিয়েছেন। 
গত ১১ মে সাধারণ ক্ষমার আওতায় অবৈধ বিদেশী নাগরিকদের বিনা দ-ে দেশ ছাড়তে ৩ জুলাই পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় সউদী সরকার। একইসঙ্গে এই সময়ের মধ্যে কাজের অনুমতিপত্র পরিবর্তন করে এবং পাসপোর্ট নবায়ন করে অবস্থানের সুযোগও দেয়া হয়।
২০০৯ সাল থেকেই দেশটিতে বাংলাদেশীদের কাজের অনুমতিপত্র পরিবর্তনের সুযোগ বন্ধ থাকায় জনশক্তি রপ্তানি প্রায় বন্ধ রয়েছে।
সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর বাংলাদেশের কর্মকর্তারা অবৈধ প্রবাসীদের বৈধতা লাভের কাজে নেমে পড়েন। সউদীতে অবস্থানরত অবৈধ প্রবাসী কর্মীরা বৈধতা লাভের জন্য জেদ্দা, রিয়াদসহ বিভিন্ন ডিস্ট্রিকে বাংলাদেশী মিশনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। প্রবাসী কর্মীদের সাহায্যে ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু রাখার জন্য সউদী দূতাবাসে অতিরিক্ত জনশক্তি নিয়োগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনসুলেটে ১ শ’ ২০ জন অতিরিক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজে যোগদান করেছে। ছুটির দিন বৃহস্পতি ও শুক্রবারে জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনসুলেটে এবং রিয়াদস্থ শহরতলীর দু’টি ক্লাবে ‘চাকরি মেলা’র’ (জব ফেয়ার) আয়োজন করা হয়েছে। সউদী বিনিয়োগকারীরা উল্লেখিত ‘জব ফেয়ার’-এর মাধ্যমে তাদের কোম্পানিতে কর্মী নিয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। সউদী বিনিয়োগকারীরা প্রবাসী বাংলাদেশী কর্মীদের নিয়োগে আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। সউদী প্রবাসী কল্যাণ ও পুনর্বাসন সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক সারোয়ার আলম গতকাল সউদী আরবের তাবুক থেকে টেলিফোনে ইনকিলাবকে এ তথ্য জানান। প্রবাসী শ্রমিক নেতা সারোয়ার আলম বলেন, যৌক্তিক কারণেই সাধারণ ক্ষমার সময় বাড়ানোর সম্ভবনা রয়েছে। কারণ যে পরিমাণ ফাইল সউদী কর্তৃপক্ষের কাছে জমা পড়েছে তা অনুমতি দিতে আরো অনেক সময়ের প্রয়োজন। তিনি বলেন, আগামী ৩ জুলাইয়ের পর সউদী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী’র ধরপাকড় অভিযান শুরু হবার বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তিনি বলেন, এখনো সউদী আরবে প্রায় ৪ লাখ অবৈধ প্রবাসী কর্মী রয়েছে।  
বাংলাদেশের জনশক্তির সবচেয়ে বড় গন্তব্য তেলসমৃদ্ধ সউদী আরবে প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে এক চতুর্থাংশই বাংলাদেশী।
সউদী সাধারণ ক্ষমার আওতায় অবৈধ প্রবাসী কর্মীরা কোনো প্রকার জরিমানা ছাড়াই আউট পাসের মাধ্যমে দেশে ফিরে আসতে পারবে। জরিমানা ছাড়াই অবৈধরা বৈধতা লাভ ও আকামা পরিবর্তনের সুযোগ পাচ্ছে। সউদী আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনসুলেট-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা রাত-দিন কাজ করছে। সউদী সরকারী ছুটির দিনেও বৈধতা লাভের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এখনো যেসব প্রবাসী বাংলাদেশী বৈধতা লাভের কার্যক্রম থেকে বিরত রয়েছে তাদেরকে সাধারণ ক্ষমার আওতায় দ্রুত বৈধতা লাভের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. দিপু মনি প্রবাসীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। জেদ্দাস্থ কনসুলেটের অধীনে প্রায় ৫০ হাজার অবৈধ কর্মী নতুন পাসপোর্ট লাভ করেছে। রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের অধীনেও বিভিন্ন ডিস্ট্রিকে অবৈধ প্রবাসীদের বৈধতা লাভে নতুন পাসপোর্ট সরবরাহ, আউট পাস ইস্যু ও পাসপোর্টের নবায়ন করা হচ্ছে।
সউদী আরবে অবৈধ অভিবাসী কর্মীদের জন্য সাধারণ ক্ষমার মেয়াদ ৩ জুলাই থেকে আরো বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
বুধবার সউদী শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে দেশটির ব্যবসায়ীরা এই মেয়াদ বাড়ানোর আহ্বান জানান বলে আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুহাম্মদ আল-সুবহি নামে এক ব্যবসায়ীকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া যথাযথ নয় এবং অসংগঠিত।
“সাধারণ ক্ষমার মেয়াদ শুরুর ছয় সপ্তাহ পরে ওই প্রক্রিয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। তাই আমরা মেয়াদ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছি।”
আরব নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদাওয়ি আল-হাসুন নামে এক নারী ব্যবসায়ী বলেন, “অভিবাসীদের ওপর নির্ভরশীল সউদীতে জন্মগ্রহণকারী এবং যারা বৈধভাবে এখানে বাস করছে তাদের সাহায্যে কিছু করা দরকার।
“বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ৮০ শতাংশই এই ধরনের এবং তাদের উচ্চ গুণাবলি ও ব্যাপক দক্ষতা আছে।
“এই ধরনের শ্রমিকদের ওপরই বেশি নজর দেয়া দরকার। কারণ তারা একমাত্র সউদী আরবকেই জানে,” যোগ করেন তিনি।
বৈঠকে শ্রম দপ্তরের পরিচালক আব্দুল মুনিম আল-সেহরি বলেন, নিয়োগকর্তারা পাসপোর্ট ও আবাসিক অনুমতিপত্র না দিলে শ্রমিকরা নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করার অধিকার পাবে।
“সাধারণ ক্ষমা নির্দিষ্ট ধরনের অভিবাসীদের জন্য- যেমন যারা পলাতক ছিলো, কাজ থেকে অনুপস্থিত ছিলো, দেশীয়দের মধ্যে লঙ্ঘনকারী বা যারা হজ বা ওমরার পরে অতিরিক্ত সময় অবস্থান করছে- তাদের জন্য।”
এই সাধারণ ক্ষমার মেয়াদ সব জাতীয়তার মানুষদের জন্য বলে জানান তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সউদী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মাদানি দীপু মনিকে জানিয়েছেন যে মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়েছে।
আরব নিউজের মতে, সাধারণ ক্ষমার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনো অবৈধ নাগরিক সউদীতে অবস্থান করলে তাকে এক লাখ রিয়াল জরিমানা করা হবে এবং দুই বছরের কারদ- দেয়া হবে।
দূতাবাসের এই কার্যক্রম পরিদর্শনই দীপু মনির এবারের সৌদি আরব সফরের প্রধান উদ্দেশ্য।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেদ্দা, রিয়াদ, দাম্মাম শহরে শ্রমিকদের বৈধকরণ কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন বলে আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম।
সউদী প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতকালে ২০০৭ ও ২০০৯ সালে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সহযোগিতার জন্য সউদী বাদশা আব্দুল¬াহ এবং তার সরকারকে ধন্যবাদ জানান দীপুমনি।
বৈঠকে দু’দেশের স্বার্থ সংশ্লি¬ষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা ছাড়াও বাণিজ্য, শিক্ষা এবং কৃষিতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য সউদী সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ডা. দীপু মনি। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে ওষুধ, তৈরি পোশাক এবং সিরামিক জাতীয় পণ্য আমদানির জন্য সউদী আরবের প্রতি অনুরোধ জানান দীপু মনি।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন সউদী আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, কনসাল জেনারেল নাজমুল ইসলামসহ দু’দেশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। 
বৈঠকের আগে জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট পরিদর্শন করেন দীপু মনি। এ সময় তিনি কনস্যুলেটে সেবা নিতে আসা প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলেন। রাতে জেদ্দাস্থ কনসুলেটে প্রবাসী নাগরিকদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সর্ম্বধনা অনুষ্ঠানে ডা. দিপু মনি বলেন, এখনো যারা অবৈধ রয়েছেন তাদের দ্রুত বৈধতা লাভের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। 

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়