সাত বিদেশি কোম্পানির হাতে জিম্মি দেশীয় পোল্ট্রি শিল্প

সাত বিদেশি কোম্পানির হাতে জিম্মি দেশীয় পোল্ট্রি শিল্পইনকিলাব ১৫ জানু, ১৩
স্টাফ রিপোর্টার : সাতটি বিদেশি কোম্পানির হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশীয় পোল্ট্রি শিল্প। উচ্চ হারে ব্যাংক সুদ, অসম প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাব এবং সরকারি প্রণোদনার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়ার কারণে পোল্ট্রি সেক্টর বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। যার নেতিবাচক প্রভাবে বেড়েই চলেছে ডিম, মুরগির দাম। সাধারণ খামারিদের অভিযোগ, বিদেশি কোম্পানিগুলো প্রতিবছর বিশাল অংকের টাকা মুনাফা হিসেবে দেশীয় বাজার থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। আর এজন্য সরকারের উদাসীনতা, দূরদৃষ্টির অভাব এবং বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের ভ্রান্ত উদার নীতিকেই কারণ হিসেবে দায়ী করছেন তারা।  দেশের পোল্ট্রি শিল্পের সাথে জড়িত বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ করে জানা যায়,  দেশীয় খামারিরা যুগ যুগ ধরে গড়ে তোলা ব্যবসা হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। বার্ড-ফ্লু’র ভয়াবহ সংক্রমণ, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ব্যাংক সুদের উচ্চ হার, বিদেশি কোম্পানির আগ্রাসন প্রভৃতি কারণে গত তিন বছরে প্রায় ৫৪ হাজার খামার বন্ধ হয়ে গেলেও বিদেশি কোম্পানিগুলোর কলেবর দিন দিন বেড়েই চলেছে। খামারিদের শঙ্কার অন্যতম কারণ হচ্ছে বিদেশি কোম্পানির আশপাশে কোন দেশি খামার রুগ্্ণ কিংবা বন্ধ হয়ে গেলে বিদেশি কোম্পানিগুলো তা নামমাত্র মূল্যে কিনে নিচ্ছে কিংবা লিজ নিচ্ছে। সংশি¬øষ্টরা বলছেন, দেশীয় স্বার্থ সংরক্ষণে বিদেশিদের কাছে এভাবে দেশীয় কোম্পানি বিক্রি ঠেকাতে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। 
অনুসন্ধানে জানা যায়,  পোল্ট্রি সেক্টরের জন্য সরকারের দেয়া সুবিধাদির সবটুকুই ভোগ করছে বিদেশি কোম্পানিগুলো। কিন্তু সরকারকে দেয়া কমিটমেন্ট রক্ষার কোন তাগিদ নেই। এই বিদেশি কোম্পানিগুলো বিদেশি ব্যাংক থেকে মাত্র ৩-৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে এদেশে বিনিয়োগ করছে। অথচ দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রায় ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ হার সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে দেশীয় উদ্যোক্তা ও খামারিরা বিদেশি কোম্পানিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় মার খাচ্ছে। শুধু ভারতীয় কোম্পানি গোদরেজ বাদে সিপি, সুগুনা, ভিএইচ গ্রুপ, অমৃত গ্রুপ, টাটা, নিউ হোপ প্রভৃতি কোম্পানির কারোরই দেশীয় কোম্পানির সাথে কোন অংশীদারিত্ব নেই। ফলে অর্জিত মুনাফার পুরোটাই ডলারে কনভার্ট করে তারা নিজ দেশে নিয়ে যাচ্ছে। এতে করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর পড়ছে অতিরিক্ত চাপ। বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পরিবর্তে কষ্টার্জিত মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা তাদের পেছনেই ব্যয় করতে হচ্ছে। অবশ্য বিনিয়োগ বোর্ডের একটি সূত্র মতে, ১৯৮৯ সালের বিনিয়োগ আইনে বিদেশি বিনিয়োগ, কর প্রদান প্রভৃতি বিষয়ের উল্লে¬খ থাকলেও বিদেশি কোম্পানিগুলো কি পরিমাণ অর্থ তাদের নিজ দেশে পাঠাতে পারবে তার কোন উলে¬øখ নেই। স্বার্থ পরিপন্থী সরকারি এ নীতিও ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লি¬ষ্টদের।  
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায়ে গড়ে ওঠা প্রথম পোল্ট্রি খামার ‘এগ অ্যান্ড হেনস লিঃ’ কিনে নেয় থাইল্যান্ডের কোম্পানি সিপি। কোম্পানিটি বাংলাদেশে প্রথম ব্যবসা শুরু করে গাজীপুর-শ্রীপুরের জয়না বাজারে অবস্থিত জনৈক রফিজউদ্দিনের খামার ভাড়া নিয়ে। বছরে মাত্র ৬৬ হাজার টাকায় এই খামার ভাড়া নেয় তারা ৫ বছরের জন্য। ৪ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর তারা চুক্তি আর নবায়ন করবে না বলে জানিয়ে দেয় রফিজউদ্দিনকে। বর্তমানে চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিরাজগঞ্জসহ দেশের ১৮টিরও অধিক স্থানে নিজস্ব খামার, হ্যাচারি ও ফিডমিল স্থাপন করেছে সিপি। অপর একটি কোম্পানি সুগুনা বিনিয়োগ করেছে ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলার রাজ পোল্ট্রি, গোল্ডেন চিকসসহ আরও ১০টিরও অধিক খামারে। কোম্পানিটি ইতোমধ্যেই ১৫টিরও বেশি দেশীয় কোম্পানি লিজ নিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। গোদরেজই একমাত্র বিদেশি কোম্পানি যে যৌথ অংশীদারিত্বে এসিআই-এর সাথে ব্যবসা করছে। পোল্ট্রি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আশি এমনকি নব্বইয়ের দশকেও এদেশের মানুষ পোল্ট্রি মুরগি কিংবা ডিম খেতে চাইত না। দেশি মুরগি ও ডিমই ছিল তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। ফলে পোল্ট্রি মুরগি ও ডিম খেতে উৎসাহিত করা এবং আপামর মানুষের কাছে তা গ্রহণযোগ্য করে তুলতে দেশীয় খামারি ও উদ্যোক্তাদের বছরের পর বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম আর অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। অথচ এত কষ্টে গড়ে তোলা একটি শিল্পকে যেন বিদেশিদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এর সপক্ষে যুক্তি দেখানো হয়েছেÑ বিদেশি কোম্পানি এলে তুলনামূলক কম দামে সাধারণ মানুষ ডিম ও মুরগির মাংস কিনে খেতে পারবে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছেÑ বিদেশি কোম্পানিগুলো আসার পর ডিম ও মুরগির দাম কমেনি; বরং আরও বেড়েছে। পোল্ট্রি খামারিরা বলছেন, দেশীয় খামারিদের উৎপাদিত ডিম ও মুরগির চেয়ে বিদেশি কোম্পানির পোল্ট্রি পণ্যের দাম বরাবরই অনেক বেশি। আর আজকের বাস্তবতা হচ্ছেÑ পোল্ট্রি খাতের মোট মার্কেট শেয়ারের প্রায় ৪০ ভাগই চলে গেছে ৭টি বিদেশি কোম্পানির হাতে।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়