আওয়ামী সরকারী সন্ত্রাসের এসিড হামলা


রংপুরে ছাত্রলীগের এসিড হামলা : ঢাকায় পুলিশের মরিচগুঁড়া স্প্রে

স্টাফ রিপোর্টার ও রংপুর প্রতিনিধি
আমার দেশ- ১/১১/১৩ পরের সংবাদ»
ঢাকা ও রংপুরে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ ও পুলিশ সদস্যরা। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষকদের ওপর এসিড হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তাদের সঙ্গে বহিরাগতরা যোগ দেয়। এসিডে ঝলসে গেছে দুই শিক্ষকের শরীর। এদিকে এ ঘটনার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরুরি বৈঠকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
অপরদিকে এমপিওভুক্তির দাবিতে ঢাকায় আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর তরল মরিচ স্প্রে (পিপার স্প্রে) নিক্ষেপ করে অনশন কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে পুলিশ। মরিচের গুঁড়ায় শরীরে প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া করায় সাংবাদিকসহ অর্ধশত শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এরপর থেকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া সংগঠন শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার কুণ্ডু নিখোঁজ রয়েছেন। অনেক খোঁজ করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। 
রংপুর : অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিয়োগবাণিজ্যের অভিযোগে রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আবদুুল জলিল মিয়ার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর গতকাল হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে ছাত্রলীগের কর্মীরা শিক্ষকদের লক্ষ্য করে এসিড ছুড়ে মারে। এতে ভিসিবিরোধী আন্দোলনকারী দু’জন শিক্ষকের মুখ ঝলসে গেছে। আহত হয়েছেন আরও ৮ শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। গুরুতর আহত অবস্থায় ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ড. মতিউর রহমান ও বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল সকাল পৌনে দশটায় ক্যাম্পাসের একাডেমিক ভবন-৩ এর সামনে এ ঘটনা ঘটে। এছাড়াও সকাল থেকে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কাম্পাসে কমপক্ষে অর্ধশত ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে তারা। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করেছে। রাতে এক জরুরি বৈঠকের পর বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের বাইরে পার্ক মোড়, লালবাগ, সর্দারপাড়ায় বহিরাগত ছাত্রলীগ ক্যাডাররা দেশীয় অস্ত্র এবং লাঠিসোটা হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালায়। শিক্ষার্থীদের বেধড়ক মারধর করে। এতে অন্তত ২৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তাণ্ডবের সময় শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ঢুকতে বাধা দেয় ভিসিপন্থী ছাত্রলীগের সদস্যরা। ক্যাম্পাসে সকাল থেকে ছাত্রলীগ কর্মীরা পুলিশের সশস্ত্র অবস্থায় মহড়া দিয়েছে। পরে রংপুর পুলিশ সুপার আবদুুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে বিশ্বদ্যািলয়ের প্রশাসনিক ভবন এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলরত শিক্ষক শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আমরণ অনশন শুরু করেছেন। আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার মোজাম্মেল হক ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজু। 
রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আবদুল জলিল মিয়ার অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিয়োগবাণিজ্যের প্রতিবাদে গত শনিবার থেকে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। ছাত্রলীগের তাণ্ডবের কাছে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে আন্দোলনকারী সাংবাদিকদের উদ্দেশে তারা বলেন, আপনারা ছাড়া আমাদের পাশে কেউ নেই। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, ড. মতিউর রহমানের চোখ এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় এসিড লেগেছে এবং ড. ওয়াদুদের মুখ ও চোখে এসিড লেগেছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আন্দোলনকারী শিক্ষক আশরাফুল আলম অভিযোগ করে বলেন, এসিড নিক্ষেপকারীদের মুখ মাফলারে বাধা ছিল। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর পরিমল মজুমদার ও শিক্ষক আজিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। 
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এসিড সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভেতর ও বাইরে আন্দোলনে নেমে পড়ে। আন্দোলন ঠেকাতে একই সময়ে ক্যাম্পাসের গেটের বাইরে দেশীয় অস্ত্র আর লাঠিসোটা নিয়ে অস্থান নেন বহিরাগত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তারা শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ঢুকতে বাধা দেন। 
পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, অর্ধশতাধিক পটকা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। সেগুলো ককটেল নয়, ককটেল সদৃশ পটকা। এতে ক্যাম্পাসে তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। 
আন্দোলনকারী শিক্ষক আশরাফুল আলম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর বহিরাগতদের দিয়ে হামলার নজির বিশ্বের কোথাও আছে কিনা আমাদের জানা নেই। ভিসির অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা আমরণ অনশন করব। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ড. মোজাম্মেল হক সাংবাদিকদের জানান, বিশ্বদ্যািলয়ের শিক্ষকদের ওপর হামলা করা অযৌক্তিক। তবে তারা যে দাবিতে আন্দোলন করছে, তা সময় দেয়া দরকার। 
ঢাকা : এমপিওভুক্তির দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনশন কর্মসূচি পালন করতে দেয়নি পুলিশ-র্যাবের বিপুলসংখ্যক মারমুখী সদস্যরা। গত বুধবার পুলিশের বেধড়ক মারধর, টিয়ারশেল ও তরল গ্যাস নিক্ষেপের প্রতিবাদে গতকাল তারা অনশন কর্মসূচি পালন করতে যায়। পুলিশের বাধার মুখে প্রেস ক্লাবের সামনে কর্মসূচি পালন করতে না পেরে বাধ্য হয়ে হাজার হাজার শিক্ষক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বেদিতে অনশনের জন্য শুয়ে পড়েন। সেখানে শিক্ষকদের ওপর তরল মরিচের গুঁড়া (পিপার স্প্রে) নিক্ষেপ করে কর্মসূচি পণ্ড করে দেয় পুলিশ। এতে আন্দোলনকারীদের সংগঠন শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের সভাপতিসহ অন্তত অর্ধশত শিক্ষক ও সাংবাদিক মরিচের গুঁড়ার কবলে পড়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঘটনার পর থেকে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার কুণ্ডু নিখোঁজ রয়েছেন। 
এদিকে শহীদ মিনারে আজ আমরণ অনশন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট। সংগঠনের সভাপতি এশারত আলী বলেছেন, সরকার ও প্রশাসন শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। শিক্ষকদের ওপর যতই নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হোক, তারা জাতি গড়ার কারিগর। আমরা তো আর পুলিশের সঙ্গে মারামারি করতে পারি না। এমপিওভুক্তি’ একদফা দাবি না মানা পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরে যাব না। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নিখোঁজ সম্পর্কে এশারত আলী বলেন, পুলিশি হামলায় সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যেতে পারে বলে সন্দেহ হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে শাহবাগ থানার এসআই কামরুল ইসলাম আমার দেশ-কে জানান, শিক্ষকদের কর্মসূচি থেকে কাউকে আটক করা হয়নি। 
প্রসঙ্গত, স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এমপিওভুক্তির (বেতন-ভাতা বাবদ মাসিক সরকারি টাকা) একদফা দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন করে আসছে। ওই দাবিতে চলতি বছরে আন্দোলনের তৃতীয় দিনে গত বুধবার শিক্ষকরা শিক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয় ঘেরাও করতে গেলে পুলিশের হামলায় তা পণ্ড হয়ে যায়। ওই হামলার প্রতিবাদ এবং এমপিওভুক্তির একদফা দাবিতে শিক্ষকরা আমরণ অনশন কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। 
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তায় গতকাল সকাল ১০টায় শিক্ষকদের আমরণ অনশন কর্মসূচির শুরু হওয়ার কথা ছিল। শিক্ষকরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সকালে সেখানে এসে দেখেন বিপুলসংখ্যক দাঙ্গা পুলিশ ও র্যাব যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে অবস্থান করছেন। আশপাশের এলাকাও পুলিশ ঘিরে রেখেছে। ওই এলাকায় শিক্ষকদের দাঁড়াতে দেয়া হয়নি। প্রেস ক্লাবে যেতে না পেরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষক-কর্মচারী শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাদের অনেকে শহীদ মিনারের বেদিতে ও পাদদেশে শুয়ে পড়েন। পুলিশ এসে দুপুর ২টার মধ্যে শহীদ মিনার থেকে সরে যেতে বলে। বেলা ১টার দিকে তারা মাইকিং করার চেষ্টা চালালে পুলিশ মাইক কেড়ে নেয়। পুলিশের বেঁধে দেয়া সময় পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুপুর ২টার দিকে মরিচের গুঁড়া স্প্রে করা হয়। মরিচের গুঁড়ার কবলে শিক্ষকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ঐক্যজোটের সভাপতি এশারত আলী বলেন, সকালে প্রেস ক্লাবের সামনে শিক্ষক-কর্মচারীরা জড়ো হতে চাইলে পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। শিক্ষকদের গ্রেফতারের হুমকি দেয়। ভয়ে অনেক শিক্ষকই প্রেস ক্লাবের সামনে আসেননি। এরপরও শিক্ষকরা তোপখানা রোড হয়ে প্রেস ক্লাবের সামনে যেতে চাইলে তাদের বাধা দেয় পুলিশ। তাই তারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কর্মসূচি পালন করার সিদ্ধান্ত নেন। শিক্ষক সমিতির সভাপতির দাবি, মরিচের গুঁড়া হামলায় তিনিসহ (সভাপতি) অন্তত অর্ধশত শিক্ষক-কর্মচারী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মরিচের গুঁড়ায় আক্রান্ত হয়ে চোখে জ্বালাপোড়া হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। সারা শরীরেও জ্বালাপোড়া হচ্ছে। অসুস্থদের মধ্যে ৩০ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মরিচের গুঁড়ার কবলে পড়েন সময় টেলিভিশনের এক সাংবাদিকও। কর্মসূচি পণ্ড ও মরিচের গুঁড়া হামলা সম্পর্কে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, অনুমতি ছাড়াই শিক্ষকরা এখানে জমায়েত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরের অনুমতি না থাকা এবং কোনো অনুষ্ঠান করার ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করায় শিক্ষকদের শহীদ মিনার ছাড়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। তা না হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশ বাধ্য হবে বলে তিনি জানিয়েছিলেন। আর এ কারণেই শহীদ মিনার থেকে তাদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়