রেশমার কাহিনী : আল্লাহর রহমত ও কুদরত
মোহাম্মদ খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী : সাভারে রানা প্লাজা ধসের ১৭ দিন পর রেশমাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবত, অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে আনা একদিকে যেমন উদ্ধারকর্মীদের দক্ষ সফল অভিযানের অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত, তেমনি এই ঘটনা আল্লাহর কুদরতি রহস্যমালার এক বিস্ময়কর উদাহরণও বটে। প্রথমেই পরম করুণাময় আল্লাহ তালার অজ¯্র শুকরিয়া-কৃতজ্ঞতার সাথে সাথে উদ্ধার অভিযান তৎপরতার সাথে নিবিড় ও সক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট উদ্ধার কর্মীদেরও এ প্রশংসনীয় তৎপরতার জন্য অভিনন্দন জানাতে হয়। ইতিহাসের এ দুর্লভ ঘটনার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও অসীম ক্ষমতায় অবিশ্বাসীদের চিন্তা-চেতনায় আলোড়ন সৃষ্টি হওয়ার কথা। সঠিক পথের দিশারী হওয়ার পক্ষে এমন ঘটনা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বিশ্ব ইতিহাসের প্রতি তাকালে দেখা যাবে, আদিকাল থেকে যুগে যগে, দেশে দেশে ¯্রষ্টা মানুষকে নানাভাবে পরীক্ষা করে থাকেন, মানুষের অন্যায়-অত্যাচার, আল্লাহদ্রোহিতা তথা পাপাচারের শাস্তি দুনিয়াতে পাপিষ্ঠরা যেমন ভোগ করে থাকে, তেমনি তাদের সাথে সৎলোকদেরও ভোগ করতে হয়। আবার অভাবিতভাবে অনেকের প্রতি আল্লাহর করুণাও বর্ষিত হয়।
পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন জাতির জঘন্য পাপাচারের জন্য চরম ও কঠোর শাস্তির বহু কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, বহু অবিশ্বাস্য, বিস্ময়কর ঘটনার কথাও বলা হয়েছে। মহাপ্রতাপশালী শাদ্দাদ, ফেরাউন, নমরুদদের ন্যায় রাজা-বাদশাহদের নির্মম ধ্বংসকাহিনী বর্ণিত হয়েছে। অলৌকিক অভূতপূর্ব বহু কাহিনীও রয়েছে। যেমন আসহাবে কাহফ, হজরত মূসা (আ.)-এর নিরাপদে নীল দরিয়া পার হয়ে যাওয়া, ফেরাউনের লাশ অক্ষত রাখা, সুদীর্ঘ কাল মুত্যৃর পর হজরত সুলায়মান (আ.)-এর লাশ লাঠির ওপর দ-ায়মান থাকা, হজরত ইদ্রিস (আ.) ও হজরত ঈসা (আ.)-কে জীবত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নেয়া এবং মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর মেরাজ ইত্যাদি বহু বিস্ময়কর অলৌকিক ঘটনা। তাছাড়া প্রায় চৌদ্দশ বছর পরে দু’জন বিশিষ্ট সাহাবীর অক্ষত লাশ ইরাকের সালমান পার্ক নামক স্থানে এনে দাফন করা, আরো কয়েকজন সাহাবীর অক্ষত লাশের সন্ধান পাওয়া, মৃত্যুর পর বিভিন্ন সময় কয়েকজনের জীবত হয়ে কথা বলা ইত্যাদিসহ আরো বিভিন্ন প্রকারের বহু অলৌকিক বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে, যা রেশমার ঘটনার চেয়েও বিস্ময়কর।
যেখানে আল্লাহর গজবের অবতরণ, সেখানে তার রহমতের বিচরণ মানুষের পরীক্ষারই নিদর্শন। সাভার ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের স্মরণাতীত কালের মনুষ্যসৃষ্ট এক মহাদুর্যোগ। গত ২৪ এপ্রিল সকাল থেকে ৯ মে দুপুর পর্যন্ত ১৭ দিন রানা প্লাজার করুণ দৃশ্য, কঠোরতম উদ্ধার অভিযানের প্রতি গোটা দেশবাসীর দৃষ্টি গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সাথে নিবদ্ধ ছিল। অধীর আগ্রহে চোখগুলো উদ্ধার তৎপরতার প্রতি তাকিয়ে থাকে যদি কোনো জীবিত প্রাণ উঠে আসে। কিন্তু উদ্ধার অভিযানের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হওয়ার পর থেকে শুধু লাশ আর লাশের সারি। প্রথম উদ্ধার অভিযানে প্রায় আড়াই হাজার জীবিত লোক উদ্ধারের পর লাশের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। আশা-নিরাশায় দোদুল্যমান অবস্থা চলতে থাকে গত শুক্রবার ৯ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত। বরং বলা যায়, ধ্বংসস্তূপে আর কোনো প্রাণের স্পন্দন আশা করা যায় না। জানা যায়, উদ্ধার অভিযান বেগবান করার প্রস্তুতি চলে যেন ধ্বংসস্তূপে লাশের সন্ধান পাওয়া গেলে তা দ্রুত স্থানান্তরিত করা যায়। আগেই বলে রাখতে চাই সাভার ট্র্যাজেডির বিবরণ দান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। শুক্রবার (৯ এপ্রিল) দুপুরের পর রানা প্লাজা ধ্বংসলীলার মধ্যে যে এক অভাবনীয় বিস্ময়কর ঘটনার অবতারণা টিভি পর্দায় তা প্রত্যক্ষ করে যে অনুভূতি হয়েছে, তা উদ্বুদ্ধ করেছে আল্লাহর কারিশমা, যা রেশমার ক্ষেত্রে প্রদর্শিত হয়েছে, সে সম্পর্কে এখানে আরো কিছু অলৌকিক তথ্য পরিবেশন করার। প্রথমে রেশমা। রেশমার গ্রাম দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার কোশিগাড়ি। রেশমার বাবা আনসার আলী ১৭ বছর আগে মারা যান। পরে একই এলাকার আরজান আলী নামে এক ব্যক্তি রেশমার মা জবেদাকে বিয়ে করেন। জবেদার আগের স্বামী আনসার আলীর ছেলে সাদেক আলী ও জাহেদুল ইসলাম এবং মেয়ে আসমা ফাতেমা ও রেশমা। রেশমা সবার ছোট। চার বছর আগে রাজ্জাক নামে এক ছেলের সঙ্গে রেশমার বিয়ে হয়। ৬ মাস আগে রাজ্জাক রেশমাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিবরণে আরো বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে রেশমা রানা প্লাজার তৃতীয়তলায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করছিলেন। রেশমার বড়বোন ফাতেমা বেগম জানান, সাভার ট্র্যাজেডির পর থেকে আমি সবসময় টিভি দেখতাম আর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতাম বোনকে ফিরে পাওয়ার জন্য। যখন টিভিতে রেশমাকে দেখতে পাই তখন আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। আল্লাহ আমার কথা শুনেছেন। তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন আমার বোনকে। মেয়ের জীবত উদ্ধারের খবর শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রেশমার মা জবেদা খাতুন। দীর্ঘদিন মেয়ের অপেক্ষায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। রেশমার মা জবেদা খাতুন, দুই ভাই ও বোন আসমা রেশমা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই রয়েছেন সাভারে। রেশমার অক্ষত লাশ পাওয়ার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। উনিশ বছর বয়সী রেশমার সংসার জীবন কাটে স্বামীর নিষ্ঠুর নির্যাতনে। তাকে না খেয়েও থাকতে হতো অনেক সময়। তার নিষ্ঠুর স্বামীর অকথ্য নির্যাতনের কাহিনীও প্রকাশিত হয়েছে। রেশমার স্বামী রাজ্জাক তার খোঁজখবর পর্যন্ত রাখত না। কিন্তু রেশমা উদ্ধারের পরপরই রাজ্জাক নামক একজন ব্যক্তি তাকে স্ত্রী বলে দাবি করে, পরে সেনা কর্মকর্তারা তাকে রেশমার কাছে নিয়ে গেলে লোকটি তার স্বামী নয় বলে রেশমা জানান। সাভারের বাজার রোড এলাকায় নুরু মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন রেশমা ৪১৬ ঘণ্টা পর অর্থাৎ ১৭ দিন পর মৃত্যু উপত্যকা হতে উদ্ধার করা হয় তাকে। রানা প্লাজার বেজমেন্ট থেকে পৌনে এক ঘণ্টার চেষ্টায় এবং বিকাল ৪টা ২৬ মিনিটে রেশমাকে উদ্ধার করে আনেন উদ্ধারকর্মীরা। পোশাককর্মী রেশমা ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন জানান, তিনি বেঁচে আছেন, এ সংবাদ গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। রেশমার উদ্ধার কাহিনী গোটা বিশ্বকে বিস্মিত করেছে নিঃসন্দেহে। সাভারের শোকাবহ পরিবেশে, লাশের পর লাশ উঠে আসার করুণ অবস্থায় এহেন এক পরম আনন্দের সংবাদ, সুসংবাদ। ১৭ দিন পর এই প্রায় অবিশ্বাস্য অলৌকিক সংবাদ সবার মাঝে এক অভাবিত আলোড়নের সৃষ্টি করে। রেশমাকে যেন সুস্থভাবে জীবিত উদ্ধার করা যায়, সেজন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া প্রার্থনার জন্য ঘনঘন আহ্বান জানানো হতে থাকে। উপস্থিত হাজার হাজার জনতার কণ্ঠে শ্রোত হতে থাকে আবেগময় প্রার্থনা। ধ্বংসস্তুপের নিকটে অনবরত কোরআন তেলাওয়াত হতে থাকে। সবারই একই আকুতি, আল্লাহ যেন রেশমাকে সুস্থ, জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে দেন। উদ্ধারকর্মীরা রেশমাকে অক্ষত অবস্থায় তুলে আনেন। নারায়ে তকবীর, আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে পরিবেশ মুখরিত হয়ে ওঠে।
আল্লাহর অপার মহিমার বাস্তব নিদর্শন মৃত্যুঞ্জয়ী রেশমার এ অলৌকিভাবে বেঁচে যাওয়ার কোনো ব্যাখ্যা দিতে বিজ্ঞান অক্ষম। সর্বশক্তিমান আল্লাহর কুদরতের একটি অতিক্ষুদ্র নমুনা রেশমার অক্ষত জীবিত উদ্ধার হয়ে আসা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এরূপ অলৌকিক ঘটনা এটি প্রথম হলেও বিগত প্রায় সিকি শতকে বিশ্বের নানাস্থানে এরূপ দৃষ্টান্তের অভাব নেই। উদাহরণ স্বরূপ সংবাদপত্রে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ভূমিকম্প, ভবন ধস ইত্যাদি ধ্বংসলীলায় চাপা পড়ে, আটকা পড়ে বহুদিন পর জীবিত উদ্ধার পাওয়ার ঘটনাবলির প্রত্যেকটি আল্লাহর অসীম কুদরতেরই জ্বলন্ত নিদর্শন। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২০০৫ সালে পাকিস্তানে ৪০ বছরের নারী নাকশা বিবিকে ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় ৬৩ দিন পর। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে হাইতিতে ২০১০ সালে। হাইতির নাগরিক ইভানসকে ভুমিকম্পের ধ্বংসস্তুপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় ২৭ দিন পর।
চতুর্থ ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায়। সিউলে ধসে পড়া একটি বহুতল শপিং কমপ্লেক্সের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ১৬ দিন পর জীবিত উদ্ধার হন এক ব্যক্তি।
ফিলিপাইনে ঘটে পঞ্চম ঘটনাটি। ১৯৯০ সালে ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি হোটেলের নিচে চাপা পড়া এক ব্যক্তিকে চৌদ্দ দিন পর সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ষষ্ঠ ঘটনাটি ইরানের। ২০০৪ সালে ভূমিকম্পে ধসে পড়া বাড়ির নিচে চাপা পড়া বৃদ্ধাকে ৯ দিন পর অবিশ্বাস্যভাবে অক্ষত অবস্থায় জীবিত উদ্ধার করা হয়।
মোহাম্মদ খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী
একথাও বিশ্বাস করতে হবে যে, মানুষের জীবনে আপতিত বহু বিপর্যয় মানুষেরই কৃতকর্মের ফল। মানুষ ভুল করলে সে ভুলের মাসুল তাকে দিতে হবে। পাপ করলে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়। আল্লাহতালা কোরআনের নানাস্থানে স্পষ্ট বলেছেন যে, তোমাদের উপর যে বিপদাপদ পতিত তা তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল। আবার এমনও বলেছেন যে, তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, অনেক বিপদ-বিপর্যয় মানুষরাই ডেকে আনে। উদাহরণস্বরূপ আলোচ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত রানা প্লাজার কথাই ধরা যাক। এর জমির মালিকানা, ক্রয়-বিক্রয়, নির্মাণকার্যে অসাধুতা, দুর্নীতি প্রভৃতি সম্পর্কে যেসব তথ্য উদ্ঘাটিত হচ্ছে, তাতে সততা, ন্যায়পরায়ণতার পরিবর্তে আত্মসাৎ, অন্যের অধিকার হরণ ইত্যাদি অন্যায়-অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তা যথার্থ ও সত্য প্রমাণিত হলে আইনের এবং ধর্মের দিক থেকে স্থাপনাটির অস্তিত্বই অবৈধ বিবেচিত হওয়ার কথা। ফলে ভেজাল কৃত্রিমতার পরিণতির জন্য কে দায়ী। বস্তুত, সৎ লোকের দ্বারা কখনো অন্যায়, পাপাচার, অপকর্ম সাধিত হতে পারে না, তবে মানুষ মাত্রই যেহেতু ভুল-ভ্রান্তির শিকার হতে পারে, সে ভুলের মাসুল ভোগ করা ও স্বাভাবিক তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমাও করতে পারেন। অনেক পাপকর্ম কিন্তু কারো অপকর্ম, পাপাচারের কারণে আল্লাহর পক্ষ হতে কোনো বিপদাপদ পতিত হলে বিপর্যয় ঘটলে তাতে সৎ, নিরীহ, নিরপরাধ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়Ñএটাই বিধাতার বিধান। এরূপ আকস্মিক দুর্ঘটনা-বিপর্যয়ে যারা প্রাণ হারায়, মারা যায় তাদের মধ্যে বিশ্বাসী কিছ লোক শহীদি মর্যাদার অধিকারী হয়ে থাকে। যেমন অন্যায়ভাবে করা, নিহত হওয়া, আগুনে পুড়ে মরা বা পুড়িয়ে মারা, পানিতে ডুবে মরা বা ডুবিয়ে মারা, স্থলে, পানিতে, হিং¯্র প্রাণীর আহার হওয়া, ভবন ধসে পতিত হয়ে কঠিন রোগে মারা যাওয়া, ন্যায্য অধিকার তথা ধনসম্পদ ইত্যাদি রক্ষায় নিহত হওয়া, সীমান্ত রক্ষায় নিহত হওয়া, অলঙ্ঘিত সীমায় অবস্থান করে বৈধ আত্মস্বার্থ রক্ষায় দ্বীন, ধর্ম প্রতিষ্ঠার আহ্বানে যারা অন্যায়ভাবে নিহত হয়, মারা যায় তারা বিশ্বাসী মুসলমান গণশহীদ বলে বিবেচিত। মিল কারখানা প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক কর্মচারী এবং মালিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে উভয় শ্রেণীর লোকই থাকতে পারেন যারা নিজ নিজ স্থানে ন্যায় ও সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। তবে সত্যাসত্য আল্লাহই ভালো জানেন।
পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন জাতির জঘন্য পাপাচারের জন্য চরম ও কঠোর শাস্তির বহু কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, বহু অবিশ্বাস্য, বিস্ময়কর ঘটনার কথাও বলা হয়েছে। মহাপ্রতাপশালী শাদ্দাদ, ফেরাউন, নমরুদদের ন্যায় রাজা-বাদশাহদের নির্মম ধ্বংসকাহিনী বর্ণিত হয়েছে। অলৌকিক অভূতপূর্ব বহু কাহিনীও রয়েছে। যেমন আসহাবে কাহফ, হজরত মূসা (আ.)-এর নিরাপদে নীল দরিয়া পার হয়ে যাওয়া, ফেরাউনের লাশ অক্ষত রাখা, সুদীর্ঘ কাল মুত্যৃর পর হজরত সুলায়মান (আ.)-এর লাশ লাঠির ওপর দ-ায়মান থাকা, হজরত ইদ্রিস (আ.) ও হজরত ঈসা (আ.)-কে জীবত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নেয়া এবং মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর মেরাজ ইত্যাদি বহু বিস্ময়কর অলৌকিক ঘটনা। তাছাড়া প্রায় চৌদ্দশ বছর পরে দু’জন বিশিষ্ট সাহাবীর অক্ষত লাশ ইরাকের সালমান পার্ক নামক স্থানে এনে দাফন করা, আরো কয়েকজন সাহাবীর অক্ষত লাশের সন্ধান পাওয়া, মৃত্যুর পর বিভিন্ন সময় কয়েকজনের জীবত হয়ে কথা বলা ইত্যাদিসহ আরো বিভিন্ন প্রকারের বহু অলৌকিক বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে, যা রেশমার ঘটনার চেয়েও বিস্ময়কর।
যেখানে আল্লাহর গজবের অবতরণ, সেখানে তার রহমতের বিচরণ মানুষের পরীক্ষারই নিদর্শন। সাভার ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের স্মরণাতীত কালের মনুষ্যসৃষ্ট এক মহাদুর্যোগ। গত ২৪ এপ্রিল সকাল থেকে ৯ মে দুপুর পর্যন্ত ১৭ দিন রানা প্লাজার করুণ দৃশ্য, কঠোরতম উদ্ধার অভিযানের প্রতি গোটা দেশবাসীর দৃষ্টি গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সাথে নিবদ্ধ ছিল। অধীর আগ্রহে চোখগুলো উদ্ধার তৎপরতার প্রতি তাকিয়ে থাকে যদি কোনো জীবিত প্রাণ উঠে আসে। কিন্তু উদ্ধার অভিযানের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হওয়ার পর থেকে শুধু লাশ আর লাশের সারি। প্রথম উদ্ধার অভিযানে প্রায় আড়াই হাজার জীবিত লোক উদ্ধারের পর লাশের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। আশা-নিরাশায় দোদুল্যমান অবস্থা চলতে থাকে গত শুক্রবার ৯ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত। বরং বলা যায়, ধ্বংসস্তূপে আর কোনো প্রাণের স্পন্দন আশা করা যায় না। জানা যায়, উদ্ধার অভিযান বেগবান করার প্রস্তুতি চলে যেন ধ্বংসস্তূপে লাশের সন্ধান পাওয়া গেলে তা দ্রুত স্থানান্তরিত করা যায়। আগেই বলে রাখতে চাই সাভার ট্র্যাজেডির বিবরণ দান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। শুক্রবার (৯ এপ্রিল) দুপুরের পর রানা প্লাজা ধ্বংসলীলার মধ্যে যে এক অভাবনীয় বিস্ময়কর ঘটনার অবতারণা টিভি পর্দায় তা প্রত্যক্ষ করে যে অনুভূতি হয়েছে, তা উদ্বুদ্ধ করেছে আল্লাহর কারিশমা, যা রেশমার ক্ষেত্রে প্রদর্শিত হয়েছে, সে সম্পর্কে এখানে আরো কিছু অলৌকিক তথ্য পরিবেশন করার। প্রথমে রেশমা। রেশমার গ্রাম দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার কোশিগাড়ি। রেশমার বাবা আনসার আলী ১৭ বছর আগে মারা যান। পরে একই এলাকার আরজান আলী নামে এক ব্যক্তি রেশমার মা জবেদাকে বিয়ে করেন। জবেদার আগের স্বামী আনসার আলীর ছেলে সাদেক আলী ও জাহেদুল ইসলাম এবং মেয়ে আসমা ফাতেমা ও রেশমা। রেশমা সবার ছোট। চার বছর আগে রাজ্জাক নামে এক ছেলের সঙ্গে রেশমার বিয়ে হয়। ৬ মাস আগে রাজ্জাক রেশমাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিবরণে আরো বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে রেশমা রানা প্লাজার তৃতীয়তলায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করছিলেন। রেশমার বড়বোন ফাতেমা বেগম জানান, সাভার ট্র্যাজেডির পর থেকে আমি সবসময় টিভি দেখতাম আর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতাম বোনকে ফিরে পাওয়ার জন্য। যখন টিভিতে রেশমাকে দেখতে পাই তখন আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। আল্লাহ আমার কথা শুনেছেন। তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন আমার বোনকে। মেয়ের জীবত উদ্ধারের খবর শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রেশমার মা জবেদা খাতুন। দীর্ঘদিন মেয়ের অপেক্ষায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। রেশমার মা জবেদা খাতুন, দুই ভাই ও বোন আসমা রেশমা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই রয়েছেন সাভারে। রেশমার অক্ষত লাশ পাওয়ার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। উনিশ বছর বয়সী রেশমার সংসার জীবন কাটে স্বামীর নিষ্ঠুর নির্যাতনে। তাকে না খেয়েও থাকতে হতো অনেক সময়। তার নিষ্ঠুর স্বামীর অকথ্য নির্যাতনের কাহিনীও প্রকাশিত হয়েছে। রেশমার স্বামী রাজ্জাক তার খোঁজখবর পর্যন্ত রাখত না। কিন্তু রেশমা উদ্ধারের পরপরই রাজ্জাক নামক একজন ব্যক্তি তাকে স্ত্রী বলে দাবি করে, পরে সেনা কর্মকর্তারা তাকে রেশমার কাছে নিয়ে গেলে লোকটি তার স্বামী নয় বলে রেশমা জানান। সাভারের বাজার রোড এলাকায় নুরু মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন রেশমা ৪১৬ ঘণ্টা পর অর্থাৎ ১৭ দিন পর মৃত্যু উপত্যকা হতে উদ্ধার করা হয় তাকে। রানা প্লাজার বেজমেন্ট থেকে পৌনে এক ঘণ্টার চেষ্টায় এবং বিকাল ৪টা ২৬ মিনিটে রেশমাকে উদ্ধার করে আনেন উদ্ধারকর্মীরা। পোশাককর্মী রেশমা ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন জানান, তিনি বেঁচে আছেন, এ সংবাদ গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। রেশমার উদ্ধার কাহিনী গোটা বিশ্বকে বিস্মিত করেছে নিঃসন্দেহে। সাভারের শোকাবহ পরিবেশে, লাশের পর লাশ উঠে আসার করুণ অবস্থায় এহেন এক পরম আনন্দের সংবাদ, সুসংবাদ। ১৭ দিন পর এই প্রায় অবিশ্বাস্য অলৌকিক সংবাদ সবার মাঝে এক অভাবিত আলোড়নের সৃষ্টি করে। রেশমাকে যেন সুস্থভাবে জীবিত উদ্ধার করা যায়, সেজন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া প্রার্থনার জন্য ঘনঘন আহ্বান জানানো হতে থাকে। উপস্থিত হাজার হাজার জনতার কণ্ঠে শ্রোত হতে থাকে আবেগময় প্রার্থনা। ধ্বংসস্তুপের নিকটে অনবরত কোরআন তেলাওয়াত হতে থাকে। সবারই একই আকুতি, আল্লাহ যেন রেশমাকে সুস্থ, জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে দেন। উদ্ধারকর্মীরা রেশমাকে অক্ষত অবস্থায় তুলে আনেন। নারায়ে তকবীর, আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে পরিবেশ মুখরিত হয়ে ওঠে।
আল্লাহর অপার মহিমার বাস্তব নিদর্শন মৃত্যুঞ্জয়ী রেশমার এ অলৌকিভাবে বেঁচে যাওয়ার কোনো ব্যাখ্যা দিতে বিজ্ঞান অক্ষম। সর্বশক্তিমান আল্লাহর কুদরতের একটি অতিক্ষুদ্র নমুনা রেশমার অক্ষত জীবিত উদ্ধার হয়ে আসা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এরূপ অলৌকিক ঘটনা এটি প্রথম হলেও বিগত প্রায় সিকি শতকে বিশ্বের নানাস্থানে এরূপ দৃষ্টান্তের অভাব নেই। উদাহরণ স্বরূপ সংবাদপত্রে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ভূমিকম্প, ভবন ধস ইত্যাদি ধ্বংসলীলায় চাপা পড়ে, আটকা পড়ে বহুদিন পর জীবিত উদ্ধার পাওয়ার ঘটনাবলির প্রত্যেকটি আল্লাহর অসীম কুদরতেরই জ্বলন্ত নিদর্শন। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২০০৫ সালে পাকিস্তানে ৪০ বছরের নারী নাকশা বিবিকে ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় ৬৩ দিন পর। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে হাইতিতে ২০১০ সালে। হাইতির নাগরিক ইভানসকে ভুমিকম্পের ধ্বংসস্তুপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় ২৭ দিন পর।
চতুর্থ ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায়। সিউলে ধসে পড়া একটি বহুতল শপিং কমপ্লেক্সের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ১৬ দিন পর জীবিত উদ্ধার হন এক ব্যক্তি।
ফিলিপাইনে ঘটে পঞ্চম ঘটনাটি। ১৯৯০ সালে ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি হোটেলের নিচে চাপা পড়া এক ব্যক্তিকে চৌদ্দ দিন পর সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ষষ্ঠ ঘটনাটি ইরানের। ২০০৪ সালে ভূমিকম্পে ধসে পড়া বাড়ির নিচে চাপা পড়া বৃদ্ধাকে ৯ দিন পর অবিশ্বাস্যভাবে অক্ষত অবস্থায় জীবিত উদ্ধার করা হয়।
মোহাম্মদ খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী
একথাও বিশ্বাস করতে হবে যে, মানুষের জীবনে আপতিত বহু বিপর্যয় মানুষেরই কৃতকর্মের ফল। মানুষ ভুল করলে সে ভুলের মাসুল তাকে দিতে হবে। পাপ করলে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়। আল্লাহতালা কোরআনের নানাস্থানে স্পষ্ট বলেছেন যে, তোমাদের উপর যে বিপদাপদ পতিত তা তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল। আবার এমনও বলেছেন যে, তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, অনেক বিপদ-বিপর্যয় মানুষরাই ডেকে আনে। উদাহরণস্বরূপ আলোচ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত রানা প্লাজার কথাই ধরা যাক। এর জমির মালিকানা, ক্রয়-বিক্রয়, নির্মাণকার্যে অসাধুতা, দুর্নীতি প্রভৃতি সম্পর্কে যেসব তথ্য উদ্ঘাটিত হচ্ছে, তাতে সততা, ন্যায়পরায়ণতার পরিবর্তে আত্মসাৎ, অন্যের অধিকার হরণ ইত্যাদি অন্যায়-অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তা যথার্থ ও সত্য প্রমাণিত হলে আইনের এবং ধর্মের দিক থেকে স্থাপনাটির অস্তিত্বই অবৈধ বিবেচিত হওয়ার কথা। ফলে ভেজাল কৃত্রিমতার পরিণতির জন্য কে দায়ী। বস্তুত, সৎ লোকের দ্বারা কখনো অন্যায়, পাপাচার, অপকর্ম সাধিত হতে পারে না, তবে মানুষ মাত্রই যেহেতু ভুল-ভ্রান্তির শিকার হতে পারে, সে ভুলের মাসুল ভোগ করা ও স্বাভাবিক তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমাও করতে পারেন। অনেক পাপকর্ম কিন্তু কারো অপকর্ম, পাপাচারের কারণে আল্লাহর পক্ষ হতে কোনো বিপদাপদ পতিত হলে বিপর্যয় ঘটলে তাতে সৎ, নিরীহ, নিরপরাধ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়Ñএটাই বিধাতার বিধান। এরূপ আকস্মিক দুর্ঘটনা-বিপর্যয়ে যারা প্রাণ হারায়, মারা যায় তাদের মধ্যে বিশ্বাসী কিছ লোক শহীদি মর্যাদার অধিকারী হয়ে থাকে। যেমন অন্যায়ভাবে করা, নিহত হওয়া, আগুনে পুড়ে মরা বা পুড়িয়ে মারা, পানিতে ডুবে মরা বা ডুবিয়ে মারা, স্থলে, পানিতে, হিং¯্র প্রাণীর আহার হওয়া, ভবন ধসে পতিত হয়ে কঠিন রোগে মারা যাওয়া, ন্যায্য অধিকার তথা ধনসম্পদ ইত্যাদি রক্ষায় নিহত হওয়া, সীমান্ত রক্ষায় নিহত হওয়া, অলঙ্ঘিত সীমায় অবস্থান করে বৈধ আত্মস্বার্থ রক্ষায় দ্বীন, ধর্ম প্রতিষ্ঠার আহ্বানে যারা অন্যায়ভাবে নিহত হয়, মারা যায় তারা বিশ্বাসী মুসলমান গণশহীদ বলে বিবেচিত। মিল কারখানা প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক কর্মচারী এবং মালিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে উভয় শ্রেণীর লোকই থাকতে পারেন যারা নিজ নিজ স্থানে ন্যায় ও সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। তবে সত্যাসত্য আল্লাহই ভালো জানেন।
Comments