বিশ্বজিৎ থেকে পল্লবীর বিহারী হত্যা
ধিক্কার সে মানুষরূপী পশুদের জন্য, যারা মানুষকে মানুষ বলে মনে করে না। বিহারী ক্যাম্পের এই শোকের ক্ষোভ ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে। হাতে কালো পতাকা ও বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে মানুষ মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে আসছে। ক্যাম্পের মাইক ব্যবহার করে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়া হচ্ছে। সংঘর্ষের দিন পুলিশের গুলিতে আহত এক বদরউদ্দিন ও তার ছেলে আরজু চিকিৎসার জন্য ঢামেক হাসপাতালে গেলে ওই রাতেই পল্লবী থানা পুলিশ তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে চালান দিয়েছে। বাংলা মেইল টোয়েন্টি ফোরের রিপোর্ট অনুযায়ী, নিখোঁজের সংখ্যা ২০-২৫ জনের মতো। অনেকের বাড়িতে সরকার সমর্থকরা বাহির থেকে তালা মেরে দখলে নেয়ার চেষ্টা করেছেন। সাধারণ পথচারী ও ভুক্তভোগীদের উপর গুলি ও তাদেরকে নির্বিচারে গ্রেফতার করে এ আন্দোলনকে থামানো যাবে বলে মনে হয় না।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য মতে, আতশবাজিকে কেন্দ্র করে ভোর সাড়ে পাঁচটায় বিহারী ক্যাম্পের বাসিন্দা ও পুলিশের সাথে বাক বিত-া, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হলে পুলিশের সাথে লাঠিসোঁঠা, চাপাতি ও অস্ত্র নিয়ে যোগ দেয় লালমিয়া বস্তি ও বাউনিয়াবাদ থেকে আসা স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ পল্লবী থানা যুবলীগের সেক্রেটারি জুয়েল রানা ও অন্যান্য স্থানীয় নেতাকর্মীরা। ক্যাম্পের বাসিন্দা ইয়াসিন আলীর ঘর সহ আরও আটটি ঘরে বাহির থেকে তালা লাগিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয় তারা। এই হত্যাকা-ের রহস্য নিয়ে যতগুলো ঘটনা পত্রিকায় ও মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে তার মূল কথা হলো- বিহারী ক্যাম্পের পাশেই রয়েছে রাজি বস্তি। সেই বস্তি থেকে সরকার দলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুগত নেতা-কর্মীরা প্রতি মাসে মাসোহারা পেতো। যার কারণে বিহারী ক্যাম্প থেকে রাজি বস্তিতে বিদ্যুত সংযোগ দেয়ার জন্য স্থানীয় এমপির অনুরোধটি বিহারী ক্যাম্পের লোকজন গ্রহণ করেনি। এ কারণে তাদের দেখে নেয়ার হুমকি দেয়ার পরই এ ধরনের নারকীয় ঘটনা ঘটল। এমপি ইলিয়াস উদ্দীন মোল্লা ও তার লোকদের সাথে ক্যাম্পের অধিবাসীদের মধ্যকার বিরোধই নির্মম হত্যাকা-ের জন্য দায়ী বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
আতশবাজি মূল কথা নয়। স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে নিরীহ একটি পরিবারকে হত্যা করার রেকর্ড এই সরকারকে ডুবানোর জন্যই যথেষ্ট। আতশবাজি তো বিভিন্ন স্থানেই কম-বেশি হয়েছে। দেশের অন্য কোথাও তো এ ধরনের কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। তাহলে এমন ঘটনা মিরপুরে ঘটানোর পেছনে নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। সরকারি খাস জমি দখল করে বিহারীরা দীর্ঘদিন থেকে বসবাস করছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও সরকার সমর্থক নেতা-কর্মীরা সেই জমি জবরদখল করার নানা ফন্দির মধ্যে আগুন লাগানোর ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত বলেই ধারণা করা হচ্ছে। যদিও সরকার সমর্থিত কিছু কিছু পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল এ ঘটনাকে বাঙালি বনাম বিহারী সংঘর্ষ বোঝাতে চেষ্টা করেছে।
হত্যাকারী কারা? তারা এতটাই শক্তিশালী যে, প্রশাসনের সামনে নির্ভয়ে এমন কর্মকা- করে বীরদর্পে চলে যেতে সক্ষম হয়েছে। প্রাচ্যের ড্যান্ডি হিসেবে এক সময়ের নারায়ণগঞ্জের পরিচিতি থাকলেও এখন আর সেই পরিচয়ের কারো মুখেই শোনা যায় না। নারায়ণগঞ্জ মানেই যেন শামীম ওসমান, আর শামীম ওসমান মানেই হলো নারায়ণগঞ্জ। যেমনটা আমরা দেখেছি নিজাম ও জয়নাল হাজারীর ফেনী, আবু তাহেরের লক্ষীপুরকে। কালশীর অগ্নিকা-ের মূল আসামিরা নারায়ণগঞ্জের মতো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে সরকার সত্যিকারার্থে যদি আন্তরিক থাকে তাহলে অবশ্যই প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব। আর যদি অন্যায়ভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে ওসমান পরিবারের সদস্যদের মতো মিরপুরের ঘটনায় দায়ীদের পাশেও কেউ দাঁড়িয়ে যায় তাহলে তো কথাই নেই।
কালশী নারকীয় ঘটনার ৩৬ ঘণ্টা পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে যান ঢাকা-১৬ আসনের এমপি ইলিয়াস মোল্লা। তার দেয়া এক লাখ টাকা তার মুখের উপর ছুড়ে মেরে নিহত আশিকের বাবা ইয়াসিন আলী বলেন, ‘তোর টাকার আমার দরকার নেই। তোর কারণে আমার স্ত্রী-সন্তান-নাতনিসহ ৯ জন সদস্য নিহত হয়েছে। আমি তোর ফাঁসি চাই। (ইনকিলাব : ১৬ জুন ’১৪)। ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর জনগণের দৃষ্টি ভিন্নখাতে ফেরাতে একের পর এক ইস্যু তৈরি করা হচ্ছে বলে গুঞ্জন আছে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনার শোক দূর না হতেই ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যানকে পুড়িয়ে মারা হলো। তারপর কালশীর হত্যাকা-, এভাবে করে নতুন নতুন ইস্যু সৃষ্টি হচ্ছে। এর পর আবার কোন জঘন্য কাজটি ঘটবে তা বলা যাচ্ছে না। এ সকল ঘটনায় বারবার কেন যেন সরকার সমর্থক গোষ্ঠীর নাম চলে আসে। যদিও হাজারো তথ্য প্রমাণ থাকলেও সরকার তার দায় স্বীকার করে না। সরকার যথারীতি বিরোধী দলের উপর দায় চাপানোর চেষ্টা করে। ভাগ্যিস অপরাধীদের কেউ না কেউ দোষ স্বীকার করায় বিরোধীদল সাময়িকের জন্য হলেও বেঁচে যায়। তবে একথা অনেক বার প্রমাণিত হয়েছে যে, যেখানেই অনিয়ম, দুর্নীতি, লুট-পাট, জমি দখল, বিশ্বজিৎ এর মতো কুপিয়ে মানুষ হত্যা, নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার, ফেনীর মতো নিজ দলীয় চেয়ারম্যানকে পুড়িয়ে হত্যা, ঘুমন্ত ব্যক্তিদের ঘরের বাহির থেকে তালাবদ্ধ করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা, পুলিশকে হত্যা করে জঙ্গি ছিনতাই, ভোট কেন্দ্রে হামলা, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোট শুরু হওয়ার আগেই জাল ভোটে বাক্স ভর্তি, টেন্ডারবাজি, শেয়ার বাজার লুট, পদ্মা সেতু দুর্নীতি, গুম-খুন, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় সবখানেই ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ, কৃষকলীগ কিংবা আওয়ামী লীগ-এভাবে কোন না কোন লীগ জড়িত থাকার প্রমাণ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। গত ১৫ জুন (২০১৪) টিএসসি অডিটরিয়ামে যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীর কারণে দেশে ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আওয়ামী লীগের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। তারা দলের মাঝে থেকে নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে।’ এভাবে লীগারদের হস্তক্ষেপ চলতে থাকলে সোনার বাংলাদেশ নামটি বিলীন হয়ে লীগারদের বাংলাদেশ নামে পরিচয় লাভ করতে বেশি দিন লাগবে না।
বিহারীদের আবাসিক সমস্যাটি দীর্ঘ ৪৪ বছরেও সমাধান হয়নি। কী অপরাধে এভাবে জ্যান্ত মানুষদের পুড়িয়ে মারতে হবে? তাহলে বিহারী পল্লীতে কেন আগুন লাগানো হলো? ৪৩ বছর আগের মীমাংসিত ইস্যুকে যদি একটি কথিত বিদেশী পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে কারো ফাঁসির দাবিতে যদি আন্দোলন হতে পারে, তাহলে নারায়ণগঞ্জের ৭ জন, ফেনীর চেয়ারম্যানকে হত্যা ও বিহারী পল্লীর ১০ জন মানুষকে হত্যার সাথে যারা জড়িত তাদের কেন ফাঁসির দাবি করা যাবে না? কিন্তু তাদের ফাঁসি তো দূরের কথা প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যরা আদৌও গ্রেফতার হবে কি না সেটা নিয়েই জনেমনে প্রশ্ন রয়েছে। জনভাবনার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে সংসদের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন বর্তমান (১০ম) সংসদের জাতীয় পার্টির এমপি পীর ফজলুর রহমান। গত ১৪ জুন জাতীয় সংসদে দ্বিতীয় অধিবেশনের পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা দেখেছি মিরপুরে কীভাবে ঘরের মধ্যে আগুন দিয়ে নয়জনকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। আমরা যখন সংসদে আসি, তখন আমাদের বিবেককে বাইরে রেখে আসি না। এমন নৃশংস ঘটনা আর কত ঘটতে দেয়া হবে? এমন নৃশংস ঘটনার ব্যাপারে তাদের পদক্ষেপ কী?” আটটি ঘরে তালা লাগিয়ে এবং একটি ঘরের সব সদস্যকে পুড়িয়ে মারা কোন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব হতে পারে না। এ ঘটনায় সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বে যথেষ্ট অবহেলা রয়েছে।
ইতোমধ্যে এই ঘটনায় অনেকেই বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন। বিশেষ করে ১৯ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন, ফজলে হোসেন বাদশা, শফিউল আলম প্রধান, খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সহ আরো অনেকে। প্রশ্ন হলো- এর আগে যতগুলো ঘটনা ঘটছে সবগুলোর কি বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে তাহলে তার কারণ কী? শরিষার মধ্যে যদি ভূত থাকে তাহলে কোন তদন্তই সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে না।
স্ট্যান্ডার্ড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটির প্রধান আব্দুল জব্বার খান বলেন, অগ্নিকা-ের ঘটনা বিহারীদের উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্রের একটি নমুনা মাত্র। পুড়িয়ে মানুষ মারাই কি জমি দখলের সহজ পথ। এটাই কি সমাধান? ভুক্তভোগীরা সচেতন প্রত্যেকটি নাগরিক, সাংবাদিক সমাজ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কালশী বিহারী ক্যাম্পের অধিবাসীদের উপর হামলা ও দুঃখ-দুর্দশা স্বচক্ষে দেখার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। যেখানে মানুষের জীবন-মরণ সম্পর্ক, বেঁচে থাকার জন্য মাথা গোঁজার একটু জমিই যাদের সম্বল। সেই জমি থেকে তাদেরকে উচ্ছেদ করতেই পরিকল্পিত হত্যাকা- মেনে নেয়ার মতো নয়।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
Comments