একটি গাছ একটি ওষুধ কারখানা
প্রতিটি উদ্ভিদ এক একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানা যা প্রকৃতি থেকে রসদগ্রহণ করে থাকে, এটি যেন শত কোটি টাকার ফার্মাসিউটিক্যাল ল্যাবরেটরি। যে ল্যাবরেটরি প্রকৃতি থেকে কাঁচামাল গ্রহণ করে তা রূপান্তরিত হয়ে রোগ নিরাময় ওসুধে পরিণত করছে।
আশ্চার্য এত সব কা- আপনার আঙ্গিনায় হচ্ছে বিনা খরচে। আপনার কাছে কোন কিছু দাবি বা চাহিদা আশা না করে শুধু অল্প কিছু যত্ন আশা করে সে, মাঝে মধ্যে পানি দেয়া, সূর্যের আলো যাতে পড়ে তার ব্যবস্থা করে দেয়া এবং আগাছা পরিষ্কারসহ কিছু সহানুভূতি।
তাদের রয়েছে বিস্ময়কর উৎপাদন করার ক্ষমতার ইঞ্জিন। তারা মাটি থেকে নেয় পানি, খনিজ পদার্থ তথা নিউট্রিশন, কার্বন ডাই-অক্সাইড নেয় বাতাস থেকে, সূর্য থেকে নেয় ফোটন, নিজস্ব ফ্লোরোফিলের শক্তি দিয়ে উৎপাদন করে আপনার সুস্থ থাকার যত সব প্রতিরক্ষামূলক ও নিরামায়ক ওষুধ। কোটি টাকার ওষুধ ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠার আজই প্রস্তুতি নিন। ফলমূল, সবজির বাগান করুন। বাড়ির খালি জায়গা ফেলে না রেখে গাছ লাগান। রঙিন সব ফলমূল আপনাকে অসুস্থ হতে দেবে না। বাড়ির আঙিনায় রংধনু (সাত) রঙের শাকসবজি-ফল তৈরির বাগান করুন। আপনার খাবার প্লেটে প্রকৃতির রংধনুর সাত রঙ যদি থাকে তবে মার্কেটের ফার্মেসি থেকে রাসায়নিক সিনথেটিক রঙ্গিন ওষুধ আপনাকে কিনতে হবে না। পৃথিবী সৃষ্টির পর প্রাকৃতিক ভারসাম্য অর্থাৎ ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স সৃষ্টি হয়ে রয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। পৃথিবীর কোন জিনিস সৃষ্টিকর্তা অকারণে সৃষ্টি করেননি। দুঃখজনক এই ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স নষ্ট করে একমাত্র মানুষ। আবাসস্থল তৈরি, আসবাব, আগুন জ্বালানোসহ বিভিন্ন কারণে উদ্ভিদ কেটে ধ্বংস করছে, পানি দূষিত করে পরিবেশ ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। যান্ত্রিক যানবাহনের ধোঁয়া, মিল-কারখানার ধোঁয়া ও বর্জ্য, পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ, বিভিন্ন গোলাবারুদ যুদ্ধাস্ত্র প্রয়োগ পৃথিবীকে রক্ষাকারী ওজন বলয় ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু বরফ গলে পানির স্তর বাড়ছে। পৃথিবীর নিম্ন অঞ্চলসমূহ বিপজ্জনক অবস্থাসহ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এলাকা পানির নিচে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ থেকে বাঁচার উপায় কি?
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থাগুলো পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। এ কারণেই জাতিসংঘ প্রতি বছর ২১ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক বন দিবস’ পালনের ঘোষণা দিয়েছেন। যা গত বছর (২০১৩) থেকে সারাবিশ্বে তা পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে যে পরিমাণ বনাঞ্চল থাকা দরকার তা নেই। প্রয়োজন বনাঞ্চল রক্ষা করাসহ শহরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে ব্যাপক ভিত্তিতে বৃক্ষরোপণ করা। এক্ষেত্রে বিশেষ কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া অতি জরুরি। যেমন :
* অপরিণত গাছ কাটার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
* সমুদ্র উপকূলে ব্যাপক বনাঞ্চল সৃষ্টি করা, পাহাড় ও পাদদেশে পরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার বনজ, ফলজ উদ্ভিদ লাগিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য ও কাঠের চাহিদা মেটানো সম্ভব। পরিণত ১টি গাছ কাটলে অন্ততঃ আরও ২টি গাছ লাগানো।
* পারিবারিকভাবে বাড়ির আঙ্গিনায় ও চারিধারে, ডাব, পেয়ারা, ডালিম, আতা প্রভৃতি গাছ লাগানো সম্ভব।
* বাড়ির রান্নাঘরের জানালার পাশে কিচেন গার্ডেন (রান্নাঘরের বাগান) তৈরি করুন মরিচ, ঢেরশ, পেঁপে, শিম, লাউ, শশা, পুঁইশাক, লালশাক, ধনেপাতা, লেটুস প্রভৃতি সিজনাল সবজি লাগান, রান্নার সময় বাগান থেকে তুলে টাটকা সবজি গ্রহণ করুন রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় ক্ষমতা জাগ্রত করে সুস্থ দীর্ঘ জীবনযাপন করুন।
দিনাজপুরের সেফায়েত উল্লাহ পাটোয়ারী ঢেপা নদীর ধারে অনুর্বর জমিতে গাছ লাগাতে লাগাতে ৬০ হাজারের উপরে গাছ তিনি লাগিয়ে এক ছোট্ট এক সুন্দর বন বানিয়ে ফেলেছেন। সুজলাপুর ইউনিয়নের তার গ্রামটি মাত্র ১০ বছরে নীরবচ্ছিন্ন গাছ লাগানোর নেশা তাকে দেশব্যাপী আলোচিত করেছে। এই ৯৬ বছরের বৃদ্ধের চিরসবুজ পরিতৃপ্তির হাসি তার মুখে। এক অনুসরণীয় আদর্শ মানুষ তিনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক মরুময় এলাকার ৫০ বছর থেকে গাছ লাগাচ্ছেন কার্তিন প্রামাণিক। রাস্তার ধারে, মাঠে, ঘাটে, বাজারে, আজ সবুজে ঘেরা এক ছায়াশীতল আদর্শ গ্রামে পরিণত হয়েছে। বড় বড় গাছের নিচে হাট/বাজার বসে আজ যা কার্তিকের লাগানো। ছায়াশীতল আদর্শ গ্রামে পরিণত হয়েছে সেটি। নিজের কি লাভ বিবেচনা করেননি তিনি। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে লাগিয়ে গেছেন গাছ। আজ তিনি উদ্ভিদ তথা প্রকৃতি প্রেমিক হিসেবে আলোচিত ব্যক্তিত্ব।
উপসংহার
আমাদের প্রত্যেকের পরিবেশ উন্নয়ন তথা দেশ উন্নয়নে কিছু না কিছু দায়িত্ব রয়েছে। অনেক কাজের মধ্যে সহজ দায়িত্ব হলো কিছু না কিছু গাছ লাগানো এবং পরিবেশ দূষণ হয় এমন কিছু না করা। মহানবী (সা.) একাধিক হাদিসে গাছ লাগানোর জন্য তাগিদ দিয়েছেন। সাদকায়ে জারিয়ার প্রতিদান রয়েছে এতে অর্থাৎ রোপণকারী মৃত্যুবরণ করলেও ওই উদ্ভিদ যতদিন অন্যদের উপকার করতে থাকবে ততদিন রোপণকারী পুরস্কার (নেকি) পেতে থাকবেন। আজকের নিবন্ধ সমাপ্ত করছি একজন প্রকৃতি বিজ্ঞানির একটি উদ্ধৃতি দিয়ে ‘যে ব্যক্তি দেশ ও দেশের রাজনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে সচেতন নন, তিনি একজন প্রকৃত ভোটার যেমন হতে পারেন না, তেমনি যে ব্যক্তি প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন নন তিনি একজন সুযোগ্য নাগরিক হতে পারেন না’।
আমরা পৃথিবীতে জন্মেছি কিছু দিতে। আপনার ক্ষমতা ও যোগ্যতা রয়েছে অনেক কিছু দেয়ার। দিতে যদি কিছু না চান অন্ততঃ ধ্বংস করবেন না।
ড. মো. আলমাসুর রহমান
কাউন্সিলর : হলিসটিক হেলথ কেয়ার সেন্টার, পান্থপথ, ঢাকা।
মোবাঃ- ০১৭১৬-৫০০২৩২
Comments