সাঈদীর আপিলের যুক্তিতর্ক অব্যাহত : ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা করা হয় চিতলিয়ায় নয়, নলবুনিয়া গ্রামে
স্টাফ রিপোর্টার
| « আগের সংবাদ | পরের সংবাদ» |
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদন শুনানিতে গতকালও আট নম্বর অভিযোগ যথা মানিক পসারির বাড়িতে লুটপাট শেষে আগুন দেয়া, তাদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা ও মফিজের ওপর নির্যাতন এবং আশপাশের হিন্দু বাড়িতে আগুন দেয়ার বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান। এ অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মাওলানা সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। আট নম্বর অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে আসামিপক্ষের যেসব সাক্ষীর ওপর ট্রাইব্যুনাল নির্ভর করেছেন, তাদের বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী।
তিনি বলেন, আসামিপক্ষের তিনজন সাক্ষী যাথা ২, ৭ ও ১১ নম্বর সাক্ষী তাদের সাক্ষ্যে বলেছেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইব্রাহিম কুট্টিকে নলবুনিয়া গ্রামে তার শ্বশুরবাড়িতে রাতের প্রথম ভাগে রাজাকাররা গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় স্বাধীনতার কয়েক মাস পর ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম বাদী হয়ে একটি হত্যামামলা দায়ের করেন।
আইনজীবী বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ১৯৭১ সালের ৮ মে চিতলিয়া গ্রামের মানিক পসারির বাড়ি থেকে ইব্রাহিম কুট্টিকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে পাকসেনারা তাকে গুলি করে হত্যা করে যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
এস এম শাহজাহান বলেন, ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং আসামিপক্ষের তিন সাক্ষীর সাক্ষ্যে ঘটনার স্থান এবং তারিখের মধ্যে বিরাট তফাত দেখা যায়। আসামিপক্ষের সাক্ষ্যে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে এসেছে বলে তিনি দাবি করেন।
গতকাল বুধবার প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বিচারপতির আপিল বেঞ্চে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা), আবদুল ওয়াহ্হাব মিয়া, হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
গতকাল আইনজীবী এস এম শাহজাহান, আসামিপক্ষের ২ নম্বর সাক্ষীর জবানবন্দি পড়ে শোনান আদালতে। ২ নম্বর সাক্ষী আবদুর রাজ্জাক তার জবানবন্দিতে বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন আমাদের নলবুনিয়ায় একটি ঘটনাই ঘটেছে। আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি হঠাত্ একদিন শেষরাতে একটি আওয়াজ হয়। আমি অনুমান করলাম এটা গুলির আওয়াজ। তারপর দেখি যে, ফজরের টাইম হয়ে গেছে। আমি আজান দিয়া নামাজ পড়ি। নামাজ পড়ার পর উত্তরদিকে রাস্তার পাশে যাই কোথায় কী হয়েছে জানার জন্য। তখন গিয়ে দেখি উত্তর দিক থেকে সামনের খাল দিয়ে নৌকায় করে ইব্রাহিম কুট্টির লাশ নিয়ে পাড়ের হাটের দিকে আসতেছে। নৌকায় কালাম চৌকিদার, আইয়ুব আলী চৌকিদার এবং হাকিম মুন্সিকে দেখি। এরপর দেখি আরও কয়েকজন লোক খালের পাড় দিয়ে উত্তর দিক থেকে আসতেছে। যেসব লোক আসতেছে তাদের মধ্যে দানেশ মোল্লা, সেকেন্দার শিকদার, মোসলেম মাওলানা, রুহুল আমিন, মোমিন রাজাকার ছিল। আরও দেখি উক্ত লোকেরা আজু হাওলাদারের বউ এবং তার ছেলে সাহেব আলীকে বেঁধে নিয়ে আসতেছে এবং পাড়ের হাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তার পরদিন শুনি আজু হাওলাদারের বউ বাড়িতে আসে এবং সাহেব আলীকে পিরোজপুরে নিয়ে পাকসেনারা গুলি করে হত্যা করেছে।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, এ সাক্ষী ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা বিষয়ে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছেন। ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল তার ওপর নির্ভর করেছে; কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ চুপ থেকেছে। আসামিপক্ষের সাক্ষীও তো সাক্ষী এবং তার দেয়া এভিডেন্সও এভিডেন্স। তার দেয়া তথ্যও বিবেচনার দাবি রাখে; কিন্তু তা করা হয়নি রায়ের ক্ষেত্রে। এ সময় একজন বিচারপতি বলেন, ইব্রাহিমকে যে হত্যা করা হয়েছে সেটা নেয়া হয়েছে এ সাক্ষীর মাধ্যমে। তখন অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ইব্রাহিমকে হত্যা করা হয়েছে; কিন্তু হত্যার সময় এবং ঘটনাস্থল বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য তুলে ধরেছেন এ সাক্ষী। এ সাক্ষীর বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার যে, ইব্রাহিমকে নলবুনিয়ায় হত্যা করেছে রাজাকার বাহিনী, পাড়ের হাটে নয়। হত্যার সময় অক্টোবর মাস, জুন মাস নয়। এরপর ইব্রাহিম হত্যা বিষয়ে আসামিপক্ষের ৭ এবং ১১ নম্বর সাক্ষীর জবানবন্দিও পড়ে শোনানো হয়।
সাত নম্বর সাক্ষী জামাল হোসেন ফকির বলেছেন, আমার বাড়ি পিরোজপুর জেলার নলবুনিয়া গ্রামে অবস্থিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আমি আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাত্রের প্রথম ভাগে বিলে বঁড়শি পেতে আসি। রাত্রের শেষ ভাগে আমি নৌকা নিয়ে বঁড়শি তুলে বাড়ির কাছাকাছি আসলে বিশাল একটা শব্দ শুনতে পাই। শব্দ শুনে আমি খেয়াল করি আমার পাশ লাগানো আজহার আলী হাওলাদারের বাড়িতে কান্নাকাটির শব্দ শোনা যায়। আমি ঘরে চলে আসি। আমার আব্বা বলেন, আজহার মামার বাড়ি বড় একটা শব্দ শোনা গেছে এবং কান্নাকাটিরও শব্দ শোনা যাচ্ছে। চলো গিয়ে দেখে আসি। আজহার আলীর বাড়ির উঠানের মাঝ বরাবর পূর্বদিকের গাছের আড়ালে গিয়ে দেখি ইব্রাহিম কুট্টির লাশ আইয়ুব আলী চৌকিদার, কালাম চৌকিদার, হাকিম মুন্সি, মান্নান ও আশরাফ আলী খালের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তার পিছে দানেশ মোল্লা, সেকান্দার শিকদার, মোসলেম মওলানা, রুহুল আমিন, মোমিনরা মিলে সাহেব আলীকে পিছমোড়া দিয়ে বেঁধে তার মাকেসহ পাড়ের হাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সামনে এগিয়ে দেখি ইব্রাহিম কুট্টির লাশ নৌকায় তুলে পাড়ের হাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সাহেব আলীদের ঘরে চলে আসি। ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতেছে এবং তার হাত দিয়ে রক্ত বেয়ে পড়ছে। তার বোন রানী বেগম মমতাজের হাত বেঁধে দিচ্ছে দেখি। তখন আমি ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগমকে জিজ্ঞাসা করলাম, ফুফু তোমার কী হয়েছে? তখন মমতাজ বেগম উত্তর দেয়, যে গুলিতে ইব্রাহিম কুট্টি মারা গেছে সেই গুলি তার হাতেও লেগেছে, লাঠি দিয়ে তার আব্বার গায়েও আঘাত করেছে। ওইখানে তখন পাড়া-প্রতিবেশী অনেক লোকজন জমায়েত হয়। আমরা বাড়িতে চলে যাই। বিকালে শুনতে পাই যে, সাহেব আলী ও তার আম্মাকে পিরোজপুরে নিয়ে গেছে। ইব্রাহিম কুট্টির লাশ পাড়ের হাট বাদুরা পোলের সাথে নৌকায় বেঁধে রেখেছে। তার পরদিন বেলা এগারোটার দিকে শুনতে পাই যে, সাহেব আলীর আম্মা বাড়িতে ফিরেছে। তারপর আমরা তাদের বাড়িতে যাই। জিজ্ঞাসা করি বুয়া (সাহেব আলীর আম্মা) আপনি এসেছেন, সাহেব আলী চাচা কই? তারপর সে বলে যে, পিরোজপুর নিয়া সাহেব আলীকে মিলিটারিরা গুলি করে মারছে। এর কিছুদিন পর দেশ স্বাধীন হয়। দেশ স্বাধীনের পাঁচ-ছয় মাস পর মমতাজ বেগম ভাই এবং স্বামী হত্যার মামলা করে।
মাওলানা সাঈদীর পক্ষে ১১ নম্বর সাক্ষী গোলাম মোস্তফা ট্রাইব্যুনালে বলেছেন, আমার গ্রাম নলবুনিয়া, থানা জিয়ানগর, জেলা- পিরোজপুর। বর্তমানে আমি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১ অক্টোবর আমার গ্রাম নলবুনিয়ায় আজাহার আলী হাওলাদারের বাড়িতে একটি ঘটনা ঘটে। ওইদিন ফজরের আজানের পূর্বমুহূর্তে এক প্রচণ্ড শব্দ শুনে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম থেকে ওঠার পরেই মসজিদে আজান হলে মসজিদে নামাজ পড়তে যাই। নামাজের পরে মুসল্লিদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হতে থাকে যে, আজানের আগে কোথায় এই প্রচণ্ড শব্দটি হলো। এই আলাপ-আলোচনা করতে করতে আমরা মসজিদের সামান্য দূরে খালের পাড়ের রাস্তায় আসি। একটু পরেই দেখতে পাই যে, উত্তর দিক থেকে দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেম মাওলানা, সেকেন্দার শিকদার, রুহুল আমীন, মোমিন, আজহার আলী হাওলাদারের ছেলে সাবেহ আলী এবং তার মাকে নিয়ে পাড়ের হাটের দিকে যাচ্ছে। তার ৫-৭ মিনিট পর নৌকায় করে আইউব আলী চৌকিদার, কালাম চৌকিদার, হামিক মুন্সী, আবদুল মান্নান, আশরাফ আলী মিলে আজহার আল হাওলাদারের জামাই ইব্রাহিম কুট্টির লাশ নিয়ে যাচ্ছে। এরপর আমরা কায়েকজন আজহার হাওলাদারের বাড়ি যাই। সেখানে গিয়ে বাড়িভর্তি মানুষ এবং ঘরে কান্নার রোল শুনতে পাই। লোকজন বলাবলি করছে আজহার হাওলাদারের জামাইকে (ইব্রাহিম কুট্টি) মেরে ফেলেছে। আজহার আলীর স্ত্রী এবং ছেলেকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে গেছে। আজাহরকেও মেরেছে। লোকজন বলল ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যার সময় তার স্ত্রী মমতাজের হাতেও গুলি লাগে। মমতাজকেও জিজ্ঞাসা করায় সেও তাই জানাল। এরপর আমরা সেখান থেকে চলে আসি, বিকালের দিকে শুনি সাহেব আলীকে এবং তার মাকে রাজাকাররা পিরোজপুরে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে গেছে। পরের দিন শুনি সাহেব আলীর মা সেতারা বেগম ফিরে এসেছে এবং সাহেব আলীকে পাকিস্তানি বাহিনী পিরোজপুরে গুলি করে মেরেছে।
এর আগে সকালে আট নম্বর অভিযোগ বিষয়ে আগের দিন উপস্থাপিত যুক্তির ধারাবাহিকতায় সাত নম্বর সাক্ষী মফিজ উদ্দিন পসারির সাক্ষ্য খণ্ডন করে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মফিজ উদ্দিন যে জবানবন্দি দিয়েছেন তার একটি কথাও তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে বলেননি।
সকালে মহিষ চরাতে যাওয়ার কথা, সকাল ১০টা-১১টার দিকে গরু আতালে নিয়ে আসার কথা, দেলু শিকদার কর্তৃক থাবা দিয়ে ইব্রাহিম কুট্টির চুল ধরে গালি দেয়ার কথা, তাকে ও ইব্রাহিম কুট্টিকে এক দড়িতে বেঁধে রাখা, ইব্রাহিম কুট্টিকে ২-৪টি ঘা গুঁতা মারা, মা বলে চিত্কার শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখি ইব্রাহিমকে গুলি করছে। এরপর লাথি মেরে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া, ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে দানেশ মোল্লা ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেয়ার তার ঠোঁট কেটে যাওয়া এবং দাঁত ভেঙে যাওয়া, ক্যাম্পে রাজ্জাক রাজাকার কর্তৃক তাকে ভাত খাবা বলে জিজ্ঞেস করা, তারপর প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার কথা বলার পর রাজ্জাক রাজাকার তাকে নিয়ে বাইরে যাওয়া এবং তখন নদী পার হয়ে পালিয়ে যাওয়া, এরপর ফজরের সময় মানিক পসারীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তাকে সব ঘটনা খুলে বলার কথা তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে বলেননি।
অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান বলেন, মানিক পসারী পিরোজপুরে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যে মামলা করেছেন ২০০৯ সালে তাতে মফিজকে নির্যাতন বিষয়ে একটি শব্দও উল্লেখ নেই এবং মফিজকে সে মামলায় সাক্ষীও করা হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের সাত নং সাক্ষী মফিজউদ্দিন এ মামলায় একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ৬নং সাক্ষী মানিক পসারীদের বাড়িতে সে কাজ করত। মানিক পসারীর বাড়ি থেকে অপর কাজের লোক ইব্রাহিম কুট্টির সঙ্গে তাকেও ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা করা হলেও সে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয় ক্যাম্প থেকে। ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা ঘটনা বিষয়ে তার ওপর নির্যাতনের ঘটনাও জড়িত এবং সে এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী দাবিদার। কিন্তু একই ঘটনায় এরকম একজন ব্যক্তিকে মানিক পসারী তার পিরোজপুরের মামলায় সাক্ষী করেনি এবং তার বিষয়ে মামলায় কিছু উল্লেখও করেনি।
শুধু তাই নয়, মফিজউদ্দিন পিরোজপুর মেজিস্ট্রেটের কাছে যে জবানবন্দি দিয়েছেন তার সঙ্গে কোনো মিল নেই তার ট্রাইব্যুনালে প্রদত্ত জবানবন্দির সঙ্গে বলে আদালতকে জানান আইনজীবী। মানিক পসারীর মামলায় মফিজউদ্দিন পিরোজপুর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যে জবানবন্দি প্রদান করেন তা আদালতে তুলে ধরা হয়। আমি ১৯৭১ সালে মুুক্তিযুদ্ধের সময় মানিক পসারীর বাবা সইজুদ্দীন পসারির বাড়িতে গরু-মহিষ চরানোর কাজ করতাম। আমার সঙ্গে ইব্রাহিমও কাজ করত। একদিন পাক বাহিনীর লোকজন, মিলিটারি, দানেশ মোল্লা, সেকেন্দার সিকদার ও দেলোয়ার আসে। এসে সইজুদ্দিন ও রইজুদ্দিনকে খোঁজ করে। তাদের না পেয়ে বাড়িঘরে আগুন দেয়। এতে আনুমানিক লাখ টাকার ক্ষতি হয়। আমাকে ও ইব্রাহিমকে মিলিটারি, সেকেন্দার সিকদার ও দানেশ মোল্লা নিয়ে যায়। আমি রাতে পালায় আসি। ইব্রাহিমকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে শুনি ইব্রাহিম মারা গেছে। কিন্তু কে মেরেছে দেখিনি এবং জানি না। পিরোজপুরে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এ কথা বলেছেন কিন্তু একই ঘটনা বিষয়ে তিনি ট্রাইব্যুনালে নিম্নরূপ জবানবন্দি দিয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালে মফিজ উদ্দিন তার সাক্ষ্যে বলেন, ১৯৭১ সালের ৮ মে সকালে গরু মহিষ নিয়ে চরে যাই। সঙ্গে ইব্রাহিম কুট্টিও ছিল। কিন্তু আনুমানিক ১০-১১টার দিকে চরে বসে বসে মামার বাড়িতে আগুন এবং ধোয়া দেখতে পাই। তারপর মামার বাড়ির দিকে ফিরে আসি। ১২-১৪ জন পাক আর্মি, ২০-২২ জন রাজাকার মামার বাড়ি যাচ্ছে দেখতে পাই। তার মধ্যে দিলু শিকদার ছিল। আমরা পালাতে চাইলে পাক আর্মি ধরে ফেলে। দিলু শিকদার ইব্রাহিমের চুল ধরে বলে ‘শুয়ারের বাচ্চা যাচ্ছ কোথায়’। রাজাকার মবিন, রাজ্জাক আরও কয়েকজন আমাদের দুজনকে এক দড়িতে বাঁধে। এরপর রাজাকাররা ঘরে ঢুকে লুটপাট করে এবং কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেকেন্দার শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মবিন, রাজ্জাক দিলু শিকদারসহ আরও অনেক রাজাকার তেল ছিটিয়ে ঘরে আগুন দিতে বলে। তারপর আমাদের দুজনকে পারেরহট বাজারে নিয়ে যায়। বাজারের মধ্যে ব্রিজের মাঝখানে নিয়ে ইব্রাহিমকে জিজ্ঞেস করে সইজুদ্দীন পসারী, মানিক পসারী কোথায় থাকে। তুই তো সইজুদ্দীনের বডি গার্ড । তুই জানিস তারা কোথায়। না বললে তোকে গুলি করব। এরপর পুল থেকে নামিয়ে দিলু শিকদার (তাদের ভাষায় দিলু শিকদার মানে মাওলানা সাঈদী) সেকেন্দার শিকাদর উর্দুতে কি যেন বলল। আমি উর্দু বুঝি না এবং কি বলেছিল তা শুনতে পাইনি। এরপর ইব্রাহিমকে দড়ি থেকে খুলে ছেড়ে দিল এবং আমাকে নিয়ে সামনের দিকে গেল। তারপর গুলির শব্দ শুনতে পাই। ইব্রাহিম মা বলে চিত্কার করে। পেছনে তাকিয়ে দেখি ইব্রাহিমকে গুলি করছে। সেনাবাহিনী লাথি মেরে লাশ নদীতে ফেলে দিল। তারপর আমাকে নিয়ে পারেরহাট রাজাকার ক্যাম্পে গেল। সইজুদ্দীন পসারী এবং মানিক পসারীর নাম জানার জন্য অনেক অত্যাচার করল দানেশ আলী মোল।লা, সেকেন্দার শিকদার, দেলু শিকদার মবিন রাজাকার। এর একপর্যায়ে রাতে বাথরুমে যাওযার কথা বললে আমাকে রাজ্জাক রাজকার বাইরে নিয়ে যায় এবং এ সময় আমি নদী পার হয়ে পালিয়ে আসি।
মফিজউদ্দিন ট্রাইব্যুনালে উপরোক্ত সাক্ষ্য দিলেও তিনি ট্রাইবু্যুনালে এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দি দিয়েছেন তার সঙ্গে আবার এ বক্তব্যের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ইব্রাহিম কুট্টিকে পাড়েরহাটে হত্যার ঘটনা দেখার কথা তিনি পিরোজপুরেও বলেননি এবং এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকেও বলেননি। এ সময় একজন বিচারপতি বলেন, বরং পিরোজপুরে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তিনি পজিটিভ জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইব্রাহিম কুট্টিকে কে মেরেছে তা তিনি জানেন না। দ্যাট ইজ ভেরি ইমপরটেম্লট।
অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, চার্জে ঘটনার সময় উল্লেখ আছে ৩টা। কিন্তু মফিজ উদ্দিন বলেছেন ১০-১১টার দিকে তিনি মানিক পসারীর বাড়িতে ধোয়া উড়তে দেখেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের ছয় নং সাক্ষী মানিক পসারী বলেছেন, ঘটনার দিন রাত দেড়টার দিকে মফিজ পালিয়ে তার কাছে আসে। তিনি তখন মফিজের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন। পরে তাকে সেবা শুশ্রূষা করেন। অপরদিকে মফিজ বলেছেন, রাতে পালিয়ে এসে মানিক পসারির বাড়িতে কাউকে তিনি পাননি। জঙ্গলে বাকি রাত পার করেন। ফজরের সময় মানিক পসারি জঙ্গলে তার কাছে আসে দেখা করার জন্য। এরপর আট নং অভিযোগ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আট নম্বর সাক্ষী মোস্তফা হাওলাদারের সাক্ষ্য খণ্ডন করে যুক্তি পেশ করেন অ্যাডভোকেট শাহজাহান। তিনি বলেন, অন্য সাক্ষীরা বলেছেন ইব্রাহিম ও মফিজকে প্রথমে পাড়েরহাট বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ইব্রাহিমকে হত্যার পর মফিজকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু আট নং সাক্ষী বলেছেন প্রথমে দুজনকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় পরে কুট্টিকে পাড়ের হাট ব্রিজের কাছে আনা হয়। জেরায় মোস্তফা হাওলাদারকে সাজেশন দিয়ে বলা হয় একই দড়িতে দুজনকে বাঁধা, লাথি মেরে ইব্রাহীমের লাশ নদীতে ফেলে দেয়ার কথা আপনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বলেননি। মোস্তফা হাওলদার জবাব দেন তিনি বলেছেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে জেরায় প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান একথা মোস্তফা হাওলাদার তাকে বলেননি। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের নয় নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়ে যুক্তি পেশ করা হয়। আট নম্বর অভিযোগ বিষয়ে নয় নম্বর সাক্ষী বলেছেন পাড়েরহাট ও আশপাশের এলাকায় যেসব লুটপাট, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে তা সবাই হয়েছে মাওলানা সাঈদীর নেতৃত্বে। ট্রাইব্যুনাল রায়ে নয় নং সাক্ষীর এ কথাটা আমলে নিয়েছে কিন্তু এই কথাটা আবার সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বলেননি।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষের ১০ নম্বর সাক্ষী বাসুদেব মিস্ত্রির সাক্ষ্য বিষয়ে যুক্তি পেশ করা হয়। অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, সাক্ষী বলেছেন, সাক্ষীর তার জবানবন্দিতে জানিয়েছেন তার বাবা তখন মানিক পসারীর বাড়িতে কাঠ মিস্ত্রির কাজ করত। সেও তার বাবার সঙ্গে জোগালির কাজ করত। ঘটনার দিন খুব সকালে সে তার বাবার সঙ্গে মানিক পসারীর বাড়িতে আসে। সাক্ষী জানায় সকাল ৮-৯টার দিকে আর্মি আসার ঘটনায় বাড়ির সব লোকজন পালিয়ে যায়। অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, সকাল ৮-৯টার দিকে বাড়ির সব লোকজন পালিয়ে গেল। ঘটনা ঘটল বিকাল তিনটায়। সাক্ষী দাবি করেছেন তিনি বাড়ি লুটপাট, আগুন দেয়া, ইব্রাহিম ও মাফিজকে বেঁধে নিয়ে যাওয়া এবং হত্যার ঘটনা দেখেছেন। এ ঘটনা দেখতে হলে তাকে তিনটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। প্রশ্ন হলো বাড়ির সব লোক যখন পালিয়ে গেল তখন একজন কাঠ মিস্ত্রি কেন সেখানে এত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন? এটা মানুষের স্বাভাবিক স্বভাবের বিরুদ্ধ আচরণ এবং এটা অসম্ভব ও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তদুপরি তিনি একজন হিন্দু। তখনকার পরিস্থিতিতে পাকিস্তান আর্মি আসায় সবাই পালিয়ে গেল আর তিনি একজন হিন্দু যুবক হয়েও সেখানে অবস্থান করার দাবি সে সময়কার বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। তাছাড়া বাসুদেব পিরোজপুর মামলায় একজন সাক্ষী এবং সেখানে তিনি তার জবানবন্দিতে বলেছেন ইব্রাহিমকে কে গুলি করেছে তা তিনি দেখেননি। তিনি একথা শুনেছেন। সুতরাং এ সাক্ষী কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নয়। রাষ্ট্রপক্ষের ১১ নম্বর সাক্ষী আবদুল জলিল শেখ সাক্ষ্য দেয়ার এক বছর আগে থেকে একটি খামার একটি বাড়ি প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন। তার প্রথম স্ত্রীর নাম সখিনা। তৃতীয় স্ত্রীর নাম ফিরোজা। দ্বিতীয় স্ত্রী গোলেনুর তার বিরুদ্ধে যৌতুক মামলা করলে পরে সমঝোতা হয়। কিন্তু পরে গোলেনুর আবার স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে গলায় ছুরি চালিয়ে হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগে। এ কারণে সে তখন সাত মাস হাজত খাটে। পরে আপস রফায় মামলা নিষ্পত্তি হয় বলে ট্রাইব্যুনালে জানিয়েছে সে। সাক্ষী বিষয়ে এ তথ্য উপস্থাপনের সময় একজন বিচারপতি বলেন মামলা ফেস করা এবং হাজতবাস মানেই দোষীসাব্যস্ত হওয়া নয়। কারও বিরুদ্ধে মামলা থাকতেই পারে। কাজেই এসব বিষয় না বলাই ভালো।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ১১নং সাক্ষী আবদুল জলিল শেখ বলেছেন তিনি মানিক পসারীর বাড়িতে আগুন দেয়ার দিন মানিক পসারীর ভাই আলমগীর শেখসহ অন্যদের বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে দেখেছেন। কিন্তু মানিক পসারী জানিয়েছেন আলমগীর পসারি তার থেকে ৩০ বছরের ছোট। ১৯৭১ সালে মানিক পসারীর বয়স ছিল ২৭ বছর। সে হিসেবে আলমগীর পসারীর তখন জন্মই হয়নি। কাজেই তাকে দেখার কথা মিথ্যা।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে আট নং অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষের ১২নং সাক্ষীর ওপরও নির্ভর করেছেন। কিন্তু ১২নং সাক্ষী এমপি আবদুল আউয়াল ৮নং অভিযোগ বিষয়ে কিছুই বলেননি। ৮নং অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে কেন তার ওপরও নির্ভর করল তা আমরা বুঝতে পারছি না।
শুনানি আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান, প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলীসহ আসামি পক্ষে অন্যদের মধ্যে ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, আসামিপক্ষের তিনজন সাক্ষী যাথা ২, ৭ ও ১১ নম্বর সাক্ষী তাদের সাক্ষ্যে বলেছেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইব্রাহিম কুট্টিকে নলবুনিয়া গ্রামে তার শ্বশুরবাড়িতে রাতের প্রথম ভাগে রাজাকাররা গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় স্বাধীনতার কয়েক মাস পর ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম বাদী হয়ে একটি হত্যামামলা দায়ের করেন।
আইনজীবী বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ১৯৭১ সালের ৮ মে চিতলিয়া গ্রামের মানিক পসারির বাড়ি থেকে ইব্রাহিম কুট্টিকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে পাকসেনারা তাকে গুলি করে হত্যা করে যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
এস এম শাহজাহান বলেন, ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং আসামিপক্ষের তিন সাক্ষীর সাক্ষ্যে ঘটনার স্থান এবং তারিখের মধ্যে বিরাট তফাত দেখা যায়। আসামিপক্ষের সাক্ষ্যে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে এসেছে বলে তিনি দাবি করেন।
গতকাল বুধবার প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বিচারপতির আপিল বেঞ্চে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা), আবদুল ওয়াহ্হাব মিয়া, হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
গতকাল আইনজীবী এস এম শাহজাহান, আসামিপক্ষের ২ নম্বর সাক্ষীর জবানবন্দি পড়ে শোনান আদালতে। ২ নম্বর সাক্ষী আবদুর রাজ্জাক তার জবানবন্দিতে বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন আমাদের নলবুনিয়ায় একটি ঘটনাই ঘটেছে। আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি হঠাত্ একদিন শেষরাতে একটি আওয়াজ হয়। আমি অনুমান করলাম এটা গুলির আওয়াজ। তারপর দেখি যে, ফজরের টাইম হয়ে গেছে। আমি আজান দিয়া নামাজ পড়ি। নামাজ পড়ার পর উত্তরদিকে রাস্তার পাশে যাই কোথায় কী হয়েছে জানার জন্য। তখন গিয়ে দেখি উত্তর দিক থেকে সামনের খাল দিয়ে নৌকায় করে ইব্রাহিম কুট্টির লাশ নিয়ে পাড়ের হাটের দিকে আসতেছে। নৌকায় কালাম চৌকিদার, আইয়ুব আলী চৌকিদার এবং হাকিম মুন্সিকে দেখি। এরপর দেখি আরও কয়েকজন লোক খালের পাড় দিয়ে উত্তর দিক থেকে আসতেছে। যেসব লোক আসতেছে তাদের মধ্যে দানেশ মোল্লা, সেকেন্দার শিকদার, মোসলেম মাওলানা, রুহুল আমিন, মোমিন রাজাকার ছিল। আরও দেখি উক্ত লোকেরা আজু হাওলাদারের বউ এবং তার ছেলে সাহেব আলীকে বেঁধে নিয়ে আসতেছে এবং পাড়ের হাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তার পরদিন শুনি আজু হাওলাদারের বউ বাড়িতে আসে এবং সাহেব আলীকে পিরোজপুরে নিয়ে পাকসেনারা গুলি করে হত্যা করেছে।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, এ সাক্ষী ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা বিষয়ে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছেন। ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল তার ওপর নির্ভর করেছে; কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ চুপ থেকেছে। আসামিপক্ষের সাক্ষীও তো সাক্ষী এবং তার দেয়া এভিডেন্সও এভিডেন্স। তার দেয়া তথ্যও বিবেচনার দাবি রাখে; কিন্তু তা করা হয়নি রায়ের ক্ষেত্রে। এ সময় একজন বিচারপতি বলেন, ইব্রাহিমকে যে হত্যা করা হয়েছে সেটা নেয়া হয়েছে এ সাক্ষীর মাধ্যমে। তখন অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ইব্রাহিমকে হত্যা করা হয়েছে; কিন্তু হত্যার সময় এবং ঘটনাস্থল বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য তুলে ধরেছেন এ সাক্ষী। এ সাক্ষীর বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার যে, ইব্রাহিমকে নলবুনিয়ায় হত্যা করেছে রাজাকার বাহিনী, পাড়ের হাটে নয়। হত্যার সময় অক্টোবর মাস, জুন মাস নয়। এরপর ইব্রাহিম হত্যা বিষয়ে আসামিপক্ষের ৭ এবং ১১ নম্বর সাক্ষীর জবানবন্দিও পড়ে শোনানো হয়।
সাত নম্বর সাক্ষী জামাল হোসেন ফকির বলেছেন, আমার বাড়ি পিরোজপুর জেলার নলবুনিয়া গ্রামে অবস্থিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আমি আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাত্রের প্রথম ভাগে বিলে বঁড়শি পেতে আসি। রাত্রের শেষ ভাগে আমি নৌকা নিয়ে বঁড়শি তুলে বাড়ির কাছাকাছি আসলে বিশাল একটা শব্দ শুনতে পাই। শব্দ শুনে আমি খেয়াল করি আমার পাশ লাগানো আজহার আলী হাওলাদারের বাড়িতে কান্নাকাটির শব্দ শোনা যায়। আমি ঘরে চলে আসি। আমার আব্বা বলেন, আজহার মামার বাড়ি বড় একটা শব্দ শোনা গেছে এবং কান্নাকাটিরও শব্দ শোনা যাচ্ছে। চলো গিয়ে দেখে আসি। আজহার আলীর বাড়ির উঠানের মাঝ বরাবর পূর্বদিকের গাছের আড়ালে গিয়ে দেখি ইব্রাহিম কুট্টির লাশ আইয়ুব আলী চৌকিদার, কালাম চৌকিদার, হাকিম মুন্সি, মান্নান ও আশরাফ আলী খালের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তার পিছে দানেশ মোল্লা, সেকান্দার শিকদার, মোসলেম মওলানা, রুহুল আমিন, মোমিনরা মিলে সাহেব আলীকে পিছমোড়া দিয়ে বেঁধে তার মাকেসহ পাড়ের হাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সামনে এগিয়ে দেখি ইব্রাহিম কুট্টির লাশ নৌকায় তুলে পাড়ের হাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সাহেব আলীদের ঘরে চলে আসি। ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতেছে এবং তার হাত দিয়ে রক্ত বেয়ে পড়ছে। তার বোন রানী বেগম মমতাজের হাত বেঁধে দিচ্ছে দেখি। তখন আমি ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগমকে জিজ্ঞাসা করলাম, ফুফু তোমার কী হয়েছে? তখন মমতাজ বেগম উত্তর দেয়, যে গুলিতে ইব্রাহিম কুট্টি মারা গেছে সেই গুলি তার হাতেও লেগেছে, লাঠি দিয়ে তার আব্বার গায়েও আঘাত করেছে। ওইখানে তখন পাড়া-প্রতিবেশী অনেক লোকজন জমায়েত হয়। আমরা বাড়িতে চলে যাই। বিকালে শুনতে পাই যে, সাহেব আলী ও তার আম্মাকে পিরোজপুরে নিয়ে গেছে। ইব্রাহিম কুট্টির লাশ পাড়ের হাট বাদুরা পোলের সাথে নৌকায় বেঁধে রেখেছে। তার পরদিন বেলা এগারোটার দিকে শুনতে পাই যে, সাহেব আলীর আম্মা বাড়িতে ফিরেছে। তারপর আমরা তাদের বাড়িতে যাই। জিজ্ঞাসা করি বুয়া (সাহেব আলীর আম্মা) আপনি এসেছেন, সাহেব আলী চাচা কই? তারপর সে বলে যে, পিরোজপুর নিয়া সাহেব আলীকে মিলিটারিরা গুলি করে মারছে। এর কিছুদিন পর দেশ স্বাধীন হয়। দেশ স্বাধীনের পাঁচ-ছয় মাস পর মমতাজ বেগম ভাই এবং স্বামী হত্যার মামলা করে।
মাওলানা সাঈদীর পক্ষে ১১ নম্বর সাক্ষী গোলাম মোস্তফা ট্রাইব্যুনালে বলেছেন, আমার গ্রাম নলবুনিয়া, থানা জিয়ানগর, জেলা- পিরোজপুর। বর্তমানে আমি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১ অক্টোবর আমার গ্রাম নলবুনিয়ায় আজাহার আলী হাওলাদারের বাড়িতে একটি ঘটনা ঘটে। ওইদিন ফজরের আজানের পূর্বমুহূর্তে এক প্রচণ্ড শব্দ শুনে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম থেকে ওঠার পরেই মসজিদে আজান হলে মসজিদে নামাজ পড়তে যাই। নামাজের পরে মুসল্লিদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হতে থাকে যে, আজানের আগে কোথায় এই প্রচণ্ড শব্দটি হলো। এই আলাপ-আলোচনা করতে করতে আমরা মসজিদের সামান্য দূরে খালের পাড়ের রাস্তায় আসি। একটু পরেই দেখতে পাই যে, উত্তর দিক থেকে দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেম মাওলানা, সেকেন্দার শিকদার, রুহুল আমীন, মোমিন, আজহার আলী হাওলাদারের ছেলে সাবেহ আলী এবং তার মাকে নিয়ে পাড়ের হাটের দিকে যাচ্ছে। তার ৫-৭ মিনিট পর নৌকায় করে আইউব আলী চৌকিদার, কালাম চৌকিদার, হামিক মুন্সী, আবদুল মান্নান, আশরাফ আলী মিলে আজহার আল হাওলাদারের জামাই ইব্রাহিম কুট্টির লাশ নিয়ে যাচ্ছে। এরপর আমরা কায়েকজন আজহার হাওলাদারের বাড়ি যাই। সেখানে গিয়ে বাড়িভর্তি মানুষ এবং ঘরে কান্নার রোল শুনতে পাই। লোকজন বলাবলি করছে আজহার হাওলাদারের জামাইকে (ইব্রাহিম কুট্টি) মেরে ফেলেছে। আজহার আলীর স্ত্রী এবং ছেলেকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে গেছে। আজাহরকেও মেরেছে। লোকজন বলল ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যার সময় তার স্ত্রী মমতাজের হাতেও গুলি লাগে। মমতাজকেও জিজ্ঞাসা করায় সেও তাই জানাল। এরপর আমরা সেখান থেকে চলে আসি, বিকালের দিকে শুনি সাহেব আলীকে এবং তার মাকে রাজাকাররা পিরোজপুরে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে গেছে। পরের দিন শুনি সাহেব আলীর মা সেতারা বেগম ফিরে এসেছে এবং সাহেব আলীকে পাকিস্তানি বাহিনী পিরোজপুরে গুলি করে মেরেছে।
এর আগে সকালে আট নম্বর অভিযোগ বিষয়ে আগের দিন উপস্থাপিত যুক্তির ধারাবাহিকতায় সাত নম্বর সাক্ষী মফিজ উদ্দিন পসারির সাক্ষ্য খণ্ডন করে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মফিজ উদ্দিন যে জবানবন্দি দিয়েছেন তার একটি কথাও তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে বলেননি।
সকালে মহিষ চরাতে যাওয়ার কথা, সকাল ১০টা-১১টার দিকে গরু আতালে নিয়ে আসার কথা, দেলু শিকদার কর্তৃক থাবা দিয়ে ইব্রাহিম কুট্টির চুল ধরে গালি দেয়ার কথা, তাকে ও ইব্রাহিম কুট্টিকে এক দড়িতে বেঁধে রাখা, ইব্রাহিম কুট্টিকে ২-৪টি ঘা গুঁতা মারা, মা বলে চিত্কার শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখি ইব্রাহিমকে গুলি করছে। এরপর লাথি মেরে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া, ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে দানেশ মোল্লা ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেয়ার তার ঠোঁট কেটে যাওয়া এবং দাঁত ভেঙে যাওয়া, ক্যাম্পে রাজ্জাক রাজাকার কর্তৃক তাকে ভাত খাবা বলে জিজ্ঞেস করা, তারপর প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার কথা বলার পর রাজ্জাক রাজাকার তাকে নিয়ে বাইরে যাওয়া এবং তখন নদী পার হয়ে পালিয়ে যাওয়া, এরপর ফজরের সময় মানিক পসারীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তাকে সব ঘটনা খুলে বলার কথা তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে বলেননি।
অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান বলেন, মানিক পসারী পিরোজপুরে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যে মামলা করেছেন ২০০৯ সালে তাতে মফিজকে নির্যাতন বিষয়ে একটি শব্দও উল্লেখ নেই এবং মফিজকে সে মামলায় সাক্ষীও করা হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের সাত নং সাক্ষী মফিজউদ্দিন এ মামলায় একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ৬নং সাক্ষী মানিক পসারীদের বাড়িতে সে কাজ করত। মানিক পসারীর বাড়ি থেকে অপর কাজের লোক ইব্রাহিম কুট্টির সঙ্গে তাকেও ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা করা হলেও সে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয় ক্যাম্প থেকে। ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা ঘটনা বিষয়ে তার ওপর নির্যাতনের ঘটনাও জড়িত এবং সে এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী দাবিদার। কিন্তু একই ঘটনায় এরকম একজন ব্যক্তিকে মানিক পসারী তার পিরোজপুরের মামলায় সাক্ষী করেনি এবং তার বিষয়ে মামলায় কিছু উল্লেখও করেনি।
শুধু তাই নয়, মফিজউদ্দিন পিরোজপুর মেজিস্ট্রেটের কাছে যে জবানবন্দি দিয়েছেন তার সঙ্গে কোনো মিল নেই তার ট্রাইব্যুনালে প্রদত্ত জবানবন্দির সঙ্গে বলে আদালতকে জানান আইনজীবী। মানিক পসারীর মামলায় মফিজউদ্দিন পিরোজপুর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যে জবানবন্দি প্রদান করেন তা আদালতে তুলে ধরা হয়। আমি ১৯৭১ সালে মুুক্তিযুদ্ধের সময় মানিক পসারীর বাবা সইজুদ্দীন পসারির বাড়িতে গরু-মহিষ চরানোর কাজ করতাম। আমার সঙ্গে ইব্রাহিমও কাজ করত। একদিন পাক বাহিনীর লোকজন, মিলিটারি, দানেশ মোল্লা, সেকেন্দার সিকদার ও দেলোয়ার আসে। এসে সইজুদ্দিন ও রইজুদ্দিনকে খোঁজ করে। তাদের না পেয়ে বাড়িঘরে আগুন দেয়। এতে আনুমানিক লাখ টাকার ক্ষতি হয়। আমাকে ও ইব্রাহিমকে মিলিটারি, সেকেন্দার সিকদার ও দানেশ মোল্লা নিয়ে যায়। আমি রাতে পালায় আসি। ইব্রাহিমকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে শুনি ইব্রাহিম মারা গেছে। কিন্তু কে মেরেছে দেখিনি এবং জানি না। পিরোজপুরে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এ কথা বলেছেন কিন্তু একই ঘটনা বিষয়ে তিনি ট্রাইব্যুনালে নিম্নরূপ জবানবন্দি দিয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালে মফিজ উদ্দিন তার সাক্ষ্যে বলেন, ১৯৭১ সালের ৮ মে সকালে গরু মহিষ নিয়ে চরে যাই। সঙ্গে ইব্রাহিম কুট্টিও ছিল। কিন্তু আনুমানিক ১০-১১টার দিকে চরে বসে বসে মামার বাড়িতে আগুন এবং ধোয়া দেখতে পাই। তারপর মামার বাড়ির দিকে ফিরে আসি। ১২-১৪ জন পাক আর্মি, ২০-২২ জন রাজাকার মামার বাড়ি যাচ্ছে দেখতে পাই। তার মধ্যে দিলু শিকদার ছিল। আমরা পালাতে চাইলে পাক আর্মি ধরে ফেলে। দিলু শিকদার ইব্রাহিমের চুল ধরে বলে ‘শুয়ারের বাচ্চা যাচ্ছ কোথায়’। রাজাকার মবিন, রাজ্জাক আরও কয়েকজন আমাদের দুজনকে এক দড়িতে বাঁধে। এরপর রাজাকাররা ঘরে ঢুকে লুটপাট করে এবং কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেকেন্দার শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মবিন, রাজ্জাক দিলু শিকদারসহ আরও অনেক রাজাকার তেল ছিটিয়ে ঘরে আগুন দিতে বলে। তারপর আমাদের দুজনকে পারেরহট বাজারে নিয়ে যায়। বাজারের মধ্যে ব্রিজের মাঝখানে নিয়ে ইব্রাহিমকে জিজ্ঞেস করে সইজুদ্দীন পসারী, মানিক পসারী কোথায় থাকে। তুই তো সইজুদ্দীনের বডি গার্ড । তুই জানিস তারা কোথায়। না বললে তোকে গুলি করব। এরপর পুল থেকে নামিয়ে দিলু শিকদার (তাদের ভাষায় দিলু শিকদার মানে মাওলানা সাঈদী) সেকেন্দার শিকাদর উর্দুতে কি যেন বলল। আমি উর্দু বুঝি না এবং কি বলেছিল তা শুনতে পাইনি। এরপর ইব্রাহিমকে দড়ি থেকে খুলে ছেড়ে দিল এবং আমাকে নিয়ে সামনের দিকে গেল। তারপর গুলির শব্দ শুনতে পাই। ইব্রাহিম মা বলে চিত্কার করে। পেছনে তাকিয়ে দেখি ইব্রাহিমকে গুলি করছে। সেনাবাহিনী লাথি মেরে লাশ নদীতে ফেলে দিল। তারপর আমাকে নিয়ে পারেরহাট রাজাকার ক্যাম্পে গেল। সইজুদ্দীন পসারী এবং মানিক পসারীর নাম জানার জন্য অনেক অত্যাচার করল দানেশ আলী মোল।লা, সেকেন্দার শিকদার, দেলু শিকদার মবিন রাজাকার। এর একপর্যায়ে রাতে বাথরুমে যাওযার কথা বললে আমাকে রাজ্জাক রাজকার বাইরে নিয়ে যায় এবং এ সময় আমি নদী পার হয়ে পালিয়ে আসি।
মফিজউদ্দিন ট্রাইব্যুনালে উপরোক্ত সাক্ষ্য দিলেও তিনি ট্রাইবু্যুনালে এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দি দিয়েছেন তার সঙ্গে আবার এ বক্তব্যের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ইব্রাহিম কুট্টিকে পাড়েরহাটে হত্যার ঘটনা দেখার কথা তিনি পিরোজপুরেও বলেননি এবং এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকেও বলেননি। এ সময় একজন বিচারপতি বলেন, বরং পিরোজপুরে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তিনি পজিটিভ জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইব্রাহিম কুট্টিকে কে মেরেছে তা তিনি জানেন না। দ্যাট ইজ ভেরি ইমপরটেম্লট।
অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, চার্জে ঘটনার সময় উল্লেখ আছে ৩টা। কিন্তু মফিজ উদ্দিন বলেছেন ১০-১১টার দিকে তিনি মানিক পসারীর বাড়িতে ধোয়া উড়তে দেখেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের ছয় নং সাক্ষী মানিক পসারী বলেছেন, ঘটনার দিন রাত দেড়টার দিকে মফিজ পালিয়ে তার কাছে আসে। তিনি তখন মফিজের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন। পরে তাকে সেবা শুশ্রূষা করেন। অপরদিকে মফিজ বলেছেন, রাতে পালিয়ে এসে মানিক পসারির বাড়িতে কাউকে তিনি পাননি। জঙ্গলে বাকি রাত পার করেন। ফজরের সময় মানিক পসারি জঙ্গলে তার কাছে আসে দেখা করার জন্য। এরপর আট নং অভিযোগ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আট নম্বর সাক্ষী মোস্তফা হাওলাদারের সাক্ষ্য খণ্ডন করে যুক্তি পেশ করেন অ্যাডভোকেট শাহজাহান। তিনি বলেন, অন্য সাক্ষীরা বলেছেন ইব্রাহিম ও মফিজকে প্রথমে পাড়েরহাট বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ইব্রাহিমকে হত্যার পর মফিজকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু আট নং সাক্ষী বলেছেন প্রথমে দুজনকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় পরে কুট্টিকে পাড়ের হাট ব্রিজের কাছে আনা হয়। জেরায় মোস্তফা হাওলাদারকে সাজেশন দিয়ে বলা হয় একই দড়িতে দুজনকে বাঁধা, লাথি মেরে ইব্রাহীমের লাশ নদীতে ফেলে দেয়ার কথা আপনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বলেননি। মোস্তফা হাওলদার জবাব দেন তিনি বলেছেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে জেরায় প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান একথা মোস্তফা হাওলাদার তাকে বলেননি। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের নয় নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়ে যুক্তি পেশ করা হয়। আট নম্বর অভিযোগ বিষয়ে নয় নম্বর সাক্ষী বলেছেন পাড়েরহাট ও আশপাশের এলাকায় যেসব লুটপাট, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে তা সবাই হয়েছে মাওলানা সাঈদীর নেতৃত্বে। ট্রাইব্যুনাল রায়ে নয় নং সাক্ষীর এ কথাটা আমলে নিয়েছে কিন্তু এই কথাটা আবার সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বলেননি।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষের ১০ নম্বর সাক্ষী বাসুদেব মিস্ত্রির সাক্ষ্য বিষয়ে যুক্তি পেশ করা হয়। অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, সাক্ষী বলেছেন, সাক্ষীর তার জবানবন্দিতে জানিয়েছেন তার বাবা তখন মানিক পসারীর বাড়িতে কাঠ মিস্ত্রির কাজ করত। সেও তার বাবার সঙ্গে জোগালির কাজ করত। ঘটনার দিন খুব সকালে সে তার বাবার সঙ্গে মানিক পসারীর বাড়িতে আসে। সাক্ষী জানায় সকাল ৮-৯টার দিকে আর্মি আসার ঘটনায় বাড়ির সব লোকজন পালিয়ে যায়। অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, সকাল ৮-৯টার দিকে বাড়ির সব লোকজন পালিয়ে গেল। ঘটনা ঘটল বিকাল তিনটায়। সাক্ষী দাবি করেছেন তিনি বাড়ি লুটপাট, আগুন দেয়া, ইব্রাহিম ও মাফিজকে বেঁধে নিয়ে যাওয়া এবং হত্যার ঘটনা দেখেছেন। এ ঘটনা দেখতে হলে তাকে তিনটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। প্রশ্ন হলো বাড়ির সব লোক যখন পালিয়ে গেল তখন একজন কাঠ মিস্ত্রি কেন সেখানে এত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন? এটা মানুষের স্বাভাবিক স্বভাবের বিরুদ্ধ আচরণ এবং এটা অসম্ভব ও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তদুপরি তিনি একজন হিন্দু। তখনকার পরিস্থিতিতে পাকিস্তান আর্মি আসায় সবাই পালিয়ে গেল আর তিনি একজন হিন্দু যুবক হয়েও সেখানে অবস্থান করার দাবি সে সময়কার বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। তাছাড়া বাসুদেব পিরোজপুর মামলায় একজন সাক্ষী এবং সেখানে তিনি তার জবানবন্দিতে বলেছেন ইব্রাহিমকে কে গুলি করেছে তা তিনি দেখেননি। তিনি একথা শুনেছেন। সুতরাং এ সাক্ষী কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নয়। রাষ্ট্রপক্ষের ১১ নম্বর সাক্ষী আবদুল জলিল শেখ সাক্ষ্য দেয়ার এক বছর আগে থেকে একটি খামার একটি বাড়ি প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন। তার প্রথম স্ত্রীর নাম সখিনা। তৃতীয় স্ত্রীর নাম ফিরোজা। দ্বিতীয় স্ত্রী গোলেনুর তার বিরুদ্ধে যৌতুক মামলা করলে পরে সমঝোতা হয়। কিন্তু পরে গোলেনুর আবার স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে গলায় ছুরি চালিয়ে হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগে। এ কারণে সে তখন সাত মাস হাজত খাটে। পরে আপস রফায় মামলা নিষ্পত্তি হয় বলে ট্রাইব্যুনালে জানিয়েছে সে। সাক্ষী বিষয়ে এ তথ্য উপস্থাপনের সময় একজন বিচারপতি বলেন মামলা ফেস করা এবং হাজতবাস মানেই দোষীসাব্যস্ত হওয়া নয়। কারও বিরুদ্ধে মামলা থাকতেই পারে। কাজেই এসব বিষয় না বলাই ভালো।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ১১নং সাক্ষী আবদুল জলিল শেখ বলেছেন তিনি মানিক পসারীর বাড়িতে আগুন দেয়ার দিন মানিক পসারীর ভাই আলমগীর শেখসহ অন্যদের বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে দেখেছেন। কিন্তু মানিক পসারী জানিয়েছেন আলমগীর পসারি তার থেকে ৩০ বছরের ছোট। ১৯৭১ সালে মানিক পসারীর বয়স ছিল ২৭ বছর। সে হিসেবে আলমগীর পসারীর তখন জন্মই হয়নি। কাজেই তাকে দেখার কথা মিথ্যা।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে আট নং অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষের ১২নং সাক্ষীর ওপরও নির্ভর করেছেন। কিন্তু ১২নং সাক্ষী এমপি আবদুল আউয়াল ৮নং অভিযোগ বিষয়ে কিছুই বলেননি। ৮নং অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে কেন তার ওপরও নির্ভর করল তা আমরা বুঝতে পারছি না।
শুনানি আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান, প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলীসহ আসামি পক্ষে অন্যদের মধ্যে ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন উপস্থিত ছিলেন।
Comments