ভালোবাসার একই ভাষা

অজন্তা চৌধুরী | আপডেট: ০০:০৫, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০১৪ প্রিন্ট সংস্করণ
জাপানি বাবা-মায়ের সঙ্গে স্বামীসহ লেখিকাকদিন পরই ভ্যালেন্টাইনস ডে। তাই আজ দুটি ভালোবাসার গল্প বলব। স্থান-কাল-পাত্র প্রথমে বলে নিই। স্থান হলো জাপান, কালটি হবে ১৯৯৮ থেকে আজ পর্যন্ত। আর পাত্র হলো জাপানিজ দুটি পরিবার। এবার একটু বিস্তারিত বলি।
মনোবুশো স্কলারশিপ নিয়ে জাপানে গিয়েছিলাম ১৯৯৮ সালের শেষের দিকে। হিরোশিমার কাছাকাছি ছোট্ট একটি শহর ওকায়ামা। এই ওকায়ামা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসের পিএইচডির জন্য দীর্ঘ পাঁচ বছরের যাত্রা। জীবনে প্রথমবারের মতো বাবা-মা, পরিবার ছেড়ে একা একা থাকা। স্বাধীনতার আনন্দের চেয়ে একাকিত্ব আর হোম সিকে ভুগছিলাম বেশি।
সারা দিন ল্যাবে নতুন কাজ, নতুন মানুষ আর নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর যখন চেষ্টা করছি, তখন একদিন বাংলাদেশ নিয়ে কিছু বলার জন্য একটি সেমিনারে ডাক পড়ল কুরাশিকি নামে একটি ছোট্ট শহরে। হলভর্তি বিভিন্ন বয়সী মানুষের সামনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বারবার চোখ ভিজে যাচ্ছে, কণ্ঠ কেঁপে যাচ্ছে। আমার বক্তব্য শেষের যখন স্টেজ থেকে নেমে আসছি তখন ইউকো নামে ছোটখাটো একটি মেয়ে এগিয়ে এল।
এক কথা দুকথার পর খুব তাড়াতাড়িই বন্ধুত্ব হলো ইউকোর সঙ্গে। এরপর চিঠি বিনিময় এবং কয়েকবার দেখা হলো ওকায়ামাতে। তারপর তাঁর নিমন্ত্রণে ওদের বাড়িতে যাই। পরিচিত হই ওর মা-বাবার সঙ্গে। আমার সম্পর্কে অনেক গল্প আগেই শোনা ছিল তাঁদের। তাই ইউকোর বাবা-মা আমার দুই দিনের ছুটিতে আমাকে এমনভাবে আদর-যত্ন করলেন যে আমার বুঝতে বাকি রইল না তাঁরা চেষ্টা করছেন যেন আমি বাংলাদেশের কথা ভুলে থাকতে পারি।
প্রথম দিনই আধো আধো ইংলিশে বললেন, তাঁরা আমার জাপানিজ বাবা-মা হতে চান। আমি যেন ইউকোর মতো ওকাসান (বাংলা অর্থ মা) আর ওতোসান (বাংলা অর্থ বাবা) বলে তাঁদের ডাকি। সেই থেকে তাঁরা আমার জাপানিজ বাবা-মা। আমার দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হয়ে রইলেন, রয়েছেন আজ পর্যন্ত। জাপানে থাকাকালে বিভিন্ন ছুটিতে প্রায়ই আমাকে যেতে হতো হিরোশিমায় তাঁদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য।
কোনো কারণে না যেতে পারলে আমার জাপানি মা গাল ফুলিয়ে বসে থাকতেন। যতটুকু সময় হিরোশিমায় থাকতাম তিনি ব্যস্ত থাকতেন আমার প্রিয় খাবারগুলো তৈরিতে। অনেক সকালে জাপানি বাবা চলে যেতেন সমুদ্রের ধারের বাজারে। যেখানে কিছুক্ষণ আগেই মাছ ধরা হয়েছে, সতেজ মাছ মেয়েকে খাওয়াতে চান বলে।
এদিকে এই ফাঁকে আমার জাপানি মা নানা রকম অভিযোগ তুলে ধরতেন জাপানিজ বাবাকে কেন্দ্র করে। আমি বাংলাদেশের আমার বাড়ির সঙ্গে প্রায়ই মিলিয়ে ফেলতাম এই জাপানিজ পরিবারটিকে। আমি জাপানে থাকাকালেই বিয়ে করি। বিয়ের পর আমার স্বামীকে তাঁরা জাপানিজ নিয়মে বরণ করে নেন। এরপর তাঁরা তাদের বাংলাদেশি মেয়ে আর জামাইকে নিয়ে পাহাড়ের ওপরে চমৎকার একটি হোটেলে যান।
সেখানে অনেকগুলো আকর্ষণের মধ্যে একটি ছিল কোটি কোটি জোনাকি পোকা পাহাড়ের গায়ে জ্বলে আর নেভে। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। আমার ওকাসান আর ওতোসান এখনো গর্বভরে বলে, আমি তাদের একটি মেয়ে। বাসার আনাচকানাচে আমার ছবিগুলো যত্নে ফ্রেমে বন্দী করেছেন। যদিও ভাষা আমাদের মধ্যে একটি সমস্যা ছিল, কিন্তু ভালোবাসার ভাষা তো এক।
এবার বলব দ্বিতীয় ভালোবাসার গল্প। জাপানে থাকাকালে হঠাৎই একদিন ফুজি নামে একজন মধ্যবয়স্ক জাপানিজ মহিলার সঙ্গে পরিচয় হয়। জাপানিজরা অন্য দেশের মানুষকে, তাদের কৃষি কালচারকে জানতে চায়। নিঃসন্তান, বিভিন্ন দেশ ভ্রমণকারী ফুজি সানের আগ্রহটা ছিল আরও বেশি। কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কের রূপটা বদলে গেল। তিনি হয়ে উঠলেন আমার জাপানিজ বোন।
ছোট বোনকে তিনি আগলে রাখেন ভালোবাসা আর মায়া-মমতায়। আমাদের নবান্নের মতো জাপানেও ইংলিশ নিউ ইয়ারে নতুন চালের একটি বিশেষ খাবার মোচি অনেক আয়োজন করে তৈরি করা হয়। আমাকে প্রতিবছর ফুজি সানদের বাড়ির এই আয়োজনে শরিক হতে হয়েছে।
আমি জাপান ছেড়ে চলে আসার এক বছরের মাথাতে ফুজি সান স্বামীসহ আমার নতুন সংসার দেখতে আসেন। আমার সঙ্গে সহজভাবে যোগাযোগ রাখার জন্য ইংলিশে কথা বলার কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু ভালোবাসা যেখানে অকৃত্রিম, বর্ণময়, সেখানে ফুজি সান, ওকাসান বা ওতোসানের সঙ্গে আজেও যে সম্পর্ক, সেখানে ভাষাকে কোনো বাধা মনে হয়নি। কারণ ভালোবাসার একই ভাষা।
অজন্তা চৌধুরী
ব্রাম্পটন, কানাডা

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়