৫৪ ধারায় আটক ২০ নারী কারাগারে, কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ


৫৪ ধারায় আটক ২০ নারী কারাগারে, কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ

স্টাফ রিপোর্টার
« আগের সংবাদপরের সংবাদ»
বোরকা পরা ২০ নারীকে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়েও তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ। ৫৪ ধারায় আটকের পর আইনবহির্ভূতভাবে তাদের দু’দিনের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালিয়েছে পুলিশ। রমনা থানা পুলিশ গতকাল তাদের আদালতে হাজির করলে সিএমএম আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুর রহমান জামিন না দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করেন।
রমনা থানা পুলিশ গতকাল দুপুরে ২০ নারীকে সিএমএম আদালতে নিয়ে যায়। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রমনা থানার ওসি (তদন্ত) মশিউর রহমান রিমান আসামিদের জামিনে আপত্তি দিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, আসামিদের জামিন না দিয়ে কারাগারে আটক রাখা হোক। অন্যদিকে ২০ নারীর পক্ষে জামিন আবেদন শুনানি করেন অ্যাডভোকেট আবদুর রাজ্জাক ও মশিউল আলম। তারা জামিন চেয়ে আদালতে উল্লেখ করেন, আটকৃতরা বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন। তাদের সেমিস্টার পদ্ধতির পরীক্ষা শুরু হবে চলতি সপ্তাহে। সন্দেহজনকভাবে তাদের আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ।
এখন আর তাদের আটক রাখার প্রয়োজন নেই। তাদের জামিন না দিলে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটবে। এতএব তাদের জামিন দেয়া হোক। আইনজীবীরা আরও বলেন, পুলিশ তাদের আটক করার সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জব্দ করেছে। তাই তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুর রহমান শুনানি শেষে জামিন নামঞ্জুর করে ২০ নারীকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেয়। বিকালে তাদের পুলিশ ভ্যানে করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
এদিকে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রিমান্ডে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত বোরকা পরা নারীরা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আদালত তাদের জামিন না দিয়ে কারাগারের প্রেরণ করার আদেশকে অমানবিক বলে মন্তব্য করেছেন আইনজীবীরা।
উল্লেখ্য, সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বড় মগবাজারের ৪৯৩, গ্রিনভ্যালি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কারাবন্দি আবদুল কাদের মোল্লার স্ত্রী সানোয়ারা জাহানসহ বোরকা পরা ২১ নারীকে আটক করে রমনা থানা পুলিশ ও ডিবি। পরে তাদের ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করলে ২০ জনকে দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
জামায়াতের প্রতিবাদ : কারাবন্দি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার স্ত্রী সানোয়ারা জাহানসহ ২০ ছাত্রীকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কারাগারে আটক রাখার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ।
গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিনা কারণে, নিবর্তনমূলক ৫৪ ধারার অপপ্রয়োগ করে আওয়ামী সরকার সানোয়ারা জাহানসহ ২০ ছাত্রীকে গ্রেফতার করে, দু’দিন রিমান্ডে নিয়ে মানসিক নির্যাতন চালিয়ে তাদের কারাগারে পাঠিয়ে সরকার চরম অন্যায় ও জুলুম করেছে। বিশেষ করে কারাবন্দি আবদুল কাদের মোল্লাকে কারাগারে যেমন একদিকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে, অপরদিকে তার স্ত্রীকে বিনা কারণে আটক রেখে এ পরিবারের ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাচ্ছে। এটি চরম মানবতা বিরোধী কাজ ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
ব্রিটিশ প্রবর্তিত ১৮৯৮ সালের নিবর্তনমূলক আইনটি অন্যায়ভাবে অপপ্রয়োগ করে সরকার ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো সরকার নারীদের সম্মান, মর্যাদা ও অধিকারের প্রতি কোনো তোয়াক্কা করে না। ৫৪ ধারা সম্পর্কে মহামান্য হাইকোর্ট ২০১০ সালে যে নির্দেশনা দিয়েছে এ সরকার তাও মানছে না। এ সরকারের কাছে আজ কেউ নিরাপদ নয়। এই সরকারের ফ্যাসিবাদী, অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী মানসিকতার নিন্দা জানানোর কোনো ভাষা আমার জানা নেই। সরকার একদিকে বিনা কারণে নিরীহ ও সম্ভ্রান্ত নারীদের কারাগারে আটক করে রেখেছে, অপরদিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় দাগি আসামিদের মামলা থেকে রেহাই দিয়ে কারাগার থেকে মুক্তি দিচ্ছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় এ সরকার আইনের শাসনে বিশ্বাস করে না। এ সরকারের কাছে তার দলের মদতপুষ্ট ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ নিরাপদ নয়। আমরা এই স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে চলমান প্রতিরোধ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে সানোয়ারা জাহানসহ আটক ২০ জন ছাত্রীর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি।
খেলাফত মজলিস : খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের এক যুক্ত বিবৃতিতে সম্প্রতি সন্দেহমূলকভাবে ছাত্রীসংস্থার ২০ জন ছাত্রীকে তাদের অফিস থেকে গ্রেফতার করে দু’দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেয়ার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, সরকার এবার রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী নির্যাতন শুরু করেছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে একজন গর্ভবতী মহিলাকে গ্রেফতার করে যেভাবে টেনে হিঁচড়ে ৭ তলায় উঠিয়ে আবার নিচে নামানো হয়েছে তার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী অথচ তাদের সামনে এভাবে পর্দানশীন মহিলাদের শুধু রাজনৈতিক হয়রানির জন্য গ্রেফতার করে, রিমান্ডে নিয়ে হেনস্তা করে সমগ্র নারী জাতিকে অপমান করা হচ্ছে। বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় জুলুম-নির্যাতন বন্ধ করে অনতিবিলম্বে গ্রেফতারকৃতদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন।
লিগ্যাল এসিসটেন্স অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস : লিগ্যাল এসিসটেন্স অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী এক বিবৃতিতে বলেন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন দমনে ১৮৯৮ সালে ইংরেজরা সর্বপ্রথম নিবর্তনমূলক এ আইন তৈরি করে। এ আইনের ৫৪ ধারায় বিনা পরোয়ানায় মানুষকে গ্রেফতার করার সুযোগ রাখা হয়। অবলা নারীর ওপর হাত তোলার অধিকার কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে আইনে দেয়া হয়নি। যে কোনো অপরাধের বিচার হতে পারে। সেজন্য সুনির্দিষ্ট আইন আছে। কিন্তু ৫৪ ধারায় এসব ছাত্রীদের গ্রেফতারে প্রমাণিত হয় তাদের হয়রানির উদ্দেশেই গ্রেফতার করে বর্বর যুগে নারীদের ওপর নির্যাতন করা হতো। কিন্তু আজকের সভ্য জগতে নারীর ওপর পুলিশি বর্বরতা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। অবিলম্বে গ্রেফতারকৃত ছাত্রীদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি ও এসব ছাত্রীদের গায়ে যারা হাত তুলেছে তাদের বিচার দাবি করছি।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়