বিকাশ ও বিশ্বজিতের ঘটনায় সরকারের দ্বিচারিতা
- Get link
- X
- Other Apps
বিকাশ ও বিশ্বজিতের ঘটনায় সরকারের দ্বিচারিতা
সুলতানা কামাল |প্রথম আলোঃ তারিখ: ২৬-১২-২০১২
বিকাশ কুমার বিশ্বাস ও বিশ্বজিৎ দাস—এই সমাজেরই দুই বিপরীতমুখী চরিত্র। বিকাশ পুলিশের খাতায় তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। আর বিশ্বজিৎ নিরীহ শ্রমজীবী মানুষ। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন করা সরকারের দায়িত্ব হলেও আমরা এখানে তার বিপরীত ভূমিকাই লক্ষ করি।
শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ কুমার বিশ্বাসকে যেভাবে কারাগার থেকে মুক্ত করা হয়েছে, তাতে আমরা শুধু বিস্মিত হইনি; হতাশও হয়েছি। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাসহ নানা গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে; কোনো কোনো মামলায় বিকাশ কুমার বিশ্বাস দণ্ড ভোগও করেছেন; কোনো কোনো মামলায় জামিন পেয়েছেন। তিনি যেসব মামলায় জামিন পেয়েছেন, সেসব মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সরকারপক্ষের আইনজীবীর ভূমিকা কী ছিল, সেটাও জানা দরকার। সবার অগোচরে প্রশাসনিক নির্দেশে এ রকম দুর্ধর্ষ অপরাধীকে ছেড়ে দেওয়া আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন ছাড়া কিছু নয়।
একজন দুর্ধর্ষ অপরাধী জেলখানা থেকে ছাড়া পেলেন অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুই জানে না। জেলার পুলিশ প্রশাসনকে কিছু জানানো হলো না। যেকোনো আসামিকে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ছেড়ে দিলে কারও কিছু বলার থাকত না। কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কীভাবে বিকাশ কুমার ছাড়া পেলেন? একটি গণতান্ত্রিক সরকার কেন একজন অপরাধীর মুক্তি নিয়ে এ রকম লুকোচুরি করল?
মানবসমাজে বাস করতে হলে ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্যটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্র বা সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ন্যায় ও অন্যায়ের এই ফারাকটি মুছে ফেলতে পারেন না। সরকার তথ্য অধিকার আইন পাস করেছে, জনগণের দোরগোড়ায় তথ্য পৌঁছে দেওয়ার দাবি করছে। বিকাশ কুমার বিশ্বাস কীভাবে ছাড়া পেলেন, তা জানার অধিকারও জনগণের আছে। সরকার নিজেই যদি আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি এ রকম অবহেলা ও অশ্রদ্ধা দেখায়, তাহলে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অপরাধ দমনের পূর্বশর্ত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা। বিকাশের ক্ষেত্রে সরকার তার ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। সরকার অন্যায়ভাবে যেমন একজনকে জেলখানা থেকে ছেড়ে দিতে পারে না, তেমনি বিচারবহির্ভূতভাবে কাউকে শাস্তিও দিতে পারে না। দুর্ধর্ষ অপরাধীদের শাস্তি না হলে সমাজে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য বেড়ে যায়।
বিচারহীনতাই যে সমাজে ও রাষ্ট্রে অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরিস্থিতি এমন হয় যে, সরকারকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ‘ক্রসফায়ার’, ‘এনকাউন্টার’-এর মতো বেআইনি পন্থার আশ্রয় নিতে হয়।
আইনের শাসন কায়েম করতে হলে রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগকে নিজ নিজ সীমার ভেতরে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নির্বাহী বিভাগ এমন কিছু করতে পারে না, যাতে বিচার বিভাগের অধিকার ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।
বিকাশ কুমার বিশ্বাসের মুক্তি নিয়ে নানা জল্পনা চলছে। মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও পত্রিকায় খবর এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদ করা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। সরকার যেখানে অবাধ তথ্য অধিকারের কথা বলে, সেখানে একজন আসামির কারামুক্তি নিয়ে এই লুকোচুরি কেন? বিকাশ কুমার বিশ্বাসের মুক্তি নিয়ে কী ঘটেছে, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো কোন অবস্থায় আছে, সেসব জনগণকে জানানো সরকারেরই দায়িত্ব। এ ব্যাপারে দায়িত্ব আছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনেরও।
এ ধরনের ভয়ংকর অপরাধীরা বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে জেলখানা থেকে ছাড়া পাওয়া কেবল জননিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, দেশের মানমর্যাদার জন্যও ক্ষতিকর। আমরা যারা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করি, দেশের বাইরেও এসব ঘটনার জন্য প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। এর আগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদেরও কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং সে জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছে। চিহ্নিত অপরাধীদের যদি নানা কৌশলে জেলখানা থেকে এভাবে বের করে আনা হয়, তাহলে যে সমাজে অপরাধ বাড়বে এবং অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে, তাতে সন্দেহ নেই। অপরাধীদের হাত থেকে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এ ক্ষেত্রে তারা সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের মনে আছে, বছর দুই আগে মিলন নামের একটি ছেলেকে উন্মত্ত জনতার হাতে ছেড়ে দিয়েছিল পুলিশ। ফলে গণপিটুনিতেই ছেলেটি মারা যায়।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নানাভাবে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণার কথা বলে ক্ষমতায় এলেও দুর্নীতি রোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছে বলা যাবে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) জরিপে এ বছর দুর্নীতির সূচকে বংলাদেশের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকলেও ক্রম ২৪ ধাপ নিচে নেমে গেছে। এটি অবশ্যই উদ্বেগজনক।
২.
বিকাশ কুমার বিশ্বাসের কারামুক্তির আলোচনা প্রসঙ্গে বিশ্বজিৎ দাসের ঘটনাটিও এসে পড়ে। কয়েক দিন আগে পুরান ঢাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হওয়ার আগে কেউ তাঁর নামও জানত না। তাঁকে হত্যা করা হয়েছে প্রকাশ্যে, অনেক মানুষের সামনে। যারা সেদিন তাঁর ওপর চড়াও হয়েছিল, তাদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু আশপাশে থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হলেও কেউ দুর্বৃত্তদের মোকাবিলা করতে এগিয়ে আসেনি। ঘটনাস্থলে কাছাকাছি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন। তাঁরাও বিশ্বজিৎকে বাঁচানোর চেষ্টা করেননি। ফলে গুটিকয়েক সন্ত্রাসীর হাতে জীবন দিতে হলো বিশ্বজিৎ নামের নিরীহ এক যুবককে। প্রকাশ্যে একজন মানুষকে কতিপয় সন্ত্রাসী ছুরি, চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে লাঠির আঘাতে মেরে ফেলল, আর সবাই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করল, এটি কিসের আলামত? আমাদের অসহায়ত্ব, আমাদের মানবিক বিপন্নতা কত গভীর হলে এ রকম ঘটনা ঘটতে পারে? কোনো সভ্য সমাজে এ ধরনের ঘটনা চিন্তাও করা যায় না।
আরও দুঃখজনক হলো বিশ্বজিৎ দাস নিহত হওয়ার পর সরকারের মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের প্রতিক্রিয়া। অপরাধীদের পরিচয় আড়াল করতে গিয়ে কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হত্যার দায় চাপাতেও দ্বিধা করেননি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তদন্তের আগেই ঘোষণা করে দিলেন, বিশ্বজিৎ হত্যার সঙ্গে ছাত্রলীগ জড়িত নয়। অথচ পত্রপত্রিকায় ও টেলিভিশনে যেসব ছবি প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে; তাতে এটি স্পষ্ট যে বিশ্বজিতের ওপর চাপাতি ও ছুরি নিয়ে যারা হামলা করেছে, তারা সবাই ছাত্রলীগের বর্তমান বা সাবেক কর্মী। সেদিন ছাত্রলীগের মিছিল থেকেই তারা হামলা চালিয়েছিল।
এই যে বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড ঘটল, এর জন্য কি কেবল কতিপয় সন্ত্রাসীই দায়ী? হ্যাঁ, তারা দায়ী তো বটেই। কিন্তু সেই ঘটনা যারা প্রত্যক্ষ করেও প্রতিবাদ করেনি, তারাও এ হত্যার দায় এড়াতে পারবে না। নাগরিক হিসেবে আমরাও পারি না। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন একটি লেখায় লিখেছিলেন, ‘মানুষের বিভিন্ন রকম দায়িত্ব আছে। পারফেক্ট এবং ইমপারফেক্ট। যেমন আমার সামনে যদি একজন অন্যায় করে, আমার দায়িত্ব হলো সেই অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।’ সেদিন ঘটনাস্থলে কাছাকাছি যারা ছিল, তারা কেউ সেই দায়িত্ব পালন করেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও করেনি। এ আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা।
আমরা যদি সাহস করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে না দাঁড়াই, তাহলে অপরাধীরা আশকারা পেয়ে যাবে। বিশ্বজিৎ হত্যার পর বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ হয়েছে। ঘাতকদের গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন হয়েছে। পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে। সরকার কয়েকজন হত্যাকারীকে গ্রেপ্তারও করেছে। সংবাদপত্রের মাধ্যমে জেনেছি, সেই সঙ্গে পুলিশ কিছু নিরীহ মানুষকেও গ্রেপ্তার করেছে, যাঁদের ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পর্ক নেই। কেন তাঁদের গ্রেপ্তার করা হলো? স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বিশ্বজিৎ হত্যাকারীরা শাস্তি পাবে কি না।
আমাদের দেশে বিচারিক প্রক্রিয়ার নামে আসামিদের ধরে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা স্বাভাবিক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যদিও এটি সম্পূর্ণ বেআইনি। অনেক সময় রিমান্ডের সময় নির্যাতনের ভয়ে আসামিরা তদন্ত কর্মকর্তাদের শিখিয়ে দেওয়া কথা বলেন, অতীতে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের বাঁচাতে জজ মিয়া কাহিনি শোনানো হয়েছে।
বিশ্বজিৎ হত্যা মামলায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলেই আমরা বিশ্বাস করতে চাই। একই সঙ্গে বিশ্বাস করতে চাই, বিশ্বজিৎ হত্যার সঙ্গে জড়িত নয়, এমন আটক ব্যক্তিদের সরকার অবিলম্বে ছেড়ে দেবে। যারা প্রকৃত হত্যাকারী, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করবে। সেটি তারা করতে ব্যর্থ হলে ন্যায়বিচারের পথ যেমন রুদ্ধ হয়ে পড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বলেও কিছু থাকবে না।
সুলতানা কামাল: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক এবং সাবেকতত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।
শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ কুমার বিশ্বাসকে যেভাবে কারাগার থেকে মুক্ত করা হয়েছে, তাতে আমরা শুধু বিস্মিত হইনি; হতাশও হয়েছি। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাসহ নানা গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে; কোনো কোনো মামলায় বিকাশ কুমার বিশ্বাস দণ্ড ভোগও করেছেন; কোনো কোনো মামলায় জামিন পেয়েছেন। তিনি যেসব মামলায় জামিন পেয়েছেন, সেসব মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সরকারপক্ষের আইনজীবীর ভূমিকা কী ছিল, সেটাও জানা দরকার। সবার অগোচরে প্রশাসনিক নির্দেশে এ রকম দুর্ধর্ষ অপরাধীকে ছেড়ে দেওয়া আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন ছাড়া কিছু নয়।
একজন দুর্ধর্ষ অপরাধী জেলখানা থেকে ছাড়া পেলেন অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুই জানে না। জেলার পুলিশ প্রশাসনকে কিছু জানানো হলো না। যেকোনো আসামিকে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ছেড়ে দিলে কারও কিছু বলার থাকত না। কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কীভাবে বিকাশ কুমার ছাড়া পেলেন? একটি গণতান্ত্রিক সরকার কেন একজন অপরাধীর মুক্তি নিয়ে এ রকম লুকোচুরি করল?
মানবসমাজে বাস করতে হলে ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্যটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্র বা সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ন্যায় ও অন্যায়ের এই ফারাকটি মুছে ফেলতে পারেন না। সরকার তথ্য অধিকার আইন পাস করেছে, জনগণের দোরগোড়ায় তথ্য পৌঁছে দেওয়ার দাবি করছে। বিকাশ কুমার বিশ্বাস কীভাবে ছাড়া পেলেন, তা জানার অধিকারও জনগণের আছে। সরকার নিজেই যদি আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি এ রকম অবহেলা ও অশ্রদ্ধা দেখায়, তাহলে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অপরাধ দমনের পূর্বশর্ত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা। বিকাশের ক্ষেত্রে সরকার তার ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। সরকার অন্যায়ভাবে যেমন একজনকে জেলখানা থেকে ছেড়ে দিতে পারে না, তেমনি বিচারবহির্ভূতভাবে কাউকে শাস্তিও দিতে পারে না। দুর্ধর্ষ অপরাধীদের শাস্তি না হলে সমাজে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য বেড়ে যায়।
বিচারহীনতাই যে সমাজে ও রাষ্ট্রে অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরিস্থিতি এমন হয় যে, সরকারকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ‘ক্রসফায়ার’, ‘এনকাউন্টার’-এর মতো বেআইনি পন্থার আশ্রয় নিতে হয়।
আইনের শাসন কায়েম করতে হলে রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগকে নিজ নিজ সীমার ভেতরে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নির্বাহী বিভাগ এমন কিছু করতে পারে না, যাতে বিচার বিভাগের অধিকার ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।
বিকাশ কুমার বিশ্বাসের মুক্তি নিয়ে নানা জল্পনা চলছে। মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও পত্রিকায় খবর এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদ করা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। সরকার যেখানে অবাধ তথ্য অধিকারের কথা বলে, সেখানে একজন আসামির কারামুক্তি নিয়ে এই লুকোচুরি কেন? বিকাশ কুমার বিশ্বাসের মুক্তি নিয়ে কী ঘটেছে, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো কোন অবস্থায় আছে, সেসব জনগণকে জানানো সরকারেরই দায়িত্ব। এ ব্যাপারে দায়িত্ব আছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনেরও।
এ ধরনের ভয়ংকর অপরাধীরা বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে জেলখানা থেকে ছাড়া পাওয়া কেবল জননিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, দেশের মানমর্যাদার জন্যও ক্ষতিকর। আমরা যারা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করি, দেশের বাইরেও এসব ঘটনার জন্য প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। এর আগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদেরও কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং সে জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছে। চিহ্নিত অপরাধীদের যদি নানা কৌশলে জেলখানা থেকে এভাবে বের করে আনা হয়, তাহলে যে সমাজে অপরাধ বাড়বে এবং অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে, তাতে সন্দেহ নেই। অপরাধীদের হাত থেকে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এ ক্ষেত্রে তারা সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের মনে আছে, বছর দুই আগে মিলন নামের একটি ছেলেকে উন্মত্ত জনতার হাতে ছেড়ে দিয়েছিল পুলিশ। ফলে গণপিটুনিতেই ছেলেটি মারা যায়।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নানাভাবে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণার কথা বলে ক্ষমতায় এলেও দুর্নীতি রোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছে বলা যাবে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) জরিপে এ বছর দুর্নীতির সূচকে বংলাদেশের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকলেও ক্রম ২৪ ধাপ নিচে নেমে গেছে। এটি অবশ্যই উদ্বেগজনক।
২.
বিকাশ কুমার বিশ্বাসের কারামুক্তির আলোচনা প্রসঙ্গে বিশ্বজিৎ দাসের ঘটনাটিও এসে পড়ে। কয়েক দিন আগে পুরান ঢাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হওয়ার আগে কেউ তাঁর নামও জানত না। তাঁকে হত্যা করা হয়েছে প্রকাশ্যে, অনেক মানুষের সামনে। যারা সেদিন তাঁর ওপর চড়াও হয়েছিল, তাদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু আশপাশে থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হলেও কেউ দুর্বৃত্তদের মোকাবিলা করতে এগিয়ে আসেনি। ঘটনাস্থলে কাছাকাছি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন। তাঁরাও বিশ্বজিৎকে বাঁচানোর চেষ্টা করেননি। ফলে গুটিকয়েক সন্ত্রাসীর হাতে জীবন দিতে হলো বিশ্বজিৎ নামের নিরীহ এক যুবককে। প্রকাশ্যে একজন মানুষকে কতিপয় সন্ত্রাসী ছুরি, চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে লাঠির আঘাতে মেরে ফেলল, আর সবাই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করল, এটি কিসের আলামত? আমাদের অসহায়ত্ব, আমাদের মানবিক বিপন্নতা কত গভীর হলে এ রকম ঘটনা ঘটতে পারে? কোনো সভ্য সমাজে এ ধরনের ঘটনা চিন্তাও করা যায় না।
আরও দুঃখজনক হলো বিশ্বজিৎ দাস নিহত হওয়ার পর সরকারের মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের প্রতিক্রিয়া। অপরাধীদের পরিচয় আড়াল করতে গিয়ে কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হত্যার দায় চাপাতেও দ্বিধা করেননি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তদন্তের আগেই ঘোষণা করে দিলেন, বিশ্বজিৎ হত্যার সঙ্গে ছাত্রলীগ জড়িত নয়। অথচ পত্রপত্রিকায় ও টেলিভিশনে যেসব ছবি প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে; তাতে এটি স্পষ্ট যে বিশ্বজিতের ওপর চাপাতি ও ছুরি নিয়ে যারা হামলা করেছে, তারা সবাই ছাত্রলীগের বর্তমান বা সাবেক কর্মী। সেদিন ছাত্রলীগের মিছিল থেকেই তারা হামলা চালিয়েছিল।
এই যে বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড ঘটল, এর জন্য কি কেবল কতিপয় সন্ত্রাসীই দায়ী? হ্যাঁ, তারা দায়ী তো বটেই। কিন্তু সেই ঘটনা যারা প্রত্যক্ষ করেও প্রতিবাদ করেনি, তারাও এ হত্যার দায় এড়াতে পারবে না। নাগরিক হিসেবে আমরাও পারি না। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন একটি লেখায় লিখেছিলেন, ‘মানুষের বিভিন্ন রকম দায়িত্ব আছে। পারফেক্ট এবং ইমপারফেক্ট। যেমন আমার সামনে যদি একজন অন্যায় করে, আমার দায়িত্ব হলো সেই অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।’ সেদিন ঘটনাস্থলে কাছাকাছি যারা ছিল, তারা কেউ সেই দায়িত্ব পালন করেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও করেনি। এ আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা।
আমরা যদি সাহস করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে না দাঁড়াই, তাহলে অপরাধীরা আশকারা পেয়ে যাবে। বিশ্বজিৎ হত্যার পর বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ হয়েছে। ঘাতকদের গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন হয়েছে। পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে। সরকার কয়েকজন হত্যাকারীকে গ্রেপ্তারও করেছে। সংবাদপত্রের মাধ্যমে জেনেছি, সেই সঙ্গে পুলিশ কিছু নিরীহ মানুষকেও গ্রেপ্তার করেছে, যাঁদের ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পর্ক নেই। কেন তাঁদের গ্রেপ্তার করা হলো? স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বিশ্বজিৎ হত্যাকারীরা শাস্তি পাবে কি না।
আমাদের দেশে বিচারিক প্রক্রিয়ার নামে আসামিদের ধরে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা স্বাভাবিক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যদিও এটি সম্পূর্ণ বেআইনি। অনেক সময় রিমান্ডের সময় নির্যাতনের ভয়ে আসামিরা তদন্ত কর্মকর্তাদের শিখিয়ে দেওয়া কথা বলেন, অতীতে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের বাঁচাতে জজ মিয়া কাহিনি শোনানো হয়েছে।
বিশ্বজিৎ হত্যা মামলায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলেই আমরা বিশ্বাস করতে চাই। একই সঙ্গে বিশ্বাস করতে চাই, বিশ্বজিৎ হত্যার সঙ্গে জড়িত নয়, এমন আটক ব্যক্তিদের সরকার অবিলম্বে ছেড়ে দেবে। যারা প্রকৃত হত্যাকারী, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করবে। সেটি তারা করতে ব্যর্থ হলে ন্যায়বিচারের পথ যেমন রুদ্ধ হয়ে পড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বলেও কিছু থাকবে না।
সুলতানা কামাল: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক এবং সাবেকতত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।
- Get link
- X
- Other Apps
Comments