রাষ্ট্র কার: বিশ্বজিৎ না বিকাশদের?
- Get link
- X
- Other Apps
রাষ্ট্র কার: বিশ্বজিৎ না বিকাশদের?
সোহরাব হাসান | তারিখ: ১৮-১২-২০১২
দেশের ১৬ কোটি মানুষের সঙ্গে বিকাশ কুমার বিশ্বাস নামের পুলিশের তালিকাভুক্ত এক সন্ত্রাসীও এবার মুক্ত মানুষ হিসেবে বিজয় দিবস উদ্যাপন করেছেন। কিন্তু পুরান ঢাকার ‘আমন্ত্রণ’ টেইলারিংয়ের বিশ্বজিৎ দাস বিজয় দিবস উদ্যাপন করতে পারলেন না। বিজয় দিবসের কয়েক দিন আগেই বিরোধী দলের অবরোধের এক সকালে ছাত্রলীগ নামধারী কতিপয় সন্ত্রাসী ছুরি, চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে তাঁকে হত্যা করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছেন, বিকাশ কুমার বিশ্বাস মুক্তি পেয়েছেন আইন অনুযায়ী। তাঁর ভাষায়, ‘যে ব্যক্তির কথা বলেছেন, তিনি আদালতের নির্দেশেই বের হয়েছেন। এখানে আমাদের করার কিছু নেই।...এখানে প্রশাসন আইন অনুযায়ী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। (প্রথম আলো, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১২)
কিন্তু প্রশাসন (পুলিশ) বিরোধী দলের অবরোধের দিন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেনি। করলে বিশ্বজিৎকে সন্ত্রাসীদের থাবা থেকে বাঁচানো যেত। মাত্র ২৪ বছর বয়সে এক সম্ভাবনাময় যুবককে এভাবে জীবন দিতে হতো না।
গতকাল রস+আলোর প্রচ্ছদে প্রথম আলোর অনলাইন পাঠক শপথ গুহের একটি চিঠি ছাপা হয়েছে। সেই সঙ্গে কার্টুনও। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘জজকোর্ট এলাকা। হঠাৎ একটা ছেলেকে কোপাতে শুরু করল কয়েকজন। পাশ দিয়ে যাওয়া ব্যাংকের ক্যাশিয়ার রিকশা থেকে নেমে হাত চেপে ধরলেন চাপাতি হাতের ছেলেটির। চায়ের দোকানের উৎসুক লোকগুলো চেপে ধরল অন্য আরেকজনের হাত। ছবি তুলতে থাকা সাংবাদিকেরা হাতের ক্যামেরা ফেলে বিশ্বজিৎকে আড়াল করলেন তিন-চারটা রডের সামনে থেকে। দুজন পুলিশ দৌড়ে এসে কলার চেপে ধরল চাপাতি হাতের ছেলেগুলোর, লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করল লাঠি ধরা হাতের ওপর। ফুটপাতের চাওয়ালা তাঁর ছেলেকে নিয়ে বিশ্বজিৎ নামের ছেলেটির দিকে এগোতে থাকলেন, তাঁর ক্ষতগুলো হাত দিয়ে চেপে ধরলেন। জগন্নাথের সমাজবিজ্ঞান পড়া ছেলেটি শক্ত করে ধরে রাখলেন বিশ্বজিতের হাত, ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে। পুলিশ গ্রেপ্তার করল চাপাতি হাতের ছেলেগুলোকে। রিকশাওয়ালা প্রচণ্ড গতিতে ছুটলেন মেডিকেলের দিকে। ফেসবুকে স্ট্যাটাস নয়, সবাই গেল বিশ্বজিৎকে দেখতে। বেঁচে গেলেন বিশ্বজিৎ। বহিষ্কার করা হলো ছাত্র নামের পশুগুলোকে।’
এই চিঠি ছিল শপথ গুহের কল্পনা। সেই কল্পনা বাস্তব হলে বাংলাদেশ একটি আদর্শ ও সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র হতে পারত। কেন হয়নি, সে আলোচনায় যাওয়ার আগে বিকাশ কুমার বিশ্বাস ও বিশ্বজিৎ দাস দুই বিপরীতমুখী ঘটনার আরও কিছু তথ্য জানানো জরুরি বলে মনে করছি।
২০০১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার যে ২৩ শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করেছিল, বিকাশ কুমার বিশ্বাস তাঁদের একজন। পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্ত্রাসী প্রকাশ-বিকাশ প্রথমে বাসাবো এলাকায় কর্মকাণ্ড চালালেও পরে মিরপুর-আগারগাঁও এলাকায় আস্তানা গাড়েন। আগারগাঁওয়ে জোড়া খুন, এলজিইডি ভবনে খুনসহ আরও কয়েকটি খুনের দায়ে সরাসরি বিকাশকে আসামি করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ১২টি মামলা ছিল, তার ছয়টি থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। বাকি ছয়টিতে জামিনে আছেন। ১৯৯৭ সালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। ২০০৯ সালে জামিন পেলেও সরকার ফের গ্রেপ্তার করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘আদালত থেকে জামিন পেয়ে তিনি ছাড়া পেয়েছেন।’ প্রশ্ন হলো, এই জামিন পাওয়ায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সরকারপক্ষের আইনজীবীর কী ভূমিকা ছিল? আসামির জামিন পাওয়া নির্ভর করে মামলার তদন্তের ওপর। যে মামলায় ২০০৯ সালে বিকাশ গ্রেপ্তার হলেন, সেই মামলায় এখন কীভাবে জামিন পেলেন? বিকাশের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসীরা যদি কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে দেশে কারাগার রাখার প্রয়োজন হবে না। জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই সরকার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের আটক রাখে। যে ব্যক্তি কারাগারে বসেও চাঁদাবাজি করেন, সেই ব্যক্তি বাইরে এসে কি সাধু হয়ে যাবেন?
২.
এই যে বিশ্বজিৎ নামের এক শ্রমজীবী যুবক রাজপথে নৃশংসভাবে খুন হলেন, তার জন্য রাষ্ট্র বিন্দুমাত্র দুঃখ প্রকাশ করেনি, শোক জানায়নি। ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী ছাড়া কোনো নেতা তাঁর বাড়িতে যাননি। তিনি কোনো দলের কর্মী ছিলেন না। কর্মী হলে নেতাদের ভিড় জমত। বিরোধী পক্ষকে দেখে নেওয়ার হুমকি উচ্চারিত হতো। এ দেশে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। অথচ জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার আছে, জনগণের করের অর্থে পরিচালিত প্রশাসন-পুলিশ আছে।
বিশ্বজিতের পরিচয় নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল প্রথম কয়েক দিন ধরে বাদানুবাদে লিপ্ত হলো। বাগ্যুদ্ধ চলল ঘাতকদের পরিচয় নিয়েও। বিএনপি প্রথমে বিশ্বজিৎকে তাদের কর্মী বলে দাবি করল, পরে আওয়ামী লীগ বলল, তিনি একসময় ছাত্রলীগ করতেন। কিন্তু বিশ্বজিৎ এখন সব পরিচয় পেছনে ফেলে পরলোকে চলে গেলেন। আমাদের বৈরী ও বিদ্বেষী রাজনীতি একটি জীবন্ত মানুষকে মুহূর্তে লাশ বানিয়ে দিল।
টেলিভিশনের ফুটেজ, পত্রিকার ছবি বলছে, ছাত্রলীগের অবরোধবিরোধী মিছিল থেকেই বিশ্বজিৎকে ধাওয়া করা হয়েছিল। ছাত্রলীগের মিছিলে অংশগ্রহণকারীরাই তাঁকে চাপাতির কোপে হত্যা করেছিল। কিন্তু ছাত্রলীগ বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ‘তারা বহিষ্কৃত।’ বহিষ্কৃত কথার অর্থ হলো একসময় ছাত্রলীগে ছিলেন, এখন নেই। ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃতরা সেদিন ছাত্রলীগের অবরোধবিরোধী মিছিলে অংশ নিলেন কীভাবে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘ছাত্রলীগের কোনো কর্মী বিশ্বজিৎকে হত্যা করেনি।’ আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছেন, ‘তারা ছাত্রলীগের কেউ নয়।’ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ‘বিশ্বজিৎ হত্যার দায়ে অভিযুক্তদের পরিবার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করে।’
পরিবার বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতি করে, কিন্তু তাঁরা কী করেন, সে কথা খোলাসা করে বলেননি তিনি। জামায়াতের নেতার ছেলের ছাত্রলীগ করার সম্ভাবনা কম। কিন্তু বাবা বিএনপি করলে ছেলে ছাত্রলীগ করতে পারবে না, এমন কথা নেই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে ও পরে এ দেশের অধিকাংশ রাজনীতিক মুসলিম লীগ করলেও তাঁদের ছেলেমেয়েরা খুব কমই মুসলিম ছাত্রলীগ করেছেন। তাঁরা করেছেন ছাত্রলীগ বা ছাত্র ইউনিয়ন। আবার আওয়ামী লীগের নেতার ছেলেমেয়ের অন্য ছাত্রসংগঠন করার নজিরও ঢের আছে। নজির আছে একই বাবার দুই ছেলের দুই সংগঠন করারও। তাই পারিবারিক পরিচয়ের বিতর্কে সত্য আড়াল করা যাবে না।
বিশ্বজিতের ঘাতকদের রাজনৈতিক পরিচয় জানা দরকার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি জানা দরকার যে রাজনীতি শিক্ষিত তরুণদের এমনিভাবে মানব হননের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে যে ঘৃণা ও বিদ্বেষের প্রাবল্য, যে প্রতিহিংসার ছায়া সবকিছুকে গ্রাস করছে, বিশ্বজিৎ হত্যা তারই পরিণতি।
এর আগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাকে কীভাবে পায়ের রগ, হাতের রগ কেটে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখেছিলেন, সেই রক্তাক্ত ছবিও আমরা দেখেছি। ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররা মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাঁদের পূর্বসূরিরা এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ একাত্তরে করেছেন, এখন তাঁরা করছেন। কিংবা আওয়ামী লীগের ভাষায় ‘সামরিক স্বৈরাচারের গর্ভে জন্ম নেওয়া’ বিএনপি-ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও এই কাজ করতে পারেন। কিন্তু প্রগতিশীল ও সেক্যুলার রাজনীতির বাহক দলটির নেতা-কর্মীরা কেন একই কাজ করবেন? দলীয় আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করার আগে ন্যূনতম মানবিক আদর্শটি শেখান। ভালো কর্মী হতে হলে ভালো মানুষ হতে হয়।
বিশ্বজিৎ হত্যার আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে পুলিশ বাহিনী নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। সরকার চাইলে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকেও তারা পাকড়াও করতে পারে। সরকার না চাইলে পুলিশের সামনে আসামিরা বুক ফুলিয়ে চললেও পুলিশ কিছু বলবে না, দেখবে না।
বিশ্বজিৎ হত্যার অন্যতম আসামি রফিকুল ইসলাম শাকিলের বাবা ছেলের এই অপকর্মের খবর পেয়ে হূদেরাগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। যে রাজনীতি বাবার কোল থেকে সন্তানকে কেড়ে নেয়, আমরা সেই রাজনীতিকে ঘৃণা করি। শাকিলরা কোন ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জড়িত, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো রাজনীতির কারণেই রাজনীতি না করেও নিরপরাধ বিশ্বজিৎ নিহত হন, রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থেকেও পুত্রের অপকর্মের অপবাদ সইতে না পেরে একজন বাবাকে মরতে হয়।
৩.
যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের একটি বিদ্যালয়ে এক বন্দুকধারীর গুলিতে ২০টি শিশুসহ ২৭ জন নিহত হয়। দেশটির প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘এ ঘটনায় আমার হূদয় ভেঙে গেছে। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। সবাই মিলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মন খুবই নরম বলেই হয়তো এক বন্দুকধারীর নির্মমতা তাঁকে আবেগাপ্লুত করেছে। আমাদের নেতা-নেত্রীদের হূদয় বেশ কঠোর। তাই সন্ত্রাসীদের হাতে নিরপরাধ যুবক নিহত হলে কিংবা যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়ে পিকেটাররা মানুষ হত্যা করলেও তাঁদের হূদয় ভাঙে না। কিংবা সন্ত্রাসীদের হাতে বিশ্বজিৎ নামের নিরীহ যুবক মারা গেলেও তাঁরা শোক বা সমবেদনা জানানোর প্রয়োজন বোধ করেন না।
বিরোধী দল বিশ্বজিৎ হত্যার জন্য সরকারি দলকে দায়ী করলেও কেউ তাঁর বাড়িতে যাননি। তবে একজন গিয়েছেন। সেদিন, যে রিকশাচালক বিশ্বজিৎকে মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি বিশ্বজিৎকে বাঁচাতে না পারলেও তাঁর বাড়িতে গিয়ে বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। তাঁর এই মানবতাবোধ আমাদের একই সঙ্গে লজ্জা দেয় এবং আশা জাগায়। লজ্জা দেয় এ কারণে যে, আমরা বিবেকের তাবৎ পাহারাদারেরা যা করতে পারিনি, একজন গরিব রিকশাচালক তা-ই করে দেখিয়েছেন। রাজনীতি যতই প্রতিহিংসায় আচ্ছন্ন থাকুক না কেন, রাজনীতিকেরা যতই বিবেকহীন হোন না কেন, মানবতাবোধ একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এটাই আশা জাগায়।
বিশ্বজিৎ দাস খুন হয়েছেন। আমরা তাঁকে ফিরে পাব না। কিন্তু তাঁর ঘাতকেরা যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পান, তাহলে ভবিষ্যতে বিশ্বজিতের মতো কাউকে খুন হতে হবে না। কিন্তু ভবিষ্যতে বর্তমান সরকার কিংবা পরবর্তী সরকার এসে যদি বিশ্বজিৎ হত্যার আসামিদের বিকাশের মতো জামিনে মুক্তি দেয়, হত্যার বিচার না হয়, তাহলে বুঝতে হবে এ জাতির কপালে বহু দুঃখ আছে। সেই দুঃখ সরকার বা বিরোধী দল বইবে না। বইবে দেশের গরিব-দুঃখী মানুষ। এখন রাষ্ট্রকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—কার পক্ষ নেবে বিশ্বজিৎ না বিকাশের?
সোহরাব হাসান, কবি ও সাংবাদিক।
sohৎab03@dhaka.net
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছেন, বিকাশ কুমার বিশ্বাস মুক্তি পেয়েছেন আইন অনুযায়ী। তাঁর ভাষায়, ‘যে ব্যক্তির কথা বলেছেন, তিনি আদালতের নির্দেশেই বের হয়েছেন। এখানে আমাদের করার কিছু নেই।...এখানে প্রশাসন আইন অনুযায়ী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। (প্রথম আলো, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১২)
কিন্তু প্রশাসন (পুলিশ) বিরোধী দলের অবরোধের দিন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেনি। করলে বিশ্বজিৎকে সন্ত্রাসীদের থাবা থেকে বাঁচানো যেত। মাত্র ২৪ বছর বয়সে এক সম্ভাবনাময় যুবককে এভাবে জীবন দিতে হতো না।
গতকাল রস+আলোর প্রচ্ছদে প্রথম আলোর অনলাইন পাঠক শপথ গুহের একটি চিঠি ছাপা হয়েছে। সেই সঙ্গে কার্টুনও। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘জজকোর্ট এলাকা। হঠাৎ একটা ছেলেকে কোপাতে শুরু করল কয়েকজন। পাশ দিয়ে যাওয়া ব্যাংকের ক্যাশিয়ার রিকশা থেকে নেমে হাত চেপে ধরলেন চাপাতি হাতের ছেলেটির। চায়ের দোকানের উৎসুক লোকগুলো চেপে ধরল অন্য আরেকজনের হাত। ছবি তুলতে থাকা সাংবাদিকেরা হাতের ক্যামেরা ফেলে বিশ্বজিৎকে আড়াল করলেন তিন-চারটা রডের সামনে থেকে। দুজন পুলিশ দৌড়ে এসে কলার চেপে ধরল চাপাতি হাতের ছেলেগুলোর, লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করল লাঠি ধরা হাতের ওপর। ফুটপাতের চাওয়ালা তাঁর ছেলেকে নিয়ে বিশ্বজিৎ নামের ছেলেটির দিকে এগোতে থাকলেন, তাঁর ক্ষতগুলো হাত দিয়ে চেপে ধরলেন। জগন্নাথের সমাজবিজ্ঞান পড়া ছেলেটি শক্ত করে ধরে রাখলেন বিশ্বজিতের হাত, ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে। পুলিশ গ্রেপ্তার করল চাপাতি হাতের ছেলেগুলোকে। রিকশাওয়ালা প্রচণ্ড গতিতে ছুটলেন মেডিকেলের দিকে। ফেসবুকে স্ট্যাটাস নয়, সবাই গেল বিশ্বজিৎকে দেখতে। বেঁচে গেলেন বিশ্বজিৎ। বহিষ্কার করা হলো ছাত্র নামের পশুগুলোকে।’
এই চিঠি ছিল শপথ গুহের কল্পনা। সেই কল্পনা বাস্তব হলে বাংলাদেশ একটি আদর্শ ও সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র হতে পারত। কেন হয়নি, সে আলোচনায় যাওয়ার আগে বিকাশ কুমার বিশ্বাস ও বিশ্বজিৎ দাস দুই বিপরীতমুখী ঘটনার আরও কিছু তথ্য জানানো জরুরি বলে মনে করছি।
২০০১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার যে ২৩ শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করেছিল, বিকাশ কুমার বিশ্বাস তাঁদের একজন। পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্ত্রাসী প্রকাশ-বিকাশ প্রথমে বাসাবো এলাকায় কর্মকাণ্ড চালালেও পরে মিরপুর-আগারগাঁও এলাকায় আস্তানা গাড়েন। আগারগাঁওয়ে জোড়া খুন, এলজিইডি ভবনে খুনসহ আরও কয়েকটি খুনের দায়ে সরাসরি বিকাশকে আসামি করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ১২টি মামলা ছিল, তার ছয়টি থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। বাকি ছয়টিতে জামিনে আছেন। ১৯৯৭ সালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। ২০০৯ সালে জামিন পেলেও সরকার ফের গ্রেপ্তার করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘আদালত থেকে জামিন পেয়ে তিনি ছাড়া পেয়েছেন।’ প্রশ্ন হলো, এই জামিন পাওয়ায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সরকারপক্ষের আইনজীবীর কী ভূমিকা ছিল? আসামির জামিন পাওয়া নির্ভর করে মামলার তদন্তের ওপর। যে মামলায় ২০০৯ সালে বিকাশ গ্রেপ্তার হলেন, সেই মামলায় এখন কীভাবে জামিন পেলেন? বিকাশের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসীরা যদি কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে দেশে কারাগার রাখার প্রয়োজন হবে না। জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই সরকার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের আটক রাখে। যে ব্যক্তি কারাগারে বসেও চাঁদাবাজি করেন, সেই ব্যক্তি বাইরে এসে কি সাধু হয়ে যাবেন?
২.
এই যে বিশ্বজিৎ নামের এক শ্রমজীবী যুবক রাজপথে নৃশংসভাবে খুন হলেন, তার জন্য রাষ্ট্র বিন্দুমাত্র দুঃখ প্রকাশ করেনি, শোক জানায়নি। ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী ছাড়া কোনো নেতা তাঁর বাড়িতে যাননি। তিনি কোনো দলের কর্মী ছিলেন না। কর্মী হলে নেতাদের ভিড় জমত। বিরোধী পক্ষকে দেখে নেওয়ার হুমকি উচ্চারিত হতো। এ দেশে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। অথচ জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার আছে, জনগণের করের অর্থে পরিচালিত প্রশাসন-পুলিশ আছে।
বিশ্বজিতের পরিচয় নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল প্রথম কয়েক দিন ধরে বাদানুবাদে লিপ্ত হলো। বাগ্যুদ্ধ চলল ঘাতকদের পরিচয় নিয়েও। বিএনপি প্রথমে বিশ্বজিৎকে তাদের কর্মী বলে দাবি করল, পরে আওয়ামী লীগ বলল, তিনি একসময় ছাত্রলীগ করতেন। কিন্তু বিশ্বজিৎ এখন সব পরিচয় পেছনে ফেলে পরলোকে চলে গেলেন। আমাদের বৈরী ও বিদ্বেষী রাজনীতি একটি জীবন্ত মানুষকে মুহূর্তে লাশ বানিয়ে দিল।
টেলিভিশনের ফুটেজ, পত্রিকার ছবি বলছে, ছাত্রলীগের অবরোধবিরোধী মিছিল থেকেই বিশ্বজিৎকে ধাওয়া করা হয়েছিল। ছাত্রলীগের মিছিলে অংশগ্রহণকারীরাই তাঁকে চাপাতির কোপে হত্যা করেছিল। কিন্তু ছাত্রলীগ বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ‘তারা বহিষ্কৃত।’ বহিষ্কৃত কথার অর্থ হলো একসময় ছাত্রলীগে ছিলেন, এখন নেই। ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃতরা সেদিন ছাত্রলীগের অবরোধবিরোধী মিছিলে অংশ নিলেন কীভাবে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘ছাত্রলীগের কোনো কর্মী বিশ্বজিৎকে হত্যা করেনি।’ আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছেন, ‘তারা ছাত্রলীগের কেউ নয়।’ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ‘বিশ্বজিৎ হত্যার দায়ে অভিযুক্তদের পরিবার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করে।’
পরিবার বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতি করে, কিন্তু তাঁরা কী করেন, সে কথা খোলাসা করে বলেননি তিনি। জামায়াতের নেতার ছেলের ছাত্রলীগ করার সম্ভাবনা কম। কিন্তু বাবা বিএনপি করলে ছেলে ছাত্রলীগ করতে পারবে না, এমন কথা নেই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে ও পরে এ দেশের অধিকাংশ রাজনীতিক মুসলিম লীগ করলেও তাঁদের ছেলেমেয়েরা খুব কমই মুসলিম ছাত্রলীগ করেছেন। তাঁরা করেছেন ছাত্রলীগ বা ছাত্র ইউনিয়ন। আবার আওয়ামী লীগের নেতার ছেলেমেয়ের অন্য ছাত্রসংগঠন করার নজিরও ঢের আছে। নজির আছে একই বাবার দুই ছেলের দুই সংগঠন করারও। তাই পারিবারিক পরিচয়ের বিতর্কে সত্য আড়াল করা যাবে না।
বিশ্বজিতের ঘাতকদের রাজনৈতিক পরিচয় জানা দরকার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি জানা দরকার যে রাজনীতি শিক্ষিত তরুণদের এমনিভাবে মানব হননের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে যে ঘৃণা ও বিদ্বেষের প্রাবল্য, যে প্রতিহিংসার ছায়া সবকিছুকে গ্রাস করছে, বিশ্বজিৎ হত্যা তারই পরিণতি।
এর আগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাকে কীভাবে পায়ের রগ, হাতের রগ কেটে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখেছিলেন, সেই রক্তাক্ত ছবিও আমরা দেখেছি। ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররা মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাঁদের পূর্বসূরিরা এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ একাত্তরে করেছেন, এখন তাঁরা করছেন। কিংবা আওয়ামী লীগের ভাষায় ‘সামরিক স্বৈরাচারের গর্ভে জন্ম নেওয়া’ বিএনপি-ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও এই কাজ করতে পারেন। কিন্তু প্রগতিশীল ও সেক্যুলার রাজনীতির বাহক দলটির নেতা-কর্মীরা কেন একই কাজ করবেন? দলীয় আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করার আগে ন্যূনতম মানবিক আদর্শটি শেখান। ভালো কর্মী হতে হলে ভালো মানুষ হতে হয়।
বিশ্বজিৎ হত্যার আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে পুলিশ বাহিনী নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। সরকার চাইলে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকেও তারা পাকড়াও করতে পারে। সরকার না চাইলে পুলিশের সামনে আসামিরা বুক ফুলিয়ে চললেও পুলিশ কিছু বলবে না, দেখবে না।
বিশ্বজিৎ হত্যার অন্যতম আসামি রফিকুল ইসলাম শাকিলের বাবা ছেলের এই অপকর্মের খবর পেয়ে হূদেরাগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। যে রাজনীতি বাবার কোল থেকে সন্তানকে কেড়ে নেয়, আমরা সেই রাজনীতিকে ঘৃণা করি। শাকিলরা কোন ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জড়িত, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো রাজনীতির কারণেই রাজনীতি না করেও নিরপরাধ বিশ্বজিৎ নিহত হন, রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থেকেও পুত্রের অপকর্মের অপবাদ সইতে না পেরে একজন বাবাকে মরতে হয়।
৩.
যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের একটি বিদ্যালয়ে এক বন্দুকধারীর গুলিতে ২০টি শিশুসহ ২৭ জন নিহত হয়। দেশটির প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘এ ঘটনায় আমার হূদয় ভেঙে গেছে। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। সবাই মিলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মন খুবই নরম বলেই হয়তো এক বন্দুকধারীর নির্মমতা তাঁকে আবেগাপ্লুত করেছে। আমাদের নেতা-নেত্রীদের হূদয় বেশ কঠোর। তাই সন্ত্রাসীদের হাতে নিরপরাধ যুবক নিহত হলে কিংবা যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়ে পিকেটাররা মানুষ হত্যা করলেও তাঁদের হূদয় ভাঙে না। কিংবা সন্ত্রাসীদের হাতে বিশ্বজিৎ নামের নিরীহ যুবক মারা গেলেও তাঁরা শোক বা সমবেদনা জানানোর প্রয়োজন বোধ করেন না।
বিরোধী দল বিশ্বজিৎ হত্যার জন্য সরকারি দলকে দায়ী করলেও কেউ তাঁর বাড়িতে যাননি। তবে একজন গিয়েছেন। সেদিন, যে রিকশাচালক বিশ্বজিৎকে মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি বিশ্বজিৎকে বাঁচাতে না পারলেও তাঁর বাড়িতে গিয়ে বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। তাঁর এই মানবতাবোধ আমাদের একই সঙ্গে লজ্জা দেয় এবং আশা জাগায়। লজ্জা দেয় এ কারণে যে, আমরা বিবেকের তাবৎ পাহারাদারেরা যা করতে পারিনি, একজন গরিব রিকশাচালক তা-ই করে দেখিয়েছেন। রাজনীতি যতই প্রতিহিংসায় আচ্ছন্ন থাকুক না কেন, রাজনীতিকেরা যতই বিবেকহীন হোন না কেন, মানবতাবোধ একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এটাই আশা জাগায়।
বিশ্বজিৎ দাস খুন হয়েছেন। আমরা তাঁকে ফিরে পাব না। কিন্তু তাঁর ঘাতকেরা যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পান, তাহলে ভবিষ্যতে বিশ্বজিতের মতো কাউকে খুন হতে হবে না। কিন্তু ভবিষ্যতে বর্তমান সরকার কিংবা পরবর্তী সরকার এসে যদি বিশ্বজিৎ হত্যার আসামিদের বিকাশের মতো জামিনে মুক্তি দেয়, হত্যার বিচার না হয়, তাহলে বুঝতে হবে এ জাতির কপালে বহু দুঃখ আছে। সেই দুঃখ সরকার বা বিরোধী দল বইবে না। বইবে দেশের গরিব-দুঃখী মানুষ। এখন রাষ্ট্রকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—কার পক্ষ নেবে বিশ্বজিৎ না বিকাশের?
সোহরাব হাসান, কবি ও সাংবাদিক।
sohৎab03@dhaka.net
- Get link
- X
- Other Apps
Comments