যেভাবে সফল হলাম


আপডেট: ০০:৫৪, ডিসেম্বর ০১, ২০১৩ প্রিন্ট সংস্করণ
৩৩তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ২১ নভেম্বর। মেধাতালিকায় শীর্ষস্থান অর্জনকারী তিন মেধাবী জানাচ্ছেন নতুনদের জন্য তাঁদের অভিজ্ঞতা।

রিদওয়ান ইসলামপ্রথম হতে ভালোই লাগে!রিদওয়ান ইসলাম
সম্মিলিত মেধাতালিকায় প্রথম
জীবনে কখনো দূরবর্তী কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগোইনি। এটি আমার ব্যক্তিত্বের একটি সীমাবদ্ধতা। কেউ কখনো জীবনের লক্ষ্য জানতে চাইলে বলতাম, মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা। কলেজজীবনে বলতাম, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বলতাম, অনার্স পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা আর তার পরে বলতাম, মাস্টার্স পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা। সত্যিই, আমার জীবনের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য কখনো ছিল না। যখন ফার্মেসি বিভাগ থেকে অনার্স পরীক্ষায় সিজিপিএ-৩.৯৫ নিয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করলাম, তখন ভাবলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার চেষ্টা করতে পারি অথবা স্কলারশিপ নিয়ে দেশের বাইরে যাওয়ার চেষ্টাও করতে পারি উচ্চতর ডিগ্রি নিতে।
আমার জন্ম সাভারে। জীবনে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পড়েছি, তার মধ্যে আলাদা করে বলতে হয় দুটি প্রতিষ্ঠানের কথা। এর মধ্যে একটি হলো মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সেখানেই পড়েছি। আমি সেখানকার ৩৮তম ব্যাচের ছাত্র। আর বলতে হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা।
 মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক দুটি পরীক্ষায়ই জিপিএ-৫ পেয়েছি। তারপর ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সুযোগ পাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শেষ পর্যন্ত মাস্টার্স পরীক্ষায়ও প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করি, যেখানে আমার সিজিপিএ ছিল ৪.০০।
অনার্স পরীক্ষার পর বন্ধুদের কাছ থেকেই তখন প্রথম জানতে পারলাম কীভাবে বিসিএস পরীক্ষা হয়, কেমন প্রশ্ন হয়। তখন ভাবলাম, আমিও ফরম পূরণ করব। এভাবেই প্রথম ৩১তম বিসিএসে অংশ নিই।
তারপর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে ঢুকি। আর অল্প অল্প করে পড়তে শুরু করি বিসিএসের জন্য। একে একে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক—প্রতিটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শুল্ক ও আবগারি ক্যাডারে সুযোগ পাই। এ বছরই ১৭ সেপ্টেম্বর কাজ শুরু করি রংপুরে। কিন্তু ৩১তম বিসিএসের রেজাল্টের আগেই ৩৩তম বিসিএসের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। তাই তখন ৩৩তম বিসিএসেও অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিই। ৩১তম বিসিএসেও পররাষ্ট্রই ছিল আমার প্রথম পছন্দ, ৩৩তম বিসিএসেও তাই। মনের কোণে একটা সূক্ষ্ম ইচ্ছা ছিল, পররাষ্ট্রতে হলে মন্দ হতো না। তবে স্বপ্নেও ভাবিনি প্রথম হব।
আমার রেজাল্টের পেছনে আমার বাবা সাইফুল ইসলাম ও মা তাজকারা আক্তারের অবদান সবচেয়ে বেশি।
যা অর্জন করেছি, তার জন্য আমি অত্যন্ত খুশি। উচ্চশিক্ষা নেওয়ার স্বপ্ন আছে আমার। আর অবশ্যই আমার দেশের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের কিছু করতে চাই।

মোরশেদুর রহমানধৈর্যই আমার শক্তিমোরশেদুর রহমান
সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বিতীয়
আমার পড়ার টেবিলের এক কোনায় সব সময় থাকত ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকারের একটি ছবি। ওই ছবিটি দেখলেই মনে এক আশ্চর্য শক্তি পেতাম আমি, সে শক্তি ধৈর্যের। আমি জীবনে সফল হওয়ার জন্য ধৈর্য নামের অদৃশ্য চাবিটি পেয়েছি শচীনের পথচলা থেকেই। আর বাবার অনুপ্রেরণা, সে তো অন্য এক জীবনীশক্তি। সেই পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি পাওয়ার পর স্বপ্ন দেখতাম আইনজীবী হওয়ার। এরপর আবার যখন অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি পেলাম, স্বপ্ন উজ্জ্বল হতে থাকল। প্রথম বিভাগ নিয়ে এসএসসি পাস করার পর ২০০০ সালে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হই রংপুর পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। তখন একটি অজানা স্বপ্ন পেয়ে বসে। সেই স্বপ্নটি হলো, আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেই হবে!
এইচএসসিতে প্রথম বিভাগে পাস করার পর সে স্বপ্নও পূরণ হলো। কিন্তু ছেদ পড়ে গেল ছোটবেলা থেকে লালন করা সেই আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন। সেই দুঃখ ঘুচে গেল রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়া শুরু করার পর থেকেই। বিষয়টি আমার পছন্দ হলো ভীষণ। তখন থেকে স্বপ্ন মোড় নিল অন্যদিকে। স্থির হলো সে স্বপ্ন, পররাষ্ট্র ক্যাডার হয়ে নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার।
স্নাতক শেষ হলো। ফলাফল খুব বেশি ভালো হলো না। তবে প্রথম শ্রেণীতে স্নাতকোত্তর শেষ করে ২৮তম বিসিএস পরীক্ষা দিলাম। সব পরীক্ষা শেষে দেখি, আমি বিসিএসের চূড়ান্ত তালিকায় টিকে গেছি। কিন্তু আমার পছন্দের বিষয় পররাষ্ট্র না পেয়ে পেয়েছি রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ানোর দায়িত্ব। মানে, শিক্ষা ক্যাডারে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। যোগ দিলাম রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে। তারপর ২৯তম, ৩০তম, ৩১তম বিসিএস পরীক্ষার প্রতিটিতে মৌখিক পরীক্ষা পর্যন্ত গেলাম। কিন্তু আমার স্বপ্ন পূরণ হলো না। অবশেষে ৩৩তম বিসিএসে আমি আমার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছি।

ইসরাত জাহানসময়ের মূল্য দিয়েছি
ইসরাত জাহান
সম্মিলিত মেধাতালিকায় তৃতীয়
আমি তখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। আমার বড় ভাই বিসিএস পরীক্ষা দেবেন। তিনি খুব তোড়জোড় দিয়ে নিয়মিত পড়ছেন। আমি মাঝে মাঝে তাঁর পড়া ধরতাম। পড়া ধরতাম মানে হচ্ছে—ভাইয়া পড়তেন আমি সেই পড়া বইয়ের সঙ্গে মিলাতাম। বিশেষ করে সাধারণ জ্ঞানের পাঠ। সে সময় থেকে সাধারণ জ্ঞানের বিষয়গুলো জেনে খুব আনন্দ পেতাম। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতাম আমি বিসিএস ক্যাডার হব—এমনটি কেউ ভাববেন না! পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থেকে মাধ্যমিক পাঠ শেষে ভর্তি হয়েছিলাম ঢাকার মতিঝিল মডেল কলেজে। আমার বাবার ইচ্ছা ছিল আমি চিকিৎসক হই। আমিও স্বপ্ন দেখতাম, চিকিৎসক হব। কিন্তু জীবনের নানা পথপরিক্রমা আমাকে নিয়ে আসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ভর্তি হই উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পেলাম অসাধারণ সব শিক্ষকদের, সহপাঠী বন্ধুদের। আমার জ্ঞানের স্বর্গরাজ্য থেকে শিখলাম সাহিত্য, মৃত্তিকাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—আরও অনেক কিছু। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আমার পবিত্র বিদ্যাপীঠ, আরাধনার স্থান। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি দিন সঠিকভাবে কাজে লাগাতে চেয়েছি। প্রতিনিয়ত পাঠ্য বিষয়ের পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞান আর ইংরেজি পড়েছি আলাদাভাবে। একদিন আমার স্নাতক পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হলো। আমি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছি। আমার স্বপ্ন তখন আকাশছোঁয়া। তারপর স্নাতকোত্তরেও হয়েছি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। পড়তে থাকি বিসিএস পরীক্ষার জন্য। বিসিএস পরীক্ষার আগে আমি খুব বেশি সময় পাইনি। তবে চেষ্টা করেছি সর্বোচ্চ। আমার সে চেষ্টা আর অধ্যবসায় আমাকে সফল করেছে। আমি ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধাতালিকায় তৃতীয় হয়েছি। আমার কাছে সফলতার মূল সূত্র—সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন। আর আমার এই অর্জনের পেছনে রয়েছে আমার পরিবারের প্রত্যেকের অসামান্য অবদান। বিশেষ করে আমার স্বামীর সহযোগিতার কথা বলতেই হবে আলাদা করে।
আমার কাছে বিসিএস হচ্ছে সারা জীবনে আমি যা শিখলাম, তার পরীক্ষা। নতুনদের প্রতি পরামর্শ হচ্ছে—বিসিএস পরীক্ষায় ভালো করতে নিয়মিত অধ্যয়ন করুন, অধ্যবসায়ী হোন।

অনুলিখন: সজীব মিয়া, রাফিয়া আলম ও জান্নাতুল ফেরদৌস

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়