নির্বাচনব্যবস্থা তছনছ, প্রশ্নের মুখে আ.লীগ



বিশেষ প্রতিনিধি | আপডেট: ০৩:০৫, এপ্রিল ০২, ২০১৪ প্রিন্ট সংস্করণ
এরশাদ-উত্তর গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গত ২৩ বছরে দাঁড় করানো নির্বাচনব্যবস্থা কার্যত তছনছ হয়েছে এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে। উৎসবের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠা নির্বাচন এবার কেন্দ্র দখল, ব্যালটে গণহারে সিল মারা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তায় অনেকটাই বিবর্ণ ছিল। এর দায় গিয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ওপর।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন এর আগের সরকারের পাঁচ বছরে (২০০৯-২০১৩) অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনগুলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ছিল এবং তার পূর্ণ কৃতিত্বের দাবি করত আওয়ামী লীগ। তখন বিরোধী দলের নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি নাকচ করে দিয়ে ওই উদাহরণ টানতেন শেখ হাসিনাসহ দলের নেতারা। তাঁরা ‘বাংলার মাটিতে ভোট ডাকাতি’ চিরতরে কবর দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করতেন।
এরপর চলতি বছরের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন করে আবার ক্ষমতায় আসার দুই মাসের মাথায় পাঁচ পর্বে অনুষ্ঠিত হলো উপজেলা নির্বাচন। প্রথম দফার নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হলেও পরবর্তী সময়ে ক্রমেই সহিংসতা, অনিয়ম, কেন্দ্র দখল ও জোরজবরদস্তির ঘটনা বাড়তে থাকে। বিপুল ক্ষমতা থাকলেও নির্বাচন কমিশন নিষ্ক্রিয় থাকে। অনিয়ম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা প্রশাসন অনিয়মকেই সহযোগিতা দেওয়ায় সর্বশেষ দুই পর্বে নির্বাচনী অপকর্ম সীমা অতিক্রম করে। অনেক উপজেলায় ভোট গ্রহণ শুরুর আগেই সিল মারা ব্যালট বাক্সে ভরে রাখা হয় প্রশাসনের সহায়তায়। প্রতিপক্ষ এমনকি দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীকেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে কোণঠাসা, এলাকাছাড়া করার অনেক ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের সেই গর্বের জায়গাটি আর রইল না বলে মনে করছেন খোদ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও। ব্যক্তিগত আলাপে তাঁরা প্রথম আলোর কাছে তা স্বীকারও করেছেন।
এবার পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত ৪৫৯টি উপজেলার মধ্যে পাঁচটির ফলাফল স্থগিত রয়েছে। বাকি ৪৫৪টি উপজেলার মধ্যে ২২১টিতে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ও ১৫৩টিতে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত ৩৬ জন, জাতীয় পার্টির (জাপা) তিনজন ও অন্যান্য ৪১ জন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
বিএনপি ও জামায়াত অংশ নেওয়ায় এ নির্বাচন অনেকটা জাতীয় নির্বাচনের আবহ পায়। মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আগ্রহের সৃষ্টি হয়। প্রথম ধাপের নির্বাচনে সরকারি দল-সমর্থিত প্রার্থীরা কমসংখ্যক উপজেলায় বিজয়ী হওয়ার পর থেকেই পরবর্তী ধাপের নির্বাচনগুলোয় কেন্দ্র দখল ও জোরজবরদস্তি শুরু হয় এবং ক্রমে তা বাড়তে থাকে। ধাপে ধাপে সহিংসতা ও জোরজবরদস্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ফল ভালো হয়েছে।
অবশ্য এসব অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ মানতে রাজি নন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব। উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রচার সমন্বয়কের দায়িত্ব পালনকারী দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোট কারচুপি হলে আমরা বগুড়ায় কেন হারলাম? গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ সদর এবং পীরগঞ্জেও তো আমরা জয়ী হতে পারিনি।’
প্রসঙ্গত, বগুড়া বিএনপি-অধ্যুষিত এলাকা। গোপালগঞ্জ ও পীরগঞ্জ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর নির্বাচনী এলাকা। কিশোরগঞ্জ সদর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের নির্বাচনী এলাকা।
অবশ্য ওবায়দুল কাদের এটাও বলেছেন, কিছু অনিয়ম, ভুলত্রুটি আছে। কিছু সহিংসতা হয়েছে। তা ছাড়া দলের অন্তঃকলহ একটা সমস্যা ছিল। এগুলো থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা হবে।
পাঁচ ধাপে নির্বাচনী সহিংসতায় মোট ১০ জন নিহত এবং কয়েক শ আহত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ও ভোট কারচুপি হয়েছে বৃহত্তর নোয়াখালী, বৃহত্তর বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলে। সিলেট ও রাজশাহী বিভাগে সহিংসতা কম থাকলেও কারচুপির অভিযোগ আছে। ঢাকা বিভাগের কোথাও কোথাও সহিংসতা এবং কারচুপি হয়েছে। তুলনামূলকভাবে রংপুর বিভাগে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। বেশ কিছু প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতার এলাকায় সরকারি দলের প্রভাব বিস্তারের খবর পাওয়া গেছে। আবার মুন্সিগঞ্জ, গাজীপুরের শ্রীপুরসহ কিছু এলাকায় সরকারি দলের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে টাঙ্গাইল-৮ উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকেরা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাকে চাপ প্রয়োগ করে একটি স্থগিত কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা করিয়ে নেন। অবশ্য নির্বাচন কমিশন পরে স্থগিত কেন্দ্রের ফলাফল বাতিল করে দেয়।
বিরোধী দলের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ ও সরকারের শীর্ষ পর্যায় ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত স্থানীয় ও বিভিন্ন উপনির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে তাঁদের অধীনে হওয়া অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে গর্ব করতেন। প্রধানমন্ত্রীসহ দলের শীর্ষ নেতারা বলতেন, তাঁদের সময়ে পাঁচ হাজারের বেশি স্থানে নির্বাচন হলেও তা নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলতে পারেনি। বিরোধী দলও কোনো অভিযোগ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের ওই বক্তব্য দেশি-বিদেশি মহল মেনেও নিয়েছিল।
কিন্তু এবারের উপজেলা নির্বাচন আওয়ামী লীগ সরকারের সেই গর্বের জায়গাটি শেষ হয়ে গেছে বলে সরকারি দলের অনেক নেতা স্বীকার করেছেন।
আওয়ামী লীগের অনেকেই মনে করেন, উপজেলা নির্বাচনে শক্তি প্রয়োগ করায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে বিরোধী দল নতুন করে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাঁরা অতি উৎসাহী কিছু নেতা ও আমলাকে দায়ী করেন। এ নির্বাচনে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরেই সমালোচনা আছে। অবশ্য এসব নেতার কেউই সংবাদপত্রে উদ্ধৃত হয়ে কিছু বলতে রাজি হননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের পতনের পর গত ২৩ বছরে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের একটা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। সিল মেরে ভোটের বাক্স ভরার সংস্কৃতি মানুষ ভুলতে বসেছিল।
জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া সরকারি দলের সুযোগ ছিল। সে সুযোগ তারা নষ্ট করেছে। মনে হচ্ছে, আমরা আবার আশির দশকে ফিরে এলাম। এরশাদের পতনের পর যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা হেলায় ধ্বংস করলাম।’ তিনি এ জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে দায়ী করেন।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়