গোপন ক্যামেরার কথা


অনলাইন ডেস্ক | আপডেট: 
স্মৃতি ইরানির ছবি ধারণ করা হচ্ছিল গোপন ক্যামেরায়মাত্র কয়েক দিন আগের কথা। দোকানের পোশাক পরিবর্তন কক্ষে (ট্রায়াল রুম) পোশাক পাল্টাতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলেন ভারতের মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী স্মৃতি ইরানি। তাঁর পোশাক পরিবর্তনের ছবি ধারণ করা হচ্ছিল গোয়ার ফ্যাবইন্ডিয়া নামের ওই দোকানের গোপন ক্যামেরায়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের এই ঘটনাটি সিসিটিভির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কীভাবে এল সিসিটিভি?
গোপনে ভিডিওর মাধ্যমে নজরদারির ব্যবস্থা বা সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন) এখন বেশ পরিচিত। কিন্তু কীভাবে এল এই সিসিটিভি? সিসিটিভির ইতিহাস জানতে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কয়েক বছর আগে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।
১৯৪২ সালে জার্মানিতে প্রথম সিসিটিভি ব্যবহৃত হয়। জার্মানির ভি-২ রকেট উৎক্ষেপণের দৃশ্য ধারণ করতে একটি কারিগরি পদ্ধতি হিসেবে সিসিটিভির ব্যবহার শুরু হয়। এই সিসিটিভি তৈরি করে সিমেন্স এজি। জার্মানির প্রকৌশলী ওয়াল্টার ব্রুচ এটির কারিগরি নকশা ও সিস্টেম ইনস্টল করেন। টেলিভিশন সম্প্রচারযন্ত্রের মতো একটি অ্যান্টেনা ব্যবহার করে যে কেউ সিসিটিভির ফুটেজ দেখার সুযোগ পেতেন। তবে সার্কিটের বাইরের কেউ তা দেখার সুযোগ পেতেন না। এই রেকর্ডিং তারের মাধ্যমে বা পিয়ার টু পিয়ার (স্বাধীন গ্রাহক থেকে গ্রাহকের মধ্যে যোগাযোগ) তারহীন যোগাযোগের মাধ্যমে সম্প্রচার করার সুবিধা ছিল। ‘সিসিটিভি’ শব্দটি সাধারণত নজরদারি করার ক্যামেরার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। বাণিজ্যিকভাবে চল্লিশের দশকের পর থেকে সিসিটিভির ব্যবহার শুরু হয়।
সেই সময়কার সিসিটিভির সঙ্গে আধুনিককালের সিসিটিভির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য চোখে পড়ে। ওই সময় সিসিটিভির দৃশ্য রেকর্ড এবং তা সংরক্ষণ করার সুযোগ ছিল না। অধিকাংশ সিস্টেম তখন সব সময় নজরদারিতে রাখতে হতো। এর পরই ম্যাগনেটিক টেপের উদ্ভাবন ও ব্যবহার শুরু হলে তাতে ভিডিও রেকর্ড করে রাখার সুবিধা যুক্ত হয়। রিল-টু-রিল সিস্টেমে অবশ্য অনেক বেশি সময় লাগত এবং এর খরচও ছিল অনেক বেশি। বর্তমান সময়ের তুলনায় সে সময়ে রিলের স্টোরেজ ক্ষমতাও ছিল অনেক কম এবং ম্যানুয়াল সিস্টেমে তা ধারণ করতে হতো। এ ধরনের অসুবিধার কারণেই সিসিটিভির ব্যবহার তখন জনপ্রিয় হয়নি। সত্তরের দশকে ভিডিও ক্যাসেট রেকর্ডিং প্রযুক্তির উদ্ভাবনের ফলে তথ্য রেকর্ড ও মুছে ফেলার সুবিধা সহজতর হয়ে যায় এবং নজরদারি করার প্রযুক্তিও পরিচিত হয়ে ওঠে। একসঙ্গে একাধিক ডেটা স্ট্রিম করার জন্য মাল্টিপ্লেক্সিং পদ্ধতির উন্নয়ন, সুলভ ডিজিটাল স্টোরেজ পণ্যের কারণে পরবর্তী সময়ে সিসিটিভি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আধুনিক সিসিটিভি নেটওয়ার্কে নজরদারির কাজের জন্য একসঙ্গে একাধিক ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়।
প্রথম সিসিটিভির ব্যবহারগোপন ক্যামেরা
যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধ ঠেকাতে প্রথম সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয় ১৯৬৮ সালে নিউইয়র্কের অলিনের রাস্তায়। ১৯৭৩ সালে টাইমস স্কয়ারেও বসানো হয় ক্যামেরা। আশির দশকে এসে সিসিটিভি নেটওয়ার্কের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে অপরাধ ঠেকানোর জন্য সিসিটিভির ব্যবহার শুরু হয় আশির দশকে এসে। বর্তমানে ব্যাংক থেকে শুরু করে রাস্তা, অফিস, দোকান এমনকি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বাড়িতেও সিসিটিভি বসানো হচ্ছে।
অপরাধ ঠেকাতে সিসিটিভি কতটুকু ভূমিকা রেখেছে
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিসিটিভি নেটওয়ার্কের পর্যবেক্ষণে মিশ্র ফলাফল দেখা যায়। ২০০২ সালে জাপানের টোকিওতে সিসিটিভি বসানোর পরে গাড়ি চুরি ও সহিংসতা কমে যাওয়ার কিছুটা লক্ষণ দেখা যায়। এ ছাড়াও অসলো, লন্ডন, আমস্টারডামসহ বেশ কয়েকটি শহরে ডাকাতি ও গাড়ি চুরির ঘটনা কমার প্রমাণ মেলে। গ্লাসগো, বেইজিং, সাংহাই, মস্কো, শিকাগোর মতো শহরেও সিসিটিভি বসানোর ফলে অপরাধ কমেছে।
আধুনিক সিসিটিভির সুবিধা
মূলত নিরাপত্তা ক্যামেরার সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে সরাসরি কাজ করে এ পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম। এতে প্রতিষ্ঠানের যেসব জায়গা গুরুত্বপূর্ণ, সেসব স্থানে ক্যামেরা লাগানোর পর সেটি ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় আনা হয়। ক্যামেরায় ধারণ করা চলমান ছবি মনিটরে দেখা যায় সরাসরি। পুরো কার্যক্রমটি পরিচালিত হয় একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে। সাধারণত সিসিটিভি শুধু তথ্য সংরক্ষণ করে, যা পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন হলেই ব্যবহার করা হয়। বর্তমান সময়ে রিয়াল টাইম সার্ভিলেন্স মনিটরিং ব্যবস্থা নামে আরও উন্নত ব্যবস্থাও ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কার্যক্রমে নিরাপত্তার বিষয়টি যে কেউ তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারেন। যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এ ব্যবস্থায় চাইলে নিজের স্মার্টফোন কিংবা ট্যাবলেট থেকেও নিরাপত্তার বিষয়টি দেখা সম্ভব।
গোপন ক্যামেরা থেকে নিরাপদ থাকার পরামর্শ
১. কখনো ট্রায়াল রুমে গিয়ে পোশাক খুলে ফেলবেন না। বরং কাপড়ের ওপর তা পরীক্ষা করে দেখুন। ট্রায়াল রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে ফেলুন এবং খেয়াল করে দেখুন কোনোভাবে নজরদারি করা হচ্ছে কি না বা কোথাও কোনো ক্যামেরা বসানো রয়েছে কি না। আশপাশে কোথাও কাপড় ঝোলানো থাকলে তার আড়ালে কোনো ক্যামেরা আছে কি না, পরীক্ষা করে দেখুন।
২. টয়লেট বা ওয়াশ রুমে গিয়ে একবার অন্তত গোপন ক্যামেরা বা সিসিটিভির অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন। বিশেষ করে হোটেল, বিউটি পারলার, দোকানের ট্রায়াল রুমে সতর্ক থাকুন।
৩. ট্রায়াল রুমে সাধারণত আয়না থাকে। আঙুল ঠেকিয়ে দেখুন তা সত্যিকারের আয়না কি না। কারণ, নকল আয়নার মাধ্যমে দৃষ্টি বিভ্রম ঘটিয়ে প্রতারণা করা হতে পারে। আসল আয়নার সঙ্গে নকল আয়না বা ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস যুক্ত থাকতে পারে। এতে একপাশ থেকে নিজের চেহারা দেখা গেলেও অন্যপাশ থেকে কেউ দেখছে কি না তা বোঝার উপায় থাকে না। এ ধরনের আয়না শনাক্ত করতে আঙুল আয়নার ওপর রাখুন। যদি আপনার আঙুলের মাথার প্রতিবিম্ব আঙুলের মাথার সঙ্গে না লাগে (মাঝে যদি ফাঁকা থাকে) তাহলে আয়নাটি সাধারণ বা আসল। আর যদি আঙুলের মাথা প্রতিবিম্বের মাথার সঙ্গে লেগে যায়, তার মানে আয়না নকল।
৪. গোপন ক্যামেরা থাকতে পারে, এমন স্থানে আপনার সন্দেহ হলে চারপাশে কোথাও ছিদ্র আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখুন। দরজা-জানলা বা দেয়ালের ফাঁকফোকর দিয়ে মোবাইলে কেউ ছবি তুলছে কি না, তা-ও খেয়াল রাখতে হবে। সিসিটিভি বা মোবাইলে তোলা এ ফুটেজ অনেক ক্ষেত্রে নানা অশ্লীল সাইটে বিক্রি বা ব্ল্যাকমেইল করা হয়।
৫. অপরিচিত স্থানে ঘুমানোর আগে উজ্জ্বল আলো নিভিয়ে রাখা ভালো।
৬. এখন বড় বড় মার্কেট থেকে শুরু করে ছোটখাটো দোকানেও গোপন ক্যামেরা থাকতে পারে। অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএসে গোপন ক্যামেরা শনাক্তকরণ অ্যাপস পাওয়া যায়। প্রয়োজনে এ ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করে দেখে নিতে পারেন কোথাও ক্যামেরা লুকানো রয়েছে কি না। সচেতন থাকুন।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়