পুলিশের অস্ত্র পকেটে রাখার জন্য নয় অপরাধী দমনের জন্য-প্রধানমন্ত্রী |
প্রকাশের সময় : ২০১৫-০৪-১৬ | আপডেট : ২০১৫-০৪-১৬ ০০:৩৭:৪৫ Share on - 1184 বিশেষ সংবাদদাতা : প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ক্রসফায়ারে মানুষ মরলে মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা হয়। পুলিশ তো আইনের মধ্যে সব করছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে একটা শ্রেণী আছে তাদের জন্য মায়াকান্না করে। কেউ যদি অপরাধ করে পুলিশের তো রাইট আছে মানুষের জানমাল বাঁচানো। আর মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য যেটা দরকার সেটা করতে হবে। আমরা বাধ্য হয়েছি পুলিশকে সেই নির্দেশ দিতে। আমরা স্পষ্ট বলেছি যে, অস্ত্র পকেটে রেখে দেয়ার জন্য নয়, অপরাধীকে দমন করার জন্য। অপরাধীকে দমন করতেই হবে। তিনি বলেন, যারা আগুনে পুড়ে গেলো অথবা পোড়া ঘা নিয়ে এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, যাদের পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে তাদের জন্য যতটা চিন্তা, তার চেয়ে যারা এ অঘটন ঘটাতে গেছে, ঘটাতে গিয়ে তাদের ওপর আঘাত এসেছে অথবা মারা গেছে সেই অপরাধীদের জন্য যত মায়া। কিন্তু কেন? গতকাল গণভবনে নববর্ষ-১৪২২ উপলক্ষে সম্পাদক, কলামিস্ট, লেখক ও টেলিভিশন টক-শো’তে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। অনুষ্ঠানে পয়লা বৈশাখ উদযাপন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেকে বাংলা নববর্ষকে সুন্দরভাবে বরণ করে নিয়েছেন। আমার আশা, বাংলা নববর্ষে নবযাত্রা শুরু হবে। বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন আরো দ্রুতগতিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একেবারে নিকট অতীতে যে ঘটনাগুলো ঘটে গেল, সেই হরতাল-অবরোধের নাম করে ৯৩ দিন পর্যন্ত যিনি হরতাল-অবরোধ ডাকলেন, তিনি নিজেই নিজেকে অবরুদ্ধ রেখে মানুষ খুন করা শুরু করলেন। আর জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে মারা, এর থেকে জঘন্য কাজ আর হতে পারে না। কারণ, এগুলো চোখে দেখে সহ্য করা যায় না। তিনি বলেন, কীভাবে অন্তঃসত্ত্বা মা, ছোট্ট শিশু, ছেলেমেয়ে, বাবার সামনে সন্তান, সন্তানের সামনে বাবা-মা-বোন, বাবা- মেয়ে এই যে পুড়ে পুড়ে মরে যাওয়া বা খেটে খাওয়া মানুষ, একটা বাসের ড্রাইভার, বাসের হেলপার। কাজের শেষে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে বাসের ভেতরে, জানে, দেখতে পাচ্ছে; যাতে বেরোতে না পারে, দরজা আটকে সেখানে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া এটা তো জঘন্য ঘটনা, বর্বরতা।শেখ হাসিনা বলেন, একটা মানুষের জন্য যদি ৫০টা মানুষ বাঁচানো যায়। তো কোনটা সঠিক হবে? এই ৫০টা মানুষকে বাঁচানো নাকি ওই অপরাধীকে বাঁচিয়ে আরও ৫০ মানুষকে হত্যা করার সুযোগ করে দেয়া? তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে আমি অদ্ভূত একটা বিষয় দেখি যারা ক্ষতিগ্রস্ত, নিহত তাদের জন্য দুঃখ নেই, দুঃখ হলো, যারা অপরাধী তারা কেন মারা গেলো? আমাদের দেশে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে একটা শ্রেণীর কাছে তা মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়! যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকরের বিরুদ্ধে বাইরের শক্তির অবস্থানের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফাঁসির ব্যাপারে আজকে আন্তর্জাতিকভাবে এত কিছু বলা হয়। ফাঁসি কি হচ্ছে না? ফাঁসি কি হয়নি? ঈদের দিন সাদ্দামকে ফাঁসি দেয়া হলো। সাদ্দামের ফাঁসি দেখে তারাই আবার হাত তালি দেয়। সাদ্দাম যে অপরাধ করেছে, ’৭১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধীরা তার চেয়ে জঘন্য অপরাধ করেছে। এই লাদেন, সাদ্দাম, গাদ্দাফিকে কারা সৃষ্টি করেছে, কারা মেরেছে, কারা মেরে আবার খুশি হচ্ছে। তারা অপরাধ করলে তাদের শাস্তি দেয়া যাবে, আমার দেশে যারা একই অপরাধ করেছে তাদের শাস্তি হলে কেন মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে? মানবতাবিরোধীদের বিচারের রায় কার্যকর না করতে, ফাঁসি না দিতে অনেক উঁচু জায়গা থেকে অনুরোধ করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে তাদের মানবাধিকার রক্ষা করতে হবে কেন? সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকরের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ইতোমধ্যে দুটি রায় কার্যকর করেছি। আমরা বাকিগুলো কার্যকর করব। যত বাধাই আসুক এটা আমরা করব। লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও টকশো’র আলোচকদের উদ্দেশ্যে করে শেখ হাসিনা বলেন, অনেক সময় দেখি যারা মারা গেলেন, যারা নির্যাতিত হলেন, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হলেন, তাদের কথা চিন্তা না করে; যারা ক্ষতি করছে, যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, সেই মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের মানবাধিকার নিয়ে সবাই খুব সোচ্চার হয়ে পড়েন। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীর মানবাধিকার নিয়ে সবাই ব্যস্ত। কিন্তু যে আপনজন হারা সে বোঝে ব্যাথাটা কোথায়। এ একটা অদ্ভূত বিষয় আমি দেখি, অপরাধীদের জন্য তাদের মায়াকান্না। তিনি বলেন, আমরা রায় কার্যকর করতে শুরু করেছি। আপনারা দেখেছেন যে, এ বিচারের রায় কার্যকর করতে গিয়ে কত উঁচু জায়গার টেলিফোন, ফাঁসি যেন দেয়া না হয় সেই অনুরোধ পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ৪৫ বছরে আমাদের যতটুকু এগোনোর কথা ততটুকু এগোতে পারিনি। আমরা পিছিয়েছি। কারণ, যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করার পর এক পক্ষ ষড়যন্ত্র করে। তারা পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে দেশকে পিছিয়ে দিয়েছে। পঁচাত্তরের পর কেবল দেশ পিছিয়েছে। একের পর এক ষড়যন্ত্র হয়েছে। একের পর এক ক্যু হয়েছে। মতিঝিল থেকে হেফাজতে ইসলামীর কর্মীদের সরিয়ে দেয়ার ঘটনা নিয়ে মিথ্যাচারের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, রটনা করা হলো ২০০০ মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে। যখন বারবার ডিমান্ড করা হল, তালিকা চাওয়া হল তারা তো ২০০ মানুষের তালিকা দিতে পারেনি। ৬১ জনের যে তালিকা দেয়া হলো সেখানেও অনেককে দেখা গেল যে, ‘আমি তো মরি নাই, আমি এখনো বেঁচে আছি’। এরাই হল, মানবিধকার সংরক্ষণ করার দায়িত্বে আছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটা ধোঁকাবাজি খেলা হল। তিনি বলেন, প্রচার-অপপ্রচার, লেখা-নানা ধরনের কথাবার্তা। স্বাভাবিকভাবেই এটা মোকাবিলা করতে আমি জানি। কারণ, যে মুহূর্তেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে শুরু করেছি তখন অনেক কিছু মোকাবিলা করতে হবে। মতবিনিময়ে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সমালোচনা আপনারা করবেন, তাতে কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু এমন কিছু করবেন না যাতে, ওই সন্ত্রাসী গ্রুপ বা যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাই চায়নি, তাদের হাত শক্তিশালী হয়। এটুকুই সহযোগিতা চাইব। বাংলাদেশকে ‘উন্নত, সমৃদ্ধ’ এবং ২০২০ সালের মধ্যেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার জনগণের সেবা করতে ক্ষমতায় এসেছেÑ নিজের ভাগ্য গড়তে নয়। বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমান সরকারের হাতে চলতি মেয়াদের মাত্র ৩ বছর ৯ মাস সময় আছে একথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সময় খুব অল্প, কিন্তু আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। ২০১৯ সালে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগে সব উন্নয়ন কর্মসূচি একটি বিশেষ পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা বিজয়ী জাতি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যেতে হবে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছি। এজন্য যে কেউ যেকোন চ্যালেঞ্জ দিক না কেন, তা আমরা মোকাবেলা করবো এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। সততাই তার সরকারের মূল শক্তি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল পদ্মা সেতু ইস্যুতে আমাদের ভাবমূর্তি ম্লান করতে চেয়েছিল। আমরা এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি এবং নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন স্থগিত করেছিল। তারা ভেবেছিল যে ওদের অর্থ ছাড়া আমরা এ সেতু নির্মাণ করতে পারবো না। কিন্তু আমরা তাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করেছি। পদ্মা সেতু হবে অসাধারণ এক স্থাপনা, এর জন্য বাংলাদেশের মানুষ গর্ববোধ করবে। মতবিনিময়ে অন্যদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শাসসুজ্জামান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, লেখক সেলিনা হোসেন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল, কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ কে এম শামীম চৌধুরী, বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল, উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন, মামুন-অর-রশিদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। -
See more at: http://www.dailyinqilab.com/details/

Comments