শিক্ষকবাসে হামলা তাহলে করাই যায়!
- Get link
- X
- Other Apps
আমি এর আগেও লিখেছি, আমরা যাঁরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই, আমাদের বেতন এবং অন্যান্য সুবিধা এত কম হওয়া সত্ত্বেও আজও প্রতিটি বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে বের হওয়া ছেলেটি বা মেয়েটি প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার চেষ্টাই করেন। আমি ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, কেন তাঁরা এত অল্প সুযোগ-সুবিধার চাকরিতে আসতে চান? সবারই এক কথা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি সম্মানজনক। হায়, সারা পৃথিবী এবং দেশ যখন মুক্তবাজার অর্থনীতির করালগ্রাসে খাদক-সমাজে পরিণত হয়েছে, তখনো সবচেয়ে ভালো ফলাফল করা শিক্ষার্থীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চান সেই বিত্তবৈভবহীন একধরনের সম্মানের জন্য। কিন্তু তাঁদের জীবন যে খুব মূল্যবান নয় আর, সেটি বেশ বোঝা যাচ্ছে। ভাবছিলাম, এমন ঘটনা যদি পাকিস্তান আমলে হতো, তাহলে কী হতো? দেশে কি আগুন জ্বলে উঠত না? কিংবা আজকের দিনেও, ধরা যাক, বিজিএমইএ, আইনজীবী, ডাক্তার, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ বা সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়িতে যদি এমন বোমা হামলা করা হতো, তাহলেও কি এমনই মৃদু থাকত গণমাধ্যম? নিশ্চুপ থাকত সারা দেশ? তাহলে শিক্ষকদের ওপর এহেন বর্বরোচিত ঘটনা কেন কোনো অভিঘাত তৈরি করতে পারল না জনপরিসরে? ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি বলেই তো! কাদের ওপর সংঘটিত অন্যায়কে এভাবে নীরবে পার করে দেওয়া যায়? যাঁদের অবস্থান সমাজ আর গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না।
এই নীরবে পার করে দেওয়ার ব্যাপারটি মাথায় এল যখন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ঘটনার সাধারণ বিবরণ পড়তে গিয়ে দেখলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবাসের ওপর হামলা এই প্রথম নয়। এ মাসের শুরুতেই অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়গামী শাটল ট্রেন লক্ষ্য করে হাতবোমা ছোড়া হয়েছিল চৌধুরীহাট এলাকার এক মাঠ থেকে। শহরের পাহাড়তলী এলাকায় একটি শিক্ষকবাসকে ভাঙচুর করা হয়েছে ৪ সেপ্টেম্বর। বোঝাই যাচ্ছে, শিক্ষকদের বাস কোনো একটি গোষ্ঠীর ক্রমাগত হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। খুব জানতে ইচ্ছে করে, এই দুই ঘটনার পরে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? গণমাধ্যমে কি এসেছিল ঘটনাগুলো যথাযথভাবে? ১০ দিনের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়-বাসে বোমা হামলা করার পরেও যেহেতু ÿশিক্ষকেরা প্রাণে বেঁচে গেছেন, তাই হয়তো ১০ সেপ্টেম্বরের এত বড় ঘটনাটিও সেভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি দেশবাসীর। টক শোর বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে পারেনি এমন ঘটনাও। অথচ ঘটনাটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর ক্রমাগত হামলার এক আপাতসাফল্য। পুরো সাফল্য কী ভয়াবহ হতে পারে, সে কথা ভাবতে চাই না বলেই কী করা যেতে পারে—সেটি নিয়ে চিন্তা করার অনুরোধ জানাই দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রথম, তারপরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকার-বিরোধী দলসহ রাজনীতিবিদ এবং অন্য সবাইকে।
গত ২৪ আগস্ট ইসলামী ছাত্রশিবিরের আধিপত্য রয়েছে মর্মে পরিচিত সোহরাওয়ার্দী হল থেকে পুলিশ হাতবোমা ও স্থানীয়ভাবে তৈরি অস্ত্র উদ্ধার করার পরে হলটি বন্ধ করলে গত ৩১ আগস্ট ‘আবাসিক হল শিক্ষার্থী’দের ব্যানারে একটি ছাত্র ধর্মঘট ডাকা হয়। সাধারণ ছাত্রসমাজের ব্যানারে যাঁরা আন্দোলন করছিলেন, ছাত্রলীগের দাবি অনুযায়ী তাঁরা ছাত্রশিবিরের কর্মী। পুলিশের দাবিও তাই। অন্যদিকে ছাত্রশিবির ছাত্রলীগের অন্তর্কোন্দলকে দায়ী করেছে। পুলিশ যাঁদের গ্রেপ্তার করেছে এবং যাঁদের অন্তত দুজন ১০ সেপ্টেম্বরের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন, তাঁরা শিবির কর্মী। যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বিচলিত করেছে আমাকে তা হলো, গ্রেপ্তারকৃতরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী। কোন রাজনীতি তবে সরাসরি ছাত্রদের নিয়োজিত করে শিক্ষকদের মেরে ফেলার জন্য? বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রভাষক শ্রাবন্তী সাহা প্রশ্ন করেছেন, ‘আমরা তো যাচ্ছিলাম তাদের পড়ানোর জন্য, তাদের সেশনজট যেন কমে, তারা কীভাবে আমাদের ওপর হামলা করতে পারল?’ (দ্য ডেইলি স্টার, ১২ সেপ্টেম্বর) এই প্রশ্নটিতেই ফিরতে হবে বারবার, সমস্যার সমাধান করতে চাইলে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে যাঁরা ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করেছেন, তাঁদের ভালো করে জিজ্ঞাসাবাদ করে মূলে পৌঁছানো হোক। বিষয়টি যদি অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে মিলিয়ে যায়, তার চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না। বন্ধ হল খুলে দেওয়া আর বৈধ ছাত্রদের হলে তুলে দেওয়ার দাবি নিয়ে যে ছাত্র ধর্মঘটের সূচনা ৩১ আগস্ট, আর তারপরই ১ সেপ্টেম্বর, ৪ সেপ্টেম্বর ও ১০ সেপ্টেম্বর লাগাতারভাবে শিক্ষকদের বাসে-ট্রেনে হামলাকে নিরীহভাবে নেওয়ার সুযোগ কম।
প্রকাশ্য দিনের আলোয় ক্রমাগত এই কাজ যাঁরা করে যাচ্ছেন, তাঁদের ধরতে পারতে হবে। যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকেরা তাঁদের বাসে করে কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছিলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একজন সাধারণ শিক্ষক হিসেবে আমার এটুকু চাওয়া নিশ্চয়ই খুব বেশি নয়। কিন্তু যাঁরা এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন, তাঁদের কাছে আমার একার কণ্ঠস্বর পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাই আমি যাঁদের একজন, সেই শিক্ষকসমাজকে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাই।
শিক্ষকবাসে ককটেল হামলা, ১৪ জন আহতআরেকটি ১৪ ডিসেম্বর আমরা দেখতে চাই না। দীর্ঘকাল ধরে আমরা মেধার সংকটে ভুগছি। ১৯৭১ সালে কারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল, অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে কারা চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছিল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাহের, অধ্যাপক ইউনুসকে কারা জবাই করেছিল, আজ কারা সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবাসে ১০ দিনের মধ্যে তিনবার আক্রমণ করল—এসব বিন্দুকে জোড়া লাগানো খুব কঠিন কিছু নয়। প্রয়োজন আন্তরিক ইচ্ছা। সরকার সেই আন্তরিক ইচ্ছাটুকু দেখাবে, বিশ্বাস করতে চাই।
আমাদের অনেক না-থাকার মধ্যেও গণমাধ্যম কিছু কিছু জায়গায় পৌঁছে যায় এবং প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে পারে, রাখে। আমি বিশ্বাস করি, ১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়গামী শাটল ট্রেন লক্ষ্য করে যে হাতবোমা ছোড়া হয়েছিল, তা যথাযথভাবে জনপরিসরের দৃষ্টিসীমায় নিয়ে আসা সম্ভব হলে, তার সুরাহা করা গেলে ৪ সেপ্টেম্বর আর ১০ সেপ্টেম্বরের ঘটনা রোধ করা যেত। সেই সুরাহা করা যায়নি বলেই ঘাতক জেনেছে শিক্ষকবাসে হামলা তাহলে করাই যায়। এই অরক্ষিত অবস্থানের যে নিশ্চিন্তিকে কাজে লাগিয়ে ঘাতকেরা তৎপর, সেই নিশ্চিন্তিকে আঘাত করা না গেলে শিক্ষকদের বাসে বোমা হামলা থামবে না। আমাদের নির্লিপ্তি যেন আমাদের গলায় বারেবারে ছুরি ধরে কিংবা আমাদের বাসে বোমা হামলা করে পার না পায়, সেটুকুর জন্যই যত আকুতি। শিক্ষকদের বাসে হামলা হলে দেশবাসী যেন নড়েচড়ে বসে, অন্তত সেটুকু গুরুত্ব দিয়ে গণমাধ্যম এসব খবর প্রচার করবে, সেই আশা এখনো ছাড়তে চাইছি না।
ড. কাবেরী গায়েন, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
- Get link
- X
- Other Apps
Comments