সরকার, তুমি কার?
- Get link
- X
- Other Apps
হাসান ফেরদৌস | আপডেট: ০০:০৬, মে ২৯, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ
আমেরিকায় ডেমোক্রেটিক রাজনীতিকেরা ‘এল’ (অর্থাৎ লিবারেল) শব্দটি ছিনেজোঁকের মতো এড়িয়ে চলেন৷ অন্য যে নামে ইচ্ছা ডাকুন, কিন্তু লিবারেল বলা যাবে না৷ এর এক ব্যতিক্রম এই এলিজাবেথ ওয়ারেন৷ দুই বছর আগে ম্যাসাচুসেটস থেকে মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই এলিজাবেথ আমেরিকার উদারনৈতিক মহলে জনপ্রিয়৷ এ দেশে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে মস্ত বিবাদ হলো সরকারের ভূমিকা নিয়ে৷ রক্ষণশীল রিপাবলিকানদের যুক্তি, সরকারের ভূমিকা যতটা সম্ভব কাটছাঁট করতে হবে৷ কেউ কেউ সম্ভব হলে পুরো সরকার নামক প্রতিষ্ঠানটি তুলে দিতে আগ্রহী৷ তা যখন পারা যাচ্ছে না, তখন নিয়মকানুন কমিয়ে এনে ব্যবসা-বাণিজ্য ও নাগরিক জীবনের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ সীমিত করতে হবে৷ অন্যদিকে, উদারনৈতিকদের বক্তব্য, সরকারের ভূমিকা খাটো করে আনার ফল দাঁড়াবে বাজারব্যবস্থার ওপর সব দায়দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া৷ তাতে অবশ্য ধনী ও ক্ষমতাবানদের কোনো সমস্যা নেই৷ কিন্তু যারা অভাবী ও অক্ষম, তাদের সাহায্য করার আর কেউ থাকবে না৷ সরকারের একটা বড় কাজই হলো এই ক্ষমতাহীনদের পাশে দাঁড়ানো৷
একসময় এডওয়ার্ড কেনেডি অথবা টিপ ও’িনলের মতো রাজনীতিকেরা গর্বের সঙ্গে উদারনৈতিক নামের চাদর গায়ে জড়াতেন৷ বিল ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে সে চাদর ছুড়ে ফেলে নিজেদের মধ্যপন্থী হিসেবে প্রমাণ করার৷ অধিকাংশ সামাজিক প্রশ্নে তাঁরা উদারনৈতিক হবেন, কিন্তু অর্থনীতির কথা উঠলে বাজারব্যবস্থার ওপর আর কোনো বড় বাপ নেই৷ এখানে তাঁদের সঙ্গে রিপাবলিকান রক্ষণশীলদের কোনো তফাত নেই৷
এই নিয়মের এক বড় ব্যতিক্রম এলিজাবেথ ওয়ারেন৷ এমনিতে হার্ভার্ডের অধ্যাপক, কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের মতো ধৈর্য ও স্বচ্ছতা নিয়ে তিনি সরকারের ভূমিকা প্রশ্নে বিরুদ্ধবাদীদের সব যুক্তি-তর্ক খণ্ডন করে চলেছেন৷ স্বাভাবিকভাবেই রিপাবলিকানরা তাঁকে দুচক্ষে দেখতে পারেন না, কিন্তু দেশের উদারনৈতিক মহলে তিনি ‘ডার্লিং’৷
এলিজাবেথ ওয়ারেনের যুক্তিগুলো খুব স্পষ্ট৷ যারা সরকারের ভূমিকা ‘ফুঁ ফুঁ’ করে উড়িয়ে দেয়, তাদের উদ্দেশে তাঁর প্রশ্ন, ঠিক আছে, তোমরা সরকার চাও না৷ তাহলে বিমানে চলাচলের জন্য তোমাদের কোনো ট্রাফিক কন্ট্রোলারের প্রয়োজন নেই৷ ফুড ইন্সপেক্টররা কী বলল, তা জানার অপেক্ষা না করেই তোমরা খাবার কিনে খাবে৷ ঘরে আগুন ধরলে নিজেরাই তা নেভাবে, তার জন্য কোনো সরকাির দমকলকর্মীর প্রয়োজন নেই৷
সরকারের ভূমিকাকে বাদ দিতে চায় কারা, সে ব্যাপারেও এলিজাবেথ ওয়ারেন স্পষ্টবাক৷ যারা কোনো জবাবদিহির বিপক্ষে, যারা কর ফাঁকি দিতে চায় বা চুরি করে ফায়দা লোটে, একমাত্র তারাই চায় সরকার দুর্বল হোক৷ যারা সবল, যাদের পকেটে রেস্ত আছে, ঘরে ডাকাত পড়লে যারা নিজেরা লাঠি-বন্দুক নিয়ে প্রতিরোধ করতে পারে, তাদের সরকার না হলেও চলে৷ কিন্তু যারা দুর্বল ও অভাবী, বিপদের সময় যাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই, সরকার ছাড়া, বিশেষ করে গণকল্যাণমুখী সরকার ছাড়া, কার মুখের দিকে তারা তাকাবে?
এলিজাবেথ সম্প্রতি ফাইটিং চান্স নামে আত্মজৈবনিক একটি বই লিখেছেন৷ স্মৃতিকথা, নিজের বড় হয়ে ওঠার গল্প, কিন্তু তারই ফাঁকে ফাঁকে তাঁর লড়াইয়ের কাহিনি৷ অর্থনীতি প্রশ্নে নীতিনির্দেশক বিভিন্ন পরামর্শও রয়েছে৷ এলিজাবেথ ওয়ারেনের সমীকরণ অনুসারে, আমেরিকার সরকার সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত নয়৷ যে ধনিক গোষ্ঠীর কোলে চেপে তারা ক্ষমতায় বসে, দেশের তাবৎ আইনকানুন করা হয় তাদের স্বার্থ সুরক্ষার কথা মাথায় রেখেই৷ অতএব, এলিজাবেথের সরল উপসংহার, এই সরকার আমার নয়৷ চলতি সরকারব্যবস্থার আগাপাছতলা না বদলালে দেশের বৃহদংশ মানুষের অধিকার সংরক্ষিত হবে না৷
আমেরিকার শাসনব্যবস্থার যে গঠনকাঠামো, তাতে ক্ষমতার গোছা ধরা থাকে ক্ষমতাবান একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে৷ যাদের হাতে টাকার গোছা, রাজনীতির সব কলকাঠি তারাই নাড়ে৷ বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার রাজনীতির কাঠামোগত কোনো সমতা নেই, কিন্তু এই এক ক্ষেত্রে তারা যেন গলায় গলায় সই৷ সবচেয়ে যারা অসৎ, তারাই সবচেয়ে অধিক ক্ষমতার অধিকারী৷ রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের ক্ষমতাও তাদের সর্বাধিক৷ এই সাধারণ মিল সত্ত্বেও একটা জায়গায় আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের মস্ত ফারাক৷ হ্যঁা, এ কথা ঠিক, এ দেশের সরকারও গৃহস্থের বদলে চোরের পাহারায় অধিক ব্যস্ত৷ কিন্তু একবার যদি সে চোর ধরা পড়ে, রক্ষা পাওয়া তার জন্য খুব সোজা নয়৷
বাংলাদেশের বেলায় যে চোর, সে-ই পুলিশ৷ আপনি যদি টাকার পাহাড়ের মালিক হন, সাত খুন করেও মাফ পেয়ে
যাবেন৷ আমি কথাটা আক্ষরিক অর্থেই বলছি৷ ভাবুন, মাত্র ছয় কোটি টাকা দিয়ে আপনি সাতজন মানুষ খুন করে তাদের লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিতে পারেন৷ আরও ছয় বা তার চেয়ে কিছু বেশি মালকড়ি ঢাললে খুনের সরদারকে (অর্থাৎ, যার টাকায় খুন হলো) বিদেশে পাচার করা যায়৷ এর সবটাই বেআইনি, অথচ কোনোটাই বেআইনি নয়৷ খোদ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাই যদি এই মহান দায়িত্ব পালনে নেতৃত্ব দেয়, তাহলে তাকে বেআইনি বলার কোনো সুযোগই তো থাকে না৷
দেশের শাসনব্যবস্থা এখন কতটা অসুস্থ, গলা-পচা আকার নিয়েছে, তা বোঝার জন্য শুধু র৵াবের দিকে তাকিয়ে দেখুন৷ এরা আমাদের দেশের সবচেয়ে এলিট নিরাপত্তা বাহিনী৷ এত দিন পত্রপত্রিকায় অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার কাজে র৵াবকে ব্যবহার করা হয়েছে৷ কিন্তু এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন, বিগত সরকারের আমলে র৵াবের হাতে মানুষ খুন হতো৷ সম্প্রতি খালেদা জিয়া র৵াবকে বিলুপ্ত করা না হলে আন্দোলন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিলে তাঁর জবাব হিসেবে ১৪ মে গণভবনে দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভার সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যখন র৵াব দিয়ে বিএনপির নেত্রী হত্যা করতেন, তখন ভালো ছিল৷ অপারেশন ক্লিন হার্টে হত্যা করে দায়মুক্তি দিয়েছিলেন৷ এখন ব্যবহার করতে পারছেন না৷ এ জন্যেই র৵াব বন্ধের কথা বলছেন৷’ (প্রথম আলো, ১৫ মে, ২০১৪)
কী ভয়াবহ কথা! প্রধানমন্ত্রী নিজে জানাচ্ছেন, এই র৵াব একসময় মানুষ খুন করত৷ তিনি সে কথা জানেন, অথচ তাঁদের কারও বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন, কই, এমন কথা তো শুনিনি! এখনো যাঁরা আইন-নিরাপত্তাব্যবস্থার দায়িত্বে, তাঁরা তো সেই বাহিনীরই লোক৷ সেই একই লোক, কাজকর্মেও কোনো পরিবর্তন নেই৷ তাহলে জেনেশুনে এমন লোকদের পেলেপুষে রাখা কেন? এমন অবস্থা বদলই বা হবে কবে, কীভাবে?
এ প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য কার কাছে যাব, তা আমার জানা নেই৷ গত্যন্তর না পেয়ে আমি এলিজাবেথ ওয়ারেনের শরণাপন্ন হতে মনস্থ করেছি৷ তাঁর বই পড়ে শিখেছি, সরকার অনেকটা ফুলগাছের মতো৷ সময়মতো যত্ন না পেলে, তাতে আগাছা জন্মে, পরগাছা সেখানে আশ্রয় নেয়৷ সত্যিই তো, যেসব খুনি সরদার এখন দাবি করছে, তারা ফুলের মতো পবিত্র, সুবহে সাদিকে ঘুম ভেঙে তারা তাহাজ্জতের নামাজ আদায় করে, তারা আসলে তো ওই পরগাছা৷ সরকার নামক বটবৃক্ষের গা ঘেঁষে তারা দিব্যি হাত-পা ছড়িয়ে বেঁচে থাকে৷
এই অবস্থা বদলাবেন কী করে? এলিজাবেথ ওয়ারেন তাঁর নিজের জীবনের উদাহরণ দিয়ে বলছেন, সমাজ ও সরকার বদলাতে হলে লড়তে হয়৷ আর সে লড়াই দীর্ঘ ও বন্ধুর৷ খুব সহজে বিজয় আসে না, কিন্তু একদম কখনো বিজয় অর্জিত হবে না, সে কথাও সত্যি নয়৷ প্রমাণ এলিজাবেথ নিজে৷ সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তিনি সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন৷ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জন্য যে এজেন্সির প্রস্তাব তিনি রেখেছিলেন, এখন তা বাস্তবে পরিণত হয়েছে৷ ব্যাংকিং-ব্যবস্থার ওপর নানাবিধ নজরদারিমূলক আইনকানুন হয়েছে, তাও মুখ্যত তাঁর নেতৃত্বে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের কারণেই৷
আহা, একজন এলিজাবেথ ওয়ারেনের জন্য আরও কত দিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে?
২৭ মে, ২০১৪, নিউইয়র্ক
lহাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
দেশের শাসনব্যবস্থা এখন কতটা অসুস্থ, গলা-পচা আকার নিয়েছে, তা বোঝার জন্য শুধু র৵াবের দিকে তাকিয়ে দেখুন৷ এরা আমাদের দেশের সবচেয়ে এলিট নিরাপত্তা বাহিনী৷ এত দিন পত্রপত্রিকায় অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার কাজে র৵াবকে ব্যবহার করা হয়েছে৷ কিন্তু এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন, বিগত সরকারের আমলে র৵াবের হাতে মানুষ খুন হতো৷ সম্প্রতি খালেদা জিয়া র৵াবকে বিলুপ্ত করা না হলে আন্দোলন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিলে তাঁর জবাব হিসেবে ১৪ মে গণভবনে দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভার সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যখন র৵াব দিয়ে বিএনপির নেত্রী হত্যা করতেন, তখন ভালো ছিল৷ অপারেশন ক্লিন হার্টে হত্যা করে দায়মুক্তি দিয়েছিলেন৷ এখন ব্যবহার করতে পারছেন না৷ এ জন্যেই র৵াব বন্ধের কথা বলছেন৷’ (প্রথম আলো, ১৫ মে, ২০১৪)
কী ভয়াবহ কথা! প্রধানমন্ত্রী নিজে জানাচ্ছেন, এই র৵াব একসময় মানুষ খুন করত৷ তিনি সে কথা জানেন, অথচ তাঁদের কারও বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন, কই, এমন কথা তো শুনিনি! এখনো যাঁরা আইন-নিরাপত্তাব্যবস্থার দায়িত্বে, তাঁরা তো সেই বাহিনীরই লোক৷ সেই একই লোক, কাজকর্মেও কোনো পরিবর্তন নেই৷ তাহলে জেনেশুনে এমন লোকদের পেলেপুষে রাখা কেন? এমন অবস্থা বদলই বা হবে কবে, কীভাবে?
এ প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য কার কাছে যাব, তা আমার জানা নেই৷ গত্যন্তর না পেয়ে আমি এলিজাবেথ ওয়ারেনের শরণাপন্ন হতে মনস্থ করেছি৷ তাঁর বই পড়ে শিখেছি, সরকার অনেকটা ফুলগাছের মতো৷ সময়মতো যত্ন না পেলে, তাতে আগাছা জন্মে, পরগাছা সেখানে আশ্রয় নেয়৷ সত্যিই তো, যেসব খুনি সরদার এখন দাবি করছে, তারা ফুলের মতো পবিত্র, সুবহে সাদিকে ঘুম ভেঙে তারা তাহাজ্জতের নামাজ আদায় করে, তারা আসলে তো ওই পরগাছা৷ সরকার নামক বটবৃক্ষের গা ঘেঁষে তারা দিব্যি হাত-পা ছড়িয়ে বেঁচে থাকে৷
এই অবস্থা বদলাবেন কী করে? এলিজাবেথ ওয়ারেন তাঁর নিজের জীবনের উদাহরণ দিয়ে বলছেন, সমাজ ও সরকার বদলাতে হলে লড়তে হয়৷ আর সে লড়াই দীর্ঘ ও বন্ধুর৷ খুব সহজে বিজয় আসে না, কিন্তু একদম কখনো বিজয় অর্জিত হবে না, সে কথাও সত্যি নয়৷ প্রমাণ এলিজাবেথ নিজে৷ সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তিনি সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন৷ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জন্য যে এজেন্সির প্রস্তাব তিনি রেখেছিলেন, এখন তা বাস্তবে পরিণত হয়েছে৷ ব্যাংকিং-ব্যবস্থার ওপর নানাবিধ নজরদারিমূলক আইনকানুন হয়েছে, তাও মুখ্যত তাঁর নেতৃত্বে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের কারণেই৷
আহা, একজন এলিজাবেথ ওয়ারেনের জন্য আরও কত দিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে?
২৭ মে, ২০১৪, নিউইয়র্ক
lহাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
- Get link
- X
- Other Apps
Comments