নীল সময়


তানজিনা হোসেন | আপডেট:  | প্রিন্ট সংস্করণ
সন্তান হওয়ার পরের বিষাদগ্রস্ততা স্বাভাবিক একটা ঘটনা, সবার উচিত এ সময় মাকে বোঝার চেষ্টা করা। প্রতীকী এই ছবির মডেল হয়েছেন তূর্যি। ছবি: কবির হোসেনসন্তান হওয়ার পর মায়ের দৈনন্দিন রুটিন বদলে যায়। দিন–রাত পুরোটা সময়ই দিতে হয় তাকে। মনে হয়, তাঁর জীবন বুঝি শোবার ঘরে বন্দী হয়ে গেল। বিশেষ করে প্রথম সন্তান হওয়ার পর একধরনের বিষণ্নতায় পেয়ে বসে বেশির ভাগ মাকে। এই বিষাদগ্রস্ততাকে বলে ‘পোস্ট পারটাম ব্লু’।
প্রথম সন্তান জন্মের আনন্দ ও উত্তেজনা আসলেই অন্য রকম ছিল। জন্মের আগে আলট্রাসনোগ্রামের সাদাকালো অস্পষ্ট ছবিতে বোকার মতো অনাগত সন্তানের অবয়ব খুঁজেছি, নাম নিয়ে খুনসুটি করেছি, দিন যতই ঘনিয়ে আসছিল, ততই অজানা উত্তেজনায় অধীর হয়ে উঠছিলাম। তারপর আসে সেই দিনগুলো; মাথার ওপর বুক কাঁপানো অপারেশন থিয়েটারের তীব্র আলো, চিকিৎসকদের টুকটাক কথাবার্তা, একঝলক টুকটুকে এক পুতুলের মুখ, তারপর তীব্র ব্যথা, ব্যথানাশক ইনজেকশনের পর গভীর ঘুম, স্বপ্ন আর তন্দ্রার মধ্যে সিস্টারদের খোশ গল্পের আওয়াজ, ব্রেস্ট ফিডিংয়ে বারবার ভুল ও ব্যর্থতা, নবজাতকের জন্ডিস, ফটোথেরাপি, পুরো রাত কেবিনে শিশুর তীব্র কান্না আর চিৎকার।
একদিন চিকিৎসক রাউন্ডে এসে দেখেন আমি হাপুস নয়নে কাঁদছি। কী ব্যাপার? কাঁদতে কাঁদতে বলি, আমি বাড়ি যাব, এখানে একটুও ভালো লাগছে না। চিকিৎসক দ্রুত ছাড়পত্র দিয়ে দেন। আমি প্রথম বাচ্চা নিয়ে হাসতে হাসতে বাড়ি যাই—বাড়িতে নিশ্চয় ভালো লাগবে। কিন্তু কী মুশকিল! কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসতে চায় আমার। দিন নেই রাত নেই, সময় নেই অসময় নেই, জীবনটা এই শোবার ঘরে বন্দী হয়ে গেছে। বাইরের পৃথিবীতে কত আলো, কত বাতাস, কত প্রজাপতি, কত পাখি ওড়ে—কিছুই আর আমার নয়। আমার জীবনে কেবল শিশুর কান্না, ওকে খাওয়ানো, কাঁথা-কাপড় পাল্টানো, গোসল করানো, সারা রাত জাগা, ঘুমচোখে আবারও জেগে থাকা, এমনকি ঠিকমতো খাওয়ারও সময় নেই, ফুরসত নেই একটা ভালো পোশাক পরার। বই তো দূরের কথা, পত্রিকাও চোখে দেখি না, জানি না কত কী হয়ে যাচ্ছে বিশ্বে। ক্রমে নিজের ওপর বিতৃষ্ণা এল, আমার কাজ, অফিস, রোগীদের সঙ্গে নানা আলাপচারিতা, অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে গল্প-গুজব, স্বামীর সঙ্গে যখন-তখন ঘুরতে যাওয়া, শহরের নানা অনুষ্ঠান উৎসব—সব মনে হলো হারিয়ে গেছে, যেন চিরকালের মতো। সরকারি চাকরির সুবাদে স্বামীর তখন ঢাকার বাইরে পোস্টিং, যখনই ঢাকায় আসে, দেখে আমি মুখ কালো করে আছি, কী হয়েছে তার উত্তরে দুচোখ পানিতে ভাসে। কী মুশকিল! লজ্জাও হয়—মা হওয়ার পর মেয়েরা কত আনন্দে ভাসে, আর আমি এসব কী করছি! ছি ছি! লোকে কী ভাববে!
বহুদিন পর আবিষ্কার করেছি, আমার আসলে যা হয়েছিল, তার নাম ‘পোস্ট পারটাম ব্লু’। নিজে চিকিৎসক হওয়ার কারণে এ সম্পর্কে খানিকটা আগে থেকেই জানা ছিল, কিন্তু নিজেই যখন আক্রান্ত হলাম, তখন বুঝতেই পারিনি! সন্তান জন্মের পর কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত মায়ের হৃদয়টা মেঘাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। তাই এর নাম ব্লু, যেন বেদনার নীল। এ সময় মেয়েরা খিটখিটে হয়ে ওঠে, বিষাদগ্রস্ত থাকে, মুড ওঠানামা করে, ঘুম ও রুচিতে হেরফের হয়, কখনো একা একা কাঁদে।
কেন এই সমস্যা হয়, তা নিয়ে নানা মত আছে। আকস্মিক হরমোনের ভারসাম্যহীনতাকে দায়ী করা হয় অনেক সময়। আবার হঠাৎ পাল্টে যাওয়া দিনলিপি, সন্তানের যত্ন নিয়ে মায়ের উৎকণ্ঠা বা অপরাধবোধ, অতিরিক্ত দায়িত্ব—সব মিলিয়ে মনোজগতে একটা পরিবর্তন হয়। গবেষকেরা বলছেন, ৮৫ শতাংশ নারীই এই সমস্যায় ভুগতে পারেন। প্রথম সন্তানের বেলায় বেশি। ইচ্ছার বিরুদ্ধে গর্ভধারণ, যথেষ্ট সামাজিক সহযোগিতা বা সমর্থন না থাকা, পরিবারে এ ধরনের সমস্যার ইতিহাস, নানা ধরনের সোশ্যাল স্টিগমা (যেমন মেয়েসন্তান হওয়া বা চাপা রঙের সন্তান হওয়া ইত্যাদি) ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। সন্তান প্রসবের পর কাছের মানুষদের সমবেদনা ও সহমর্মিতা, সন্তানকে সামলাতে সবার সার্বিক সহযোগিতা সমস্যাকে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে অনেকটাই। তবে এসব সমস্যা যদি আট সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থেকে যায়, উপসর্গগুলো বাড়তে থাকে এমনকি কোনো নারী যদি আত্মহত্যা বা এ ধরনের গুরুতর কোনো কিছু চিন্তা করেন, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পোস্ট পারটাম ব্লু বা সন্তান প্রসবোত্তর বিষাদগ্রস্ততা খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা, এ সময় মাকে একটু বুঝতে চেষ্টা করুন, তাঁর নানা অদ্ভুত আচরণ সহানুভূতির সঙ্গে মেনে নিন। তাঁকে এই কঠিন সময় উত্তরণে সহায়তা করুন।
একটি মেয়ে জীবনের নানা বাঁকে নানা ধাপে নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতা পেরিয়ে চলে, তার মধ্যে সবচেয়ে জটিল হলো এই মা হওয়ার অভিজ্ঞতা। তাঁর পাশে থাকুন। তাঁকে এই সময় থেকে উঠে আসার জন্য হাত বাড়িয়ে দিতে হবে পরিবারের সদস্যদেরই।
আর নীল সময়ের মধ্যে যদি পড়েই যান তবে নিজেকে বলতে হবে আপনি তো জয়িতা! এই চমৎকার অভিজ্ঞতাকে উপভোগ করুন। ভয় পাবেন না, এই পৃথিবী আপনারই আছে, এই আলো এই হাওয়া প্রজাপতির ওড়াউড়ি ফড়িংয়ের জীবন আপনারই আছে। কোনো কিছুই আপনাকে থামাতে পারবে না।
লেখক: চিকিৎসক

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়