বাংলাদেশ এগিয়ে নিক মাহফুজাকে


নাইর ইকবাল | আপডেট: 
নতুন স্বপ্ন পূরণে পৃষ্ঠপোষকদের সাহায্য চান মাহফুজা। ছবি: প্রথম আলো।ছোটবেলায় মাহফুজার অসম্ভব অভিমান হয়েছিল মায়ের ওপর। শিশু একাডেমি থেকে পাওয়া তাঁর একটি সোনার পদক বাধ্য হয়েই বিক্রি করতে হয়েছিল মা করিমুন্নেসাকে। স্বামীর চিকিৎসার জন্য। জীবনের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন যিনি, তিনি একটি সোনার পদক জমিয়ে রাখার বিলাসিতা দেখান কী করে! 

মেয়ের অভিমানী চেহারাটা দেখে মাথায় হাত বুলিয়ে মা বলেছিলেন, ‘একটু গুছিয়ে উঠি, আমি তোর এই সোনার মেডেল আবার ফিরিয়ে দেব।’ অভিমান হলেও জীবন-সংগ্রামের প্রয়োজনটা বোঝার বুদ্ধিটা কিশোরী মাহফুজার ছিল। চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এমন আরও পদক জেতার। মাহফুজার সেই প্রত্যয় থেকেই গর্বিত আজ তাঁর দেশ। শিলংয়ে দক্ষিণ এশীয় গেমসে সাঁতার পুলে ঝড় তুলে জিতে নিলেন দুটি সোনার পদক। প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে কোনো দক্ষিণ এশীয় গেমসে সাঁতারে সোনার পদক জিতে নাম লেখালেন তিনি ইতিহাসে। 

যশোরের অভয়নগরে বেড়ে ওঠা মাহফুজার জীবনটা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না কোনো দিনই। বরং কাঁটা বিছানো পথেই তাঁকে হাঁটতে হয়েছে নিরন্তর। একটু জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই বাবা আহমেদ গাজীকে অসুখে ধুঁকতে দেখছেন। মা করিমুন্নেসা একার চেষ্টায় চালিয়ে নিয়েছেন সংসারটা। এর মধ্যে মাহফুজার পেয়ে বসা খেলার নেশাটাকেও অনেক সময় চাপই মনে হয়েছে করিমুন্নেসার কাছে। মেয়ে যে সারা দিন সাঁতার নিয়েই মগ্ন। মাঝে মধ্যে মেয়ের পিঠে কিল-ঘুষিও যে মারেননি, তা-ও নয়।
বাবা ছিলেন একজন ক্রীড়াবিদ। দুর্ধর্ষ কাবাডি খেলোয়াড়। তারুণ্যে জেলা পর্যায়ে কাবাডি-কোর্ট মাতিয়েছেন। মেয়ের খেলার নেশাটাকে তিনি অনুপ্রাণিত করেছেন জীবনের সবটুকু দিয়েই। অ্যাথলেটিকস কিংবা সাঁতার—যেকোনো একটি খেলাকে বেছে নেওয়ার ইচ্ছা মাহফুজারও ছিল ছোট থেকেই। বড় হয়ে অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকেও দৌড়েছেন। কিন্তু শেষ অবধি বেছে নেন সাঁতারই। সেই সাঁতারেই ইতিহাস। এরপর বাংলাদেশে আরও অনেক সোনা জয় হবে। কিন্তু সাঁতারে এসএ গেমসে প্রথম সোনাজয়ী নারী হিসেবে উঠে আসবে তাঁরই নাম।
সাঁতার তাঁর জীবন-সংগ্রামের অনুষঙ্গও। কিছুটা বেহিসেবি-বৈষয়িক ব্যাপারে উদাসীন বাবা আহমেদ গাজীর সংসারে উপার্জনের চাবিকাঠি এখন মাহফুজার হাতেই। গ্রামের বাড়িতে একটা আধপাকা বাড়ি তুলেছেন সাঁতারের অর্থ দিয়েই। সাঁতারের জন্যই পেয়েছেন নৌবাহিনীর একটি চুক্তিভিত্তিক চাকরি। কিন্তু সচ্ছলতা যাকে বলে সেটা তো আর দেখা হয়নি। বাংলাদেশে ক্রিকেট-ফুটবলের রমরমা। অথচ, অন্য খেলাগুলো কীভাবে চলে, অন্য খেলার ক্রীড়াবিদেরা কতটা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এগিয়ে যান, সেটার খবর অনেকে হয়তো জানেনও না। 
মাহফুজার ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। নিজের এই অনন্য অর্জনের পর মাহফুজার আকুতি একটাই, খেলাটাতে আরও অখণ্ড মনোযোগের নিশ্চয়তা। জীবনযুদ্ধের ডামাডোলে তাঁর ভবিষ্যৎ স্বপ্নগুলো যেন হারিয়ে না যায়, সেই নিশ্চয়তা। 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণায় আপ্লুত মাহফুজা। প্রধানমন্ত্রী গতকালই ঘোষণা দিয়েছেন, যে এসএস গেমসের সোনাজয়ী দুই নারী ক্রীড়াবিদের বাসস্থানের দায়িত্ব তিনি নেবেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ মাহফুজা। মাহফুজা অনেক বেশি খুশি হবেন, যদি তাঁর এই অর্জনের পর কোনো পৃষ্ঠপোষক ভবিষ্যৎ স্বপ্নগুলো পূরণে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে। সেটাই জানালেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে আমি আমার কৃতজ্ঞতা জানাই। মাথা গোঁজার ঠাঁই তো লাগেই, তবে একজন ক্রীড়াবিদ হিসেবে আমি বেশি করে চাই স্পনসর। আমি যেন নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগটা সাঁতারে দিতে পারি, সেই নিশ্চয়তা চাই।’ 
শত প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনায় কোনো ছাড় দেননি মাহফুজা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় ইতিমধ্যে মাস্টার্স পরীক্ষাটা দিয়ে দিয়েছেন। এখন ফলের অপেক্ষায় আছেন। জীবনে অসচ্ছলতার মধ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, ক্রীড়াবিদ হয়ে দেশকে গৌরবের স্বাদ দেওয়া মাহফুজাকে যদি এই দেশ মাথায় তুলে না রাখে, তাহলে কাকে রাখবে! 
জীবনযুদ্ধে কখনো হারেননি। সাঁতার পুলেও হার একেবারেই পছন্দ করেন না। ভবিষ্যতের স্বপ্নপূরণকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছেন। সেই চ্যালেঞ্জ জয়ের পাথেয়টা না হয় মাহফুজার হাতে এই দেশের মানুষই তুলে দিক। 
ধন-মান কিছুই নয়, এই মুহূর্তে মাহফুজার চাওয়া এটিই—একটা স্পনসর।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়