যাপিত জীবনের দিনলিপি-ছয়
- Get link
- X
- Other Apps
ভিকারুন নিসা, সাস্কাতুন (কানাডা) থেকে | আপডেট: ১৯:৪৩, অক্টোবর ২৪, ২০১৫
রোদেলার ক্লাসটা এককোনায়। বিশাল জানালার কার্নিশে লাগানো নানা জাতের সবুজ ছোট ছোট চারা। বাচ্চারাই এসব গাছ লাগিয়ে তার যত্ন নেয়। এ রুমটাও বেশ বড়। বড় জানালা গলিয়ে সূর্যের আলো গাছের পাতায় ছুঁয়ে সারা ঘরে লুটোপুটি করে। কতগুলো গোলটেবিল ঘিরে আছে ছোট ছোট চেয়ার।
ছোট্ট একটা বুক শেলফে নানা রকম গল্পের বই। একপাশে নানা রঙের ছবি আঁকা নীল কার্পেট। বাচ্চাদের গল্পের বই পড়া, পাপেট শো, ফানেল স্টোরি এখানেই হয়। এক কোনায় ছবি আকার স্ট্যান্ড, রং, কাগজ ও অ্যাপ্রোন। আরেক কোনায় মিউজিক সেন্টার। সেখানে ক্যাসেট প্লেয়ার, বাচ্চাদের গানের সিডি, মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট। আছে রং করার রং, কাগজ, পুতুলসহ নানা রকম খেলনা। জাতীয় সংগীত দিয়ে ক্লাস শুরু হয়। তারপর বই পড়া, গান গাওয়া। এরপর শুরু হয় ছবি আঁকা বা কোনো সৃষ্টিশীল কাজ (activity)। সারা দিন কাটে খেলাধুলা আর মজার অ্যাকটিভিটি করে ব্যস্ততার মাঝে। বাচ্চার মস্তিষ্ককে সৃষ্টিশীল, উন্নত করার জন্যই কারিকুলাম তৈরি করা হয়। প্রতি বছরই শিক্ষা নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়। তারাই বের করেন কীভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে স্কুল আরও আনন্দময়, আকর্ষণীয় করা যায়। ক্লাসে প্রচুর গ্রুপ ওয়ার্ক হয়। সৃষ্টিশীলতা, বুদ্ধি, মানবিকতা, নেতৃত্ব, সততা, সামাজিক দক্ষতা, চমৎকার করে উপস্থাপনা—সবই তারা শেখে স্কুলে। পড়াশোনার চাপ থাকে না ক্লাস এইট পর্যন্ত। বাচ্চাদের ছড়া মুখস্থের বালাই নেই। হাতের লেখা সুন্দরের প্রতিযোগিতা নেই। কারিকুলাম এমন যে সারাক্ষণই আনন্দ আর আনন্দ। এরই মাঝে শেখানও হয় অঙ্ক, সাহিত্য ও বিজ্ঞান। সবচেয়ে বড় কথা শেখানো হয় মানবিকতা ও দয়ালু হওয়ার মন্ত্র। তারা স্কুলকে আনন্দের জায়গা মনে করে, ভয়ের নয়। ভালোবেসে পড়াশোনা করে, কারও চাপে নয়।
দুর্বল শিক্ষার্থী বসে শিক্ষকের পাশে। সেরা শিক্ষার্থী বসে ক্লাসে সবার পেছনে। বছর শেষ হলে স্কুল রিপোর্ট কার্ডে শিক্ষার্থীর পরীক্ষার নম্বর থাকে না। সেখানে থাকে তার কোথায় ইম্প্রুভও করতে হবে, সে বিষয়ে মন্তব্য। ক্লাসে কোনো প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় নেই, এমনকি ফেলও নেই। প্রতিদিন স্কুলে গেলেই পাস। কোনো শিক্ষার্থী পড়াশোনায় খুবই অমনোযোগী হলে তাকে ডাক্তারি পরীক্ষা করা হয়। দেখা হয় তার attention deficit disorder (ADD) বা attention deficit hyperactivity disorder (ADHD) আছে কিনা। যদি এই সমস্যা থাকে তবে তাকে একজন সহকারী শিক্ষক সব সময় সাহায্য করেন।
রোদেলা মহাআনন্দে স্কুলে যায়। জ্বর-জারি, ঠান্ডা-কাশি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবকিছু উপেক্ষা করে স্কুলে যাবেই। কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারবে না। সেদিন ছিল শিক্ষা সফর।
দশ ডলার দিতে হবে। যাবে চিড়িয়াখানায়। বছরে এ রকম তিনটা-চারটা সফর থাকে।
একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, কি বলো তো তোমার টিচাররা। দুদিন পর পর পয়সা চায়।
মেয়ে আবার শুদ্ধ বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করে। শুদ্ধ বাংলায় বড় মানুষের মতো গম্ভীর স্বরে বলল, তুমি তো কানাডার স্কুলে পড় নাই, তাই জান না। এটা আমার প্রজেক্টের পার্ট।
আমি মেয়ের বাবাকে ডাকলাম। ও মাগো, তোমার কন্যা এটা কি বলে গো। তুমি এ সব কোথা থেকে শিখলে? আমার চোখ ছানাবড়া। মাথায় হাত দেওয়ার মতো অবস্থা।
মেয়ের বাবা তো মহাখুশি, কন্যার এই সেয়ানাগিরি কথাবার্তা দেখে।
এজাজ মুচকি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কথা তো ঠিকই। স্কুলে বেতন দিতে হয় না। প্রাইভেট শিক্ষক রাখতে হয় না, স্কুলের সামনে বসে থাকতে হয় না। আর কত ফ্রি ফ্রি জিনিস চাও। দশ টাকা দিতে হবে তাতেই এত বিরক্তি। মোটামুটি বড় সরো বক্তৃতা হয়ে গেল। বিরস মুখে টাকা বের করে খামে রাখলাম।
এজাজ অবশ্য কথাটি মিথ্যে বলেনি। এ দেশে স্কুলে বাচ্চারা বিনে পয়সায় পড়ে গ্রেড টুয়েলভ পর্যন্ত। বছরে একবার খাতা কলম কিনে দিতে হয়। বইও কিনতে হয় না। বই থাকে স্কুলে শিক্ষকের কাছে। আমরা মা-বাবারা সেই বইয়ের চেহারাও দেখি না। কারণ পড়াশোনা তো সব স্কুলেই শেষ। পড়াশোনা করে প্রজেক্ট অ্যাপ্রোচে। প্রজেক্টের অংশ হিসেবে যাচ্ছে চিড়িয়াখানায়।
মুখে যাই বলি মনে মনে আফসোস হয়, ইস আমার ছোটবেলার স্কুলটা যদি এমন হতো। কত বেতের বাড়িই না খেয়েছি হক স্যারের কাছে। বা হাতের তালু যেন এখনো জ্বলছে। শরীর কেঁপে ওঠে, ভয়ে আমি হাত গুটিয়ে ফেলি ওড়নার তলায়।
সেদিন ছিল স্কুলের শেষ দিন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা মোমসহ মোমদানি কেনা হয়েছে। মিস্টার ফ্লেচারের জন্য। তিনি রোদেলার শিক্ষক। আজ তার শেষ ক্লাস গ্রেড ওয়ানে। অনেক যত্নে র্যাপিং পেপারে মুড়ে তা আজ সকালে স্কুলে নিয়ে গেছে রোদেলা। সব বাচ্চার হাতেই কিছু না কিছু উপহার। বিকেল তিনটা বিশে স্কুল ছুটি। বাইরের খেলার জায়গায় মিস্টার ফ্লেচার দাঁড়িয়ে আছেন একটা পা বাঁকা করে। তিনি এমন করেই দাঁড়ান। তার মুখে অল্প হাসি, চোখে পানি। তাকে জড়িয়ে ধরে ছয় বছরের ১০-১২টা বাচ্চা ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আশপাশে আরও গোটা দশেক বাচ্চাও অবিরাম কাঁদছে। বাচ্চাগুলো কেউ সাদা, কেউ কালো, এমনকি বাদামিও। অসম্ভব সুন্দর হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এ দৃশ্য দেখে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। আজকের পরে তারা নতুন ক্লাসে যাবে। কিন্তু প্রিয় শিক্ষক মিস্টার ফ্লেচারকে ছেড়ে কিছুতেই তারা যাবে না। অনেক কষ্টে, অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে আমরা মায়েরা যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখনো বাচ্চাগুলো কাঁদছিল। মায়ের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে তারা বাসায় ফিরল। এরপর প্রতি বছর জুনের শেষে প্রাইমারি স্কুল শেষ হয় এবং রোদেলা তার শিক্ষকের জন্য কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসিয়ে বাসায় ফেরে।
আমি এজাজকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন বাচ্চাগুলো কাঁদে প্রতিবছর বল তো?
এজাজ মুগ্ধতা নিয়ে বলে, এই প্রশ্নের উত্তর ভালোবাসা। বাচ্চাদের একটু ভালোবাসা দিয়েই জয় করা যায়।
আমিও এটা বিশ্বাস করি। এ দেশের স্কুলের শিক্ষকদের মূলমন্ত্রই এটা। এ দেশে বাচ্চাদের বকাও দেওয়া যায় না। গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা। সুন্দর করে কথা বলা, বন্ধুর মতো ব্যবহার, ওদের বয়সী হয়ে যাওয়া, মজা করা, সহানুভূতিশীল হওয়া এসবই শিক্ষকেরা প্রথম শিখে আসেন তাদের প্রশিক্ষণ থেকে।
এ দেশে যারা বাচ্চাদের সঙ্গে কাজ করতে পছন্দ করেন তারাই চার বছরের বিএড ডিগ্রি করে শিক্ষক হন। বিএড ডিগ্রি ছাড়া শিক্ষক হওয়া যায় না। এই চার বছরে চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট (child development) থেকে শুরু করে সাইকোলজি (physiology), ইথিক্স (ethics) সবই তাদের পড়তে হয়। আর তারা যা শেখেন তা বিশ্বাসও করেন।
এমন চমৎকার শিশু স্বর্গে আমার মেয়ে বড় হচ্ছে, একজন মা হিসেবে এর চেয়ে বেশি আর কী আমি চাইতে পারি? আমার মেয়ের মুখের হাসি-আনন্দ আমাকে নতুন করে বেঁচে থাকার, প্রতিকূলতা কাটিয়ে নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখায়। আমি সুখী-সুখী ভাব নিয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে তুষার ঝরা সকালে স্বপ্নের সুতো বুনি। পুরোটাই ঘিরে থাকে শুধু একজন, আমার মেয়ে রোদেলা।
রোদেলা মহাআনন্দে স্কুলে যায়। জ্বর-জারি, ঠান্ডা-কাশি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবকিছু উপেক্ষা করে স্কুলে যাবেই। কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারবে না। সেদিন ছিল শিক্ষা সফর।
একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, কি বলো তো তোমার টিচাররা। দুদিন পর পর পয়সা চায়।
মেয়ে আবার শুদ্ধ বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করে। শুদ্ধ বাংলায় বড় মানুষের মতো গম্ভীর স্বরে বলল, তুমি তো কানাডার স্কুলে পড় নাই, তাই জান না। এটা আমার প্রজেক্টের পার্ট।
আমি মেয়ের বাবাকে ডাকলাম। ও মাগো, তোমার কন্যা এটা কি বলে গো। তুমি এ সব কোথা থেকে শিখলে? আমার চোখ ছানাবড়া। মাথায় হাত দেওয়ার মতো অবস্থা।
মেয়ের বাবা তো মহাখুশি, কন্যার এই সেয়ানাগিরি কথাবার্তা দেখে।
এজাজ অবশ্য কথাটি মিথ্যে বলেনি। এ দেশে স্কুলে বাচ্চারা বিনে পয়সায় পড়ে গ্রেড টুয়েলভ পর্যন্ত। বছরে একবার খাতা কলম কিনে দিতে হয়। বইও কিনতে হয় না। বই থাকে স্কুলে শিক্ষকের কাছে। আমরা মা-বাবারা সেই বইয়ের চেহারাও দেখি না। কারণ পড়াশোনা তো সব স্কুলেই শেষ। পড়াশোনা করে প্রজেক্ট অ্যাপ্রোচে। প্রজেক্টের অংশ হিসেবে যাচ্ছে চিড়িয়াখানায়।
সেদিন ছিল স্কুলের শেষ দিন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা মোমসহ মোমদানি কেনা হয়েছে। মিস্টার ফ্লেচারের জন্য। তিনি রোদেলার শিক্ষক। আজ তার শেষ ক্লাস গ্রেড ওয়ানে। অনেক যত্নে র্যাপিং পেপারে মুড়ে তা আজ সকালে স্কুলে নিয়ে গেছে রোদেলা। সব বাচ্চার হাতেই কিছু না কিছু উপহার। বিকেল তিনটা বিশে স্কুল ছুটি। বাইরের খেলার জায়গায় মিস্টার ফ্লেচার দাঁড়িয়ে আছেন একটা পা বাঁকা করে। তিনি এমন করেই দাঁড়ান। তার মুখে অল্প হাসি, চোখে পানি। তাকে জড়িয়ে ধরে ছয় বছরের ১০-১২টা বাচ্চা ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আশপাশে আরও গোটা দশেক বাচ্চাও অবিরাম কাঁদছে। বাচ্চাগুলো কেউ সাদা, কেউ কালো, এমনকি বাদামিও। অসম্ভব সুন্দর হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এ দৃশ্য দেখে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। আজকের পরে তারা নতুন ক্লাসে যাবে। কিন্তু প্রিয় শিক্ষক মিস্টার ফ্লেচারকে ছেড়ে কিছুতেই তারা যাবে না। অনেক কষ্টে, অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে আমরা মায়েরা যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখনো বাচ্চাগুলো কাঁদছিল। মায়ের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে তারা বাসায় ফিরল। এরপর প্রতি বছর জুনের শেষে প্রাইমারি স্কুল শেষ হয় এবং রোদেলা তার শিক্ষকের জন্য কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসিয়ে বাসায় ফেরে।
আমি এজাজকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন বাচ্চাগুলো কাঁদে প্রতিবছর বল তো?
এজাজ মুগ্ধতা নিয়ে বলে, এই প্রশ্নের উত্তর ভালোবাসা। বাচ্চাদের একটু ভালোবাসা দিয়েই জয় করা যায়।
এ দেশে যারা বাচ্চাদের সঙ্গে কাজ করতে পছন্দ করেন তারাই চার বছরের বিএড ডিগ্রি করে শিক্ষক হন। বিএড ডিগ্রি ছাড়া শিক্ষক হওয়া যায় না। এই চার বছরে চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট (child development) থেকে শুরু করে সাইকোলজি (physiology), ইথিক্স (ethics) সবই তাদের পড়তে হয়। আর তারা যা শেখেন তা বিশ্বাসও করেন।
এমন চমৎকার শিশু স্বর্গে আমার মেয়ে বড় হচ্ছে, একজন মা হিসেবে এর চেয়ে বেশি আর কী আমি চাইতে পারি? আমার মেয়ের মুখের হাসি-আনন্দ আমাকে নতুন করে বেঁচে থাকার, প্রতিকূলতা কাটিয়ে নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখায়। আমি সুখী-সুখী ভাব নিয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে তুষার ঝরা সকালে স্বপ্নের সুতো বুনি। পুরোটাই ঘিরে থাকে শুধু একজন, আমার মেয়ে রোদেলা।
- Get link
- X
- Other Apps
Comments