যাপিত জীবনের দিনলিপি-পাঁচ

ভিকারুন নিসা, সাস্কাতুন (কানাডা) থেকে | আপডেট: 


স্বামী এজাজের সঙ্গে লেখিকাস্বামী এজাজের সঙ্গে লেখিকাগাছের পাতারা হলুদ হয়ে ঝরতে শুরু করেছে। ঘর থেকে বেরোতেই প্রচণ্ড ঠান্ডায় হাত পা জমে যাচ্ছিল। গায়ের পাতলা সোয়েটারের ভেতর দিয়ে হিম ঠান্ডা বাতাস টের পাইয়ে দিল শরীরের প্রতিটা লোমকূপকে তাদের আগমনী বার্তা। শীত মানেই ঘরে বন্দী। বাইরে বেরোনোর জন্য একগাদা কাপর-চোপর। গাড়িতে হিটিং, বাড়িতে হিটিং। তারপরও এটাই প্রকৃতি। এর মাঝেই কানাডীয়রা পার করে দেয় শীতের দিনগুলো। অপেক্ষা করে আরেকটি নতুন বছরের—গ্রীষ্মকালের। আবার ঝলমলে রোদ, উম দেওয়া বাতাস, সবুজ পাতা, রংবেরঙের চমৎকার ফুল, টলটলে লেকের পানি। আবার সে সময়টা ফিরে আসবে। এই অপেক্ষায় থাকে তারা।
অন্যদিকে কানাডায় আমাদের প্রথম শীত। বাইরে ঝকঝকে রোদ। বাইরে বেরিয়ে দেখি ঠান্ডায় হাত-পা জমে যাচ্ছে। কাঁপতে কাঁপতে ইংলিশ ক্লাসে গিয়ে ঢুকলাম। আমার পায়ে স্যান্ডেল।কানাডার প্রাকৃতিক দৃশ্য। সংগৃহীত ছবি
শিক্ষিকা জেনি বললেন, তোমার পায়ে মোজা নাই কেন? তার দুচোখে বিস্ময়।
আমি মোজা পরি না। গরম দেশ থেকে এসেছি। অভ্যাস নাই। আমি নির্বিকার।
কাল যখন বিছানা থেকে উঠতে পারবে না তখন বুঝবে মজা। জেনি মুখের চামড়া কুচকে ও চরম বিরক্তি নিয়ে শীতের সময় সঠিক পোশাক পরার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে লাগলেন ক্লাসে।
আমার বেশ রাগ লাগছিল। এ দেশের লোকজন দেখি খুব তাড়াতাড়ি মুখের চোয়াল শক্ত করে ফেলেন। ক্লাসে বসেই অল্প কাশতে থাকলাম। রাতের বেলায় এল প্রচণ্ড জ্বর। জ্বরে হাত পা কাঁপছে। খেতে গেলে বমি হচ্ছে। প্রচণ্ড মাথাব্যথা।
শীতের দেশে এক সেকেন্ডে ঠান্ডা লাগে। আর তুমি দশ মিনিটের রাস্তা গেছো কাপড় ঠিকমতো না পড়ে। এখন বোঝো মজা। আমাকে ঝাড়ি মারার এই সুযোগ এজাজ কাজে লাগাল। কণ্ঠে রাগ, মুখে বিরক্তি।
আমি কটমট করে তাকালাম। কি বল তুমি? বলে চেঁচিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখি আর কথা বলতে পারছি না। আমার হঠাৎ শ্বাস বন্ধ গেল। আমি দম নিতে পারছিলাম না।
টরন্টোর ইস্ট জেনারেল হাসপাতাল। সংগৃহীত ছবিআমরা যখন টরন্টোর ইস্ট জেনারেল হসপিটালে পৌঁছালাম তখন ইমারজেন্সিতে অনেক লোক অপেক্ষা করছেন। মিষ্টি চেহারার সাদা একজন নার্স আমার কাছে হেলথ কার্ড চাইল। কেন এসেছি হসপিটালে, কি সমস্যা ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন। আমি কথা বলতে পারছিলাম না।
নার্স খুবই সহানুভূতি নিয়ে বললেন, একটু পানি খাবে? ভালো লাগবে, একটু খাও। একটা সাদা কাগজের গ্লাসে পানি নিয়ে এসে আমার হাতে তুলে দিল। আমি এক নিশ্বাসে পানিটুকু শেষ করলাম। সত্যিই এবার একটু ভালো লাগছে।
সব তথ্য নিয়ে নার্স আমাকে বসতে বলল ওয়েটিং রুমে। আমরা তিনজন বসলাম। চমৎকার আসবাব দিয়ে সাজানো রুমটিতে। দেয়ালে বাঁধানো বেশ কটি ছবি—কানাডীয় গ্রীষ্মকালের পাতা ঝরার কাব্য। এক কোনায় আছে ম্যাগাজিনের সেলফ। এক পাশে পানির জার ও কাগজের গ্লাস। বিশাল বড় রুম। এক কোনায় আরেকটি ছোট্ট রুম। ওখানে দেয়ালে একটি ফ্ল্যাট টিভি। চমৎকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। রোদেলাকে রিসেপশন থেকে কাগজ কলম দেওয়া হলো ছবি আকার জন্য। ইতিমধ্যে আমাকে ডাকা হলো ছোট্ট একটি রুমে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই এল তরুণ সাদা একজন ডাক্তার। হাত বাড়িয়ে পরিচিত হলো আমার সঙ্গে। আবার শুরু হলো প্রশ্ন। আমার ও আমার পরিবারের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য নিলেন তিনি। তারপর বললেন, আমার ব্লাড পরীক্ষা ও ইসিজিসহ আরও কিছু পরীক্ষা করার। আধঘণ্টা পর হার্ট স্পেশালিস্ট আসবেন আমাকে দেখতে। তখন রাত বারোটা। মেয়েটা বাবার কোলে ঘুমাচ্ছে। সারা দিন স্কুলে খেলাধুলা করে ভীষণ ক্লান্ত। এজাজকে বললাম, বাসায় চলে যেতে। একটু গাঁইগুঁই করে তারা চলে গেল।কানাডার প্রাকৃতিক দৃশ্য। সংগৃহীত ছবি
আমার রক্ত, ইসিজি ইত্যাদি সব পরীক্ষা হয়ে গেল খুবই তাড়াতাড়ি। আমাকে আবার আধঘণ্টা পর একই রুমে বসানো হলো। দরজা খুলে ঢুকলেন লম্বা, ফরসা, খাড়া নাক, সোনালি চুলের মধ্যবয়সী কার্ডিওলজি স্পেশালিস্ট ডাক্তার। হাত বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। পরিচয়পর্ব শেষ হতেই আমাকে বসতে বলে আমার পায়ের খুব কাছে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসলেন। আমি প্রচণ্ড অস্বস্তি নিয়ে জড়সড় হয়ে গেলাম। কার্ডিও স্পেশালিস্ট বসে আছেন আমার পায়ের কাছে! বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। তিনি আবারও আমার বাবা-মার পরিবারের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সব তথ্য নিলেন হাসি মুখে। তার চোখে আন্তরিকতার ছোঁয়া। কণ্ঠ ভীষণ নরম। আমার জড়তা কেটে গেল তার বন্ধুসুলভ ব্যবহারে। তার হাতে আমার রিপোর্ট। বললেন, আমার ফ্লু হয়েছে। আর বুকে ব্যথা বা শ্বাস কষ্ট সম্ভবত টেনশনে বুকের মাসল শক্ত হয়ে গেছে। তারপরও তারা কনফার্ম হওয়ার জন্য আবার পরীক্ষা করবেন তিন ঘণ্টা পর। কারণ আমার ফ্যামিলি ইতিহাসে আছে হার্টের অসুখ। আমার দেশটা কেমন, কানাডা কেমন লাগছে, এসব ব্যক্তিগত কথাবার্তাও বাদ গেল না। বারবার দুঃখ প্রকাশ করতে থাকলেন আমার জন্য কোনো বিছানা না দিতে পারার জন্য। কারণ তাদের সেদিন প্রচুর রোগী। তিনি আমাকে বললেন, আমার আর কোনো সমস্যা আছে কিনা, যা আমি তাকে বলতে চাই। তার মুখে তখনো চমৎকার সেই হাসি।
আমার তো সব অসুখ ততক্ষণে ভালো হয়ে গেছে তার আন্তরিকতায়। বললাম, না আমার আর কোনো সমস্যা নাই।
তিনি ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছেন। তারপর বললেন, তোমাকে নার্স এসে টাইনোরেল দেবে, তুমি ভালো বোধ করবে তখন। তুমি তাহলে ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা কর। খারাপ বোধ করলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে। তুমি বললে, ডিনার খাওনি। ওষুধ খেয়ে কিছু কিনে খাও ফেন্ডিং মেশিন থেকে। জান কোথাও মেশিন?
আমি মাথা নাড়লাম, না জানি না।
আস তোমাকে দেখিয়ে দিই। দরজা খুলে বের হলেন তিনি। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার পিছু পিছু বেরিয়ে এলাম। হাতের বা দিকের কোনায় প্যাসেজ দেখিয়ে বললেন, ওই মাথায় মেশিন আছে। পারবে ​তো কিনতে? নয় তো কাউকে বলো, তোমাকে সাহায্য করবে।
কানাডার প্রাকৃতিক দৃশ্য। সংগৃহীত ছবিআমি অসম্ভব মুগ্ধতা নিয়ে সোফায় বসলাম। তিন ঘণ্টা পর আবার টেস্ট। ব্যাগে আপেল ছিল। একটা আপেল বের করে তাতে কামড় দিয়ে মনে করার চেষ্টা করলাম বাংলাদেশের আমার অতীত অভিজ্ঞতা। আমি যখন সন্তানসম্ভবা তখন বারডেমের গাইনির প্রধান আমাকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার জন্য কনভিন্স করলেন। তাহলে তিনি নিজে সি-সেকশন করবেন। বাচ্চা হওয়ার পর থাকা-খাওয়া, ইনকিবিউটর ইত্যাদি বাবদ দুই লাখ টাকার বিল ধরিয়ে দিলেন। আব্বাকে নিয়ে একজন বিশিষ্ট মেডিসিনের ডাক্তারের কাছে গেলাম। গিয়ে দেখি তিনজন রোগী এক সঙ্গে দেখেন তিনি। কারণ তার সময় খুবই মূল্যবান। রোগীর তো কোনো প্রাইভেসি নাই-ই। তার সহকারী সব শুনলেন। তিনি শুধু প্রেসক্রিপশন লিখলেন। আরেকবার বারডেমে ভর্তি হয়েছিলাম। নার্সদের রাগী চেহারা আর ডাক্তারদের গম্ভীর মুখ, তাচ্ছিল্য ব্যবহার সবকিছুই সেদিন চোখের সামনে ভাসতে থাকল।
তখন রাত তিনটা বাজে। আমার সব পরীক্ষা আবারও হলো। আমার হার্টে কোনো সমস্যা আছে কিনা, এটা জানা তাদের খুব জরুরি বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু আমার ঘুমে দুচোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি তখন একটা বিছানা চাইছিলাম। রিসেপশনে বললাম, আমি বাসায় যেতে চাই, আমার ঘুম পাচ্ছে।
একজন দৌড়ে গেল ডাক্তারের কাছে। মিনিট দশ পর ডাক্তার এলেন। আমরা আবার পুরোনো রুমটাই ঢুকলাম। তিনি বললেন, আমার রেজাল্ট আসতে একটু দেরি হবে। আমাকে আবার একটু চেক করতে চান। নাক, মুখ, গলা, বুক সবই পরীক্ষা হলো। তারপর আমাকে একটা টাইনোরেলের প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন। কানাডায় প্যারাসিটামলকে বলে টাইনোরেল।
ডাক্তার বললেন, যত দিন জ্বর থাকে চার ঘণ্টা পর পর খাবে। জ্বর থাকবে সাত থেকে দশ দিন। প্রচুর পানি খাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এদিকে আমি মনে মনে ভাবছি, সারা রাত বসিয়ে রেখে দিল কিনা প্যারাসিটামল। একটু অ্যান্টিবায়োটিক দিলে কী হয়। বিরস মুখে বললাম, শুধুই টাইনোরেল? 
হ্যাঁ, তোমার তো মনে হচ্ছে আর কোনো সমস্যা নেই। তুমি বাসায় যাও।
তিনি আমার জুতো জোড়া এগিয়ে দিলেন। হ্যাঙ্গার থেকে আমার কোট নিয়ে পেছন থেকে এগিয়ে ধরলেন। দরজাটা নিজ হাতে খুলে ধরলেন। হাসি মুখে বললেন, ভালো হয়ে যাবে শিগগিরই। বাসায় গিয়ে আরাম করে ঘুমাও।
অসম্ভব মুগ্ধতা নিয়ে বাসায় এলাম এক টাকাও খরচ না করে। এমন চমৎকার মন ভালো করে দেওয়া ব্যবহার কখনো পেয়েছি কিনা মনে করতে পারছিলাম না।
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এজাজ চারটার দিকে আমাকে জাগাল। বলল, তোমার ডাক্তার ফোন করেছিলেন এইমাত্র। সবই ভালো, কিডনি, হার্ট, ফুসফুস। বলল তোমাকে তরল জাতীয় খাবার বেশি খেতে। আর খারাপ লাগলে তোমার ফ্যামিলি ডাক্তারের কাছে যেতে।
আমি এরপর অনেকক্ষণ আর ঘুমালাম না। আমার জীবন যে এত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রথম আবিষ্কার করলাম। আমার বাদামি গায়ের রং, আমার অর্থনৈতিক সামর্থ্য, ভালো ইংরেজি বলতে না পারা, কোনো কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয় ওই হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সদের কাছে। আমি একজন রোগী এটাই আমার পরিচয়। রোগীর জন্য তাদের সর্বোচ্চ সেবাই তারা দিলেন। এ দেশে বিনা চিকিৎসায় কেউ মারা যাবেন না। যত কঠিন কিংবা ব্যয়বহুল অসুখই হোক না কেন। আমি কানাডীয় স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতি বিস্ময়, মুগ্ধতা আর আস্থা নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।
তারপর স্বপ্নে দেখলাম ঝরা পাতায় খালি পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছি, আমার বহু মূল্যবান জীবনটাকে নিয়ে। (ক্রমশ)

তথ্যসূত্রঃ Prothom Alo

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়