যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা—সরল কথা-তিন

উফুল আলম, পেনসিলভানিয়া (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে | ১৯ জানুয়ারি ২০১৭, ২০:১৪

প্রতীকী ছবি। সংগৃহীতপ্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য জিআরই (GRE) ও টোফেল (TOFEL) টেস্টের স্কোর থাকতে হবে। যদি কেউ বিজনেস প্রোগ্রামে গ্র্যাজুয়েট করতে চান (যেমন–এমবিএ), সে ক্ষেত্রে সাধারণত জিআরইর পরিবর্তে জিম্যাট (GMAT) স্কোর লাগে। ব্যাচেলর করতে হলে SAT ও টোফেল থাকতে হবে। SAT একটি স্ট্যান্ডার্ড এক্সাম। আন্ডারগ্র্যাডে ভর্তির জন্য এ দেশের ছেলেমেয়েদেরও এই পরীক্ষার স্কোর থাকতে হয়।
এ দেশে ব্যাচেলর পর্যায়ে স্কলারশিপ খুবই সীমিত। সুতরাং কেউ যদি অসম্ভব ভালো স্টুডেন্ট না হন তাহলে ব্যাচেলরে স্কলারশিপ পাওয়া বেশ কঠিন। স্কলারশিপ না পেলে টিউশন ফি দিয়ে পড়তে হয়। কে কোন প্রোগ্রামে (Study Program) এবং কোন প্রতিষ্ঠানে ব্যাচেলর করবেন, সেগুলোর ওপর নির্ভর করে অর্থের পরিমাণ কম-বেশি হয়। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, এটা খুবই ব্যয়বহুল। এ দেশের ছেলেমেয়েদেরও যদি হাইস্কুলের (দ্বাদশ পর্যন্ত) ফলাফল সন্তোষজনক না হয় তাহলে তাদের টিউশন ফি দিয়ে ব্যাচেলর করতে হয়। এ দেশের শিক্ষার্থীরা অনেকেই শিক্ষাঋণ (Education Loan) নিয়ে ব্যাচেলর করেন। বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে এখানে এসে শিক্ষাঋণ পাওয়া সহজ নয়।
কিছু কিছু কলেজ বা ইউনিভার্সিটি জিআরই ছাড়াই আবেদন গ্রহণ করে। অনেকেই এই বিষয়টি নিয়ে দ্বিধান্বিত। তারা জানতে চান এটা কি করে সম্ভব! আগেই বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক হাজার কলেজ ও ইউনিভার্সিটি আছে। সবগুলো প্রতিষ্ঠানই গবেষণার জন্য সুখ্যাত নয়। প্রতিষ্ঠানের র‍্যাঙ্কিং এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের র‍্যাঙ্কিং যদি ভালো হয় তাহলে ভর্তির প্রতিযোগিতাও কঠোর। যেসব স্কুলগুলোর র‍্যাঙ্কিং খুবই কম সেগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে। তেমন অনেক প্রতিষ্ঠান ভর্তির যোগ্যতার ব্যাপারে শিথিল (Flexible) হয়।
একটি ইউনিভার্সিটির র‍্যাঙ্কিং তাহলে কী করে বুঝব? বছর বছর এই র‍্যাঙ্কিং করার জন্য বহু সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান কাজ করে। আমি ব্যক্তিগতভাবে Times Higher Education (THE), যে র‍্যাঙ্কিং করে, সেটাকে অনেক মানসম্পন্ন ও নির্ভরযোগ্য মনে করি। একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, গবেষণার জন্য শুধু প্রতিষ্ঠানের র‍্যাঙ্কিং গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রধানত কোন গবেষকের অধীন কাজ করবেন সেটা গুরুত্ব দেওয়া অধিকতর জরুরি। যে বিষয়ে পড়তে চান সে বিষয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে কত ভালো পাঠ ও গবেষণা হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
ভালো স্কুলগুলোতে ভর্তির জন্য ভালো ফলাফল থাকা গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি পিএইচডি পেতে হলে ভালো জিপিএ থাকতে হয়। অনেকের হয়তো ভালো জিপিএ থাকে না। সে ক্ষেত্রে জিআরই ও টোফেল টেস্টে ভালো স্কোর থাকলে সেটা সহায়ক হতে পারে। গবেষণায় অভিজ্ঞতা (Research Experience) থাকাটা অনেক বেশি সাহায্য করে।
আমি বেশ কয়েকজন চাইনিজ সহকর্মী পেয়েছি যাদের জিআরই ও টোফেল স্কোর খুব ভালো নয়। তবে তারা সহজেই স্কলারশিপ পেয়েছে। কারণ ব্যাচেলরেই তাদের একাধিক পাবলিকেশন (Research Publications) ছিল। গবেষণার অভিজ্ঞতা থাকলে কিংবা বড় কোনো অধ্যাপকের অধীন কাজ করলে সেটা পিএইচডি স্কলারশিপ পেতে অনেক সাহায্য করে। বড় অধ্যাপক/গবেষকের সুপারিশপত্র (Recommendation Letter) এতে ভূমিকা রাখে।
অনেক ভারতীয় ও চাইনিজ শিক্ষার্থী ব্যাচেলরের তৃতীয় বর্ষ থেকেই গবেষণার চিন্তা করে। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাচেলর পর্যায়ে গবেষণা নেই। খুব শিগগিরই এটা চালু করতে হবে। ব্যাচেলর স্টুডেন্টদের গবেষণা জ্ঞান না থাকলে, অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারব না।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে যুক্তরাষ্ট্রে পড়া যাবে কিনা এমন একটি প্রশ্ন প্রায়ই শুনতে হয়। চেষ্টা থাকলে অবশ্যই পড়া যাবে। যদি কেউ ভালো ফলাফল করেন এবং জিআরই–টোফেলে ভালো স্কোর তুলতে পারেন তাহলে সম্ভব হবে না কেন? আগেই বলা হয়েছে, গবেষণার অভিজ্ঞতা খুবই কাজে আসে। স্বেচ্ছাসেবক কাজ ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাও ভর্তির জন্য সহায়ক হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক এজেন্সি কাজ করে। অনেকের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগও ওঠে। যারা যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখেন তাদের নিজেদের আগে অনেক বিষয়ে ধারণা নিতে হবে। কাজের জন্য কারও সাহায্য নেওয়া ক্ষতির কিছু নয়। তবে নিজে জেনে কারও সাহায্য চাওয়া ভালো। তাহলে প্রতারিত হওয়ার সুযোগ কম থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোর ওয়েবসাইট থাকে। সেখানে ভর্তির জন্য যা যা দরকার তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। সময় নিয়ে এগুলো পড়তে হবে। নিজের মতো করে একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
ভিসা প্রাপ্তির সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকেই মনে করেন, সবকিছু ঠিক থাকা সত্ত্বেও অ্যাম্বাসি (Embassy) ভিসা ইস্যু করে না। এটা সত্য যে, অ্যাম্বাসি নানান কারণেই ভিসার আবেদন বাতিল (Reject) করে। তবে উচ্চশিক্ষার জন্য ভিসার আবেদন খুবই কম বাতিল হয়। যদি কোনো শিক্ষার্থী ভালো স্কুল থেকে সঠিক একসেপ্টেন্স লেটার (Letter of Acceptence) পেয়ে থাকেন এবং নির্ভুলভাবে ভিসার জন্য আবেদন করেন তাহলে ভিসা বাতিলের সম্ভাবনা খুবই কম।
তাই অন্যের কথায় নিজের আস্থা না হারিয়ে সঠিকভাবে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশ থেকেই হাজার হাজার ছেলেমেয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পৃথিবীর নানান প্রান্তে ছড়িয়ে গেছেন। তাদের সবাই আপনার মতোই! সুতরাং অ্যাম্বাসি ভিসা দেবে কি দেবে না, সে চিন্তা না করে আগে নিজেকে যোগ্য করার চেষ্টা করতে হবে। যোগ্যের জন্য পৃথিবীর বহু দ্বার খুলে যায়। (চলবে)
ড. রউফুল আলম, গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া, যুক্তরাষ্ট্র। (ইমেইল: <rauful.alam15@gmail.com>
আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন।
পর্ব এক: http://www.prothom-alo.com/durporobash/article/1058101
পর্ব দুই: http://www.prothom-alo.com/durporobash/article/1056017

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়