টক ফলের যথার্থ ব্যবহারে রোগমুক্তি এবং সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা
টক ফলের যথার্থ ব্যবহারে রোগ মুক্তি এবং সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা
যে কোন টক ফলে স্বাস্থ্যবান্ধব এসিড আছে। পৃথিবীতে যত রকম ফল আছে তার মধ্যে টক জাতীয় ফলের সংখ্যা মিষ্টি ফল থেকে বেশী। কেবলমাত্র তিন ধরনের এসিড শরীরের জন্য উপকারী যেমন সাইট্রিক (citric), মলিক (malic), টার্টারিক (tartaric) এসিড স্বাস্থ্যের পক্ষে আবশ্যক এবং হিতকর।
শরীরের পক্ষে প্রয়োজনীয় এসিড বিভিন্ন ফলের মধ্যে পাওয়া যায়। সব ধবনের লেবু জাতীয় ফলে (কাগজী, পাতি, বাতাবী, গোড়া, গন্ধরাজ ও কমলা) প্রচুর সাইট্রিক এসিড পাওয়া যায়। আপেল, নাসপতি, আঙুর ও টমেটোর মধ্যে মলিক এসিড আছে আর টার্টারিক এসিড সমৃদ্ধ ফল হচ্ছে তেঁতুল।
লেবুঃ
লেবু শরীরের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভেতরে এবং বাইরে সব জায়গায় শোধন করতে পারে। শুধুমাত্র লেবু ব্যবহার করে গ্যাসটিক, সর্দিকাশি, ব্রঙ্কাইটিস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ব্রণ, ঘা, পাঁচড়া, আমাশয় এবং সব ধরনের জ্বর ম্যালেরিয়া এবং কিৃমির জ্বালাতন ইত্যাদি সারানো যায়। শুধুমাত্র লেবুর রস, পানি এবং মধু হতে পারে মানব কুলের স্বাস্থ্যরক্ষার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। খালি পেঁটে লেবু-পানি-মধু খেলে এসিড নিস্ক্রিয় হয়ে ক্ষার (alkaline) এ রূপান্তরিত হবে। লেবু রসের ভিটামিন সি রোগ নিরোধক এবং রোগ আরোগ্য-মূলক দুধরনের কাজ করে থাকে। লেবুর যথার্থভাবে ব্যবহার হলে শরীরের কেমিকেল (Acid-alkaline) ভারসাম্যতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। অনেকের ধারণা লেবু খেলে পেঁটে ক্ষতিকর এসিড হবে এটা আদৌ ঠিক না বরং শরীরে এসিডের ভাগটা কমিয়ে এ্যালকালির দিকে নিয়ে যাবে যা শরীরের জন্য কাম্য। তবে পেঁেট খাদ্যদ্রব্য থাকলে বা খাবারের সাথে লেবু খেলে পেটে এসিড হবেই এবং লেবুর বদনাম করতে পারবেন। তাছাড়া সূর্যাস্তের পরে লেবু ও যে কোন টকফল গ্রহণ বর্জণীয়।
টমেটোঃ
গুণের কারণে তাকে সবজি শ্রেণীতে না রেখে ফলের জাতে উন্নীত করা হয়েছে। টমেটোর মতো রক্ত পরিষ্কারক খাদ্য খুব কমই আছে। একে অ-রান্না খেতে হবে। লিভারের অকেজো অবস্থায়, কিডনীর অক্ষমতায়, বদহজমে টমেটো খুবই উপকারি। পুরাতন কোষ্ঠকাঠিন্য অবস্থায় ৬/৭ টি করে পাঁকা টমেটো (রান্না না করে) বিচিসহ প্রতিদিন সকালের নাস্তার ৪০/৫০ মিনিট পূর্বে এবং দুপুরের আহারের ১ ঘন্টা পূর্বে খেলে আশ্চর্য ফল পাওয়া যাবে। টমেটো নার্ভের যে কোন সমস্যায় খুব উপযোগী, ডাইবেটিস রোগীদের পক্ষে টমেটো সত্যিকারের সঞ্জীবনী সুধা। মেদ-চর্বি এবং ওজন কমাতে টমেটো একটি মোক্ষম ঔষধ হিসাবে গণ্য হতে পারে। মৌসুমের সময় শুধু পরিপুষ্ট পাঁকা টমেটোর সালাদ লবণ ছাড়া তিন বেলা প্রধান আহারের ৪০/৫০ মি. পূর্বে খেলে শরীরের ওজন কমে যাবে। বিশেষ নিয়ম মেনে খেলে টমেটো হতে পারে কঠিন রোগের মহা ঔষধ। কচি কাঁচা অপুষ্ট টমেটো চলবে না। ঔষধীগুণ পেতে হলে পাঁকা টমেটোর কোন কিছু না ফেলে লবণ চিনি ছাড়া খেতে হবে। ভাত-রুটি-সবজি-ডাল খাবারের সাথে টমেটো খেলে এসিড বাড়বে তাই আহারের সঙ্গে টমেটো খাওয়া যাবে না। ঐ একই কারণে সালাদে টমেটো দেওয়াও যাবে না। সব সময় মনে রাখতে হবে টমেটো রান্না করলেই শরীরে এসিড বৃদ্ধি পাবে। আর এসিডিটি বাড়া মানেই রোগ হওয়া এবং রোগ থাকলে এর বাড়াবাড়ি হবেই।
আপেল ঃ
প্রবাদ আছে প্রতিদিন একটা আপেল খেলে আর ডাক্তার লাগে না। কোষ্ঠবদ্ধতাই প্রায় সব রোগের আদিকারণ। কোষ্ঠবদ্ধতা সারাতে আপেল একটা অব্যর্থ ঔষধ হিসেবে গণ্য। প্রতিদিন সকালে নাস্তার পূর্বে ২-৩ টি করে আপেল খেলে অল্প দিনের মধ্যেই কোষ্ঠবদ্ধতা নিরাময় হবে। আবার ডায়রিয়া বা বারে বারে পায়খানা হলে আপেল খুবই উপকারি। পেটের যে কোন সমস্যায়, কিডনীর দূর্বলতায় নিয়মিত আপেল খেলে উপকার পাওয়া যাবে। যাদের স্নায়ুরোগ এবং মস্তিষ্কে অবসন্নতা রোগ রয়েছে তাদের জন্য আপেল একটা মোক্ষম ঔষধ তবে কাঁচা খোসাসহ নাস্তার ৩০ মি. পূর্বে এবং দুপুরের খাবারের ৪০/৫০মি. পূর্বে খেলে অভূতপূর্ব ফল পাওয়া যাবে। আপেল খাওয়ার অভ্যাস করলে শরীরের কোথাও পাথুরি সৃষ্টি হবে না। সুস্থ থাকতে প্রতিদিন দুইবার খালি পেঁটে আপেল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অপারেশন করতে হবে এমন টনসিল রোগী ১ সপ্তাহ আপেল ডায়েট হিসাবে নিলে টনসিল সেরেই যাবে।
আঙুর ও কিসমিস ঃ
ঔষধী গুণের কারণে আঙুর একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। পুরানো কোষ্ঠবদ্ধতায় বেশী করে খেলে সেরে যাবে। যে কোন রোগ নিরাময় হতে গেলে প্রধান শর্ত পেট পরিষ্কার থাকা। আঙুর ও কিসমিস এর যথার্থ ব্যবহার করলে শ্বাস সংক্রান্ত সব ধরনের রোগ, হৃদরোগ, কিডনীর গোলযোগ সবরকম বাত বেদনা ইত্যাদি আরোগ্য পাওয়া যায়। রক্ত স্বল্পতায় আঙুর এবং কিসমিস অত্যন্ত উপকারি খাদ্য। কমপক্ষে ৪০-৫০ টি কিচমিস রাতে এক কাপ পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে কিচমিসগুলি পানি সহ খেতে হবে। এভাবে প্রতিদিন কিসমিস খেলে শরীর ভাল থাকবে, কোষ্ঠবদ্ধতা দূর হবে এবং রক্ত স্বল্পতাও দূর হবে। একইভাবে ১০০ গ্রাম পুষ্ট আঙুর সকালে খেলে স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকবে।
টক ফল কখনই বিকেলের পর খাওয়া ভাল নয়। এই ফল খেতে হবে খালি পেটে সকালে বা দুপুরের আহারের অন্তত ৩০মি. পূর্বে। এই ফল অন্য যে কোন খাবার বিশেষ করে শ্বেতসার (ভাত, রুটি, ডাল) এবং অন্য কোন মিষ্টি ফলের সাথে মিশিয়ে খাওয়া যাবে না। তাই ভাত ডালের সঙ্গে লেবু, তেঁতুল, টমেটো বা এর আঁচার-চাটনি খাওয়া ক্ষতিকর। টক ফল সবজির সাথে মিশিয়ে খাওয়া ভাল নয়। লেবুরস দিয়ে সালাদ, তেঁতুল মেখে সবজি, টমেটো ডাল বা সবজি খেলে পেটে এসিড সৃষ্টি করবে। যাদের এসিডিটি আছে তাদের জন্য টমেটো সস, চাটনি, আপেল সেদ্ধ, লেবু চা, আনারসের মোরব্বা, কিচমিসের চাটনি, পেয়ারার জেলী, আমের জেলী আচার ইত্যাদি যে কোন টক ফলের তাপে পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা খাবার বর্জনীয়।
কেবল তাজা টক ফল দিয়েই রোগ আরোগ্য, নিরাময়, প্রতিকার এবং সুস্থ নিরোগ দেহের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। শরীরে রোগ প্রতিরোধক এবং নিরাময়কারী ক্ষমতা তখনই থাকবে যখন শরীরে এসিডের মাত্রা শতকরা ২০ ভাগ এবং এ্যালকেলির মাত্রা শতকরা ৮০ ভাগ থাকবে।এই এসিড এবং এ্যালকেলির ভারসাম্য শুধুমাত্র টক ফলের যথার্থ ব্যবহার করেই সম্ভব অন্য কোন প্রকারে নয়। তাই টক ফলের ব্যবহারে সবারই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
Comments