কালো আর লাল কালির পথ-দুই


গ্লোরিয়া আনজালদুয়া, অনুবাদ: জেসিকা ইসলাম | ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫
লেখিকা গ্লোরিয়া আনজালদুয়া
(পূর্ব প্রকাশের পর) আমার জেগে দেখা স্বপ্নগুলো মূলত বদল নিয়ে। চিন্তা চেতনার বদল, বাস্তবতার বদল, লিঙ্গের বদল। একজন মানুষের আকৃতি রূপান্তরিত হয় অন্য পৃথিবীতে। যেখানে জনপদ বাতাসে উড়ে বেড়ায়, বেঁচে ওঠে নশ্বর ক্ষত থেকে। আমি নিজেকে নিয়েই খেলছি, আমি পৃথিবীর আত্মা নিয়ে খেলছি। আমি আধ্যাত্মিক পৃথিবীর সঙ্গে আমার নিজেরই সংলাপ, আমি নিজেকে বদলাই, পৃথিবীও বদলে যায়।
মাঝে মাঝে আমি কল্পনা শক্তিকে আরও ভিন্ন ভাবে ব্যবহার করি। আমি শব্দ, ছবি, শারীরিক অনুভূতি বেছে নিয়ে আমার চেতনায় প্রয়োগ করি। এভাবেই আমার বিশ্বাস আর চেতনাবোধকে নতুন ভাবে সৃষ্টি করি। এর মধ্যে দিয়েই আমি আমার ভেতরের দৈত্যদের সম্মুখীন হই। তারপর আমি সিদ্ধান্ত নেই আমি কাদের আমার সত্তার মধ্যে রাখব। যাদের আমি চাই না তাদের আমি অনাহারে রাখি। তাদের আমি কোনো শব্দ কোনো ছবি কোনো অনুভূতি উৎসর্গ করি না। আমি তাদের কোনো সময় দিই না বা আমার ঘরে আশ্রয় দিই না। অবহেলিত হয়ে তারা চলে যায়। এটা করা শুধু গল্প তৈরি করার থেকেও অনেক কঠিন। এভাবে আমি বেশিক্ষণ চলতে পারি না।
আমি আমার ভেতরের আখ্যানের কথা লিখি। আমার নিজেরই যে আখ্যান। যে আখ্যানে আমি রূপান্তর হতে চাই—শব্দ, ছবি ও অনুভূতির এক ধরনের প্রত্যক্ষ শক্তি ও প্রভাব আছে।
আমার আত্মার দৃষ্টি থেকে ছবি নিয়ে মানানসই শব্দ খুঁজি সেই ছবিকে নতুন করে সাজানোর জন্য। শব্দেরা কচি ঘাসের মতো বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে কাগজের ওপর ছড়াচ্ছে; শব্দের আত্মারা রূপান্তর হচ্ছে রক্ত মাংসের শরীরে। 
শব্দদের শরীরের মধ্যে আসা যাওয়া রক্ত মাংসের মতোই স্পষ্ট বা বাস্তব; কিছু সৃষ্টি করার প্রয়োজন হাত ও আঙুল থাকার মতোই অত্যাবশ্যকীয়। আমি আমার আঙুলের দিকে তাকিয়ে দেখি সেখানে পালক গজাচ্ছে। আমার হাত থেকে পালক থেকে কালো আর লাল কালির ফোঁটা কাগজে ছড়িয়ে পড়ছে।
Escribo con la tinta de mi sangre. আমি লাল কালিতে লিখি।। ঘনিষ্ঠ ভাবে কাগজের মসৃণ ছোঁয়ার কথা জেনে, তার বাকরুদ্ধতাকে সামনে রেখে আমি নিজেকে ছড়িয়ে দিই গাছদের ভেতরে। প্রতিদিন আমি নিঃশব্দতা আর লালের সঙ্গে যুদ্ধ করি। প্রতিদিন আমি আমার গলা টিপে ধরে রাখি যতক্ষণ না কান্না বের হয়ে আসে, আমার বাগ্‌যন্ত্র আর আমার আত্মা প্রতিদিনের এই যুদ্ধের কারণে ক্ষতবিক্ষত।
অন্ধকারকে ঘিরে কিছু কাজ
‘Quien canta, sus males espanta.’
—un dicho
ঘিনঘিনে ব্যাঙটি তার লুকানোর জায়গা থেকে আমার মাথার ভেতর বের হয়ে আসছে। এটা আবার ঘটতে যাচ্ছে। এই ব্যাঙের ভূত যে আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল আমি তাকে আমার হাতের মধ্যে ধরে রাখি। আমার ধমনি থেকে সব শক্তি, আমার ফ্যাকাশে হৃদয় থেকে রক্ত চুষে নিচ্ছে এই প্রাণীটা। আমি যেন সাপের খোলসের মতো, বাতাস আমাকে দ্রুত উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে মাটির ওপর দিয়ে। আমি টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছি দেশ জুড়ে। অন্ধকারে একটি পঙ্গু মাকড়সাকে হামাগুড়ি দিয়ে নর্দমার দিকে চলতে দেখি আর একদিনের পুরোনো সংবাদপত্র নোংরা বৃষ্টির পানিতে ডানা ঝাপটায়।
লেখনী অনেক উদ্বেগের উৎস। নিজের গভীরে ও অভিজ্ঞতা খুঁচিয়ে দেখে, নিজের দ্বন্দ্বকে খুঁজে বের করে, আমার ভেতরে অস্থিরতার জন্ম নেয়। লেখিকা হওয়া কিছুটা চিকানা (Chicana) অথবা অশিষ্ট (queer) হওয়ার মতোই, অনেক দোমড়ানো মোচড়ানো, অনেক দেয়াল ডিঙিয়ে আসা। অথবা এর উল্টো, কোনো নির্দিষ্ট কিছুর বাইরে, এক অপরিসীম, চির ভাসন্ত অবস্থায় আটকে থাকা, যেখানে আমি অস্থির হয়ে চিন্তা করি। তারপর কিছু একটা ঘটার অপেক্ষা করি।
এ রকম মানসিক অশান্তির শেষ প্রান্ত থেকেই শিল্পীরা সৃষ্টি করে আর কবিরা লেখে। ঠিক যেন ক্যাকটাসের কাটা মাংসের মধ্যে গেঁথে যাওয়া। যত গভীরে গেঁথে যায় আমি তত খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এর বেহাল অবস্থা করি। কিন্তু পচন ধরলে আমার কিছু একটা করে এই কাঁটা উপড়ে ফেলতে হবে আর দেখতে হবে এই কাঁটাটা এখনো কেন আছে। কাটার একদম গোড়া পর্যন্ত গিয়ে উপড়ে ফেলি, কোনো যন্ত্র সংগীতকে যেভাবে বাজানো হয় সেভাবেই আঙুল দিয়ে শক্ত করে ধরে ব্যথাটাকে তীব্র করে ফেলি একদম তুলে ফেলার আগে। আর কোনো অস্বস্তি নেই, নেই কোনো বিরোধ। যতক্ষণ না আর নতুন কোনো কাঁটা ঢোকে। আমার কাছে লেখালিখি এ রকম একটা ব্যাপার—এক অবিরাম চক্র সবকিছু খারাপ করার, তারপর আবার ভালো করার, কিন্তু সব সময়েই অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু অর্থ বের করে আনা।
লেখালিখি করা অথবা লেখক হতে হলে বক্তা হিসেবে আমার নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হয়। আমার ছবিগুলোতে নতুন কণ্ঠ দিতে আমার বিশ্বাস করতে হবে যে আমি আমার ছবির সঙ্গে শব্দের সংযোগ ঠিক ভাবে ঘটাতে পারি। আমার সৃষ্টিশীলতার ওপর আমার বিশ্বাসের অভাব আমার নিজের ওপর বিশ্বাসহীনতার সমতুল্য। আমি আমার লেখনী থেকে আমার জীবনকে আলাদা করতে পারব না। এ দুই মিলেই আমার জীবন।
আমি যখন লিখি মনে হয় হাড় খোদাই করছি। মনে হয় আমি আমার নিজের অবয়ব, নিজের হৃৎপিণ্ড তৈরি করছি নাহুয়াল (nahual) চিন্তাধারা। আমার আত্মা নিজেই বারবার জন্ম নেয় নিজের ভেতরে, গড়ে তোলে এই সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে। এই কটকেলিউকে (coetlecue) নিয়ে বেঁচে থাকা শিখতে গিয়েই সীমান্ত প্রান্তের দুঃস্বপ্ন এক অলৌকিক অবস্থায় রূপান্তরিত হয়। এ অন্য কোথাও পৌঁছানোর রাস্তা।
In Xóchitl in cuīcatl
অনুবাদক জেসিকা ইসলাম
সে লেখে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। কিছু একটা বের হয়ে আসতে চাইছে। সে শব্দগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করে, তাদের হেলিয়ে নিচে ফেলে দেয়, যেন মধ্য রাতে মর্নিং সিকনেস ভুগছে কোনো মহিলা। এর থেকে কত সহজ হতো নয় মাস একটা বাচ্চা পেটে রাখা তারপর তাকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া। কিন্তু এ রকম একাধিক গর্ভধারণ তাকে একদম মেরে ফেলতে যাচ্ছে। সে হচ্ছে রণক্ষেত্র, যাকে কেন্দ্র করে চিত্ররা শব্দে রূপান্তর হওয়া নিয়ে লড়াই করে। জাদুকরের (la musa burja) কোনো আদবকায়দা নেই। সে কি জানে না রাত হচ্ছে ঘুমের জন্য?
সে এখন নরকের দরজার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। পাড়ের কাছে গিয়ে টলছে, ভারসাম্য ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে আর চিন্তা করছে যে সামনে ঝাঁপ দেবে নাকি নিচে নামার নিরাপদ পথ খুঁজবে। এভাবেই সে নিজেকে অসুস্থ করে ফেলে-স্থগিত করে রাখে নিজের অন্ধকূপে চোখ বেঁধে নেমে পড়া থেকে, যেখানে অন্ধকারের গভীরে তার নিজের মুখোমুখি হতে হবে, যেই মুখ মুখোশের আড়ালে আছে।
মুখগহ্বর হওয়ার মূল্য অনেক বেশি। তার সারা জীবন ওই মুখের দাসত্ব মেনে নেওয়া। Todo pasaba por esa boca, el viento, elfuego, los maresy la Tlerra. তার শরীর, আড়াআড়ি পথ, একটি নড়বড়ে সেতু, ওপর দিয়ে চলন্ত কার্গোর ওজন সে বইতে পারে না। সে ‘থামুন’ ও ‘চলুন’ সংকেত আলো বসাতে চায় সব জায়গায়, কারফিউ জারি করতে চায়, কবিতার পুলিশ বসাতে চায়। কিন্তু কিছু একটা বের হয়ে আসতে চাইছে। 
রুদ্ধ (Coatlicue-কতলেকেউ সময়) আমার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত। আমি যেসব বিহ্বলতার মধ্যে দিয়ে যাই তা আরও বড় সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ার উপসর্গ সাংস্কৃতিক স্থানান্তর (cultural shifts). এ ধরনের সাংস্কৃতিক অনিশ্চয়তা (cultural ambiguity) একই সঙ্গে আমাকে লিখতে বাধ্য করে আবার লেখার বাধাও ঘটায়। এই আটকে থাকার সময়ের একদম শেষে আমি চিনতে পারি আর মনে করতে পারি এটা আসলে কি। আর যখন তা ঘটে ওই মুহূর্তে আমার চেতনার আলো সব বাধাকে মিলিয়ে দেয়, আমি নিজেকে বরণ করে নেই অন্ধকারের গভীরে, আমার অন্তরাত্মা থেকে কে যেন বলে ওঠে, আমি লড়তে লড়তে ক্লান্ত। আমি সমর্পণ করি, আমি মুক্ত করে দিই, সব দেয়াল ভেঙে পড়ে। যে রাতে সব অভিযোগ স্বীকার করি, Hazolteotl, diosa de la cam negm। আমার মাথার খুপরি থেকে তেলাপোকা বের হয়ে আসছে, হাড় এর ভেতর যে ইঁদুররা বাস করে তারা বের হয়ে আসতে চায়। আমার চোখ উপড়ে ফেলো, আমার দৈত্যকে আমার রাতের অন্ধকার কূপ থেকে বের করে আনি। যে বাঘ আমাকে অনুসরণ করে তার মুখে আলো জ্বেলে ধরি। আমি হাল ছেড়ে দিলাম, ছাড়া পাওয়া ভয়ংকর মৃত আত্মারা আমার মুখের ওপর দাঁত বসাচ্ছে। আমার আর প্রতিরোধের শক্তি নেই। আমি আত্মসমর্পণ করছি, সব ছেড়ে দিয়েছি, আর সব দেয়াল ধসে পড়ছে।
আর গভীরে নামতে নামতে আমি বুঝতে পারি এই নিচু পথ আসলে আসলে ঊর্ধ্বগামী, আমি উঠতে থাকি গভীরের মাঝে। আবারও আমি বুঝতে পারি প্রতিকূলতা একজন মেস্তিযা-Mestiza লেখককে (ছিঁড়ে না ফেললেও) টেনে আনে মাটির গভীর থেকে। যেখানে সে শস্য ও পানি নিয়ে এক হয়েছিল। তাকে নাহুয়াল হিসেবে বের করে আনে। তাকে পরিবর্তনের প্রতিনিধি বানায়, আদিম শক্তির আকৃতি পরিবর্তন করে। সে কারণেই সে পরে মানুষকে, নিজেকে মুরগি, নেকড়ে, গাছ ও মানুষে রূপান্তরিত করতে পারে।
আমার পূজার বেদির সামনে virgen de coatlaxopeuhকে বসিয়ে, ধূপ জালিয়ে আমি আমার কম্পিউটারের সামনে বসি। আমার সাথি একটি কাঠের সাপ, গায়ে যার ঠাসা পাখির পালক। সে আমার ডান পাশে বসে থাকে যখন আমি উপমা আর প্রতীকের রাস্তায় মনোনিবেশ করি আর আমার সত্তা আর আমার দেহকে বিহ্বল করি। এই লেখন আমার সম্পূর্ণ জীবন, এটাই আমার অনুক্ষণ। আমার রাক্ষসের মতো মেধা অন্য কোন অভিযাত্রাকে চায় না। প্রতিদিন আমি তার সঙ্গে প্রণয় করি এবং আমার মাথা তার দাঁতের নিচে সঁপে দিই। এ রকম বিসর্জন সকল সৃষ্টিতেই গুরুত্বপূর্ণ। এক করতের বলিদান। কেননা শুধুমাত্র শরীর দিয়েই, রক্ত মাংসের মধ্যে দিয়েই মানুষের আত্মার পরিশোধন সম্ভব। গল্প, কথা, ছবি এসব এর মধ্যে রূপান্তরের ক্ষমতা থাকে, তাদের মানুষের দেহ থেকেই উঠে আস্তে হবে রক্ত-মাংস ও এই পৃথিবীর শরীর থেকে, পাথর, আকাশ, তরল, মাটি থেকে। এই কাজ, এই সব ছবি, জিহ্বায় অথবা কানের লতায় গেঁথে থাকা ক্যাকটাসের কাঁটা, এসব কিছু আমার আজতেকান (Aztecan) রক্তের বিসর্জন। (শেষ)
লেখিকার বর্ডারল্যান্ডস বইয়ের দ্য পাথ অব রেড অ্যান্ড ব্ল্যাক ইন্‌ক অংশ থেকে অনূদিত। সংক্ষেপিত।
(অনুবাদক জেসিকা ইসলাম মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরপ্রবাসী)

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়