গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে পেশাজীবী পরিষদের গোলটেবিল : দেশে গণতন্ত্র না থাকায় সরকার গুম হওয়া স্বজনদের আহাজারি শুনছে না, গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় বসিয়ে গুম-খুনের বিচার করা হবে, বিরোধীমতকে দমনে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গুমের ঘটনা ঘটছে


স্টাফ রিপোর্টার
« আগের সংবাদ পরের সংবাদ»
পেশাজীবী পরিষদের গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেছেন, বর্তমান সরকার শুধু অগণতান্ত্রিকই নয়, তারা গণতন্ত্রবিরোধী। দেশে গণতন্ত্রের কোনো নমুনা উপস্থিত নেই। তাই সরকার গুম হওয়া স্বজনদের আহাজারি শুনছে না। বিরোধীমতকে দমনে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব গুমের ঘটনা ঘটেছে। বক্তারা বলেন, পুলিশ-র্যাব সরকারেরই অংশ। সুতরাং গুম-খুনের জবাব শেখ হাসিনাকেই দিতে হবে। 
বক্তারা বলেন, রাজনীতির অর্থ হলো নীতির রাজা। কিন্তু এ সরকার রাজনীতির নামে রাজার নীতি অনুসরণ করছে। তাইতো গুম-খুন দিন দিন বেড়েই চলছে। নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় বসিয়ে এসব গুম-খুনের সঙ্গে জড়িতদের বিচার করা হবে। 
গতকাল রোববার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ আয়োজিত আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০১৪ উপলক্ষে ‘গুম ও বর্তমান বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।
বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও বিএফইউজের সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন গাজীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল আলোচনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, মহাসচিব এমএ আজিজ, পেশাজীবী নেতা শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া, প্রফেসর ড. এমএ আজিজ, ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, প্রফেসর এম শামছুল আলম, রফিকুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান, প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম রিজু, এবিএম মোশারাফ হোসেন, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের মহাসচিব মো. শরীফুল ইসলাম, সাবেক ছাত্রনেতা সাইফুর রহমান প্রমুখ। এছাড়া বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সদস্য সচিব ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। 
গোলটেবিল আলোচনায় বর্তমান সরকারের আমলে গুম হওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদী ও ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমের ছোট ভাইসহ ১৭ নেতাকর্মীর পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত হয়ে মিডিয়ার সামনে গুমের ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরিবারের সদস্যদের এ কান্না দেখে সভায় উপস্থিত কেউই তাদের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। এ সময় এক হ্নদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। 
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, র্যাবের সঙ্গে গুম হওয়াদের বা তাদের স্বজনদের কোনো শত্রুতা নেই। তাহলে র্যাব পরিচয়ে কেন তাদের গুম হতে হলো। তিনি বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের আহাজারিতেও সরকারের মন গলছে না। বিরোধীমতকে দমনে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব গুমের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় বসিয়ে এসব গুম-খুনের সঙ্গে জড়িতদের বিচার করা হবে। দেশের সাবেক এ রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশে গণতন্ত্রের কোনো নমুনা উপস্থিত নেই। তাই সরকার গুম হওয়া স্বজনদের আহাজারি শুনছে না। তিনি বলেন, গুম-খুনের জবাব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই দিতে হবে। তিনি বলেন, র্যাবকে দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই। তারা হুকুম তামিল করে। এর জন্য দায়ী সরকার। এর জবাব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই দিতে হবে। গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে গুম-খুনের বিচার করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশ-র্যাব সরকারেরই অংশ। সুতরাং তারা যদি গুম, খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে তার দায় সরকারকেই নিতে হবে।
র্যাবের বিলুপ্তি দাবি করে বি. চৌধুরী বলেন, একদিন জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবেই। জনগণের সরকার গুম-খুনের বিচার করতে বাধ্য হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা বাধ্য করব। তিনি বলেন, ইলিয়াস আলীর সন্ধানের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার স্ত্রী দেখা করেছিলেন। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিলেও ইলিয়াস আলীর সন্ধানে তার আন্তরিকতা দেখা যায়নি।
তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘আমার অবস্থান আমি জানি’। এ কথার মাধ্যমে বুঝা যায় তিনি ভয়ে আছেন। গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো ভোটার ভোট কেন্দ্রে যায়নি। ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এ অগণতান্ত্রিক সরকারের কাছে আর কি আশা করা যায়। এই সরকার শুধু অগণতান্ত্রিকই নয়, তারা গণতন্ত্রবিরোধী। স্বজনহারাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আজকে আপনাদের সঙ্গে আমিও মর্মাহত। এ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে। গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা হলে জাতীয় ও সরকারি কমিটি গঠন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গুম-খুনের বিচার করা হবে।
সভায় সাবেক নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ বলেন, গুম-খুন তথাকথিত উন্নত বিশ্বের সংস্কৃতি। আমাদের দেশে এসব আমদানি করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজনীতিবিদদের অশালীন ভাষা প্রয়োগকে তিনি ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য নেতিবাচক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অশালীন ভাষা প্রয়োগের কারণে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম রাজনীতিবিদদের সম্মান ও শ্রদ্ধা করা থেকে বিরত থাকবে।
তিনি আরো বলেন, আপনারা যা করছেন তা মানুষের কাজ নয়। এগুলো অমানুষের কাজ। নিজেদেরকে মানুষ হিসেবে চিন্তা করতে পারলেই অন্যের ওপর অত্যাচার থেকে বিরত থাকতে পারবেন। তিনি বলেন, রাজনীতির অর্থ হলো নীতির রাজা। কিন্তু এ সরকার রাজনীতির নামে রাজার নীতি অনুসরণ করছে। তাইতো গুম-খুন দিন দিন বেড়েই চলেছে। 
সভাপতির বক্তব্যে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক রুহুল আমিন গাজী বলেন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আমি অংশগ্রহণ করেছি। তখন পাকসেনারা যে ব্যক্তিকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যেত তারও কিন্ু্ত হদিস পাওয়া যেত। কিন্ু্ত বর্তমান সরকার ওই পাকবাহিনীর বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। তাদের মধ্যে এসব পরিবারের আর্তনাদ নাড়া দেয় না।
তিনি বলেন, আজ গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা গুমের ঘটনা বলতে গিয়ে নিজে কেঁদেছে আমাদেরকেও কাঁদিয়েছে। তাদের ব্যথা সারা দেশের মানুষ বুঝলেও শেখ হাসিনা বুঝেন না। তিনি বলেন, গুমের দায় র্যাব অস্বীকার করতে পারবে না। 
গুম হওয়া ব্যক্তিদের অপরাধ কী ছিল প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, গুম হওয়া প্রত্যেকটি পরিবারে আজ অন্ধকার নেমে এসেছে। এসব পরিবার অত্যন্ত মানবেতরভাবে জীবনযাপন করছে। তিনি বলেন, বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম গুম হওয়ার পর তার ছোট ভাই প্রতিবাদ করায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। ইলিয়াস আলীর বৃদ্ধা মা আজো তার জন্য অপেক্ষায় আছেন। নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের ঘটনায় মিডিয়ার ভূমিকার প্রশংসা করে এ সাংবাদিক নেতা বলেন, এ ঘটনা কারা ঘটিয়েছে তা দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট। আর এ জন্যই সরকার বিচারপতিদের কন্ট্রোলের ব্যবস্থা করছে। কারণ হাইকোর্ট সেভেন মার্ডারের ব্যাপারে রুল দিয়েছিল।
রুহুল আমিন গাজী বলেন, গত ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচন হলো। ৫৯টি কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। ওইসব কেন্দ্রে কুকুর আর ছাগল ছাড়া কাউকে দেখা যায়নি। নির্বাচন হয়নি ১৫৪টি আসনে। নির্বাচন লীগ মাত্র ৫ পার্সেন্ট ভোটকে ৪০ পার্সেন্ট ভোট দেখিয়েছে। এ সরকার সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। তাদের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই। তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার দৈনিক আমার দেশ, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি ও চ্যানেল ওয়ানসহ বিভিন্ন মিডিয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে দ্বিতীয়বারের মতো কারাগারে আটক রেখেছে। সাংবাদিক সাগর-রুনির হত্যার বিচার আজো হয়নি। মিডিয়ার কণ্ঠরোধ করতেই সম্প্রচার নীতিমালা করা হয়েছে। এত কিছুর পরও শেষ রক্ষা হবে না। 
সভায় বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে বলেন, স্বজনদের আহাজারি আপনি শুনেছেন। তাহলে আপনার হ্নদয়ে কেন নাড়া দেয় না। অভিযোগের আঙ্গুল আপনার দিকে। এর দায় আপনি এড়াতে পারবেন না। তিনি বলেন, আপনি বলেছিলেন এক লাশের বদলে দশটি লাশ পড়বে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপনাকে বিকৃত মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসব বুদ্ধিজীবীরা উস্কানি দিচ্ছেন।
সভায় গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদী বলেন, কোনোদিন ভাবিনি আমার স্বামীকে এভাবে হারাতে হবে। আমি অনেকবার মিডিয়ার সামনে কথা বলেছি। তিনি (ইলিয়াস আলী) ছিলেন আমার বন্ধুর মতো। ছিলেন খুব সাহসী।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু আজ প্রায় তিন বছর হলো কোনো কিছু দেখছি না। কারা তাকে নিয়েছে তা দেখা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু সরকার রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছে। তিনি আরো বলেন, আমার শাশুড়ি বলেছেন তিনি মৃত্যুর আগে তার পুত্রকে দেখতে চান। জানি না উনার আশা পূরণ হবে কিনা। তিনি বলেন, আমার মতো আর কোনো স্ত্রীকে যেন স্বামীর জন্য এভাবে অপেক্ষা না করতে হয়।
সভায় গুম হওয়া চৌধুরী আলমের ছোট ভাই খুরশিদ আলম বলেন, ইন্দিরা রোড থেকে সাদা পোশাকধারী পুলিশ আমার ভাইকে তুলে নিয়ে যায়। আজো ফেরত পাইনি। পরবর্তী সময়ে আমার বাসায় নাকি বোমা রয়েছে এ মিথ্যা অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়। বর্তমানে আমার জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিএনপি করাটাই ছিল আমাদের অপরাধ।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়