হামের সুরক্ষার বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা বাড়ছে: ভুল সময়ে হেপাটাইটিস ‘বি’র টিকা ২০ লাখ শিশু হামের ঝুঁকিতে শিশির মোড়ল

প্রিন্ট সংস্করণ



দেশের প্রায় ২০ লাখ শিশু হাম হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এর বড় কারণ, টিকা না পাওয়া। আবার নবজাতকেরা হেপাটাইটিস ‘বি’র টিকাও পাচ্ছে দেরিতে। ফলে এই মরণ ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসবই বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড়সড় ফাঁকফোকরের চিত্র।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের হাম হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইপিআই নামে পরিচিত টিকাদান কর্মসূচিটির দুর্বলতা এর বড় কারণ। হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস থেকে যকৃতের জীবন বিপন্নকারী সংক্রমণ হতে পারে। এর টিকা দেওয়ার কথা জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। কিন্তু বাংলাদেশে এটা দেওয়া হচ্ছে জন্মের ষষ্ঠ সপ্তাহে। হাম ও হেপাটাইটিস-‘বি’ ভাইরাসের কারণে দেশে বছরে কত মানুষের মৃত্যু হয়, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) একাধিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ইপিআইয়ের আরও কিছু দুর্বলতা ধরা পড়েছে। সাধারণভাবে শতকরা ১০টি শিশু এক বা একাধিক টিকা পায় না। সরকার স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য হিসেবে এই কর্মসূচির উদাহরণ দেয়। তবে মোট ৪৩ জেলায় ইপিআইয়ের কোনো না কোনো ঘাটতি আছে। ৯টি জেলার পরিস্থিতি ২০১৪ সালের তুলনায় খারাপ হয়েছে।
ইপিআইয়ের আওতায় বর্তমানে শিশুদের ১১টি টিকা দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল দেশে এক বছরের কম বয়সী সব শিশুকে ৬টি সংক্রামক রোগের টিকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। রোগগুলো হলো যক্ষ্মা, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, নবজাতকের ধনুষ্টঙ্কার ও হাম। ২০০৩ সালে হেপাটাইটিস ‘বি’র টিকা দেওয়া শুরু হয়। ২০০৯ সাল থেকে যুক্ত হয় হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘বি’র টিকা। ২০১২ সাল থেকে হাম ও রুবেলার (এমআর) টিকা একসঙ্গে এবং ১৫ মাস বয়সে শিশুকে হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া শুরু হয়। শিশুদের নিউমোকক্কাল নামে নিউমোনিয়ার টিকা সংযোজিত হয় ২০১৩ সালে। এ ছাড়া পোলিওর একটি টিকা ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। আগামী বছর থেকে রোটা ভাইরাসের টিকাও এই ১১টির সঙ্গে যুক্ত হবে বলে ইপিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রতিটি ইউনিয়নে তিনটি করে টিকাদান কেন্দ্র আছে। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে টিকাদানের জন্য নির্দিষ্ট স্থান আছে। সব মিলে দেশে ১ লাখ ২০ হাজার স্থায়ী টিকাদান কেন্দ্র আছে। এসব কেন্দ্রে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে টিকা দেওয়া হয়।
হাম ছড়াচ্ছে
গত জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার ত্রিপুরা গ্রামে হামে আক্রান্ত হয়ে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়। হামে আক্রান্ত আরও ৮৫টি শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্তে দেখা গেছে, ওই গ্রামের কোনো শিশু কোনো দিন কোনো টিকা পায়নি।
এর আগে মে মাসে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় হামে আক্রান্ত রোগীর খবর পাওয়া গিয়েছিল। রাজধানীতে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। এ নিয়ে ২৩ মে প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় খবর ছাপা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, কোনো দেশ থেকে হাম দূর করতে চাইলে ৯৫ শতাংশ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০১৬ সালের মধ্যে সেটা পূরণের লক্ষ্যও ছিল, কিন্তু তা অর্জিত হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সর্বশেষ ইপিআই মূল্যায়ন (২০১৫) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ৮৭ শতাংশ শিশু হামের টিকা পায়।
টিকা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা দেওয়া হলেও সব শিশুর শরীরে সমানভাবে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা গড়ে ওঠে না। যেমন ১০০ শিশু টিকা পেলেও তাদের মধ্যে ১৫ জনের শরীরে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা গড়ে উঠতে না-ও পারে। প্রাকৃতিক কারণে এটা ঘটে এবং সব দেশের ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য। টিকা না পাওয়া এবং রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা গড়ে না ওঠায় শিশুদের হামের সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না। তারা সহজে হামে আক্রান্ত হতে পারে।
ইপিআই কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য বলছে, সুরক্ষার বাইরে থাকা এ রকম শিশু ২০১৪ সালে ছিল ৭ লাখ ৬০ হাজার ৬৬৭ জন। ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ লাখ ৮২ হাজার ১২৭ জনে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১৯ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫৭।
চলতি বছরের হিসাব ইপিআই থেকে পাওয়া যায়নি। তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, সংখ্যাটি কমপক্ষে ৫ লাখ হবে। সব মিলে এমন শিশুর পুঞ্জীভূত সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। এই শিশুরা হামের ঝুঁকিতে আছে। এরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে, হাম ছড়াচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইপিআইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ৩২ লাখের কিছু বেশি শিশুর হামের টিকা পাওয়ার কথা। তবে সব শিশু তা পায় না। তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারিতে হাম ক্যাম্পেইনের সময় সব শিশুকে হাম ও রুবেলার (এমআর) টিকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্যাম্পেইনের পর থেকে টিকা না পাওয়া এবং প্রতিরোধশক্তি গড়ে ওঠেনি, এমন শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। পুঞ্জীভূত এই সংখ্যা এখন অনেক বড় হয়েছে।’ তিনি জানান, ২০১৮ সালে সব শিশুকে টিকা দেওয়ার বিশেষ পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ভুল সময়ে টিকা
হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসজনিত সংক্রমণে যকৃতে তীব্র সংকট হতে পারে, তেমনি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাও দেখা দেয়। আক্রান্ত মানুষের রক্ত বা বীর্যের মতো তরল পদার্থের সংস্পর্শ থেকে এই ভাইরাস ছড়ায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মামুন আল মাহতাব হেপাটাইটিস নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৮৬ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত।
রোগ প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সংক্রামক ব্যাধি বিভাগের পরামর্শক তাজুল ইসলাম এ বারি প্রথম আলোকে বলেন, জন্মের সময় মায়ের কাছ থেকে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক। গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মের সময় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ৯০ শতাংশ নবজাতকের দীর্ঘ মেয়াদে সংক্রমণ হয়। পরে লিভার সিরোসিস ও প্রাথমিক লিভার ক্যানসার হয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’র টিকা না দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রতিরোধে তিন ডোজ টিকার প্রয়োজন। প্রথম ডোজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ডোজ দিতে হবে জন্মের পরপরই, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। কিন্তু বাংলাদেশে এই টিকা দেওয়া হয় জন্মের পর ষষ্ঠ সপ্তাহে। ২০০৩ সালে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের টিকা দেওয়া শুরু হয়। ১৪ বছর ধরে ভুল সময়ে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীর আলম সরকার প্রথম আলোকে বলেন, বছরে প্রায় ৩২ লাখ শিশুর জন্ম হয়। এর মাত্র ১৩ শতাংশ শিশুর জন্ম হয় সরকারি হাসপাতালে। বাকি শিশুর জন্ম হয় বাড়িতে বা বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালে হয়তো টিকা জন্মের পরপর দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বাড়িতে জন্ম নেওয়া শিশুকে জন্মের পরপরই টিকা দেওয়া এখনই সম্ভব নয়। সরকারের সেই অবকাঠামো নেই।
তবে তাজুল ইসলাম এ বারি বলেন, সব শিশুকে জন্মের সময় টিকা দিতে সরকারের বছরে খরচ হবে মাত্র ১০ কোটি টাকা। আর এই টিকার সুবিধা হচ্ছে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় (৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এই টিকা প্রায় এক মাস রেখে দেওয়া সম্ভব।
প্রায় পাঁচ হাজার কর্মীর ঘাটতি আছে
ইপিআই কর্মসূচির দুর্বলতাগুলো সম্পর্কে স্বাস্থ্যসচিব সিরাজুল হক খান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে ইপিআই কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ইপিআইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, সারা দেশে মাঠপর্যায়ে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মীর ঘাটতি আছে। অনেক স্থানে তদারক করার কর্মকর্তার পদ খালি আছে। কিছু জেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অগ্রগতি ধরে রাখা সম্ভব হয় না।
টিকাদানের হার শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি। কিন্তু দুর্গম এলাকায় কম। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাগজপত্রে বলা হয়েছে, উপজেলা সদর থেকে কোনো স্থানের দূরত্ব হাঁটাপথে দুই ঘণ্টা বা তার বেশি হলে এলাকাটিকে দুর্গম বলে বিবেচনা করা হয়। সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের হামে আক্রান্ত ত্রিপুরা গ্রামটির দূরত্ব উপজেলা সদর থেকে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার রাস্তা। কিন্তু এই গ্রামে কোনো টিকা কার্যক্রম ছিল না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয় প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ডভিত্তিক তৃণমূল পরিকল্পনা (মাইক্রোপ্ল্যান) অনুযায়ী। ওই পরিকল্পনায় ত্রিপুরাপাড়ার উল্লেখ নেই বলে সেখানে টিকা কার্যক্রম ছিল না। অধিদপ্তর ত্রিপুরাপাড়ার তদন্ত প্রতিবেদনে বলেছে, এ রকম আরও ছোট ছোট জনপদ ওই পরিকল্পনা থেকে বাদ পড়তে পারে।
এ বিষয়ে শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান আবিদ হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইপিআই আমাদের গর্বের বিষয়। যেকোনো মূল্যে ইপিআইয়ের সাফল্য ধরে রাখতে হবে। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, এই রোগের হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করতে টিকার এলাকা বাড়াতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব বড় আকারে প্রচারাভিযানের মাধ্যমে সব শিশুকে টিকা দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ঠিক সময়ে হেপাটাইটিস ‘বি’র টিকা দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে। আর তা না হলে মূল উদ্দেশ্য সফল হবে না।

Comments

Popular posts from this blog

কিডনি ভালো রাখতে যখন তখন ওষুধ নয়