আমি ছিলাম মায়ের দুই চোখের বিষ। মা আমাকে দেখতে পারত না। বাসায় ফিরতে রাত হলেই গালমন্দ করত। চরিত্র নিয়ে কথা বলত। বলত, তুই আমার মেয়েই না। মায়ের ওপর আমার খুব রাগ হতো।’পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সময় মাকে নিয়ে এভাবে ক্ষোভের কথা বলেছে ঐশী রহমান। জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, ঐশী ছিল পরিবার থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন। মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই তাকে অপছন্দ করতেন। সে হয়ে পড়ে একা। এ কারণে পরিবারের চেয়ে বাইরের পরিবেশ তাকে বেশি টানত।বাবার সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল? এ প্রশ্নের জবাবে চুপ থেকেছে ঐশী। কিছুক্ষণ পর বলেছে, মায়ের চেয়ে বাবা তার কাছে প্রিয় ছিল। আর সবচেয়ে প্রিয় ছোট ভাই ঐহী। ঐশী বারবার বলেছে, ‘ওরা কেউ আমাকে বুঝতে চায়নি। সব দোষ আমার। আমি কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছি। বাবা-মায়ের খাবারের সঙ্গে ঘুমের বড়ি মিশিয়ে নিজের মতো ঘুরতে বেরিয়েছি।’১৬ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর পল্টন থানার চামেলীবাগের ভাড়া ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে বাথরুম থেকে বিশেষ শাখার (এসবি) পুলিশ পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রহমানের রক্তাক্ত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মা-বাবা খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ঐশীকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। গৃহকর্মী খাদিজা ও ঐশীর বন্ধু মিজানুর রহমান ওরফে রনিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তকাজে সহায়তা করছেন মাহফুজুর রহমানের কর্মস্থল এসবির কর্মকর্তারা।জিজ্ঞাসাবাদের পদ্ধতির ব্যাপারে জানতে চাইলে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বয়স বিবেচনায় রেখেই ঐশীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাকে সতর্কভাবে প্রশ্ন করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ দলে পুলিশের নারী সদস্যরাও রয়েছেন। তার ও গৃহকর্মী সুমির বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। নারী কর্মকর্তারা ঐশীর ভাই ঐহীর সঙ্গেও কথা বলেছেন। তবে ঐশী কখনো কখনো ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে বলে জানান পুলিশের কর্মকর্তারা। নিজের বয়স নিয়েও সে একেক সময় একেক কথা বলছে। পুলিশ জানিয়েছে, আট বছর বয়সী ঐহীকে নিকটাত্মীয়দের কাছে রাখা হয়েছে।ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী হত্যায় তাঁদের মেয়ে ঐশী রহমান জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে ঐশী নিজেই খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। পুলিশকে সে বলেছে, হত্যাকাণ্ডে সে অংশ নিয়েছে। যুগ্ম কমিশনার দাবি করেন, ঐশী পুলিশকে জানিয়েছে, বাবা ও মায়ের কফিতে সে ১০টি ঘুমের ওষুধ মিশিয়েছিল। রাতের বেলা সেই ট্যাবলেট মেশানো কফি দুজনকে খাওয়ানো হয়। রাত ১১টায় বাসায় ফিরে বাবা আর কফি খেতে চাননি। ঐশী বাবাকে অনুরোধ করে কফির মগ হাতে ধরিয়ে দেয়। সেই কফি খেয়ে বাবা ঐশীর বিছানাতেই ঢলে পড়েন।
প্রশ্ন উঠেছে, ঐশীর পক্ষে একা এভাবে খুন করা সম্ভব? অন্য কেউ কি তাকে সহায়তা করেছিল? পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। হত্যার সঙ্গে ঐশী, জনি ও মিজানুর ওরফে রনি তিনজনেরই ভূমিকা ছিল। তবে কার কোন পর্যায়ের ভূমিকা ছিল, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আরও দুজনকে পেলে এ প্রশ্নের জবাব মিলবে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় আটক ঐশীর বন্ধু পারভেজকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ঐশী বলেছে, তার বন্ধু জনি ও পরিচিত আরেকজন যুবক ঘটনার রাতে বাসায় ঢুকে হত্যাকাণ্ড ঘটায়। হত্যাকাণ্ডের পর মুখে পানি ছিটিয়ে গৃহকর্মীকে ঘুম থেকে টেনে তোলে ঐশী। এরপর তাকে দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করায়। ঐশী জানায়, মাকে খুন করার সময় চিৎকারে ছোট ভাই জেগে উঠলে তাকে নিয়ে বাথরুমে আটকে রাখা হয়। ঐশী দাবি করে, মা-বাবার মৃতদেহ সে ও গৃহকর্মী মিলে টেনে বাথরুমে নিয়ে যায়।
ঐশীর মাদকাসক্ত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে যুগ্ম কমিশনার বলেন, ঐশী মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণী পাস করে ধানমন্ডিতে অক্সফোর্ড স্কুলে ভর্তি হয়। এ স্কুলে আসার পর রনি-জনিসহ কিছু বখাটে বন্ধু জুটে যায়। তখন থেকেই সে ইয়াবা আসক্ত হয়ে পড়ে।
অক্সফোর্ড স্কুল কর্তৃপক্ষ গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ২০১০ সালের জুনে ঐশী অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হয়। পরের বছর সে স্কুল ছেড়ে যায়। ২০১১ সালের জুন মাসের পর সে আর স্কুলে আসেনি।
Comments