টেস্টোস্টেরন ভালো থাকার হরমোন
ডা. এ জেড এম আহসান
টেস্টোস্টেরন পুরুষ হরমোন নামে পরিচিত হলেও নারীদের শরীরেও থাকে। একজন সুস্থ নারীর শরীরের জরায়ু ও অ্যাড্রেনাল গ্রন্থিতে প্রতিদিন অন্তত ৩০০ মাইক্রোগ্রাম তৈরি হয়। পুরুষদের মতোই নারীদের শরীরে হরমোনের মাত্রা কমে গেলে অযথাই দুর্বল লাগা, সব সময় অসুস্থ মনে হওয়া এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। এ কারণেই বলা হয়, নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই টেস্টোস্টেরন হরমোনটির মাত্রা যেন ঠিক থাকে সেটি লক্ষ রাখা উচিত।
ইনজেকশন এবং কিছু ওষুধের মাধ্যমে এটি শরীরে প্রয়োগ করা যায়; কিন্তু প্রাকৃতিক উৎস থেকে এবং প্রাকৃতিক উপায় অবলম্বন করে শরীরে হরমোনটির মাত্রা ঠিক রাখা সবচেয়ে ভালো। কিছু উপায় অবলম্বন করলে মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায়ই শরীরে হরমোনটির মাত্রা বাড়ানো যায়।
হরমোনটি পুরুষদের পুরুষালি ভাব বাড়ায়; কিন্তু সঠিক মাত্রায় নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এটি ভালো ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ তৈরি ও যৌন তৃপ্তিতে।
আবার শরীরে যেকোনো আঘাতে যথাযথ প্রতিক্রিয়া দেখাতে, রক্তে লোহিত কণিকার পরিমাণ ঠিক রাখতে, প্রতিদিন ঘুমের ধরন ঠিক রাখতে, হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে, মাংসপেশি কর্মক্ষম করতে, কাজকর্মের প্রতি আগ্রহ ও কাজকর্ম করার শক্তি বৃদ্ধি করতে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই টেস্টোস্টেরন হরমোনের সঠিক মাত্রা বজায় থাকা জরুরি।
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নারী-পুরুষ উভয়ের শরীরেই এর মাত্রা কমতে থাকে; কিন্তু আরো কিছু কারণ আছে, যাতে বয়স না বাড়লেও টেস্টোস্টেরন কমে যায়। এগুলোর মধ্যে আছে ক্রনিক স্ট্রেস বা সব সময় মানসিক চাপে থাকা, শরীরে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যহীনতা, ভিটামিন ‘ডি’র অভাব, অতিরিক্ত শারীরিক ওজন, অপর্যাপ্ত ব্যায়াম ও স্টাটিন গোত্রের কিছু ওষুধ। আবার টেস্টোস্টেরন কমলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বেশি কমতে দেখা যায় শহুরে মানুষদের। সাধারণভাবে ৪৫ বছরের পর প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষই হরমোনটির স্বল্পতায় ভোগে।
হরমোন সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধ হিসেবে হরমোন গ্রহণ করেও স্বল্পতা মেটানো যায়। কিন্তু এর নানা রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। এসব ওষুধের লক্ষ্য শুধু যৌন চাহিদা সংক্রান্ত অসুবিধা দূর করা। তাই যাদের এ ধরনের অসুবিধা আছে, তারা প্রতিক্রিয়ার কথা না ভেবেই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করে।
তাই প্রাকৃতিক পদ্ধতি নিরাপদ ও ভালো।
তাই প্রাকৃতিক পদ্ধতি নিরাপদ ও ভালো।
মাঝে মাঝে উপবাস করা
এক বেলা বা দুই বেলা যদি কোনো ধরনের ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকা যায়, তাহলে পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা ২০০ থেকে ৪০০ গুণ পর্যন্ত বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়া মেডিক্যাল স্কুল পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যালরিযুক্ত খাবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে না খেলে টেস্টোস্টেরন ও হিউম্যান গ্রোথ হরমোন বহুগুণ বাড়ে।
ট্রেনিং
টেস্টোস্টেরন ও হিউম্যান গ্রোথ হরমোন—দুটিই সমহারে বাড়াতে চাইলে ওয়েট ট্রেনিং বা ভারোত্তোলন ধরনের ব্যায়াম মাঝেমধ্যে করতে হবে। আদর্শ হচ্ছে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন করা। যত বেশি চর্বি দহন করা হবে, টেস্টোস্টেরনের মাত্রা তত বাড়বে, উচ্চ রক্তচাপ কমাবে, হৃত্স্পন্দনজনিত অসুখ নিয়ন্ত্রণে রাখবে, মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাড়িয়ে স্মৃতিশক্তিসহ বুদ্ধিমত্তা বাড়াবে, শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বেশি নিঃসরণ করবে।
উপকারী চর্বি
খাবারে উপকারী চর্বি বা মনো-আনস্যাচুরেটেড ও পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বির পরিমাণ বাড়াতে হবে। জাংক ফুড বা ফাস্ট ফুড ও কার্বহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ কমাতে হবে। মাছের তেল, বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ খাওয়া ভালো। উপকারী চর্বি আছে কদুর বীজ, বাদাম, অ্যাভোকাডো প্রভৃতিতে।
লিভার পরিশোধক
লিভার বা যকৃৎ টেস্টোস্টেরনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। লিভার যদি ঠিকভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে হরমোন উৎপাদন ঠিক থাকে। লিভার ঠিক রাখতে অ্যালকোহল সেবন বাদ দিতে হবে। হেপাটাইটিসসহ ভাইরাস ইনফেকশন যেন না হয়, সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে।
মানসিক চাপ কমাতে হবে
হতাশা, রাগ, ক্ষোভ ইত্যাদিতে আপনাআপনি টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যায়। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে গেলে স্থায়ীভাবে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যায়।
ভিটামিন ‘ডি’
ভিটামিন ‘ডি’, যা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় সূর্যালোক থেকে, টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমনকি সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধ হিসেবে ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণ করলেও টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বাড়ে ৩০ গুণ।
চিনি কম খান
এখনই যদি টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ঠিক করার কথা চিন্তা করেন, সবার আগে বাদ দিন চিনি খাওয়া। চিনি যেভাবেই খান, ক্ষতি করবেই। চিনি খেলে রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে যায়, যা ঠিক করতে অগ্ন্যাশয় থেকে বাড়তি ইনসুলিন নিঃসরণ করতে হয়। এভাবে রক্তে চিনির মাত্রা বারবার বাড়লে একসময় শরীর ইনসুলিন রেসিস্ট্যান্ট হয়, ফলে টাইপ টু ডায়াবেটিস হতে পারে। আর ডায়াবেটিস হলে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে যায়।
যথেষ্ট ঘুমান
জার্নাল অব কারেন্ট ওপিনিয়ন অব এন্ডোক্রাইনোলজি, ডায়াবেটিস অ্যান্ড ওবেসিটিতে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত ঘুম এবং যথাসময়ে ঘুম প্রাকৃতিকভাবে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বাড়ায়। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা—গবেষকদের মতে এটাই ঘুমের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
Comments