লেখার সঙ্গে জীবনের তফাত থাকবে না’
- Get link
- X
- Other Apps
- পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্প্রতি গত হয়েছেন। সাজ্জাদ শরিফ এবিসি রেডিওর এক অনুষ্ঠানে ৪ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সে সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ প্রকাশ করা হলো।
সাজ্জাদ শরিফ: আপনার জন্ম ১৯৩৪ সালে, পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরে। আপনি তো বেশ বড় হয়েই গেছেন এখান থেকে। আপনার বিস্তর স্মৃতি আছে এখানকার।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: আমার জন্ম মাদারীপুরে, আগে মহকুমা ছিল, এখন জেলা। আমাদের বাড়ি যে গ্রামে ছিল তার নাম মাইজপাড়া। আমার মামাবাড়ি ছিল ওরই কাছাকাছি আমগ্রাম বলে একটা জায়গায়। আমগ্রাম ও মাইজপাড়ায় আমার বাল্যকালের অনেকটা সময় কেটেছে। আমার বাবা কলকাতা শহরে শিক্ষকতা করতেন। ফলে আগে থেকেই আমরা কলকাতা গিয়ে থাকতাম। তবে বছরে দুবার তো আসতামই। এক মাস-দেড় মাস-দু মাস করে থাকতাম। আমার যেটা উজ্জ্বল স্মৃতি সেটা হলো, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়, ১৯৪৩ সালে, কলকাতা শহরে বোমা পড়েছিল। তখন ভয়ে বহু লোক এদিক ওদিক পালিয়ে গিয়েছিল। আমাদের স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। তখনকার দিনে একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল, স্কুল বন্ধ হলে মাস্টাররা আর মাইনে পেত না। মাইনে না পেলে বাবা খাওয়াবেন কী? তিনি আমাদের সবাইকে পাঠিয়ে দিলেন আমাদের গ্রামের বাড়িতে। সেবার আমি এক বছরের বেশি গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। গ্রামের স্কুলে ভর্তিও হয়েছিলাম। ওই বয়সের স্মৃতিটা তো একেবারে জ্বলজ্বল করে। খুব অল্প বয়স থেকেই আমি ঘরকুনো। বই পড়ার নেশাই বেশি ছিল। তবে খেলাধুলা করতাম, সাঁতার কাটতাম—আমি তো এখানেই সাঁতার শিখেছিলাম।
সাজ্জাদ: আপনার মা-বাবার কথা কিছু বলবেন?
সুনীল: আমার বাবার বাড়িটা ছিল একটু গরিব। বাবার বাবা ছিলেন টোলের পণ্ডিত, আর বাবা শিক্ষক। তখনকার দিনে শিক্ষকেরা তো অতি সামান্য বেতন পেত। কাজেই আমাদের অবস্থাটা খুব একটা ভালো ছিল না। মা এসেছিলেন মোটামুটি একটা সচ্ছল পরিবার থেকে। মামাবাড়িতে অনেক সময় কাটিয়েছি। উৎসব-টুৎসবগুলো মামাবাড়িতেই বেশি হতো।
সাজ্জাদ: আপনারা শেষ কবে চলে গেলেন এখান থেকে?
সুনীল: আমরা তো থাকতাম কলকাতায়। দেশভাগের সময় যখন গন্ডগোল, তখন ওই দাঙ্গাহাঙ্গামার ফলে আমরা আর আসিনি। তবে দেশভাগের পরেও, ১৯৪৮ সালের দিকে, আমি এখানে একবার এসেছিলাম, আমার এক মামার বিয়ে খেতে। তখনকার মতো সেই আমার শেষ আসা। তারপর আবার এখানে এসেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর।
সাজ্জাদ: আপনার অর্জুন উপন্যাসে যে শরণার্থীদের আমরা দেখি, মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে পাওয়ার জন্য যারা লড়াই করছে, ওটা আপনার...
সুনীল: ওটা ঠিক আমার নিজের জীবন নয়, আমার দেখা জীবন। ওই যে উদ্বাস্তুরা গিয়েছিল দীনহীন অবস্থায়, সেটা আমি জানি। আমরা তখন থাকতাম দমদমে। আমরা থাকতাম পাকা বাড়িতে, মধ্যবিত্ত পরিবার। কিন্তু আমাদের বাড়ির কাছেই আগেকার দিনের জমিদারদের বাগানবাড়ি ছিল। উদ্বাস্তুরা সেগুলো দখল করে নিয়ে কোনো রকমে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করে। আমি ওই কলোনিগুলো, ওদের যে সংগ্রাম এসব নিয়মিত দেখতাম। মাঝে মাঝে মনে হতো, আমার বাবা যদি এখানে চাকরি না করতেন, যদি তিনি আগেই এখানে না আসতেন, আমারও অবস্থা ওদের মতোই হতে পারত। ফলে একাত্মবোধ একটা ছিল।
সাজ্জাদ: আমরা জেনেছি, আপনার বাবা বেশ কড়া ছিলেন। আপনাকে ইংরেজি শেখানোর জন্য তিনি ইংরেজি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করতে দিতেন। আপনার মৌলিক কবিতা লেখার সূত্রপাতও ওইভাবেই বলা যেতে পারে।
সুনীল: আমরা তো বাঙাল। বাঙাল বাড়ির বাবারা হিটলারের মতো হয়। তাঁরা যা বলতেন, তার ওপর কিছু বলা যেত না। আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা হয়ে গেল। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরে তিন-চার মাস ছুটি থাকে। বাবার ধারণা ছিল, এই সময়টাতে ছেলেরা বখে যায়। আমাকে বাড়িতে আটকে রাখার জন্য টেনিসনের একটি কাব্যগ্রন্থ দিয়ে বললেন রোজ দুখানা করে অনুবাদ করতে। তাতে ইংরেজিও শেখা হবে। সে যে কী কষ্টকর ব্যাপার! বন্ধুরা যাচ্ছে সিনেমা আর খেলা দেখতে। আর আমি বাড়িতে আটকানো। বাবার মুখের ওপর কিছু বলতেও পারি না। রোজ দুটো করে কবিতা অনুবাদ করে বাবাকে দিতাম। বাবা তাতে টিক দিয়ে বলতেন, কাল আবার দুটো কবিতা অনুবাদ করে দেবে। কয়েক দিন বাদে লক্ষ করলাম, কবিতাগুলো বাবা লাইন ধরে ধরে মিলিয়ে দেখছেন না, খালি আকারটা দেখছেন—ইংরেজি কবিতাটি ১৮ লাইনের, বাংলাটাতেও ১৮ লাইন আছে কি না। আমি ভাবলাম, যদি উনি মিলিয়েই না দেখেন, তাহলে আমার হুবহু অনুবাদ করে লাভ কী? ১৮ লাইনের এলেবেলে কিছু লিখে দিলেই তো হয়। সে রকম করতে করতে আমি নিজের কবিতা লিখতে আরম্ভ করলাম। তারই মধ্যে একটি কবিতা ছিল ‘একটি চিঠি’। সেই বয়সে যা হয়, প্রেমের প্রথম মুকুল গজাচ্ছে। এক বন্ধুর বোনের সঙ্গে তখন বেশ মিষ্টি মিষ্টি ভাব হয়েছে। কিন্তু তাকে যে চিঠি দেব, তার সাহস নেই। তখন ভাবলাম, কোনো একটা পত্রিকায় ছাপিয়ে দিলেই তো হয়। তখনকার দিনে সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা ছিল দেশ। সেখানে পাঠিয়ে দিলাম সেই কবিতাটি। কী আশ্চর্য ব্যাপার! কবিতা সম্পর্কে কিছুই জানি না, অথচ সেটি ছাপা হয়ে গেল। ওই মেয়েটির বাড়িতে পত্রিকাটি রাখা হতো। মেয়েটি সেই কবিতাটি পড়েও ফেলল। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার, সে বিশ্বাসই করল না যে কবিতাটি আমার লেখা।
সাজ্জাদ: ১৯৫৩ সালে আপনারা কৃত্তিবাস পত্রিকাটি বের করলেন। এই পত্রিকা বের করার গল্পটি বলুন। আপনার বন্ধু দীপক মজুমদার বেশ চমকপ্রদ একটি চরিত্র ছিলেন।
সুনীল: দীপক অনায়াসে বড় বড় লোকের সঙ্গে গিয়ে গল্প করত। যাঁদের আমি দূর থেকে দেখে ভাবতাম, আরেব্বাবা! সে ওদের দাদা বলে ডাকত। শম্ভু মিত্র তখন নাটকের জগতে এক বিরাট ব্যক্তিত্ব। তাঁকে ও দিব্যি ‘শম্ভুদা’ বলে ডাকত। ও কবিতা লিখত। একদিন ও বলল, শোন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ আর কোলরিজ একত্রে একটি কবিতার বই করেছিল। তোমার-আমারও একটি মিলিত কবিতার বই বের করব। কবিতা বাছাই করা হলো। সে সময়ে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশক ছিল সিগনেট প্রেস। তারা জীবনানন্দ দাশ বা বুদ্ধদেব বসুর মতো বড় বড় বই বের করছে। তারা আমাদের বই কেন বের করবে? কিন্তু দীপক তো অকুতোভয়। একদিন সকালে সে আমাকে নিয়ে চলে গেল সেই প্রকাশনা সংস্থার মালিক দিলীপকুমার গুপ্তর ওখানে। আমরা দুটো বাচ্চা বাচ্চা ছেলে, মলিন জামাকাপড়। আর তাঁর সেই সাজানো-গোছানো, দারুণ শৌখিন বসার ঘর। সেখানে সংকুচিত হয়ে বসেছি। তিনি আমাদের শরবত খাওয়ালেন—ফ্রস্টেড গ্লাস, ঝালর দিয়ে ঢাকা। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, বই তো করতেই পারো। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি নিজেদের বই বের না করে কিছু করো, যাতে তোমাদের বয়সী আরও অনেকের লেখা ছাপা হতে পারে। একটা পত্রিকা করো।’ নামটার পরামর্শও তিনিই দিলেন। বললেন, ‘কৃত্তিবাসকে তো আমরা বাংলা ভাষার আদি কবিদের একজন বলে মনে করি। তাঁকে স্মরণ করে নামটা রাখো কৃত্তিবাস। কিন্তু কবিতা হবে একদম একালের।’ সেই থেকে শুরু।
সাজ্জাদ: কৃত্তিবাস পত্রিকাটিকে ঘিরে তো পঞ্চাশের দশকের কবিদের একটা বড় সমাবেশ গড়ে উঠল।
সুনীল: আস্তে আস্তে বিভিন্ন জায়গা থেকে তরুণ কবিরা এসে একটা গোষ্ঠীর মতোও হয়ে গেল।
সাজ্জাদ: আপনাদের নিয়ে তো বেশ একটা হইচই বেঁধেছিল। আপনি লিখলেন, ‘তিনজোড়া লাথির ঘায়ে রবীন্দ্ররচনাবলী লুটোয় পাপোষে।’
সুনীল: ওই বয়সটাতে এগুলোই খুব ভালো লাগে। যত নিন্দা হয়, হইচই হয়; ততই মনে হয়, বাহ, তবে ঠিকই হচ্ছে। তা ছাড়া আমরা, আমাদের কবি বন্ধু যারা ছিল তারা তো চেয়েইছিলাম, আগের প্রজন্মের কবিদের একটু ধাক্কা দিতে।
সাজ্জাদ: এরপর আপনারা কলকাতার রাত মাতিয়ে রাখতে শুরু করলেন। শক্তিকে ও আপনাকে জড়িয়ে পুলিশ নিয়ে নানা কাণ্ডকীর্তির কথা আমরা শুনেছি।
সুনীল: শক্তি আর আমাকে নিয়ে পুলিশের অজস্র কাণ্ড আছে। একবার জার্মান কনসুলেটে আমি নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিলাম। কবি সমর সেনের সঙ্গে সেখানে আমার ঝগড়া হয়। তিনি তখন নকশালদের একজন নেতা। সত্যজিৎ রায় সে সময় আমার একটি উপন্যাস নিয়ে সিনেমা করেছেন। তো তিনি মনে করতেন যে সিনেমা-টিনেমা হচ্ছে বুর্জোয়া ব্যাপার। আমার গল্প নিয়ে যেহেতু সিনেমা হয়েছে, ফলে আমিও বুর্জোয়া হয়ে গিয়েছি। অর্জুন উপন্যাসটি নিয়েও তিনি মন্তব্য করলেন যে ওতে বড়লোকদের কথা বলা হয়েছে। এসব নিয়ে বেশ তর্কাতর্কি আর ঝগড়া হয়। আমি তো পান করেছিলাম। তাই ঝগড়ার ফলে মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল। সমর সেন প্রবীণ লোক, শ্রদ্ধেয় কবি। তাই চলে এলাম ওখান থেকে। একটা ট্যাক্সি নিয়েছি। সে অবস্থায় ঠান্ডা হাওয়ার ফলে একটু দিগ্ভ্রম হচ্ছিল। ট্যাক্সিঅলা মাতাল ভেবে আমাকে সোজা নিয়ে গেল থানায়। থানা দেখে আমি সচেতন হয়ে গেলাম। আমি ভাবছি, আরে, আমার কাছে তো ভাড়া আছে। আমাকে থানায় নিয়ে এল কেন? আমি ওকে বলছি, আমার কাছে তো ভাড়া আছে। ও কোনো কথাই শুনল না। ট্যাক্সিটা ঢুকিয়ে দিল ভেতরে। দেখি, একজন পুলিশ অফিসার কার সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। ট্যাক্সি ড্রাইভারটা তাঁকে গিয়ে কী যেন বলল। অফিসার আমার দিকে তাকাতেই আমি বললাম, আমার কাছে কিন্তু ভাড়া আছে। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে আমি চলে যেতে পারি। তিনি বললেন, হুম, এখানে রাত্রিবেলায় রোজ গন্ডগোল হয়। এ সমস্ত অদ্ভুত চরিত্র। কী করেন আপনি? বললাম, আমি আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। তিনি বললেন, আপনি চেনেন এই পত্রিকার কাউকে? আমি বললাম, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই চিনি। হঠাৎই কেন যেন, জানি না, তিনি বললেন, কবিতা লেখা হয় বুঝি? আমি ভাবলাম, লোকটা বোধ হয় কবিতা খুব ভালোবাসে। খুবই উৎসাহ নিয়ে আমি বললাম, হ্যাঁ, হ্যাঁ। নিজের কবিতা সম্পর্কে যেসব বলা উচিত নয়, ওঁকে অভিভূত করার জন্য সেসব বলতে লাগলাম। তিনি বললেন, একজন কবি আছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, তাঁকে চেনেন? আমি ভাবলাম, তিনি নিশ্চয় শক্তির বন্ধু। আমি বললাম, আমি শক্তির ভীষণ বন্ধু। তিনি আমাকে দিলেন প্রচণ্ড এক থাপ্পড়। আমি একেবারে মাটিতে পড়ে গেলাম। রাগ হয়েছিল খুব। মনে হয়েছিল, আমিও মারি। কিন্তু এটুকু চেতনা ছিল যে, থানার মধ্যে যদি পুলিশের গায়ে হাত দিই, তা হলে আমাকে শেষ করে ফেলবে।
সাজ্জাদ: আরও পরে মার্কিন বিট কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ কলকাতায় এসেছিলেন এবং আপনার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়েছিল। তাঁর কবিতা ‘সেপ্টেম্বর ইন যেসোর রোড’-এ আপনার নামও আছে...
সুনীল: শুধু সেটি নয়। ওর জীবনের শেষ কবিতা ‘থিংস আয়ল নট ডু’-তেও আমার নাম আছে। সেখানে আছে কোন কোন কাজ সে আর করতে পারবে না। তার মধ্যে একটি হলো, কলকাতায় গিয়ে সুনীলের সঙ্গে আর চা-কফি খাওয়া হবে না। গিন্সবার্গ তো তখন খুবই বিতর্কিত কবি। ওরা বিট জেনারেশন আন্দোলন করেছিল। ওরা খালি পায়ে হাঁটত, দাড়ি কামাত না, চুল আঁচড়াত না, বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে পুরোনো জামাকাপড় পরত। আমরা জানতাম সাহেবরা স্যুট-টাই পরে। এ রকম সাহেব আমরা কখনো দেখিনি। গিন্সবার্গ তো আরও মারাত্মক কথা বলত। ও বলত, কবিতা লেখা হচ্ছে ২৪ ঘণ্টার কাজ। ও তাই কোনো চাকরি-বাকরি করত না। কিন্তু আমি চাকরি না করলে ঘরের লোকেদের খাওয়াব কী করে। কিন্তু ওর কথা আমার কানে কানে ঘুরত।
সাজ্জাদ: আপনাদের কাছে আরেকটা চমকও হয়তো তাঁর ছিল। তিনি তো তাঁর ছেলেবন্ধু পিটার অরলভিস্ককে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন।
সুনীল: সেটাও তখন ছিল বিরাট এক ঘটনা। এখন তো মানুষ এসব ব্যাপারে অনেক ব্যাপারই জেনে গেছে। পিটার অরলভিস্ককে সে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিত ‘ইটস মাই ওয়াইফ’ বলে। এ কথা শুনে সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে যেত। লোকদের চমকে দেওয়ার জন্যই মনে হয় এ জিনিসটা সে একটু বেশি বেশি করে করত।
সাজ্জাদ: বেশ একটু সমস্যাও তো পাকিয়ে উঠেছিল ওকে নিয়ে। ওদের প্রভাবে কলকাতায় যে হাংরি আন্দোলন হয়, তাতে শক্তি, সন্দীপন, উৎপলকুমার বসুরা আপনাদের থেকে আলাদা হয়ে যোগ দিয়েছিলেন। মামলা-মোকদ্দমাও কিছু হয়েছিল। আপনিও আদালতে গিয়েছিলেন। ওদের নেতা মলয় রায়চৌধুরীকে এক চিঠিতে আপনি লিখেছিলেন, আমি পদ্মাপাড়ের ছেলে, এখন কলকাতায় থাকলে এক চড়ে তোমার দাঁত ফেলে দিতাম।
সুনীল: ওরা যখন শুরু করেছে, তখন আমি বিদেশে ছিলাম। ওরা নানা রকম মিথ্যে কথা বলত। লোককে আঘাত করার জন্য ওরা বিট জেনারেশনকে অনুসরণ করত। কারও কারও বাড়িতে মুখোশ পাঠিয়ে ওরা লিখে দিত, এখন থেকে মুখোশ পরে বেরোবেন। আমার এগুলো পছন্দ ছিল না। কৃত্তিবাস পত্রিকায় আমরা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দিয়েছিলাম, হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু যখন মামলা হলো—মামলা শুধু মলয়ের নামেই হয়েছিল—প্রথম সাক্ষ্য দিয়েছিলাম আমি। সেটাও নীতির ব্যাপার ছিল। আমার কথা ছিল, সরকার কেন সাহিত্যে বাধার সৃষ্টি করবে?
সাজ্জাদ: কলকাতায় আমাদের প্রয়াত কবিবন্ধু জয়দেব বসু লিখেছিলেন, পঞ্চাশের দশকের কবিদের মতো আত্মবিজ্ঞাপনে পারদর্শী আর কেউ নন। আপনি যখন উপন্যাস লিখতে এলেন, তখনো নিজের জীবন ব্যবহার করলেন। আপনার প্রথম উপন্যাস আত্মপ্রকাশ-এর নায়কের নাম সুনীল। প্রথমে আপনি বলুন, আপনি উপন্যাসে চলে এলেন কেন?
সুনীল: শখ ছিল একটু-আধটু লিখব। এত বেশি লিখব, কখনো তো ভাবিনি। আমেরিকা থেকে ফিরে এসে ভীষণ বিপদে পড়ে গেলাম। একেবারে বেকার। কী করি? আমি খবরের কাগজে ফিচার লিখতে শুরু করলাম। তখনই দেশ পত্রিকার সম্পাদক আমাকে ডেকে বললেন, এবার তোমাকে দেশ শারদীয়া সংখ্যার জন্য উপন্যাস লিখতে হবে। তখনকার দিনে একটাই উপন্যাস ছাপা হতো। সেই বছর থেকে সাগরময় ঘোষ ঠিক করেছেন, তিনটি করে উপন্যাস ছাপাবেন—প্রবীণ একজন প্রেমেন্দ্র মিত্র, মধ্যবয়সী সমরেশ বসু আর একেবারে তরুণ—প্রায় কেউ চেনে না—আমি। কী করে উপন্যাস লিখতে হয়, আমি জানি না। অন দ্য রোড উপন্যাসের বিখ্যাত মার্কিন বিট গল্পকার জ্যাক কেরুয়াকের কথা মনে পড়ে গেল। ও আমাকে বলেছিল, উপন্যাস লেখা ভীষণ সোজা। তুমি ঠিক করবে তোমার নিজের জীবনের একটি দিন। ধরো, ২৩ মার্চ তুমি কী করছিলে? হয়তো সেদিন তুমি একটি বাসস্টপে দাঁড়িয়েছিলে। আরম্ভ করে দাও সেখান থেকে। বাসস্টপে তুমি দাঁড়িয়েছিলে। বাসে উঠে পড়লে। বাসটা কোথায় গেল। এই করতে করতে দেখবে, হয়ে যাবে। তখন ভাবলাম, আমি তো বানিয়ে কিছু লিখতে পারব না। নিজের জীবন নিয়েই লেখা যাক। আগের দিন রাত্রিবেলা আমার এক বন্ধুর ভাই এসে বলেছিল, এসব আপনারা কী শুরু করেছেন? দাদা কাল রাত্তিরে বাড়ি ফেরেনি। দেখলাম, উপন্যাসটা এখান থেকে শুরু করাই সোজা।
সাজ্জাদ: উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের নামটা আপনি কেন সুনীল দিয়েছিলেন?
সুনীল: নতুন ধরনের একটা কিছু করার জন্য। বাংলা ভাষায় সাধারণত লেখকেরা তো নিজের নাম দেয় না। লেখকেরা নিজেরা জীবনে অনেক রকম কাণ্ড করে, কিন্তু লেখায় সেগুলো গোপন করে যায়। আমি ভাবলাম, লেখার সঙ্গে জীবনের তফাত থাকবে না। কবিতাতেও তাই। প্রথম দিকে যে উপন্যাসগুলো আমি লিখি, সব নিজের জীবনের কথা। চাপে পড়ে যখন অনেক লিখতে আরম্ভ করলাম, তখন দেখলাম, বারবার নিজের জীবন ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে পারা যাবে না। অল্প বয়স থেকে আমার প্রিয় বিষয় হচ্ছে ইতিহাস। ঊনবিংশ শতকের যে সময়টাকে আমাদের এখানে পুনর্জাগরণ বলা হয়ে থাকে, ভাবলাম, সেই সময়টাকে নিয়ে লিখি না কেন? স্বপ্নে দেখলাম, মাইকেল মধুসূদনের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের ঝগড়া হচ্ছে। ভাবলাম, এঁদের জীবন্ত করে লিখলেই তো হয়। এঁদের জীবনী লেখা হয়েছে, কিন্তু এঁদের তো উপন্যাসের চরিত্র করে লেখা হয়নি। এভাবেই সেই সময় উপন্যাসের শুরু।
- Get link
- X
- Other Apps

Comments